বর্ণপরিচয় : ১

অন্য ভালবাসার দলিল

১৯৯৮ সালে ভারতে দীপা মেহতা পরিচালিত ‘ফায়ার’ যখন মুক্তি পায়, তখন কলেজে ভর্তি হয়েছি সবে। সেই ছবি নিয়ে কাগজে নানা লেখালিখি চোখে পড়ছে। সবটা যে ভাল বুঝতে পেরেছি তখনই, এমনও নয়। তবে বড়রা সেই কাগজ কোনও না-কোনও ছুতোয় সরিয়ে ফেলত। সমকামিতা, লেসবিয়ান, হোমো শব্দগুলোর সঙ্গে সবে পরিচয় হচ্ছে তখন। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের প্রেম ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব আছে বলেই জানতাম না এর আগে। এবং না-জেনেই এক মহিলার প্রেমে পড়েছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে, আজ থেকে ২৮ বছর আগে হলেও, সেই প্রেম আমার নিজের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। এটা অদ্ভুত, বা অন্যায়— এমন ধারণা একবারের জন্যও কোনওদিন হয়নি। অনেক পরে এই ‘কুইয়ার আমব্রেলা’, সেক্সুয়াল ফ্লুইডিটি, নানা ভেদ এবং শ্রেণিবিভাজনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জেনেছি। তাই যখন প্রথম সমপ্রেমের ছবি দেখি, তখন সেটাকে আলাদা করে কোনও ব্র্যাকেটে ফেলতে হবে, এমন কথা  মাথায় আসেনি। 

তবে ‘ফায়ার’ নয়, কিম্বারলি পিয়ার্স পরিচালিত ছবি ‘বয়েজ ডোন্ট ক্রাই’ আমার দেখা প্রথম ছবি, যা দেখে ঘুমোতে পারিনি অনেক অনেক দিন। ছবিটা ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায়। আমার ধারণা, ২০০০ সালের অস্কারে নমিনেশন এবং পুরস্কৃত হওয়ার পর কলকাতায় নন্দনে এই ছবি রিলিজ করে। এইসব খবর খুব একটা পেতাম না, কারণ যৎসামান্য পকেটমানিতে কেবল কলেজ আর বাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়ার পারমিশন ছিল না, তাই এক্সপোজারও কম ছিল! কিন্তু কলেজের কোনও এক আঁতেল বন্ধু বোধহয় বলেছিল এই ছবির কথা। নামটা শুনেই চমকে গিয়েছিলাম। সিস-হেট পুরুষ হয়ে জন্মানোর কত প্রিভিলেজ, সেসব ভাল যে বুঝতাম, তা-ও নয়, কিন্তু এই তিনটে শব্দ মাথায় আটকে গিয়েছিল, যে ‘ছেলেরা কাঁদে না’। বান্ধবীর সঙ্গে গেলাম ছবিটা দেখতে। প্রায় কাঁপতে-কাঁপতে, কেঁদে অস্থির হয়ে, খুব, খুব ভয় পেয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম ছবিটা শেষ হওয়ার পর। নন্দনের সিঁড়ি বেয়ে নামছি, আশপাশে অনেক পুরুষ, সব্বাইকে তখন ঘেন্না করছে তখন, ভয় লাগছে। বান্ধবীকে আগলে-আগলে বের হচ্ছি। কারণ ছবির শেষে বা শুরুতে লেখা ছিল, সত্যি ঘটনা অবলম্বনে (এখন মনে নেই)। আজ থেকে ২৬ বছর আগে না ছিল ইন্টারনেটের রমরমা, না ছিল হাতের মুঠোয় ইনফরমেশন, না ছিল কোনওরকমের সেনসিটাইজেশনের অবকাশ। মনে হয়েছিল, দুটো মেয়ে প্রেম করলে, তাদের ছেলে বন্ধুরা চাইলে খুনও করে দিতে পারে! ঠিক যেভাবে মাত্র ২১ বছর বয়েসি ট্রান্সম্যান টিনা ব্র্যান্ডনকে তার ১৯ বছর বয়সি বান্ধবীর পুরুষ বন্ধুরা ধর্ষণ করে খুন করে ১৯৯৩ সালে, নেব্রাস্কায়। টিনা যে ট্রান্সম্যান, সেটা পরে বুঝেছি। তখন দেখছিলাম, একটা টমবয়েইশ মেয়ে টিনা আর সুন্দরী বান্ধবী লানাকে— যারা প্রচলিত যৌনতার বেড়াজাল ছাপিয়ে পরস্পরকে ভালবাসে। টিনা ছেলে বলে নিজের পরিচয় দিয়ে লানার মন জয় করেছিল। কিন্তু টিনার নারীসত্তার পরিচয় পাওয়ার পরও লানা তাঁকে ভালবাসতেই চেয়েছিল। ছবির এই ইমোশনাল কোর প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, ঠিকই তো, এমনটাই তো হওয়ার কথা। মানুষ ভালবাসা দিয়ে যেভাবে স্পর্শ করতে পারে, আর কোনওকিছু করেই কি তেমনভাবে ছোঁয়া যায়? মনে তো হয় না। নিজের ছোট চুল আর জিন্স টি-শার্ট পরার আসক্তি ছিল টিনার মতোই— সব মিলিয়ে এই ছবির অভিঘাত ছিল ভীষণ ব্যক্তিগত। সুদূর নেব্রাস্কায় সাত বছর আগে যে ঘটনা গিয়েছে, ২০০০ সালে ভারতে বা কলকাতায় এমন ঘটতেই পারে বলে, স্থির বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। 

‘বয়েজ ডোন্ট ক্রাই’ ছবির দৃশ্য

আরও পড়ুন: বিবাহ-পূর্ব যৌনতা কি ভারতীয় ঐতিহ্যের অংশ নয়?
লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…

যে জীবন বাঁচছি, সেই জীবনের ক্রাইসিস্ যখন ছবির পর্দায় দেখতে পাই, সেটা তখন আরও আপন মনে হয়, চেনা লাগে। সেইসব সিনেমা তখন নিজের যাপনের লড়াই, পাওয়া-না-পাওয়া, বৈষম্যের দলিল মনে হয়। আট কিংবা নয়ের দশকে বেড়ে ওঠা, বিহার থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত কুইয়ার জীবন যেভাবে প্রেমের এই বৃহৎ ছাতার তলায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্ততা করেছে, অবিরাম পথ খুঁজে চলেছে; সেই জীবনের সঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকে কিছু ছবি। সেসব ছবি যেমন স্মৃতিধার্য হয়ে যায়, তেমনই হয়ে ওঠে সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ-ও। 

২০০৫ সালে মুক্তি পায় ‘মাই ব্রাদার নিখিল’। জানা যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র অনির্বাণ ওরফে ওনির এই ছবি পরিচালনা করেছে। ‘গ্লোব’ সিনেমা তখনও বেঁচে। অন্য একটা ছবি দেখব বলে গিয়েছি, কিন্তু খানিকটা ভুল করেই ‘মাই ব্রাদার নিখিল’-এর শো দেখতে ঢুকে পড়া! নিজের দেশে হিন্দিতে এমন ছবি হয়েছে, ভাবতেই পারিনি। এইডস নিয়ে নানা মিথ এমনিতেই বহাল তবিয়তে ঘোরাফেরা করছে তখন। নিজেও যে সবটা ভাল বুঝি, এমন নয়। কিন্তু ওনিরের অত্যন্ত সংবেদনশীল ছবি চোখে আঙুল দিয়ে একজন এইডস আক্রান্ত গে পুরুষের যন্ত্রণা তুলে ধরে। সেখানে সমপ্রেম রয়েছে, কিন্তু শরীরী অন্তরঙ্গতা ফোকাসে নেই। আছে দুই পুরুষের পরস্পরের হাতে হাত রেখে, একজোট হয়ে সমস্ত বাধা-বিপদের সম্মুখীন হওয়া, আছে অনায়াসে একে-অন্যের কাঁধে মাথা রেখে আশ্বাস খুঁজে পাওয়া। একুশ বছর আগে গে পুরুষ, এইডস বা সমকামিতা নিয়ে যে প্রতিরোধ কাজ করত, তার জ্বলন্ত দলিল এই ছবি। এখনও প্রতিরোধ নেই, এ-কথা বলার উপায় নেই। এবং ছেলেরাও কাঁদতে পারে, এটা বুঝে গিয়েছি ততদিনে। কিন্তু ভালবাসা এমন এক ম্যাজিক মলম, যার স্পর্শ এক মৃতপ্রায় মানুষকেও এনে দিতে পারে হাজার বছর বেঁচে যাওয়ার সমান আশা, ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ তেমন ভালবাসার কথা বলে! 

সিস-হেট নারী-পুরুষের বাইনারি প্রেম ছাড়াও ভালবাসার সম্ভাবনা এবং ব্যাপ্তি যে আকাশছোঁয়া, সেই বিশ্বাস ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে। ভালবাসাকে কোনও ফর্মুলায় বেঁধে দেওয়া যায় না, এটা বিশ্বাস করেছি মনে-মনে। জীবন এবং সিনেমা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আর সেই বছরেই আইনক্স ফোরামে দেখেছিলাম ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’। কিছু কিছু ছবি থাকে, যা অনেক-অনেক আগে দেখলেও, তার রেশ অনেক অনেক দিন থেকে যায়। বছরের পর বছর। হয়তো ছবির অনেক উপাদান, সংলাপ, দৃশ্য ভুলে গিয়েছি, কিন্তু ছবির অভিঘাত একেবারে টাটকা! ঠিক যেমন হয়েছে ‘বয়েজ ডোন্ট ক্রাই’-এর  ক্ষেত্রে। শিরদাঁড়া বেয়ে যে নিরাপত্তাহীনতার স্রোত বয়ে গিয়েছিল ২৬ বছর আগে, ‘টিনা’-র কথা ভাবতে গিয়ে এই এতদিন পরও একইরকমভাবে কষ্টটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল! এটা কিন্তু কাকতালীয় নয়। সম্প্রতি যেভাবে ট্রান্স মানুষের অধিকার খর্ব করে, তার অস্তিত্ব সংকটে ফেলে নতুন বিল পাশ হল, তা মূল খবর প্রবাহ থেকে সরে গেলেও প্রান্তিক মানুষের মনে, অবচেতনে, মাসল মেমরিতে থেকেই যাবে। এই যে একটা লম্বা সময় ধরে নানা মানুষ নানাভাবে ভুগছে, ভয়ে বাঁচছে, অস্থির হয়ে আছে— কারণ প্রতিটা স্তরের মানুষকে নানাভাবে ক্রাইসিসে রেখে দিয়েছে ক্যাপিটালিস্ট রাষ্ট্র! তাই তো ২০০৫-এ দেখা অ্যাং লি পরিচালিত ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’ এখনও আমার কাছে প্রেমের ওয়েসিস! প্রকৃতির হৃদয়-গহ্বরে এমন এক রূপকথার রাজ্য, যেখানে যেমন খুশি ভালবাসা যায়। যেখানে সমাজের তৈরি করে দেওয়া নিয়ম খাটে না। যেখানে ভয় নেই, লজ্জা নেই, আছে কেবল ক্ষণিকের দ্বিধাহীন যাপনের গল্প। যেখানে আপাতদৃষ্টিতে দু’জন সিসজেন্ডার পুরুষ তাদের অবচেতনে ঘুমিয়ে থাকা অন্য আরেক সত্তাকে খুঁজে পায়। প্রকৃতির এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে, কেউ যদি এই অকৃত্রিমতার কাছে নতজানু হতে পারে, তাহলে সে নিজেকেও খুঁজে পেতে পারে। ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’ সেই হারানো প্রাপ্তির গল্প বলে। সেই অসাধ্য প্রেমের ট্র্যাজেডির গল্প বলে, যার সময়কাল ১৯৬৩ থেকে ১৯৮৩। ‘এনিস’ এবং ‘জ্যাক’ দু’জনেই ভেবেছিল এটা একবারের শরীরী প্রেম। দু’জনেই বলেছিল— ‘ইউ নো আই এইন্ট কুইয়ার… মি নিদার’। কিন্তু তবু দু’জনেই অপেক্ষা করে থাকত আবার কবে ‘মিডল অফ নো হোয়্যার’ পাহাড়ের কোলে, জনমানবহীন নির্জনে, ভেড়া চড়াতে গিয়ে তাদের দেখা হবে! দেখা হওয়া কমে আসতে-আসতে তারপর আর অনেকদিন আর দেখা হল না। ‘এনিস’ তো প্রাণপণ চেয়েছিল, বেরিয়ে আসতে। আর ‘জ্যাক’, ‘এনিস’-কে না পেয়ে তার শার্টখানাই নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল সংগোপনে। ‘এনিস’ কি ভাবতে পেরেছিল, যাকে সে প্রাণপণে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল সামাজিক লজ্জার ভয়ে, তার স্মৃতিটুকু আঁকড়ে শেষ বয়সটা কাটিয়ে দিতে হবে। এমন তুমুল প্রেমের ছবি, এমন করুণ প্রেমের ছবি, এমন ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রেমের ছবি দেখার পর কি আর প্রেমিক-যুগলের জেন্ডার আলাদা করে মনে প্রশ্ন তোলে! আমার কাছে ‘এনিস’ আর ‘জ্যাক’ প্রেমের দুই বাতিস্তম্ভ! যাদের দেখা মেলে একমাত্র ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’-এ। তেমন পাহাড়ি সবুজ পথ আমরা বোধহয় সারাজীবন ধরে খুঁজে চলি! 

ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, তাঁর কাজই তাঁর কাছে অ্যাকটিভিজম— অর্থাৎ তাঁর ছবি, তাঁর যাপন, এটাই তাঁর কাছে পথে নেমে প্রতিবাদ। বাংলার মানচিত্রে তাঁর জীবনবোধ, তাঁর কাজ লক্ষ করলেই বোঝা যায়, তাঁর নিজের জীবনের প্রতিটা সোচ্চার পদক্ষেপ যেন প্রাইড মার্চের বিজয়-পতাকা। তাই শুধু সিনেমা দিয়ে তাঁকে বেঁধে দেওয়া যাবে না বোধহয়। আজ অন্য দুটো ছবির কথা বলতে ইচ্ছে করছে। খুব যে লোকে দেখেছে, এমন নয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘আনোয়ার কা আজব কিসসা’ (২০১৩) তো মুক্তিও পায়নি। এই ছবিতে প্রাইভেট ডিটেকটিভ ‘আনোয়ার’ এক বিধবার অনুরোধে তার আপাত-হাসিখুশি স্বামীর আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে বেরয়। লোকটির কলকাতায় বাড়ি হলেও, সে-কাজ করত জামশেদপুরে। ‘আনোয়ার’ জামশেদপুরে গিয়ে নানা খোঁজ চালানোর পর খুঁজে পায় আর-এক পুরুষকে। সে মৃত ব্যক্তির সহকর্মী। আসলে তার প্রেমিক। সামাজিক লজ্জা এবং একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে শোক-প্রকাশেও সাবধানী। মৃত ব্যক্তির এই দ্বৈত জীবনের কথা জানত না কেউ। ‘আনোয়ার’-ও তার সীমিত শিক্ষায় দুই পুরুষের প্রেমের কথা শুনে হতবাক। কিন্তু যুবকটির দৃঢ় এবং শান্ত স্বরে এমন এক ভালবাসার অঙ্গীকার ছিল যে, আনোয়ারের মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সে বলেছিল, ‘আমি কখনও চাইনি, ওর ঘর ভাঙতে। ও তো মেয়েকেও খুব ভালবাসত। আমি তো কেবল ওকে ভালবাসতেই চেয়েছি। কিন্তু বাড়ি, আর অফিসের এই চাপ বোধহয় আর সহ্য করতে পারল না।’ গোটা ছবিতে ছোট্ট একটি অংশে জায়গা পেয়েছে এই প্রেমের গল্পটি। কিন্তু এমন এক সততার সঙ্গে গল্পটি বলা, আমরা বুঝতে পারি, প্রান্তিক ভালবাসা মেনে না নেওয়া সমাজের এক নিখুঁত রেখাচিত্র আঁকা হয়ে রইল খুব স্বল্প পরিসরেই। এখনও এমন বহু  গে অথবা বাইসেক্সুয়াল পুরুষকে এমন দ্বৈত জীবন যাপন করতে হয় নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। এমন কম্প্রোমাইজড বিয়ের কথা আমি জানি।

২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া পার্থ চক্রবর্তী পরিচালিত ছবি ‘সমান্তরাল’-এর কথাও মনে পড়ছে খুব সংগত কারণেই। আগেকার দিনে আমরা প্রায়ই দেখতাম, বাড়ির মামা-মাসি, কিংবা জেঠু-কাকা বা পিসিদের মধ্যে একজন কেউ অবিবাহিত রয়েই গিয়েছে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-রচিত লেখক ‘অজিত’-ও যেমন! কারণ স্পষ্ট করে বলা নেই, আবার বলাও আছে। বাড়ির ক্ষেত্রে প্রথমে আমরা ছোট, তাই কারণ বলা হত না, বড় হয়েও আমরা অনেকেই জানার চেষ্টা করি না হয়তো। ‘সমান্তরাল’ ছবিতে তেমন এক বিয়ে না করা মানুষ ‘অর্ক’-র কাকু ‘সুজন’। তাকে সবাই বলে খ্যাপা, মাথার গোলমাল আছে। তাই দিনের বেশিরভাগ সময়েই সে একটা ঘরে বন্দি হয়েই থাকে। তাকে খুব বেশি বেরতে দেওয়া হয় না। এই যে একটা মানুষ, যাকে সবাই অদ্ভুত বলে একঘরে করে দিয়ে পাগল প্রতিপন্ন করেছে— এমন মানুষের গল্প কি আমরা আমাদের জীবনে দেখিনি, শুনিনি!  এইভাবেই তো প্রান্তিক মানুষদের খানিক বুঝতে পেরে, কতক না-বুঝে সমাজ পাগল বলে দাগিয়ে দিয়েছে। সমাজ এবং ‘সুজন’-এর পরিবার তার ট্রান্সউওম্যান সত্তাকে আড়াল করতে গিয়ে কীভাবে তাকে পাগল বানিয়ে দিল— ‘সমান্তরাল’ সেই গল্প বলে। এই ছবির অ্যাপ্রোচে একটা সৎ গল্প বলার প্রচেষ্টা দেখতে পেয়েছিলাম আর নিজের পরিবারের একটা প্রতিচ্ছবিও। 

২০২১ সালে নীরজ ঘায়ান পরিচালিত ছোট ছবি ‘গিলি পুচি’ আমার দেখা হিন্দিতে অন্যতম সেরা বহুস্তরীয় আরবান কুইয়ার প্রেমের ছবি। যেখানে জেন্ডার আইডেন্টিটি, শ্রেণিবৈষম্য, পেট্রিয়ার্কি, সামাজিক রিচুয়াল, বর্ণবিভেদ— সমস্তটা নিয়ে দুই নারীর সম্পর্কের ধারাবিবরণী তৈরি করেছেন পরিচালক। খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘গিলি পুচি’। কারণ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দু’জন মানুষ কাছে আসবে কি না, তার নির্ণায়ক কেবল প্রেম নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তারতম্য সম্পর্কের রাজনীতিতে একটা প্রভাব বিস্তার করবে, এটা মেনে নিতেই হবে। নরম ভালবাসা কেবল ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’-এই পাওয়া যায়, ২০২১ এর পৃথিবীতে কঙ্কনা সেনশর্মা ও অদিতি রায় হায়দরি অভিনীত এই কুইয়ার প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শ্রেণি, অর্থনৈতিক অবস্থান, পেট্রিয়ার্কি। টিকে থাকার লড়াই যে পৃথিবীতে, সেখানে মানুষ সর্বহারা হয়ে ভালবাসতে পারে না, সম্ভব নয়— তা সে যেমনই সম্পর্ক হোক। সমপ্রেম হলে ফলাফল আলাদা হবে, ছাড় পাবে, তা কী করে হয়! এ-ও এক গুরুত্বপূর্ণ অবজারভেশন!

২০২৩-এর মালয়লম ছবি ‘কাঠাল দা কোর’-ও সমপ্রেমকে সামাজিক লেন্সের মধ্য দিয়ে এক  নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। জিও বেবি পরিচালিত এই ছবি প্রায় ‘বার্ডস আই ভিউ’ থেকে দেখায় কীভাবে এক সুখী দম্পতির সম্পর্কে ফাটল ধরে। স্বামী ভোটে বামপন্থী পার্টির হয়ে প্রার্থী হওয়ার পরপরই স্ত্রী ডিভোর্স চায়। কারণটা কেউ-ই মুখে স্বীকার করে না। কিন্তু স্বামীর যে অন্য এক দলিত পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক ছিল বা আছে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানেও আছে অবদমিত সমকাম এবং একই সঙ্গে শ্রেণিবৈষম্যের কথা, কারণ দলিত পুরুষটিকে কোনও এজেন্সি দেওয়া হয় না বা সে কী ভাবছে, এটা জানানো হয় না। কিন্তু পরিচালক, স্ত্রী কিংবা স্বামী— কাউকেই ভিলেন করে তোলেন না। কারণ প্রান্তিক মানুষের ভালবাসার পথে অন্তরায় কোনও একজন মানুষ হয় না। 

‘আলিগড়’ ছবির একটি দৃশ্যে মনোজ বাজপেয়ী

২০১০ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রফেসর ডক্টর শ্রীনিবাস রামচন্দ্র সিরাসের যৌনতা নিয়ে স্টিং অপারেশন, সমপ্রেমের কারণে অবমাননা, কলেজ থেকে সাসপেনসন, আইনি লড়াই জিতে গিয়েও তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর জানতে পারি। ২০১৫ সালে হনসল মেহতা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘আলিগড়’ ছবিটি তৈরি করেন। আত্মজীবনীমূলক এই ছবি বলিউডের টাইমলাইনে প্রান্তিক মানুষদের জীবন নিয়ে তৈরি হওয়া খুব শক্তিশালী প্রচেষ্টা। ঘটনাপরম্পরা মোটামুটি সকলেরই জানা। এই ছবি দেখতে গিয়ে যেটা সবচেয়ে বেশি ছাপ রেখে যায়, তা হল নাগরিক জীবনে একলা থাকা বার্ধক্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া প্রান্তিক মানুষের ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার কথা। যত দিন যায়, বয়স বাড়ে, রামচন্দ্র সিরাসের একাকিত্ব আমার কাছে আরও বেশি করে অর্থবহ হয়ে ওঠে। অল্প বয়েসে প্রান্তিক মানুষরা তাও সঙ্গী খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসে কুইয়ার মানুষ নিঃসঙ্গতার স্বাদ আরও বেশি করে টের পায়, কারণ সমাজ এখনও মেনে নেয়নি তার যৌন পছন্দকে। এই একাকিত্বের মার চাবুকের মতো। ফালাফালা করে করে কেটে রেখে দেয়। নিরুপায় করে তোলে মানুষকে। যাকে কেউ ভালবাসতে চায় না, সেই মানুষটা যখন একলা ঘরে সস্তা মদের গ্লাস হাতে লতার গলায় শোনে ‘আপকি নজরো নে সমঝা প্যার কে কাবিল মুঝে’, তখন মনে হয়, শ্মশানের নীরব অন্ধকার জীবনের একমাত্র সত্যি, একমাত্র মুক্তির পথ।

‘ব্র্যান্ডন টিনা’-কে বারংবার ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। আর যখন দুই পুরুষের আদরের অন্তরঙ্গ মুহূর্তে, ঘরে লোক ঢুকে সেটাকে জোর করে ক্যামেরাবন্দি করে বাজারে ছেড়ে দিল, সেটাও তো একরকমের হিংসা, যা কোনও ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না।

বারংবার নিজের যৌন পছন্দের কারণে নানা দেশে, শহরে-গ্রামে, সিনেমায়, সত্যি জীবনে মানুষকে প্রাণ খোয়াতে হচ্ছে। প্রাইড কোথায়? তবু প্রাইড আছে। সিরাস বলে, ‘ইজ ইট আ ক্রাইম টু লাভ হু ইউ লাভ?’ এই প্রশ্ন যুগে-যুগে মানুষ করে এসেছে, এবং ভবিষ্যতেও করবে। কোনও বিল পাশ করিয়ে, আইন চাপিয়ে দিয়ে মানুষের সবচেয়ে সহজাত অনুভূতি, ইচ্ছেমতো ভালবাসার অধিকার খতম করা যাবে বলে মনে হয় না।