ভালবাসার ভাষা

বিমলকৃষ্ণ মতিলাল স্মৃতি বক্তৃতায় (রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার-এর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল) গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক কথায়-কথায় বলেছিলেন, ব্রিটিশরা বাংলা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে বাকি ভারতে যেভাবে অত্যাচার করেছিল, তার চেয়ে কণামাত্র কম হয়তো বাংলার ওপর করেছিল, কারণ অল্প হলেও তারা বাংলাকে ভালবেসেছিল। তারা বাংলা শিখেছিল, বাংলায় ইংরেজি স্কুল খুলেছিল এবং ইংরেজি ভাষা-শিক্ষা ভারতে প্রথম হয়েছিল বাঙালিদের। এই বাঙালিদের ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আড়াইশো বছরের বেশি সম্পৃক্ততা। আজও বাংলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে যে-ছাত্র বা ছাত্রীটি কলকাতার কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়তে আসে কিংবা ভাল চাকরি পাবে বলে যে-ছেলেমেয়েগুলো ‘স্পোকেন ইংলিশ’ ক্লাসে ভর্তি হয়, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের উত্তরাধিকার তাদেরও ততটুকুই, যতটা নামী দামী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের। বাংলার উচ্চবিত্ত ক্লাবে যাঁরা পরস্পরের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেন আর ফেসবুকে ত্রুটিযুক্ত ব্যাকরণের ইংরেজি যাঁরা লেখেন— প্রত্যেকের অধিকার ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সমান।

২০১০ সালে জাতিসংঘ উইলিয়ম শেক্সপিয়রের জন্ম ও মৃত্যুদিন স্মরণে রেখে ২৩ এপ্রিল তারিখটি সংস্থাপন করেন ‘ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ (ইংরেজি ভাষা দিবস) হিসেবে। এই দিনটির গুরুত্ব ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের বহুধাবিস্তৃত, আন্তর্জাতিক প্রভাব ও আত্তীকরণকে ঘিরে। ইংরেজি ভাষা থেকে যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কার্যকলাপের ইতিহাস কখনও মুছে ফেলা যাবে না, তেমন এই ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এবং এর ফলে গড়ে ওঠা ক্ষমতায়নের তত্ত্বটাও ঢাকাচাপা দেবার বিষয় থাকতে পারে না।

ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০০৫ সালের একটি ক্লাসরুম। আশুতোষ কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন বিদায়ী অধ্যাপক রমেন্দ্রনাথ দত্ত সেই ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘এডওয়ার্ড টু’। আমি তখন সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি অনেক নম্বর নিয়ে। দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজিতে সারা পশ্চিমবঙ্গে সর্বাধিক যত নম্বর সে-বছর উঠেছে, তার থেকে একটি নম্বর কম পেয়েছি। আশুতোষ কলেজের সেই বত্রিশ নম্বর রুমে, কিছুটা অনীহাতেই ইংরেজি অনার্স পড়তে আসা আমার সঙ্গে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের একটা কাঁচামিঠে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল বাকি জীবনের জন্য।

আরও পড়ুন: যাদের কাছে গ্রামবাংলা কেবলই মেঠো সৌন্দর্ষের, পূজারিণী প্রধান কি তাদের অস্বস্তিরই কারণ নয়?
লিখছেন তিতাস রায় বর্মন…

স্কুলে পড়াকালে, যাদের দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি, তাদের একটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হত প্রথমেই। ইংরেজি বিষয়টা হয়তো তথাকথিত ‘গ্ল্যামারাস’ ছিল, ‘ইংলিশ অনার্স’ পড়ছি শুনে ভাই-বেরাদররা সম্মানের চোখে তাকাত, কিন্তু লেখ্য ইংরেজিতে বাংলা মাধ্যম থেকে পড়ে আসা অনেকেরই ভীষণ রকম দক্ষতা থাকলেও ইংরেজি ভাষায় কথা বলা নিয়ে সমস্যা থাকে অনেকেরই। ভারতে, বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে, ইংরেজি ভাষা নিয়ে এমন একটা দ্বিধাবিভক্তি আছে। এদেশে ইংরেজি মানুষ লিখতে শেখে আগে, আর বলতে শেখে পরে। কিন্তু ভাষা শেখার ক্ষেত্রে হওয়া উচিত এক্কেবারে উল্টো। আমরা মাতৃভাষা তো বলি আগে, লিখি পরেই, এমনকী, অন্য কোনও বৈদেশিক ভাষা শেখা বা পড়ার ব্যাপারেও এমন নিয়ম খাটে। অথচ, ইংরেজির বেলা তা হয় না। বাঙালি সমাজে অন্তত তেমন হবার জো ছিল না অনেকদিন পর্যন্ত। ইংরেজিতে একটি বাক্য বললে উচ্চারণের ভঙ্গি আর বাক্য গঠনের দুর্বলতা ধরা পড়ে যেতই। আবার যারা তা পারত না তারা আবার স্বগতোক্তির সুরে বলত, ‘বাঙালির ছেলে বাংলা বলব, ইংরেজি একটা বিদেশি ভাষা!’ এ তো ঘটত পাড়া-বাসস্থানে। কিন্তু ইংরেজি অনার্সের পড়ুয়াদের তো এই অজুহাত দিলে চলে না। এদিকে মিশনারি স্কুল থেকে, কলকাতার নামি-দামি বিদ্যালয়গুলি থেকে আসা অনেকেই হয়তো আশপাশে তীব্র গতিতে ইংরেজি ভাষায় কথা বলছে। বলা প্রয়োজন, ইংরেজি বলা নিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিয়েও টিটকিরি চলত। ফলে, এ এক অসম লড়াই!

এত যুদ্ধের মধ্যে ইংরেজি ভাষাটাকে, তার সাহিত্যকে যারা প্রকৃত ভালবাসতে শুরু করে, তারা কীসের ভিত্তিতে ভালবাসে? আবারও কিছু ব্যক্তিগত কথন উঠে আসবেই। সেন্ট জেভিয়ার্সের ইংরেজি বিভাগের প্রধানই ছিলেন সম্ভবত বার্ট্রাম ডাসিলভা। তিনি রিপন স্ট্রিটে থাকতেন। আমাদের অনার্স পড়ার সময়, টালিগঞ্জ থেকে সকাল সাতটায় সপ্তাহে একদিন পৌঁছতে হত তাঁর বাড়ি। কলেজের বিরাট রুমগুলোতে নয়, ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আমার বার্টি স্যারের রিপন স্ট্রিটের একচিলতে ছাদঘরের ক্লাস থেকে জন্ম নিয়েছিল। মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ লুসিফার কীভাবে মামন আর বিয়ালজ়িবাবের উপস্থিতিতে সবাইকে তার দিকে প্রভাবিত করছে কিংবা শেক্সপিয়রের সনেট কী করে কাব্যময়তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে উঠছে, জেমস জয়েস-এর ‘অ্যারাবি’ গল্পে নর্থ রিচমন্ড স্ট্রিটে ন্যারেটরের ম্যাগনান্স সিস্টারকে দেখে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়া, কিংবা টমাস হার্ডির ‘রিটার্ন অফ দ্য নেটিভ’ উপন্যাসে সেই এডগান হিথ আর ইউস্টাশিয়ার বিরহযন্ত্রণা— বার্টি স্যারের পড়ানোর গুণে আমাদের ইংরেজি অনার্সের ‘ব্রিটিশ’ আর ‘নেটিভ’-রা (ইংরেজি মাধ্যম আর বাংলা মাধ্যমের বিভাজনরেখা কতকটা এরকমই ছিল তখন) প্রায় এক পঙক্তিতে চলে এল। ইংরেজি সাহিত্যটাই আর অচেনা, অজানা কিংবা দূরত্বের রইল না।

ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘এডওয়ার্ড টু’ নাটকে বিধৃত সমকামিতা কিংবা শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’, ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ অথবা ‘টুয়েল্ফথ নাইট’ নাটকের যৌনতার অভিব্যক্তি, ওই পাঠসূত্রেই বহির্জগতের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে, ইংরেজি সাহিত্যের বহু পড়ুয়ার কাছেই। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি বিভিন্ন সর্বভারতীয় ইংরেজি ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ, নানা ধরনের ইংরেজি গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ, ফুটবল-ক্রিকেটের কমেন্ট্রি— এই সবই একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে ঘরোয়া শিক্ষায় ইংরেজি শেখানোর মাধ্যম ছিল প্রাথমিকভাবে বাংলা ভাষায় শিক্ষিত বহু পড়ুয়ার কাছেই। বাংলা মাধ্যমে যেহেতু বিজ্ঞান-সহ নানা বিষয়ের পরিভাষাও ইংরেজি নয়, ফলে এই সংকট কেবল ইংরেজি সাহিত্য পড়তে যাওয়া ছাত্রেরও সমস্যা নয় কিন্তু! কাজেই, পাঠ্যের বাইরেও ইংরেজির সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরের দুনিয়াটাও সাহায্য করে এসেছে অনেক ছাত্রছাত্রীকে।

স্কুলে পড়াকালে, যাদের দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি, তাদের একটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হত প্রথমেই। ইংরেজি বিষয়টা হয়তো তথাকথিত ‘গ্ল্যামারাস’ ছিল, ‘ইংলিশ অনার্স’ পড়ছি শুনে ভাই-বেরাদররা সম্মানের চোখে তাকাত, কিন্তু লেখ্য ইংরেজিতে বাংলা মাধ্যম থেকে পড়ে আসা অনেকেরই ভীষণ রকম দক্ষতা থাকলেও ইংরেজি ভাষায় কথা বলা নিয়ে সমস্যা থাকে অনেকেরই। ভারতে, বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে, ইংরেজি ভাষা নিয়ে এমন একটা দ্বিধাবিভক্তি আছে। এদেশে ইংরেজি মানুষ লিখতে শেখে আগে, আর বলতে শেখে পরে। কিন্তু ভাষা শেখার ক্ষেত্রে হওয়া উচিত এক্কেবারে উল্টো।

কিন্তু ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ইংরেজি ভাষা বা সাহিত্যের চর্চা হয় না। সে-কর্মযজ্ঞের পরিসরও তেমন নেই। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কি শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারিয়ে দেওয়া সহজ আদৌ? তর্ক উঠতে পারে, স্কুলের ইংরেজি আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি এক নয়। স্কুলে ইংরেজি ভাষার ব্যাকরণ শিখতে হয়, ভাষাটা জানতে হয়। ভাষা শিখলে তবে তো সাহিত্য! আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চাটাই সাহিত্যের। ভাষা বলতে কেবল তার ইতিহাস পড়া ও জানা। সুতরাং, দু’টি জিনিস এক করে দেখলে কী করে চলবে? কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার বহু আগে থেকেই যে একটি প্রজন্ম আগাথা ক্রিস্টি, আর্থার কোনান ডয়েল, ড্যানিয়েল স্টিলি, সিডনি শেলডন, পিজি উডহাউজ, এমনকী, সংবাদপত্র পড়ারও অভ্যাস জারি রেখেছিল, সেই আস্বাদ কতটুকু আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের ফিরিয়ে দিতে পেরেছি?

স্বপন চক্রবর্তী ‘বাঙালির ইংরেজি সাহিত্যচর্চা’ গ্রন্থে খুবই বিস্তারিতভাবে ইংরেজি সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে বাঙালির সমস্যা ও ভাষা-সাহিত্য-দর্শনচর্চার নানা দিকে আলোকপাত করেছিলেন। এই গ্রন্থটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যে বাঙালি কীভাবে একটি ভাষার সাহিত্যকে গ্রহণ ও বর্জন করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এই চর্চার পরিসর কি ক্রমে কেঠো কাজের ইংরেজিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? অন্য রাজ্য থেকে অন্য দেশে গিয়ে যাতে যোগাযোগের ভাষায় কোনও অসুবিধে না হয়, গোটা শিক্ষার পরিসরটা কি কেবলই এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে?

বিল অ্যাশক্রফ্ট, গ্যারেথ গ্রিফিথ আর হেলেন টিফিন্স প্রণীত ‘দ্য এম্পায়ার রাইটস ব্যাক’ বইটির কথা যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন, ইংরেজি ভাষা তার ঔপনিবেশিক খোলস ছেড়ে যে সকলের ভাষা হয়ে গেছে এবং সাহিত্য যে সবসময় ইউরোপ-কেন্দ্রিক হবে না, সে-বিষয়ে একটি প্রকৃষ্ট গবেষণামূলক কাজ এই গ্রন্থ। কলেজে পড়তে এই বই আমাদের ইংরেজির উত্তরাধিকার নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। আজকের পূজারিণী প্রধানরা সেই আত্মবিশ্বাসের ফলাফল, এ-কথা বললে কি অত্যুক্তি হবে আদৌ?