নীতি, ধর্ম ও যুক্তি

বিমলকৃষ্ণ মতিলাল ও অসতর্ক এই সময়  

অঙ্কের একটি পেপারে কম নম্বর পাওয়ার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে রাশিবিজ্ঞান অনার্সের প্রথম তালিকায় ছাত্রটির নাম ওঠেনি, অথচ তার জীবনের স্বপ্ন ছিল রাশিবিজ্ঞানী হওয়ার। ফলে বিফল-মনোরথ সে যখন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ফিরে আসছে, তখন পথে আচমকাই সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজের (অধুনা মৌলানা আজাদ কলেজ) সংস্কৃতের অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা— আর এই দেখা হওয়াটাই বদলে দিল তার জীবনের মোড়। অধ্যাপক প্রস্তাব দিলেন, সে যদি সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজে সংস্কৃত নিয়ে পড়ে, তবে তিনি তাঁর বই, কলেজের বেতন ইত্যাদি খরচের ব্যাপারে সাহায্য করবেন। অনেক ভেবে আমাদের গল্পের ছাত্রটি এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। কারণ তার বাবা তখন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ফলে পারিবারিক অর্থাভাব চরমে উঠেছে। এক-এক সময় তার কাছে কাগজ কেনার মতো পয়সাও থাকত না, তাই বাস-ট্রামের টিকিটের পিছনে সে নোট লিখত। এমতাবস্থায় কলকাতায় পড়াশোনা চালাতে গেলে যে, এই সাহায্যকে উপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত হবে না— সে-কথা আগামী দিনের যুক্তিবিদের পক্ষে বোঝা শক্ত ছিল না। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে রাশিবিজ্ঞান অনার্সের দ্বিতীয় তালিকায় তার নাম ওঠে, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে— ভবিতব্য বিমলকৃষ্ণ মতিলালকে তার পথে টেনে নিয়েছে।         

বিমলকৃষ্ণ মতিলাল নামটির সঙ্গে আজকাল অনেকেই পরিচিত, হয়তো অনেকেই জানেন, তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে আমৃত্যু, অর্থাৎ ৮ জুন ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইস্টার্ন রিলিজিয়নস অ্যান্ড এথিক্স’ (Eastern Religious and Ethics)-এর স্পলডিং প্রফেসর এবং আল সোলস্‌ কলেজ (All souls Collage)-এর ফেলো হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, অনেকে হয়তো এ-ও জানেন যে, তিনি ছিলেন ‘জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান ফিলোজফি’-র (Journal of Indian Philosophy) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং একটানা কুড়ি বছর তিনি এই কাজ করে গেছেন; এমনকী, দুরারোগ্য ক্যানসার, কেমোথেরাপির যন্ত্রণাও তাঁকে এই কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বিমলকৃষ্ণ মতিলালের লেখালিখির সঙ্গে খুব অল্প লোকই পরিচিত। তার কারণ, ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনের পরিমণ্ডল সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান না থাকলে তাঁর রচনা থেকে রসগ্রহণ একপ্রকার অসম্ভব।

আরও পড়ুন : কেন আজও প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুসলমানীর গল্প’? লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…

স্পলডিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপক মতিলাল আর একজন বিখ্যাত ভারতীয় দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের উত্তরসূরি, যিনি এই পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে প্রথমে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি, পরে রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ‘রাধাকৃষ্ণণের কাজের সঙ্গে মতিলালের কাজের একটি লক্ষ্যনীয় বৈসাদৃশ্য আছে।’ বিমলকৃষ্ণের মৃত্যুর এক বছর পরে, ৬ জুন, ১৯৯২ সালে, অক্সফোর্ডের ‘ওল্ড লাইব্রেরি’-তে অনুষ্ঠিত একটি স্মরণসভায় কথাগুলি বলেছিলেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ‘রাধাকৃষ্ণণ যেখানে হিন্দু বৌদ্ধ ধর্মের আলোচনার সঙ্গে ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শনকে পাশ্চাত্য দর্শন থেকে অত্যন্ত ভিন্নরূপে দেখাতে চেয়েছিলেন বিমল মতিলাল সেখানে তিনহাজার বছরের ভারতীয় বিশ্লেষাণাত্মক দর্শনের ধারণাগুলির মূল ভিত্তিগুলিকে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুনর্মুল্যায়ন করার কর্মসূচি নিয়েছিলেন।’ আবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক, অধ্যাপক মতিলালের ছাত্র জনার্দন গনেরিও একই কথা বলেছেন যে, ‘বিমলকৃষ্ণ মতিলাল জগৎজোড়া খ্যাতিলাভ করেছিলেন ভারতীয় দর্শন ও ভাষাতত্ত্বের চর্চায় সমকালীন বিশ্লেষণমূলক পাশ্চাত্য দর্শনের রীতি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে। এ ব্যাপারে বলা যায় তিনিই পথিকৃৎ। প্রচলিত অতিকথা, বদ্ধমূল ধারণা ও গতানুগতিক ছক থেকে ভারতীয় দর্শনকে মুক্ত করার জন্য তিনি সারা জীবন সাধনা করেছেন।’

বিমলকৃষ্ণ মতিলাল প্রণীত পুস্তিকা

বস্তুত এই ‘বৈসাদৃশ্য’ বা ‘গতানুগতিকতা’ সেই উনিশ শতক থেকে চলে আসছে, তবে গত কয়েক দশক ধরে এই চিন্তা নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে জাতীয়তাবাদী ধারণার হাত ধরে। ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদরা একসময় আমাদের মগজ ধোলাই করে মনে গেঁথে দিয়েছিল যে, ‘পশ্চিম— ভোগবাদী, বস্তুপ্রিয়, আমরা—অধ্যাত্মবাদী, ত্যাগী— [ইত্যাদি] অবান্তর কথা।’ সোজা কথায়, ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদদের ধারণায়, পাশ্চাত্য দর্শনে আছে বুদ্ধি-যুক্তি-বিশ্লেষণ আর ভারতীয় দর্শনের বৈশিষ্ট্য হল মোক্ষ-মুক্তি-অতীন্দ্রিয়তা। আসলে এই দু’টি দর্শনকে একধরনের আড়ষ্ট স্টিরিওটাইপে খাড়াখাড়ি ভাগ করলে এইটা প্রমাণ করতে সুবিধা হয় যে, যুক্তি-বিজ্ঞান-উন্নয়ন ইত্যাদি সমস্ত আধুনিক দুনিয়াদারির কাজ পশ্চিমের, আর মরমী সাধন-ভজন ভারতের ঐতিহ্য।

ম্যাক্সমুলারের ‘সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস’ (A History of Ancient Sanskrit Literature, 1860) থেকে একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদরা ভারতীয়দের কীভাবে দেখতেন— ‘The Hindus were a nation of philosophers. Their struggles were the struggles of thought; their past, the problem of creation; their future, the problem of existence. The present alone, which is the real and living solution of the problems of the past and the future, seems never to have attracted their thoughts or to have called out their energies.’

এই মনোভাব থেকে ভারতীয় দর্শনের এতদিন যে মূল্যায়ন হয়েছে, তাতে পশিমের দর্শনচর্চার পদ্ধতি থেকে তার পার্থক্য এইভাবে দেখান হয়েছে যে, ভারতীয় দর্শন মূলত স্বজ্ঞামূলক (intuitive), প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ (mystical) এবং সংশ্লেষাত্মক (synthetic) আর উল্টোদিকে পাশ্চাত্য দর্শন যুক্তিধর্মী (rational) কঠোরভাবে বিধিবদ্ধ (rigorous) এবং বিশ্লেষক (analytic)। ফলে শুধু সাধারণ চিন্তাশীল ব্যক্তি নন, এমনকী, অনেক পণ্ডিতদের মনেও এই ধারণা জন্মেছিল বা এখনও আছে যে, ভারতের দর্শনের সবটুকুই উচ্চস্তরের অধিবিদ্যা। বস্তুত কেবলমাত্র আকাশের দিকে চেয়ে অথবা কেবলমাত্র মাটি আঁকড়ে কোনও জাতিই বাঁচতে পারে না। যেমন শুধুমাত্র বাইরের জড়প্রকৃতি অথবা চিন্ময় অন্তরপ্রকৃতির দিকে চেয়ে বাঁচতে পারে না কোনও মানুষ। তাই এই ‘অবান্তর’ ধারণার ঘোর বিরোধী ছিলেন অধ্যাপক মতিলাল। আধুনিক দর্শনের আলোচনার বিষয়গুলি থেকে ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শনকে আলাদাভাবে চর্চা করার যে রেওয়াজ আছে, তারও বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে একটি সংলাপ রচনার চেষ্টা করেছিলেন। তাই অমর্ত্য সেন উক্ত স্মরণসভায় বলেছিলেন— ‘মতিলাল ছিলেন এমন একজন আধুনিক দার্শনিক যিনি ভারতীয় দর্শনকে সমসাময়িক চিন্তাধারার আলোতে দেখতেন এবং একইভাবে সমসাময়িক চিন্তাকে ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শনের আলোতে দেখতেন।’

বিমল মতিলালের কাছে, যুক্তিধর্মী/স্বজ্ঞামূলক— এই পার্থক্যটি কতখানি ‘অবান্তর’ ছিল, তা বোঝা যায়, তাঁর স্পলডিং প্রফেসর পদে যোগদানের সময় অক্সফোর্ডে দেওয়া উদ্বোধনী ভাষণে, যা ১৯৭৭ সালে একটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়, নাম ‘The Logical Illumination of Indian Mysticism’। সেখানে অপূর্ব একটি আলোচনার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, ভারতীয় দর্শনের এই উচ্চস্তরের অধিবিদ্যার অনেক কিছুই বিধিবদ্ধভাবে বিশ্লেষণাত্মক— এই কথা আজ প্রমাণিত সত্য। গীতায় ভাষায় যোগীর মরমী স্বজ্ঞামূলক অনুভব ‘অতীন্দ্রিয় কিন্তু বুদ্ধিগ্রাহ্য’ (‘বুদ্ধিগ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্‌’ ৬/২১) ফলে যুক্তিগ্রাহ্যও বটে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ৩১ মে ১৯৮৬ সালে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে মতিলাল নিজেই বলেছিলেন, “আমি প্রথমে ভারতীয় দর্শন নিয়েই পড়াশোনা শুরু করি, কিছুদূর এগিয়ে যে কিঞ্চিৎ solipsism-এর প্রভাবে পড়েছিলাম তাও ঠিক। নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম ‘এই চর্চার কি কোন সময়োচিত practical relevance আছে ? ভারততত্ত্বের স্কলারশিপে যারা নিয়োজিত তাদের কথা আলাদা, কিন্তু অন্যদের কাছে এর মূল্য কতটা, সত্যিই কি এই দর্শন সেই great intellectual hight-এ পৌঁছতে পেরেছে ? এই প্রশ্নপর্বেই আমি পাশ্চাত্যদর্শনের জগতে প্রবেশ করি এবং পরে যখন বিশেষ করে আধুনিক analytical philosophy-র সঙ্গে পরিচিতি হই এবং দুটি ধারাকে পাশাপাশি বসাতে শুরু করি তখনই বুঝতে পারি যে আমাদের ঐতিহ্যকে যদি সেভাবে উপস্থিত করা যায় তার মূল্য স্বীকৃত হবে।” 

বিমল মতিলাল যেমন হার্ভার্ড বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন, তেমনই দেশীয় টোলেও পড়াশুনা করেছেন। ১৯৫৭ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষকের চাকরি পাওয়ার পর তিনি পড়ানোর পাশাপাশি অনন্ত তর্কতীর্থ, মধুসূদন ন্যায়াচার্য, বিশ্ববন্ধু তর্কতীর্থ ইত্যাদি খ্যাতনামা পণ্ডিতদের কাছে ন্যায়ের পাঠ নিতে থাকেন এবং ১৯৬২ সালে তর্কতীর্থ উপাধি পান। আবার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা ও ভাষাদর্শনের গবেষণার সঙ্গেও পরিচিত হন। এই দুই ধারায় শিক্ষিত হয়ে তিনি যে গবেষণা চালান, তারই ফসল ‘দ্য নব্যন্যায় ডক্‌ট্রিন অব নেগেশন’ (The Navya-Nyaya Doctrine of Negation)। ১৯৬৫ সালে এই গবেষণার জন্য তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডিগ্রি লাভ করেন। জনার্দন গনেরি বলেছেন, ‘এই বইটিতে আমরা প্রথম দেখি মতিলালের অতি পরিচিত বিখ্যাত উক্তি: দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্র থেকে ভারতবর্ষকে বাদ দেওয়া উচিত নয়, বাদ দেওয়া সম্ভবও নয়। এই বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি রয়েছে ওঁর পরবর্তী সব গ্রন্থে। বারবার তিনি বলেছেন দর্শনের গভীর সমস্যাগুলো নতুন মাত্রা পেতে পারে যদি ভারতীয় দর্শন ও ভাষাচর্চার আলোকে সমকালীন দার্শনিক সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হয়।’

এহেন যুক্তিনিষ্ঠ ডাকসাইটে দার্শনিকের কিন্তু জন্ম হয়েছিল জয়নগরের মজিলপুর গ্রামের এক নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবারে, ১৯৩৫ সালের ১ জুন। তাঁর স্ত্রী করবী মতিলালের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, পাঁচ বছর বয়সেই তাঁর দীক্ষা হয় শ্রদ্ধেয় বৈষ্ণব সাধক রামদাসবাবাজি মহারাজের কাছে। প্রথম জীবনে তিনি খুবই নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ছিলেন এবং নিয়মিত মালাও জপ করতেন। এমনকী, কোনও কনফারেন্সে যোগ দিতে গেলেও তিনি সঙ্গে করে মালা নিয়ে যেতেন। কখনও মালা নিয়ে যেতে ভুলে গেলে স্ত্রীকে ফোন করে মালা জপ করতে বলতেন। ‘বিশ্বাস করতেন মালা জপ না করলে, মালাকে উপোসী করে রাখলে বংশলোপ পাবে।’ একবার কোনও একটা কনফারেন্সে ভুল করে তিনি মালাটি ফেলে আসেন। তারপর থেকে তিনি আর কখনও মালা জপ করেননি। করবী মতিলাল লিখেছেন, ‘জানি না ন্যায়শাস্ত্রের চর্চা ওঁকে আচারিক ধর্মচর্চা থেকে সরিয়ে এনেছে কি না। তবে কখনও কারও ধর্মচর্চাকে কোনওভাবে সমালোচনা করেননি, মায়ের সত্যনারায়ণ পূজা বা লক্ষীপূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব যোগ দিয়েছেন।’ তবে আমাদের মনে হয়, আনুষ্ঠানিক ধর্মের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও তিনি ছিলেন স্বভাব-বৈষ্ণব, বিনয় ছিল তাঁর মজ্জাগত।

অধ্যাপক মতিলালের স্মরণসভায় তাই গায়ত্রী স্পিভাক বলেছিলেন, ‘প্রকৃত বিদ্যা দেয় আত্মার মহত্ত্ব ও সারল্য। এই আমরা শুনি। আমি কোনোদিন ভাবিনি যে এ জিনিস্টা এত কাছ থেকে দেখব।’ কিন্তু মতিলালের সারল্য কখনও-কখনও আমাদের হতবুদ্ধি করে দেয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক— অমর্ত্য সেন ও বিমলকৃষ্ণ মতিলালের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় তিনি যখন জন র‍্যাডক্লিফ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও অমর্ত্য সেনের ফোন এলে অধ্যাপক মতিলাল ‘সব যন্ত্রণা ভুলে আশার আলো দেখতেন’। কিন্তু মজার কথা, করবী মতিলাল লিখেছেন, “বিমলের প্রজ্ঞাকে অমর্ত্যদা যথেষ্ট সম্মান ও স্বীকৃতি দিতেন। কিন্তু স্বভাব লাজুক বিমল অমর্ত্যদার সঙ্গে কথা বলতে যাবার আগে সব সময় বলতেন ‘আমি হয়ত বোকা বোকা কথা বলে ফেলব।’”

আজকের পরিপ্রেক্ষিতে লোকে নিশ্চয়ই একে আত্মবিশ্বাসের অভাব বলে চিহ্নিত করবেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই, না কি এ তাঁর ‘অতিশিক্ষার’ ফল? অধ্যাপক মতিলালের আর-একজন বিশ্ববিখ্যাত ছাত্র অরিন্দম চক্রবর্তী লিখেছেন— ‘লিখনশক্তির প্রগলভ প্রাচুর্য সত্ত্বেও অনেক সময়ে ওঁর মুখের ভাষায় ও ভাষণে একটা লাজুক, দ্বিধাগ্রস্ত, অবিন্যস্ত ভাব অনেককে অবাক করত। এত বেশি মন দিয়ে প্রশ্নকারী শিষ্য ও বিরুদ্ধবাদী শ্রোতার কথা শুনতেন যে নিজের বক্তব্য যেন ভুলেই যেতেন কথার মাঝখানে। কিন্তু আত্মপ্রকাশের এই সংকোচ ও অনিশ্চয়তা ওঁর অতিশিক্ষার ফল। অর্ধশিক্ষার অবিরল দম্ভ ও দৃঢ়তার সামনে ওঁর ব্যক্তিত্ব তাই আরও গুটিয়ে যেত।’

আমাদের আরও মনে হয়, বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে আচারিক জপ-তপে তাঁর রুচি না থাকলেও বৈষ্ণবোচিত ‘জীবে দয়া’-র আর্দ্রতা তাঁর মনে ও মতে থেকেই গিয়েছিল। আর সেই আর্দ্রতার বিশেষ প্রকাশ ঘটেছিল জীবনের শেষ দেড় দশক  ধরে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উৎসস্থানীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত নিয়ে তাঁর নিরন্তর আলোচনার মধ্যে। বিমলকৃষ্ণ মনে করতেন, সামাজিক বা রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে-সঙ্গেই মানুষের মনের ইতিহাসেরও একটা মূল্য রয়েছে। তাই মানসিকতার এই বিবর্তনের ধারাটাও পরীক্ষা করা উচিত। ‘অতীতের মানুষ কি ভাবতো, কিভাবে চিন্তা করত, এসব তো আর তারা লিখে যায়নি! এই বিরাট বিচিত্র পরিবর্তনশীল মনটাকে তাহলে আমরা কোথায় খুঁজে পাব— অবশ্যই পুরাণে, মহাকাব্যে।’ (‘দেশ’, ১৯৮৬) অর্থাৎ এইগুলিকে বিশ্লেষণ করেই আমাদের সংগ্রহ করতে হবে এই বদলে-বদলে যাওয়া মনের চিত্র-বিচিত্র ছবি। বুঝতে হবে, কী ধরনের মূল্যবোধকে তারা সম্মান করত বা অসম্মান। ‘নীতিধর্ম কিরকম ছিল hierarchical না শ্বাশত, ঐতিহ্য কিভাবে ঐতিহ্যকে সমালোচনা করছে— এই সব গূঢ় প্রশ্নের উত্তর পুরাণের পরম্পরায় লুকিয়ে আছে।’ (‘দেশ’, ১৯৮৬) এই কারণেই দার্শনিক প্রতিষ্ঠার শীর্ষে থেকেও অসুস্থ শরীরে নিয়ে তিনি অবিশ্রাম দেশে-বিদেশে পুরাণ নিয়ে বক্তৃতা করে গেছেন।    

‘নীতি যুক্তি ও ধর্ম— কাহিনী সাহিত্যে রাম ও কৃষ্ণ’ বইতে মতিলাল দেখিয়েছিলেন, অপরের সঙ্গে যুদ্ধরত বালীকে হত্যা রামচন্দ্রের ‘গুপ্তঘাতকতার শামিল’। তিনি লিখেছেন, ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম পরমবীর রাম নরচন্দ্রমার এ এক অপ্রতিবিধেয় কলঙ্ক যা শতবার ধুলেও যায় না।’ কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের এ-ও বুঝতে হবে, ‘ধর্মপ্রাণ সনাতনপন্থীরাও এটাকে শান্তমনে সমর্থন করতে পারেননি’, বাঙালী পণ্ডিত কৃত্তিবাস লিখেছিলেন— কৃত্তিবাস পণ্ডিতের ঘটিলা বিষাদ।/ বালিবধ করে কেন করিলা প্রমাদ।।

বাংলা ভাষায় রচিত তাঁর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বাংলা বই ‘নীতি যুক্তি ও ধর্ম— কাহিনী সাহিত্যে রাম ও কৃষ্ণ’ এবং অন্যান্য পুরাণ ও মহাকাব্য নিয়ে রচিত ইংরেজি লেখাগুলিতেও তিনি দেখিয়েছিলেন ‘ঐতিহ্য কিভাবে ঐতিহ্যকে সমালোচনা করছে’। কোনও ঐতিহ্যই অনড় নয়, বরং সতত পরিবর্তনশীল। ঐতিহ্যের মূল্যায়ন ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই বস্তুত ঘটে চলে মূল্যবোধের আভ্যন্তরীণ সংস্কার ও পুনর্গঠনের পক্রিয়া। তাই অধ্যাপক মতিলাল প্রাচীন সংস্কৃতির মূল্যায়ন ও সমালোচনায় যে মানদণ্ড ব্যবহার করলেন, তা তাঁর নিজের সংস্কৃতির আবেষ্টন থেকেই সংগ্রহ করা, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয়। তিনি ১৯৮৬ সালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন পুরাণ ও মহাকাব্যগুলি বিশ্লেষণের সময়, ‘আমি কিন্তু কোন আধুনিক তত্ত্বের সাহায্য নেব না… পুরাণগুলির প্রকৃতি অক্ষত রেখেই আমি তাদের যুক্তিনির্ভর পুনর্গঠনের কাজে হাত দেব। তার মানে এই নয় যে সেখানে উচ্চারিত মূল্যবোধকে আমি সমর্থন করব।’

আমাদের মনে হয়, এইখানেই তাঁর অভিনবত্ব। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছিলেন— “‘রামায়ণ’-এর কথাই ধরুন, পরের রামায়ণগুলি আগের রামায়ণের সমালোচনা, যে নবীন অংশটি লিখছে সে লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে কারণ প্রাচীন অংশের বিধান সে মেনে নিতে পারেনি। কালিদাস মহাভারতের শকুন্তলা কাহিনীকে সমর্থন জানাননি এবং ভবভূতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু এরা তো কেউ সংশয়বাদী ছিল না, ভবভূতি ছিলেন বিরাট বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। সেক্ষেত্রে কেন তাদের মনে হয়েছিল যে প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও রূপ তাদের সময়ের জন্য উপযুক্ত নয়। বৌদ্ধ ও জৈনরাও মহাভারতের কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছিলেন কিন্তু তাঁদের রচনায় সেগুলি অপ্রচলিত রূপ গ্রহণ করে কেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবার সময় কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না, বুঝতে হবে কে কিভাবে পুরাণকে ব্যবহার করেছে এবং কেন। এই জিজ্ঞাসাই প্রধান এবং এর উত্তর থেকেই পুরাণের হাত ধরে আমরা বিবর্তনশীল পরিবর্তনময় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ও বিশ্ববীক্ষা সম্পর্কে সঠিক জানতে সক্ষম হব।” (‘দেশ’, ১৯৮৬)

বস্তুত সতত পরিবর্তনশীল সংস্কৃতির মধ্য থেকেই উঠে আসে মূল দার্শনিক তত্ত্বগুলির সমালোচনা। ফলে আমরা বলতেই পারি, এক অর্থে ঐতিহ্যে গড়েই ওঠে সমালোচনার ওপর ভিত্তি করে। যেমন, ‘নীতি যুক্তি ও ধর্ম— কাহিনী সাহিত্যে রাম ও কৃষ্ণ’ বইতে মতিলাল দেখিয়েছিলেন, অপরের সঙ্গে যুদ্ধরত বালীকে হত্যা রামচন্দ্রের ‘গুপ্তঘাতকতার শামিল’। তিনি লিখেছেন, ‘মর্যাদাপুরুষোত্তম পরমবীর রাম নরচন্দ্রমার এ এক অপ্রতিবিধেয় কলঙ্ক যা শতবার ধুলেও যায় না।’ কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের এ-ও বুঝতে হবে, ‘ধর্মপ্রাণ সনাতনপন্থীরাও এটাকে শান্তমনে সমর্থন করতে পারেননি’, বাঙালী পণ্ডিত কৃত্তিবাস লিখেছিলেন— কৃত্তিবাস পণ্ডিতের ঘটিলা বিষাদ।/ বালিবধ করে কেন করিলা প্রমাদ।। আবার তুলসীদাস, ভবভূতি ইত্যাদি রচয়িতারাও বালি বধ, শম্বুক হত্যা নরচন্দ্রমা রামের ইত্যাদি কলঙ্কগুলি এড়িয়ে যাননি বরং নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বস্তুত, আখ্যানের প্রাচীন অংশে যেসব ‘অসম্পূর্ণতা, বৈষম্য ও অব্যাখ্যাত’ বিষয় থাকে, পরবর্তী কবিরা অনেক সময় তার মধ্যে একটা ‘সম্পূর্ণতা ও সমতা’ আনতে এবং অব্যাখ্যাত বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মতিলালের ভাষায়, সেগুলো যেন মূল গ্রন্থের, ‘আন্‌অফিসিয়াল টীকা’। ফলে, ঐতিহ্যকে বুঝতে গেলে এই বদলে বদলে যাওয়া সটীক ঐতিহ্যকেই বুঝতে হবে। তবে ঐতিহ্যকে অনড় করে রাখলে হয়তো ঐতিহ্যের নামে সামগ্রিক অতীতের একটি কাল্পনিক ছবি তৈরি করতে সুবিধে হয়। এই প্রক্রিয়ায় এমন একটি অতীতের নির্মাণ হয়, যার সীমারেখাগুলি নির্ধারণ করা হয়েছে বর্তমানের নির্দিষ্ট প্রয়োজন বা স্পষ্ট করে বললে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের সুবিধার্থে। তাই আধুনিক ইউরোপ-চর্চার জগতের শ্রদ্ধেয় ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম, ‘অন হিসট্রি’ (১৯৯৮) বইতে লিখেছিলেন— ‘জাতীয়বাদী বা জাতিসত্তাভিত্তিক কিংবা মৌলবাদী মতাদর্শগুলির কাঁচামাল ইতিহাস (বা ঐতিহ্য), ঠিক যেমন হেরোইনের নেশার কাঁচামাল পোস্তদানা। অতীত এই মতাদর্শগুলির অত্যাবশ্যক উপাদান, সম্ভবত সবথেকে অত্যাবশ্যক উপাদান। এই মতাদর্শগুলির পক্ষে উপযোগী অতীতের যদি কোনও অস্তিত্ব না-ও থাকে, তবে তাকে যে কোনও সময়েই উদ্ভাবন করে নেওয়া যায়।’

মতিলাল আমাদের এই উদ্ভাবিত অতীতের থেকে বারবার সতর্ক থাকতে বলেছেন। মনে রাখতে হবে, স-তর্ক শব্দের অর্থ, তর্কের সহিত।  

বিমল মতিলালের পুরাণ ও মহাকাব্যভিত্তিক আলোচনাগুলির মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তিনি ‘ধর্ম’ অর্থে ‘রিলিজিয়ন’ বোঝেননি। যদিও আমরা জানি, বাংলায় রিলিজিয়নের অনুবাদ হিসেবে ধর্ম শব্দের ব্যবহার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করেছেন। ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ ও ‘মানুষের ধর্ম’ তিনি প্রায় সমান অর্থেই ব্যবহার করেছেন। এছাড়া হিন্দু ধর্ম, জৈন ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম ইত্যাদি জায়গায় আমরা ধর্মকে ‘রিলিজিয়ন’ অর্থেই ব্যবহার করি। কিন্তু মতিলাল মনে করতেন, সংস্কৃতে ‘ধর্ম’ শব্দটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা যাক ‘রিলিজিয়ন’ বলতে আমরা কী বুঝি—রিলিজিয়নের প্রধান অর্থ হচ্ছে কোনও সংঘ বা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়া। তাই আজকাল দেখি, বিদেশে জিজ্ঞাসা করা হয় না ‘আপনার ধর্ম কী?’ বরং জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘what is your faith?’ বা ‘আপনার বিশ্বাস কী?’ রিলিজিয়নের এই অর্থ পরে প্রসারিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাগ্যনিয়ন্তা কোনও এক অসামান্য অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাস এবং তার প্রতি হৃদয়গত ভক্তি বা প্রেমভাবে পূজা, আরাধনা, পার্থনা, বিবিধ আচার-বিধি ইত্যাদির অনুষ্ঠান। কিন্তু বৈদিক সাহিত্য থেকে ধর্মশাস্ত্র হয়ে লোকায়ত বিশ্বাসে সাধারণভাবে আমরা ধর্মের চারধরনের ব্যবহার দেখতে পাই। 

১) ধর্মের প্রধান অর্থ কর্তব্যকর্ম বা নৈতিকতা। এর বিপরীতার্থক শব্দ, অধর্ম বা অন্যায় কাজ। একে আবার সাধারণত দু’অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। এক, সাধারণ ধর্ম বা সকলের আচরণীয় কর্তব্য আর দুই, বিশেষ ধর্ম বা বিশেষ বিশেষ অবস্থায় বিশেষ ব্যক্তির যা কর্তব্য বা নৈতিকতা।

২) কর্মের ফলকে অনেক সময় ধর্ম বলা হয়েছে। এখানে একপ্রকার অর্থের প্রসার ঘটেছে তাই ধর্মের অর্থ পূণ্য আর অধর্মের অর্থ পাপ। 

৩) ধর্ম অর্থে বস্তুর স্বভাব, গুণ, শক্তি বোঝায়। 

৪) ধর্মের চতুর্থ অর্থ হল ঋত বা নিয়ম। ধর্মের পথ ঋতের পথ। ‘ঋত’ বেদে বহুল ব্যবহৃত একটি ‘রহস্যময়’ শব্দ। সাধারণত একে ব্যাখ্যা করা হয় বিশ্বব্যাপী নিয়ম ও সুশৃঙ্খলার দ্যোতক হিসেবে। বিমল মতিলাল মতে ঋতের অর্থ হল— এই বিশ্বপ্রকৃতির যে বিধান যা বিজ্ঞান জগতের ‘অধ্যেতব্য বিষয়’ এবং মানুষের হৃদয়ের বা মানবমনের যে বিধান যা দর্শন, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয়— ‘এই দুই জগতেরই বিধানকে যদি কোনও বৃহত্তর নিয়মশৃঙ্খলে বাঁধা যায় তারই নাম ঋত।’

‘ধর্মযুদ্ধ’ প্রবন্ধে তাই মতিলাল লিখেছিলেন— “রামের সত্যধর্ম রক্ষা বা রাজধর্মের প্রতিষ্ঠা, যুধিষ্ঠিরের বনপর্বে বকবেশী ধর্মের প্রশ্নের উত্তরে ‘ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াম’ এই উক্তি—এসব জায়গায় ধর্ম শব্দ নৈতিকতার নামান্তর মাত্র, ‘রিলিজিয়নে’-এর সাধারণ অর্থের সঙ্গে এদের যোগ নেই।” সুতরাং, ভারতের পুরাণ ও দর্শনের ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘যুক্তির দ্বারা গ্রাহ্য মহত্ত্বর নীতির অনুমোদিত কর্মকে ধর্ম বলা হয়েছে যাতে ধর্মের অর্থাৎ নৈতিকতার কল্যাণময়তা ও পরার্থপরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’ মহাভারতের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝানো যায়। বস্তুত মহাভারতের মতে, যজ্ঞ, পুজা, আরাধনা, বেদ, কোরান, বাইবেল প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ পাঠ, কুম্ভমেলা বা হজের তীর্থযাত্রা, রামনবমী বা রামজানের উপবাস, রবিবার যিশুঘরের উপসনা অথবা যিশুর রক্তমাংসের প্রতীক মদ ও বিস্কুট খাওয়া, এমনকী, বুদ্ধ স্মরণে ওম মণিপদ্ম হুং বা কৃষ্ণ স্মরণে ওম ক্লীং মন্ত্রের জপ করা ইত্যাদি কিছুই ধর্ম নয়। তবে ধর্ম কী? মহাভারতে অনুশাসন পর্বে (১৩/১১৩/৮) ধর্মের লক্ষণ বলা হয়েছে—

          যা আমার নিজের কাছে প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, অসহনীয়

সেরকম দুঃখ বা পীড়া অন্যকে না দেওয়া—

সংক্ষেপে বললে এই হল ধর্ম, কিন্তু মানুষের প্রাকৃতিক যে

          কামের স্রোত— তার বিপরীত দিকে এই ধর্মের গতি।


(অনুবাদ- অরিন্দম চক্রবর্তী)

যারা নিজেদের কাছে যা প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, অসহনীয়, সেরকম দুঃখ বা পীড়া বারবার অন্যদের দেন এবং সেটাকেই সনাতন ধর্ম বলে প্রচার করেন, মহাভারতের লক্ষণ অনুযায়ী বলতেই হবে, তারা সকলেই ঘোরতর অধার্মিক। তাই বিমল মতিলাল ১৯৮৬ সালের উক্ত সাক্ষৎকারে বলেছিলেন, ‘…যে ধর্মে ও নৈতিকতায় মানুষের মূল্য নেই সেই ধর্ম ও আপাতনৈতিকতা পরিতাজ্য।’ এখন সবটাই ভারতীয় জনগণের হাতে, তারা কি এই উদ্ভট কাল্পনিক অতীতকে ঐতিহ্য হিসেবে মেনে নেবেন এবং তার সঙ্গে-সঙ্গেই মেনে নেবেন এক অদ্ভুত আইনের শাসন, যেখানে মানবিকতার কোনও স্থান নেই, না কি স-তর্ক থেকে প্রাকৃতিক কামনার বিপরীত স্রোত সাঁতরে নিজেদের ঐতিহ্যের মধ্য থেকেই খুঁজতে চাইবেন ধর্ম বা নৈতিকতার অর্থ— আমরা শুধু বলতে পারি ‘সাধু সাবধান’।