জেলের ভাত
‘জেলের ভাত’ না খেতে পারা নিয়ে আক্ষেপ করছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কি দিন-দিন বেড়ে চলেছে? অনেকে কি মনে-মনে সত্যিই এই বাসনা পোষণ করেন যে, জেলে কিছুক্ষণ কাটিয়ে এসে লাভ করবেন বন্দি-অভিজ্ঞতা? কৌতূহল এক জিনিস, তা মানুষকে এনে দেয় ধারণা; কিন্তু কেউ যখন জেলের অভিজ্ঞতা ‘অনুভব’ করতে চান, প্রশ্ন ওঠে তা নিয়ে। একজনের অভিজ্ঞতা কি সত্যিই অন্যজন কখনও অনুভব করতে পারেন? পারা সম্ভব? এবং আরও বড় করে দেখলে, জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয়, কেউ যদি বাঘের খাঁচায় কিছুক্ষণ সময় কাটান, তিনি কি বাঘ-দর্শন জীবনেও অনুভব করে উঠতে পারবেন?
সম্প্রতি, হায়দরাবাদের চঞ্চলগুড়া সেন্ট্রাল জেল একটি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছে, যার নাম ‘ফিল দ্য জেল’। কেমন সেই প্রকল্প? সেখানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে একটি কারাকক্ষ। জেল-জীবন কেমন, তা উপলব্ধি করতে চাইলে ২৪ ঘণ্টার জন্য খরচ পড়বে দু’হাজার টাকা। হাজার টাকার বিনিময়ে কেউ চাইলে ১২ ঘণ্টাও সেখানে কাটাতে পারেন। কয়েদির পোশাকে, কয়েদিদের বরাদ্দ খাবার খেয়ে, মানতে হবে জেল-জীবনের রুটিন। প্রশ্ন হল, কয়েদিদের যা খেতে দেওয়া হয়, সেই খাবার কি উপভোগযোগ্য? আনন্দ করে খাওয়ার মতো? সংশোধনাগারকে যদি রেস্তোরাঁ করে তোলা হয়, মানবিকতা কী জবাব দেবে? দু’দিন পর কি এও দেখতে হবে আমাদের, রেস্তোরাঁর মেনুতে জ্বলজ্বল করছে ‘জেল স্পেশাল ডিশ’?
মৃণালের কলকাতা কখনও ফুরোয় না!
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৮…
সাধারণত বন্দিদের প্রাতঃরাশে দেওয়া হয় মুড়ি, গুড় অথবা পাঁউরুটি-ঘুগনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ থাকলে ডিম-পাঁউরুটি, সঙ্গে কলা কিংবা আপেল। দুপুরে ভাত-ডাল-সবজি। রাতে ভাতের পরিবর্তে রুটি। সপ্তাহে একদিন করে বরাদ্দ থাকে মাছ, ডিম, মাংস ও সোয়াবিন। তবে ব্যতিক্রম আছে। চিকিৎসকের নির্দেশ থাকলে মেনুতে বদল আসে। তবে, বন্দিদের সারাদিনে ৩০০ গ্রাম সবজি ও ১০০ গ্রাম আলু দিতেই হয়। উৎসবের দিনগুলোয় অবশ্য থাকে ভাল-মন্দ নানান খাবার। প্রশ্ন হচ্ছে, এই খাবার যদি একজন সাধারণ নাগরিক জেলে বসে একদিন খেয়ে চলে যান এবং পরের দিন বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে কোনও রেস্তোরাঁয় পোলাও-কালিয়া সাঁটান, তিনি ঠিক বন্দিজীবনের কোন অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করবেন?
সুভাষ তাঁর লেখায় বক্সার জেলখানার কথা বলতে গিয়ে আরও যেসব বর্ণনা এনেছিলেন, তা পড়লে বোঝা যায়, একজন অপরাধীর (অবশ্য রাষ্ট্রের চোখে কে অপরাধী আর কে নয়, এও এক প্রশ্ন!) জীবন জেলখানার চৌহদ্দিতে কতটা কর্কশ এবং নির্মম। একজন সাধারণ নাগরিক কি চাইবেন জেলের মধ্যে বসে কম্বল-ধোলাইয়ের মতো মার খেতে? নিশ্চয়ই নয়!
সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘জেলখানা না দেখলে দেশের একটা বড় দিক অদেখা থেকে যায়’। কেমন সেই জীবন? তাঁর ‘মেঘের গায়ে জেলখানা’ রচনার একটা ছোট অংশ উদ্ধৃত থাক এখানে, ‘… চোর-ডাকাত-খুনী-গাঁটকাঁটা— এই নিয়ে উঁচু-পাঁচিল-তোলা এখানকার জীবন। আলো-হাওয়ার সঙ্গে আড়ি। আজব এখানকার ভাষা— না-বাংলা, না-হিন্দী। তেমনি ছিরি এখানকার জীবনের। জানোয়ারের পালের মত খোঁয়ারের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে বাঁচা। সূর্যদেব পাটে বস্তেই সঙ্গে সঙ্গে লক্-আপ— ঘরে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ। রাত ফর্সা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খোয়াঁয়ার খুলবে। সার বেঁধে দাঁড়াতে হবে ফাইলে। গুনতি হবে, গুনতি মেলার তিন ঘণ্টা পড়বে। সেলাম বাজাতে হবে জেলার-জমাদারকে। পান থেকে চুন খস্লেই পিঠে ডাণ্ডা কিংবা লোহার নাল-মারা বুটের লাথি।…’
যে-‘ছিরি’র কথা সুভাষের উদ্ধৃত অংশ থেকে উঠে আসছে, বোঝাই যাচ্ছে তা কতটা অসহনীয়। সুভাষ তাঁর লেখায় বক্সার জেলখানার কথা বলতে গিয়ে আরও যেসব বর্ণনা এনেছিলেন, তা পড়লে বোঝা যায়, একজন অপরাধীর (অবশ্য রাষ্ট্রের চোখে কে অপরাধী আর কে নয়, এও এক প্রশ্ন!) জীবন জেলখানার চৌহদ্দিতে কতটা কর্কশ এবং নির্মম। একজন সাধারণ নাগরিক কি চাইবেন জেলের মধ্যে বসে কম্বল-ধোলাইয়ের মতো মার খেতে? নিশ্চয়ই নয়! আরও যা-যা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় একজন বন্দিকে, তা একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে হলে কি তিনি হাসিমুখে মেনে নেবেন, শুধু ‘অভিজ্ঞতা’র খাতিরে? মনে তো হয় না! তাহলে কয়েদির পোশাক গায়ে চাপিয়ে, দু’মুঠো ভাত-ডাল-সবজি খাইয়ে, কী এমন ‘অভিজ্ঞতা’ এনে দেবে হায়দরাবাদ কারা কর্তৃপক্ষ?
হায়দরাবাদ সেন্ট্রাল জেলের তরফে বলা হয়েছে, বন্দিজীবন এবং স্বাধীনতার ফারাক বোঝাতেই তাদের এই উদ্যোগ। সকলে যাতে সৎপথে থাকেন, এই বার্তা দেওয়ার জন্যই সাধারণ নাগরিকদের বন্দির ‘অনুভূতি’ দিতে চান তারা। জেলব্যবস্থা সম্পর্কে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে যদি এই ধরনের প্রকল্প নিতে হয় কারা কর্তৃপক্ষকে, তাহলে নেশা সচেতনতার জন্য কি ছেলেমেয়েদের হাতে ড্রাগ তুলে দেওয়া হবে? মানুষকে বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা দিতে, বিভিন্ন জেল সংগ্রহশালাগুলোর নির্মাণ কি যথেষ্ট উদ্যোগ নয় তাহলে? কয়েদির ছদ্মবেশে সময় কাটানো কি আদৌ সচেতনতা নিয়ে আসবে, না কি তা ক্রমশ হয়ে উঠবে এক বিনোদনমূলক ভ্রমণ? আমাদের মনে রাখতে হবে, সংশোধনাগার কোনও মনোরম উদ্যান কিংবা শপিং মল নয়, যেখানে চাইলেই কিছুক্ষণ ‘সময়’ কাটিয়ে আসা যায়। যে-দেশে বন্দিদশাতেই মৃত্যু হয় সমাজকর্মী স্ট্যান স্বামীর, যে-দেশে উমর খলিদের মতো ছাত্রনেতাকে ২০০০ দিনের বেশি তিহার জেলে থাকতে হয় আজও, সেখানে হায়দরাবাদের এই ‘ফিল দ্য জেল’ প্রকল্পকে আমরা কী চোখে দেখব, তা ভাববার সময় এসেছে।
জেলকেন্দ্রিক সচেতনতার উদ্দেশ্যে যদি এই প্রকল্প চালু হয়, যদি সৎপথে চালিত করার আদর্শে একদিনের এই বন্দিদশার ‘অনুভূতি’ এনে মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়— তাতে সামান্য ফাঁক থেকে যায় বলেই ধারণা। কেননা, অপরাধ করলে জেলে যেতে হবে এবং জেলে কত কষ্ট করে বন্দিরা থাকে— এই জ্ঞান সবার মধ্যেই থাকে; তা সত্ত্বেও যখন কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়, বুঝতে হবে, তার মূলে থাকে নির্দিষ্ট কোনও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান। এ-কথা কি আমরা বিশ্বাস করব যে, প্রত্যেক মানুষকে যদি একদিনের জন্য জেলে রেখে দেওয়া যায়, সে আর জীবনে কোনও অপরাধের দিকে পা বাড়াবে না? বছরের পর বছর বন্দিদশা কাটিয়েও তাহলে একজন কেন পুনরায় অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে? সুতরাং, এই প্রকল্প ঠিক পন্থা নয়। উপরন্তু, এই প্রকল্পে সংবেদনশীলতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কেউ যদি ‘যেমন খুশি সাজো’ প্রতিযোগিতায় যৌনকর্মী সেজে দাঁড়ায়, সেখানে যেমন একজন যৌনকর্মীকে সম্মান করা হয় না— ঠিক তেমনই, একদিনের বন্দিজীবন, একজন বন্দির লড়াইকে খানিক খাটো করে তোলে। যে-অসহ জীবনের মধ্যে দিয়ে একজন বন্দিকে যেতে হয়, এই প্রকল্প তার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে গোটা বিষয়টাকে লঘু করে দেয়। বোধ বা চেতনায় কাউকে সত্যিকারের উন্নীত করা না গেলে, এই ধরনের প্রকল্পের সত্যিই কি কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে? না কি তা মনুষ্যত্বের দিকে ছুড়ে দেওয়া এক উপহাসমাত্র?



