লাগাতার কয়েক মাস ধরে চিলচিৎকারে ঘোষণা করা হল, আমাদের চারিদিকে থিকথিক করছে রোহিঙ্গা। ভোটার লিস্ট ঝেঁটিয়ে সেই কোটিখানেক রোহিঙ্গা বিতাড়ন করা হবে। এসআইআর-এর প্রথম খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার চেষ্টা করেও কিছু মেলেনি। এক-আধটুকরো রোহিঙ্গার দেহাবশেষও পাওয়া গেল না। তারপর এল বাংলাদেশি তত্ত্ব। সকলকে সাক্ষী রেখে, বেশ ঘটা করে আইনি পদ্ধতিতে, ঢাকঢোল বাজিয়ে, রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়েই এবার নাম কাটা যাচ্ছে লক্ষ-লক্ষ মানুষের। নাম কাটা যাচ্ছে মানে, এর পর ধামও হয়তো যাবে। যৌক্তিক গরমিল নামক এক আশ্চর্য ফাঁদ পেতে ধরা হল লাখ-লাখ সাধারণ মানুষকে। এখন সেসব ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসতে জীবন কাবার হয়ে যাবে কি না, কেউ জানে না। জীবন যাওয়ার আগে আরও ক’টি ভোট আসবে-যাবে, এর মধ্যে যদি কেউ মরে-টরে যায়, তাহলে হয়তো বিদেশের মাটিতে সাজানো চিতায় জ্বলবে অনেকের দেহ। যে গহ্বরে কবরস্থ করা হবে আমাদের শরীর, নাম-কাটা ভোটারের কাছে সে-মাটি আসলে বিভুঁই। বিদেশ-বিভুঁইয়ে অনেকেরই দেহ লীন হবে পঞ্চভূতে। বেঁচে থাকতে-থাকতেই আমাদের পায়ের তলা থেকে চলে যাচ্ছে মাটি। জঙ্গল, পাহাড়, খনি— এসব তো লুঠপাট হয়েই থাকে। সারা বিশ্বেই হচ্ছে, শুধু আমাদের দেশে হচ্ছে এমন নয়। শুধু-শুধু নিজের দেশের বাড়তি বদনাম করার মানে নেই। কিন্তু এই জানা-কথাটির সঙ্গে এ-তাবৎ অজানা একটি কথাও এবার সামনে এল— একেবারে আইন-আদালত করে, সরকারি নথি প্রকাশ করে মানুষের নামও বেশ লুঠ করা যায়। হাপিশ করে দেওয়া যায় অবলীলায়।
এই নাম-কাটা লোকেরা বলবেন, আমাদের দেহ কিন্তু আছে। আমরা বর্তে নেই ঠিকই, কিন্তু বেঁচে আছি। আছি, কিন্তু নেই হয়ে আছি। এ-রাজ্যের প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ আজ এমনই এক শূন্যতার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে আছে। রাজ্যের বাকি মানুষজন আর ক’দিন বাদেই ভোট দেবেন। নির্বাচিত করবেন প্রচুর যোগ্য প্রতিনিধি। ভোটের লাইনে নাম-থাকা মানুষজন, আপনারা দাঁড়াবেন সারিবদ্ধভাবে, হাতে প্রখরভাবে উঁচিয়ে রাখবেন কমিশনের দেওয়া ঝলমলে ভোটার কার্ড— ছবি উঠবে ফটাস-ফটাস। আপনাদের তর্জনী ধরে রাখবে ভোটের কালি— বৃহত্তম গণতন্ত্রের নিশান। ছবি তোলা হবে আবার। কোটি-কোটি আঙুল উঠবে আকাশের দিকে তাক করে। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। গণতন্ত্র মুবারক।
আরও পড়ুন : কে বেশি ‘ভারতীয়’! সত্যজিৎ রায়ের তুলনা হবে আদিত্য ধরের সঙ্গে? ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৪…
এমন সুন্দর দৃশ্যে আপনারা যাঁরা অংশগ্রহণ করবেন, তাঁদের কাছে একটিই শুধু অনুরোধ। দয়া করে আমাদের ট্রাইবুনাল দেখাবেন না, ওসব আমরা জানি। যেখানে যেতে বলেছে রাষ্ট্র এই গত ক-মাস, সেখানেই ভোর থেকে গিয়ে লাইন দিয়েছি— সব রকম কাগজপত্র নিয়েই গিয়েছি— সার্টিফিকেট, দলিল, পাসপোর্ট— যা যা আছে সব। তবু কেটে গেছে নাম। আবার যাব, মন ভেঙে গেলেও যাব। শুধু আপনারা দয়া করে বলবেন না, একবার ভোট না দিলে কী হয়? এ আর এমন কী ক্ষতি? পরের বার নিশ্চয় দেবে— ট্রাইবুনালে আবেদন করো। ফর্ম জমা দাও। ছোট্ট ব্যাপার। জজসাহেবরা আছেন তো। তাঁরা সব দেখেশুনে নিশ্চয় একটা হিল্লে করবেন। সেই কবে থেকে শুনে আসছি স্যর— হবে হবে, এইবার আমাদের একটা হিল্লে হয়ে যাবে। পরের পর, আমাদের ঠিক হিল্লে করে দেওয়ার জন্য সে কী হুড়োহুড়ি, দৌড়োদৌড়ি! কে আগে আমাদের হিল্লে করে দিতে পারে তার চোখধাঁধানো প্রতিযোগিতা। ফলে ওই নিয়ে ভাবি না আর আমরা।
কয়েকমাস আগে বিহারে কুড়ি-বাইশ লক্ষ লোকের নাম কাটা গেছে। দেখতে পাচ্ছি, আজও তাঁদের কী অপরূপ হিল্লে হয়েই চলেছে। এমন হিল্লে কস্মিনকালেও দেখা যায়নি আগে। বিহারের ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী ভারতীয় জনতা পার্টি-র নেতা সম্রাট চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, ফিসফিসিয়ে নয়, একেবারে রোদচশমা পরে, ক্যামেরার সামনে বলেছেন— বাইশ লাখ লোকের নাম আমরা কেটেছি, আধার কার্ড বন্ধ করেছি, এইবার একে একে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অন্য সব কাগজও কেটে দেব— সব কার্ড ওঁরা বাতিল করবেন একে একে। মানে সোজা ভাষায়, বিহারের বাইশ লক্ষ লোক থাকবে, কিন্তু খাতায় কলমে থাকবে না— রাষ্টের হিসেব থেকে তারা কাট্টি। আছে এবং নেই— একই সঙ্গে। কী চমৎকার ‘হিল্লে’, তাই না?
ওপাশে আরেক রাজ্য অসমের মুখ্যমন্ত্রী, শ্রীযুক্ত হিমন্ত বিশ্বশর্মাবাবু ক’দিন আগেই একটি সর্বভারতীয় খবর-চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে খোলামেলা বলেছেন, তাঁর রাজ্য থেকে সত্তর লক্ষ মুসলমানকে তো তিনি একবারে তাড়িয়ে দিতে পারবেন না (আহা দয়ার শরীর, ও-কথা বলার সময় কী মায়াময় হয়ে উঠেছিল তাঁর চোখ), অত লোককে তাড়ানোর উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই তাঁর, তাই তিনি এমন ব্যবস্থা করছেন, যাতে ওরা নিজেরাই চলে যেতে বাধ্য হয়; এমন দুর্দিন এবং দুর্বিপাক তিনি ঘনিয়ে তুলবেন, যাতে থাকাই হয়ে ওঠে অসহনীয়। ফলে তারা নিজেরাই ধাপে ধাপে না-থাকার দিকে হেঁটে চলে যাবে। এমন অত্যাশ্চর্য হিল্লের কথা কেউ ভেবেছে আগে? অন্য রাজ্যের কথাই বা শুধু বলি কেন? এ-রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শ্রীশুভেন্দু অধিকারী এবং অন্যতম চমকদার নেতা শ্রীদিলীপ ঘোষ ঠারেঠোরে নয়, শিশুবোধ্য ভাষাতেই উল্লসিতভাবে বলেছেন, ৯০ লক্ষ দেশদ্রোহীর নাম কাটা গেছে। কেয়াবাত! কিংবা বলেছেন, এই যাদের নাম বাদ গেছে, এরা সবাই বাংলাদেশি। আরও বাদ যাবে। অহো! কী মধুর শাসানি! চোখে জল আসে, হৃদয় বিগলিত হয়ে যায়!
পুরনো বাউলের মতো একটি করুণ গান বেঁধেছি আমরা— নেচে নেচে সেইটি এদিক ওদিক গেয়ে বেড়াচ্ছে আমাদেরই কেউ কেউ— ‘পঁচিশ বছর ভোট দিসি/ তাও বলে বাংলাদেশি…’ আর কেউ না শুনুক আমরাই শুনছি…
২
এই গোটা প্রক্রিয়ার একেবারে গোড়ায় স্বয়ং নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম আছে তাঁদের কোনও কাগজ দেখাতে হবে না— তাঁরা সরাসরি নতুন তালিকায় ‘উত্তীর্ণ’ হবেন। তাঁর সেই বক্তব্যের ভিডিও-প্রমাণ এখনও ঝলমল করছে অন্তর্জালে। রাজনৈতিক নেতারা মাঝে-মাঝেই (না কি প্রায়শই?) মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, এবং সে-জন্য তাঁদের কোনও আইনি শাস্তি-টাস্তি হয় না। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সরকারি কিংবা সাংবিধানিক পদে থাকা অবস্থায়, সেই পদাধিকার ব্যবহার করে যদি কেউ মানুষকে ধোঁকা দেন, ঠকান, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চরম বিপদে ঠেলে দেন, সেক্ষেত্রেও কি বিচারব্যবস্থা নিশ্চুপ থাকতে পারে?
শুনুন ধর্মাবতার, বিচারকদের এই সম্বোধন তো আমাদের দেশের পুরনো রেওয়াজ— ‘ধর্ম’ কথাটি এক্ষেত্রে ‘রিলিজিয়ন’ অর্থে না, ‘ন্যায়’ অর্থে ব্যবহার করা হয়। সম্মাননীয় বিচারক, আপনি ধর্মের অবতার— ন্যায়ের প্রতিমূর্তি— নদিয়া-মুর্শিদাবাদ-মালদা জেলার প্রান্ত থেকে অপমানে মাটিতে ঝুঁকে-পড়া একজন ষাট কিংবা সত্তরোর্ধ্ব মানুষের তরফ থেকে আপনাদের কাছে পৌঁছতে চাইছে এই প্রশ্ন— দেশের নির্বাচন কমিশনার— অত বড় একটি সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা মানুষ— দেশের জনতাকে ভুল এবং মিথ্যে একটি তথ্য দিয়েছিলেন তিনি, বিপথে চালিত করেছিলেন। তাঁর ওপর ভরসা রেখে চরম বিপদে পড়েছেন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কত-কত আইনজীবী কতদিন ধরে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করছেন এসআইআর নিয়ে, তাঁরা কি প্রধান ধর্মাবতারের গোচরে জ্ঞানেশবাবুর সেই প্রকাশ্য ঘোষণাটির কথা এনেছেন কখনও? বলেছেন কি, প্রকাশ্যে এমন আশ্বাস দিয়েও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধান কীভাবে তার খেলাপ করতে পারেন? হয়তো বলেছেন। হয়তো আইনি কোনও ব্যাখ্যায় প্রমাণিত হয়েছে, অমন ধোঁকা দেওয়াই যায়। কিংবা ওটি আসলে ধোঁকাই নয়, অতি সূক্ষ্ম ব্যাখ্যায় হয়তো প্রমাণ হয়েছে, শ্রীজ্ঞানেশ কুমারের ওই বাণীর অর্থ ছিল অন্য— মূর্খ দেশবাসী তা বোঝেইনি! কিন্তু সেই মূর্খ দেশবাসীর তরফে এই একটি কথা খুব জোরের সঙ্গে বলব— এই সাতাশ লক্ষ ‘বিচারাধীন’ ভোটারের মধ্যে নিজের অথবা আত্মীয়ের নাম রয়েছে যতজনের, অন্তত তাঁদের এক্ষুনি স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কমিশনারের পূর্ব-ঘোষিত বয়ান অমান্য করেছে কমিশন। তাই, ২০০২-এ তালিকায় থাকা লক্ষ মানুষ যদি নতুন তালিকার বাইরে থাকেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পুরনো বয়ানটি মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত হোক। দু’টিই কী করে একসঙ্গে চলবে মান্যবর?
হয়তো ভাল করে খেয়াল করেননি, হয়তো অন্যমনস্ক ছিলেন আপনারা, দোষের কিছু নয়, অমন হতেই পারে, তাই একটু জোরেশোরে, চেল্লামিল্লি করে বলছি, সম্পত্তি, টাকাকড়ি-সোনাদানা-জায়গা-জমি নয় গো, আমাদের নাম লুঠ হয়ে যাচ্ছে মহোদয়। এক মিথ্যে থেকে আর-এক মিথ্যের দিকে আমাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। দিনরাত কানের কাছে বলে যাচ্ছে অনেকেই, তুমি বহিরাগত, তুমি বাংলাদেশি, তুমি আপদ, তুমি নামহীন, বাতিল মানুষ। আমি হয়তো মালদহ কিংবা চব্বিশ পরগনার খেতমজুর, অথবা মুর্শিদাবাদ-হুগলির ইশকুল মাস্টার, অথবা হয়তো উত্তর দিনাজপুর কিংবা নদিয়ার সামান্য বিড়িশ্রমিক— এদেশের শান-শৌর্য-বিত্তে, এদেশের পরম মহত্ত্বে সত্যিই আমার কোনও অবদান নেই, আমি কেবল বেঁচে থাকি, টিকে থাকি, মাঝে মাঝে হাসি-কাঁদি-ভালবাসি। তারপর ফুরিয়ে যাই। আমার চেনা-জানা দু’চার জন ছাড়া— তারাও সব আমাদেরই মতো সাময়িক লোক, অস্তিত্বমাত্র— তারা ছাড়া আর কারও মনে ঠাঁই মেলে না আমাদের। ইতিহাসে, ভূগোলে কোথাও আমরা একবচনে থাকি না। কখনও-সখনও ইতিহাসে যদি কোনও বহুবচনের ভিড় দরকার হয়, তখন আমাদের আসতে হয়। লোকলশকর, জনতা, কৃষক-সমাজ, শ্রমিক শ্রেণি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত— এইসব নামের কন্দরে আমরা সেঁধিয়ে থাকি। এই হচ্ছি আমরা। আমাদের নিয়ে বড়-বড় সব গল্প-উপন্যাস লেখা হয়, পুরস্কার-টুরস্কার দেওয়ানেওয়া হয়। কিন্তু আমরা ওসব বিশেষ পড়ি না। ওসব লেখায় আমরা হলুম গে ‘বিষয়’-মাত্র, ওসব আমাদের নিয়ে লেখা, আমাদের জন্য লেখা নয় বাবুমশাইরা। আমাদের ব্যথাবেদনার কথা ওখানে কিছু থাকে বটে, মাঝেমধ্যে আমাদের মহত্ত্ব-টহত্বও দেখানো হয়, আমাদের প্রতি বেশ টসটসে দরদ, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমাদের ব্যথার উপশম কীসে, তা নিয়ে তেমন কিছু পাই না। আপনেরা হয়তো খানকতক উদাহরণ টেনে এনে বলবেন, এই তো এখানে বেশ ব্যথা কমানোর উপায় বাতলে দেওয়া আছে, কিংবা বলবেন, ব্যথা কীসে কমে, তা বলা কি লেখকের কাজ বাপু? ব্যথা যে আছে, তা দেখানোই তাঁর দায়িত্ব। তারপরে কী হবে, জানে শ্যামলাল। হবেও বা। আমরা নেহাত মূর্খ মানুষ বটে, হয়তো অমনই পৃথিবীর ধারা। কবি-লেখকরা আমাদের ব্যথার কথা খানিক বলেছেন বলে কিছু বেশি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আমরা ভেবেছিলাম, ব্যথার কথা যখন বলছে, তা নিরসনের জন্যও কিছু করবে বোধ হয়। আমাদেরই দোষ। অত প্রত্যাশা করাই অন্যায়। আপনাদের ভারি ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাই, অন্তত ব্যথা যে আছে, এটুকু তো বুঝেছেন আপনারা— তাই বা ক’জন বোঝে স্যর?
৩
দেশের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে আগামী সোমবার চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত হবে। বাদ-পড়া, নাম-কাটা ২৭ লক্ষ মানুষের আবেদন বিষয়ে ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত এবারের ভোটার তালিকায় প্রতিফলিত হবে কি না, সে-বিষয়ে চূড়ান্ত মত জানাবেন তাঁরা। যাঁরা বলেছিলেন, একবার ভোট না দিলেই বা কী, তাঁরাই এবার সিদ্ধান্ত নেবেন শুনেছি। তার আগে দেখতে পাচ্ছি, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়ানো মানুষজন, কারও হাঁপের টান আছে, কেউ এসেছেন কোলে শিশুসন্তানকে কোনওমতে ঘুম পাড়িয়ে, কেউ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খুঁজছেন একটু ছায়া, কোমর ধরে গেছে, একটু বসতে চান— এঁরা আমাদেরই লোক। ভোটাধিকার নামক প্রায় অলৌকিক একটি ক্ষমতা ইতিমধ্যেই যাঁরা পেয়ে গেছেন, তাঁদেরই এখন কিছু লজ্জিত থাকার দিন— আমাদেরই যৌথ অসামর্থ্যে বাদ থেকে গেলেন আমাদের সাতাশ লাখ আত্মীয়। আমাদের এই আত্মীয়-বিয়োগকে সোল্লাসে সমর্থন জানিয়েছে দেশের শাসক দলের নেতৃত্ব। অবলীলায় তাঁরা জানিয়েছেন, এই লক্ষ-লক্ষ বাদ-পড়া লোক আসলে ভয়ানক দেশদ্রোহী, তাঁদের বাদ যাওয়াই উচিত!
আমাদের গণতন্ত্র খুব বড়মাপের, শুনেছি খুবই শক্তিশালী এর কাঠামো। কিন্তু এই নাম-কাটা অভিযানের গ্লানি আমাদের গণতন্ত্রও কি বইতে পারবে? এই গ্লানিচিহ্ন তার শরীরে কি চিরস্থায়ী অসুখ রেখে যাবে না? সাতাশ লক্ষ নাম-বাতিল ভোটারই তো শুধু বিচারাধীন নয়, আসলে আমাদের গণতন্ত্রই আজ বিচারাধীন। আমরা আশা করতে চাই, প্রাণপণে চাই, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ভারতের মান রাখবেন। সম্প্রতি তাঁরা আরাবল্লি লুঠ হয়ে যাওয়া ঠেকিয়েছেন। এবার মানুষের নাম-লুঠ ঠেকাতে পারবেন না?
পূর্বপুরুষের কবরগুলি এইবার কোথায় টেনে নিয়ে যাবেন আতর আলি? পূর্বজদের কবরের মাটি আর চিতার ছাই গায়ে মেখে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছে মানুষ। পোকাগুলো করোনাতেও মরেনি, ঘরের কাছে খেটে খেতে না পেলে নাচতে-নাচতে ‘পরিযায়ী’ হয়ে ওঠে ওদের অনেকে। গতর নিয়ে খাটতে চলে যায় এদিক-ওদিক। হিটলারি কায়দায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বানানোর খরচ অনেক। তারপর গ্যাসচেম্বার-টেম্বার করাও এখন আর সহজ কথা নয়।
এই প্রক্রিয়ায় আচার্য নন্দলাল বসুর উত্তরপুরুষ নাম হারিয়েছেন। তেমন নামীদামি নন, বেশ আবছা জীবন নিয়েই ছিলেন— এমন লক্ষ-লক্ষ মতুয়া, নমঃশূদ্র, মুসলমান ছিটকে গেছেন তালিকা থেকে। আরও আরও কত কত মানুষের সঙ্গে নাম হারিয়েছেন নদিয়ার মানুষ আতর আলি— দেশের জন্য দৌড়ে স্বর্ণপদক এনেছিলেন তিনি কিছুদিন আগেই। নাম বাদ যাওয়ার পর আবেদন করতে গিয়ে প্রশাসনিক কর্তার কাছে শুনেছেন এই বাণী, কবে এসেছেন বাংলাদেশ থেকে? পূর্বপুরুষের কবরগুলি এইবার কোথায় টেনে নিয়ে যাবেন আতর আলি? পূর্বজদের কবরের মাটি আর চিতার ছাই গায়ে মেখে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছে মানুষ। পোকাগুলো করোনাতেও মরেনি, ঘরের কাছে খেটে খেতে না পেলে নাচতে-নাচতে ‘পরিযায়ী’ হয়ে ওঠে ওদের অনেকে। গতর নিয়ে খাটতে চলে যায় এদিক-ওদিক। হিটলারি কায়দায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বানানোর খরচ অনেক। তারপর গ্যাসচেম্বার-টেম্বার করাও এখন আর সহজ কথা নয়। কর্তৃপক্ষের তাই হয়তো মনে হয়েছে, এর চেয়ে অনেক ভাল উন্মুক্ত কারাগার বানানো। খোলা জেলখানা। দেশের মধ্যেই ঘুরে বেড়াও বাছারা। শুধু দেশের পরিচয়টুকু কেড়ে নেওয়া হবে, দেশের তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হবে নাম। এও তো একরকম আইনসম্মত হত্যাকাণ্ডই হল, না কি?
সরকারি দলগুলিকে দেখা হয়ে গেছে, কমিশনের কাজ ও উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছি। এইবার বিচারবিভাগ। সমস্ত ভরসা উঠে যাওয়ার আগে জেনে নিতে চাই, ন্যায়-প্রত্যাশাই কি এবার থেকে অন্যায় বলে বিবেচিত হবে?




