‘দ্য শাইনিং’
যে-কোনও ভৌতিক ছবির একটি প্রাথমিক ট্রোপ থাকে। একটি পরিবার, বা যে-কোনও ছোট গোষ্ঠী— বন্ধুদের দল, প্রেমিক-প্রেমিকা, অথবা হঠাৎ করে কোনও অচেনা জায়গায় আটকে পড়া কিছু মানুষ— তাদের স্বাভাবিক বিচরণভূমির বাইরে গিয়ে পড়ে। সেখানে তাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিকতার ওপর আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে অতি-প্রাকৃত। নানা সংশয়, ভয় ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই অতি-প্রাকৃত শক্তিকে পরাজিত করে মানুষ তার স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে। স্বস্তি ফিরে আসে, এবং মানুষের নির্মিত পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার বিন্যাস আবার পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই ভয়ের প্রকৃতি আসলে অতল অন্ধকারের কিনারায় দাঁড়িয়ে পা টলমল করার মতো— একটি বিপদের অনুভূতি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রাস করে না। ভয় এখানে তার খেলা দেখায়, কিন্তু শেষে বিদায় নেয়; মানুষের সভ্যতা ও নিয়ন্ত্রণের ধারণা অক্ষুণ্ণ থাকে। দর্শক হল থেকে বেরিয়ে আসে একধরনের নিরাপত্তাবোধ নিয়েই। ভয়ের ছবি কেন এত জনপ্রিয়, এবং কেন ইতিহাসের বিশেষ-বিশেষ সময় ভয়ের ছবি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত এই সূত্রে আছে।
কিন্তু যদি এমন একটি ভয়ের ছবি তৈরি হয়, যেখানে এই নিয়মটাই উল্টে যায়? যেখানে অতি-প্রাকৃত কোনও বাহ্যিক শক্তি নয়, তাকে মানুষের মতোই দেখতে, তার আচরণ মানুষেরই মতো এবং মানুষের নিজের মনের ভেতর থেকেই সে উঠে আসে— এবং অটো-ইমিউন ডিজিজের মতো আক্রমণ করে সে নিজেকেই, তার তৈরি করা পরিবার ও তার সাজানো জগৎকে? এতটাই ভয়ংকর সেই আক্রমণ যে, সাত বছরের একটি শিশুকে তার বাবার হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালাতে হয়। গল্পের নিয়ম মেনে বাবা হয়তো মারা যায়, কিন্তু ছবির ভেতরে থেকেই থেকে যায় এই ইঙ্গিত— সে কোনওদিনই পুরোপুরি মরে না, সে তার জন্মের আগেও ছিল এবং মৃত্যুর পরেও থাকবে— আর বারবার ফিরে আসবে। তখন এই ভয়ের প্রকৃতি কী? কারণ এখানে পরিবার, স্বস্তি বা সভ্যতার কোনও পুনরুদ্ধার ঘটে না; দর্শক সেই আরামের নিশ্চয়তা নিয়ে হল থেকে বেরতে পারে না।
বিলি ওয়াইল্ডারের ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’ নিয়ে পড়ুন ‘ছবিঘর’ পর্ব ১…
কোয়েন ব্রাদার্সের ‘দ্য বিগ লোবোউস্কি’ নিয়ে পড়ুন ‘ছবিঘর’ পর্ব ২…
ফ্রাসোঁয়া ত্রুফোর ‘দ্য সফট স্কিন’ নিয়ে পড়ুন ‘ছবিঘর’ পর্ব ৩..
‘দ্য শাইনিং’ ছবিতে বহু ভয়াবহ ও অস্বস্তিকর দৃশ্য থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ফিরে তাকালে দেখা যায় সবচেয়ে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করে এক আপাত, অকিঞ্চিৎকর দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। ছোট্ট ড্যানি, তার আরও ছোট ট্রাইসাইকেলে, এক অতিকায় অথচ সম্পূর্ণ ফাঁকা হোটেলের করিডর ধরে এগিয়ে যায়। সিনেমায় নতুন আসা ‘স্টেডিক্যাম’-এ লাগানো ক্যামেরা তার পিছনে, প্রায় তার উচ্চতায় নেমে এসে, একই গতিতে তাকে অনুসরণ করে। করিডরের ফাঁকা, দীর্ঘ, প্রায় অনন্ত বিস্তারে তার প্লাস্টিকের সাইকেলের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কিন্তু যখনই সে কার্পেটের ওপর দিয়ে যায়, শব্দটি হঠাৎ বদলে যায়— একধরনের চাপা, ঘর্ঘর ধ্বনিতে। এই তীব্র ও হঠাৎ পরিবর্তনশীল শব্দ, যা বারবার ফিরে আসে, তার থেকে তৈরি হওয়া অনির্বচনীয় যে অস্বস্তি, তার সুতোগুলো খুলতে গেলে গোটা ছবিটার ভেতর যে ধোঁয়াশা আছে, তার মুখোমুখি হতে হয়। নইলে গোটা ছবিটির নির্মাণ-কল্প আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

‘দ্য শাইনিং’ প্রথমবার দেখার পর পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তেই দর্শকদের মনে এই প্রশ্নটা জাগে— What was this about? একটা অভিজ্ঞতা হল, যেটা প্রবল, দেখার সময় চোখ সরাতে পারলাম না, কিন্তু তার অর্থ নিয়ে ধন্দ কাটে না। তার ফলে ‘দ্য শাইনিং’ রিলিজ করার পর নানা ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া এই ছবিটিকে তাড়া করেছিল। ১৯৮০ সালে রিলিজের সময় অনেক সমালোচকই ছবিটিকে ঠান্ডাভাবে গ্রহণ করেন— কারও কাছে ছবিটা আবেগহীন লেগেছিল, কারও মনে হয়েছিল এটি মাত্রাতিরিক্ত হিসেবি একটা ছবি। এমনকী, স্ট্যানলি কুব্রিক ‘Razzie Award’-এর জন্যও মনোনীত হন এই ছবির জন্য। স্টিফেন কিং নিজেও ছবিটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, কারণ এটি তাঁর উপন্যাসের মূল সুর থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটির গ্রহণযোগ্যতা নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। VHS যুগে এবং পরে পুনরাবৃত্ত দর্শনে, দর্শক ও সমালোচকরা ছবির ভেতরের স্তরগুলো নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেন— তার অস্পষ্টতা, পুনরাবৃত্তি, আর অস্বস্তিকর নির্মাণই হয়ে ওঠে এর শক্তি। আজ ‘দ্য শাইনিং’ কেবল একটি হরর ফিল্ম নয়, বরং আধুনিক সিনেমার অন্যতম আলোচিত ও বিশ্লেষিত কাজ— যার প্রথমদিককার বিভ্রান্তিই আসলে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হরর লেখক এইচ জি লাভক্রাফটের একটি ম্যাক্সিম আছে, যা কুব্রিক ও তাঁর সহ-চিত্রনাট্যকার ডায়ান জনসন এই ছবিতে বেদবাক্যের মতো অনুসরণ করেছিলেন। “If it’s a mystery, don’t explain!” তার বদলে তাঁরা ছবিতে একটি থ্রিলারের মতো অসংখ্য ক্লু ছেড়ে গেছেন— যেগুলি কিছুতেই প্রথমবারের দর্শনে চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু মানুষ যত দেখেছে, যত সেই ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অসংখ্য চিহ্নের jigsaw puzzle-গুলোকে একটা গ্রহণযোগ্য জ্যামিতিতে সাজানোর চেষ্টা করে গেছে, তত এই ছবি নানাভাবে উন্মোচিত হয়েছে দর্শকের কাছে। অবশ্যই ছবিটির প্রথম দর্শনে কিছু একটা ছিল, যা মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে এই ছবিটির অনুশীলনে প্রণোদিত করেছে, হাজার দুর্বোধ্যতা ও ধোঁয়াশা কাটিয়ে এই ছবিটির আত্মায় প্রবেশের প্রবল ইচ্ছা তৈরি করেছে। এই কিছু একটার নাম viscerality! ‘Viscera’ শব্দটি কথ্য বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়— নাড়িভুঁড়ি। এমন কিছু, যা আমার নাড়িভুঁড়িতে গিয়ে ধাক্কা মারল। একটা প্রবল শারীরিক অভিজ্ঞতা হল, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণটা প্রসেস করতে পারল না। এইরকম অভিজ্ঞতা আমাদের দুঃস্বপ্নে হয়। ‘দ্য শাইনিং’-এর সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়ার যাত্রায় আমাদের স্বপ্ন এবং তার হাত ধরে অচেতনের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় কেন্দ্রিক। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
‘দ্য শাইনিং’-এর এই নিরন্তর শব ব্যবচ্ছেদের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ, স্ট্যানলি কুব্রিক নিজে। এটার একটা আন্দাজ এই গল্পটায় পাওয়া যেতে পারে। ছবিতে ডিক হ্যালোর্যান বলে একটা চরিত্র রয়েছে। তার জন্য একজন অভিনেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি আগে কুব্রিকের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে তিনি একটি শর্ত দেন। কন্ট্রাক্টে লেখা থাকতে হবে যে, কোনও অবস্থাতেই কুব্রিক কোনও একটি শটের ১০০টার বেশি টেক নিতে পারবেন না। কুব্রিক এরকম কোনও শর্ত মানতে রাজি হননি । ফলে এই অভিনেতাও, এত বড় একটা ছবির অফার পেয়েও তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কুব্রিকের সঙ্গে কাজ করা সহজ নয়। এই ছবিতেই জ্যাক নিকোলসন ও শেলি দুভালের একটি দৃশ্য আছে, যেখানে তার স্ত্রীকে বিস্তর ভয় দেখানোর পর বেসবল ব্যাটের বাড়ি খেয়ে জ্যাক নিকোলসন সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়েন। এই সিনটির জন্য ১২৭টি টেক-এর প্রয়োজন হয়, যেটা পরবর্তীতে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড-এ জায়গা করে নেয়। গোটা ছবিটা জুড়ে এরকম অজস্র নিদর্শন আছে। ডিক হ্যালোর্যানের সঙ্গে ড্যানির কথোপকথনের দৃশ্যে ৬৮টি টেক লাগে। গোটা ছবিটা শুট হয় প্রায় এগারো মাস ধরে। বিশালাকায় ওভারলুক হোটেলটির ইন্টেরিয়র সম্পূর্ণ নির্মাণ করা হয় EMI Elstree Studios, হার্টফোর্ডশায়ার ইংল্যান্ডে। সাধারণত এত বড় লোকেশন পুনর্নির্মাণ করতে হলে, বাজেটের কারণেই ধাপে ধাপে করতে হয়। যাতে করে যখন যেমন প্রয়োজন, সেই ভাবে শুট করতে-করতে প্রোডাকশন এগতে পারে। কুব্রিক এসবের ধার ধারেন না। তিনি গোটা সেটটা একত্রে নির্মাণ করে ১১ মাস ফেলে রেখেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, নতুন কোনও আইডিয়া মাথায় এলে পুরো সেটটা না থাকলে সেটা বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। কথাটা জেনেবুঝেই বলা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে স্ক্রিপ্ট লেখার পরেও, কুব্রিক শুটিংয়ের সময় নিরন্তর দৃশ্য পাল্টে পাল্টে দিতেন। বা হয়তো নতুন কোনও দৃশ্য শুট করার পরিকল্পনা করলেন। হাতের কাছে পুরো সেটটা রেডি না থাকলে সেটা সম্ভব হয় না। এই বিলাসিতা পৃথিবীতে খুব কম পরিচালকই পান। তাদের মধ্যে কুব্রিক অন্যতম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে নিয়ে নানারকম মাইথোলজি, চলচ্চিত্র চর্চার মধ্যেই তৈরি হয়েছে। সেই মাইথোলজির সবটা স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু কুব্রিককে নিয়ে এই প্রবাদের কারণেই যত দিন গেছে, মানুষ এই ছবিটাকে খুলে খুলে পড়ার চেষ্টা করেছে, তার নতুন অর্থ বের করার চেষ্টা করেছে। ইন্টারনেটের যুগে এই অর্থসন্ধান নানা দিকে যায়। তার পুরোটা সিরিয়াস অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধানও নয়। অনেকগুলি ব্যাখ্যা-ই প্রায় কন্সপিরেসি থিওরির ছাতার তলায় চলে আসে। কিন্তু উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
এই বিষয়ে স্টিভেন স্পিলবার্গের বয়ান একটু খেয়াল করা যেতে পারে:
I’ve only seen it once, and I didn’t love The Shining the first time I saw it. I have since seen The Shining twenty-five times. One of my favorite pictures. Kubrick films tend to grow on you. You have to see them more than once, but the wild thing is… I defy you to turn off one Kubrick film, once you start. It’s impossible! He’s got this fail-safe button or something. But I didn’t like it the first time I saw it. I was telling him all the things I liked about it, and he saw right through me and he said, “Well, Steven obviously you didn’t like my picture very much.” I said, “Well, there’s a lot of things I loved about it,” and he says, “Yeah, but there’s a lot of things you didn’t, probably more you didn’t than you did, so tell me what you liked about it.” I said, “Well, the thing that I thought was that Jack Nicholson, who was a great actor, and I thought it was a great performance, but it was almost a great kabuki performance. It’s almost like kabuki theater.” He said, “You mean you think Jack went over the top?” I said, “Yeah, I kind of did,” and he said, “Okay, quickly, without thinking, who are your top favorite actors of all time? I don’t want you to think, just name off some names.’’ “So I quickly went: Spencer Tracy, Henry Fonda, Jimmy Stewart, Cary Grant, Clark Gable.” He said, “Stop.” He stopped me. He said, “Okay, where was James Cagney on that list?” I didn’t have”… I thought, “Well, he’s up there high.” He said, “Ah, but he’s not in the top five.” He said, “You don’t consider James Cagney one of the five best actors around. You see, I do. This is why Jack Nicholson’s performance is a great one.”
ছবিটির দৃশ্যের অধিকাংশই অসম্ভব শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জিং। শেলি দুভাল পোড়-খাওয়া অভিনেত্রী নন। এর আগে মাত্র কয়েকটা কাজই তিনি করেছিলেন। এক-একটা দৃশ্য বহুবার করে তাঁকে অভিনয় করতে হয়েছিল, সঙ্গে কুব্রিকের নিরন্তর বকুনি ও খুঁতখুতানি। শুটিংয়ের প্রায় পুরো সময়টা ধরে তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে যেতে থাকেন। সেই ধকল তার চেহারায় একটা বিপুল পরিবর্তন আনে, সেই অসুস্থতা ও ডেসপারেশন ধীরে-ধীরে তার অভিনয়কে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। এর জন্য পরে কুব্রিক প্রভূত সমালোচিত হন। আজকের দিনে হলে হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়ে যেত। কিন্তু ছবি যত গড়াতে থাকে, শেলির চেহারায় যে পরিবর্তন আসে, তা ছবির অভিঘাতের একটি অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে, এটাও সত্যি। এই বিষয়ে কুব্রিকের একটা নিজস্ব ধারণাও কাজ করে। এই যে অনন্ত রিপিটেশন, এটা শুধুমাত্র কোনও পারফেক্ট মুহূর্ত বা এক্সপ্রেশন তৈরি করার খেলা নয়…কুব্রিকের ধারণা, বারবার এক জিনিস করতে-করতে অভিনেতারা সচেতন ইনটেনশন হারিয়ে ফেললে তবেই একটি দৃশ্যের অথেন্টিসিটি তৈরি হতে পারে। এটা চেতন এবং অচেতনের মাঝখানের একটা জায়গা— যা কুব্রিক সারাক্ষণ সন্ধান করে চলেছেন। একটু পরেই, আলোচনার পরিধি আরেকটু বিস্তৃত করলেই তার তাৎপর্য আমরা ধরতে পারবো।
শেষের দিকের একটা দৃশ্যে একটা কুঠার দিয়ে দরজা ভেঙে জ্যাক বাথরুমের মধ্যে ঢুকে তার পরিবারকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। জ্যাক নিকোলসন আগে কাজ করতেন দমকলে, ফলে কুঠার দিয়ে দরজা ভাঙা তাঁর কাছে খুব কঠিন কিছু ছিল না। সেই এফর্টটা দেখাতে, তাকে দিয়ে ৬১বার সত্যিকারের ৬১টা দরজা ভাঙান কুব্রিক। ছবি বানানোর যে যত্ন, কুব্রিকের ক্ষেত্রে সেটা প্রায় পাগলামোর স্তরে চলে যায়।


এর পরের ধাপে আসে ছবিতে লুকিয়ে রাখা শত-শত ক্লু। যত এগুলো আবিষ্কৃত হতে থাকে, তত দর্শকের মনে হয় যে, এর হাত ধরে ছবির আত্মায় প্রবেশ করা যাবে। কিন্তু মুশকিল হল, কুব্রিক ক্লু দেন, কিন্তু ব্যাখ্যা করেন না। ফলে সেই শুধু ক্লু-এর হাত ধরে যাত্রা অনেক সময় ভুল পথেও চালিত হয়। আমরা ছবিতে লুকনো নানা চিহ্নের তালিকায় যাব, কিন্তু তার আগে (যারা ছবিটি দেখেননি, তাদের জন্য) কাহিনির একটা সারসংক্ষেপ জেনে নেওয়া দরকার। হয়তো আমাদের বিশেষভাবে সাহায্য করবে এইটা জানা যে, স্টিফেন কিং-এর উপন্যাস থেকে কী কী কুব্রিক ও তার সহ-চিত্রনাট্যকার নিয়েছিলেন এবং কী কী জিনিস খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন।
গল্পটা সরল। জ্যাক টরেন্স— একসময়ের স্কুলশিক্ষক, কিন্তু মদ্যপানের কারণে সেই চাকরি গেছে— শীতের ছয় মাসের জন্য কলোরাডোর পাহাড়ে অবস্থিত ওভারলুক হোটেলের কেয়ারটেকারের কাজ নেয়। জ্যাকের কাজ নেই, উপরন্তু সে চেষ্টায় আছে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার। এই সময়টা সে লেখার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময় হোটেল পুরোপুরি বন্ধ থাকে; বাইরে তুষার, চারদিক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। হোটেলের ম্যানেজার, স্টুয়ার্ট উলম্যান, কথার ফাঁকে জানিয়ে দেয় যে, এই হোটেল দুয়ের দশকে পুরনো এক ‘ইন্ডিয়ান বারিয়াল গ্রাউন্ড’-এর ওপর তৈরি— এবং সাতের দশকে ঠিক জ্যাকের মতো, একই কাজ করতে এসে এক কেয়ারটেকার, যার নাম চার্লস গ্রেডি— নিজের পরিবারকে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ‘…because for some people, solitude and isolation can, of itself (sic), become a problem…’ (প্রথমবার খেয়াল করি না, কারণ করা সম্ভবই নয়, কিন্তু দ্বিতীয় কি তৃতীয়বার চোখে পড়ে যায় উলম্যানের পেনস্ট্যান্ডে রাখা একটা ছোট্ট এক্স এর মিনিয়েচার মডেল। খুবই নিরীহ ডিটেল, কিন্তু গল্পটা শোনার পর, এবং ছবিটা যত এগতে থাকে, সেই ডিটেলটা আর তত নিরীহ থাকে না।
এই তথ্যগুলো হালকা করে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু কোথাও গেঁথে থাকে। স্ত্রী ওয়েন্ডি আর ছোট ছেলে ড্যানিকে নিয়ে সে সেখানে উঠে যায়। ছবির শুরুতেই জানা যায় ড্যানির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে— ‘shining’— যার আভাস আমরা পাই হোটেলের রাঁধুনি ডিক হ্যালোরানের (হ্যালোর্যানও একই ক্ষমতার অধিকারী) সঙ্গে তার কথোপকথনে। ড্যানি মাঝেমধ্যেই টনি নামে এক কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কথা বলে। তখন তার গলার স্বর পাল্টে যায় এবং টনি তাকে অতীত এবং ভবিষ্যতের নানা ঝলক দেখায়।


ধীরে-ধীরে, কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই, জ্যাকের আচরণ বদলাতে থাকে; হোটেলের ফাঁকা করিডর, চূড়ান্ত একাকিত্ব আর একধরনের চাপা অস্বস্তি মিলেমিশে একটা ভাঙনের দিকে নিয়ে যায় তাকে। তার চোখমুখ, ব্যবহার পাল্টাতে থাকে দ্রুত। নানা সময় প্রায় কোনও প্রতিক্রিয়া ও বিস্ময় ছাড়া সে হোটেলের অতীতের মধ্যে প্রবেশ করে… তার আচরণ সেখানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, নিরুদ্বেগ। আস্তে-আস্তে বোঝা যায়, বর্তমানের থেকে হোটেলের অতীতের মধ্যেই সে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু বর্তমানে ফিরলেই সে অন্য মানুষ। শেষ পর্যন্ত সেই ভাঙন এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে সে নিজের স্ত্রী-সন্তানের প্রতিই হিংস্র হয়ে ওঠে। ছবির শেষে জ্যাক আর ঠিক মানুষ থাকে না, এক জান্তব, বোধহীন, হিংস্র শক্তিতে পরিণত হয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য তার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করা। ছবি শেষে ওয়েন্ডি ও ড্যানি কোনওক্রমে পালিয়ে যায়। বরফের মধ্যে ব্যাখ্যাহীনভাবে জ্যাকের হিমায়িত দেহ পড়ে থাকে। আর তার ঠিক পরে ছবির গল্প থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত একটি দীর্ঘ ট্র্যাকিং শটে আমরা ওভারলুক হোটেলের ভেতর একটা দেওয়ালের দিকে এগিয়ে যাই। যেখানে প্রচুর ছবির মধ্যে একটি ছবি ১৯২১ সালের ফোর্থ জুলাইয়ের বলরুম পার্টির। এবং সেই পার্টিতে বাকি সমস্ত উৎসবে মাতা লোকেদের সঙ্গে জ্যাক অদ্ভুত এক হাসি নিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে।
স্টিফেন কিং-এর উপন্যাসে এই ঘটনাগুলোর পিছনে অনেক ব্যাখ্যা আছে— জ্যাকের অতীত, তার মদ্যপান, তার অপরাধবোধ, আর হোটেলের এক স্পষ্ট ‘অশুভ’ উপস্থিতি, যা ধীরে ধীরে তাকে অধিকার করে। কিন্তু কুব্রিক ও ডায়ান জনসন এই ব্যাখ্যার বড় অংশটাই বাদ দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে, ছবিতে যে ‘ইন্ডিয়ান বারিয়াল গ্রাউন্ড’-এর কথা শোনা যায়, তা উপন্যাসে নেই; আবার উপন্যাসে হোটেলের ‘অতিপ্রাকৃত শক্তি’, supernatural নিয়ে যে বর্ণনা আছে, ছবি তা সযত্নে এড়িয়ে যায়। । ছবিতে বরং সবকিছুই খানিকটা অমীমাংসিত থাকে— জ্যাক কি নিজে থেকেই ভেঙে পড়ছিল, না কি হোটেল তাকে বদলে দিল, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ড্যানির ক্ষমতাও ব্যাখ্যাতীতই থেকে যায়। ফলে উপন্যাস যেখানে ভয়কে ব্যাখ্যা করতে চায়, এবং সেই ভয়কে অতিক্রম করার যে ethical scale তৈরি করে, ছবিটি সেখানে সেই ব্যাখ্যাকে সরিয়ে রেখে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে—যেখানে দর্শককে নিজেকেই বারবার ফিরে গিয়ে এই টুকরো-টুকরো ইঙ্গিতগুলো জোড়া লাগাতে হয়। উপন্যাসটি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কুব্রিক বলছেন—
“I thought it was one of the most ingenious and exciting stories of the genre I had read. It seemed to strike an extraordinary balance between the psychological and the supernatural in such a way as to lead you to think that the supernatural would eventually be explained by the psychological.”

‘দ্য শাইনিং’-এ কী ঘটতে চলেছে, তার পুরো আন্দাজ আমরা ছবি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে যাই। পেয়ে যাই দৃশ্যে এবং টুকরো সংলাপে। ছবির একেবারে শুরুতেই দুটো লম্বা কার জার্নি আছে। কলোরাডোর পাহাড়ের ভেতরে প্রায় জনমানুষশূন্য রাস্তায়, খেলনার মতো ছোট একটা গাড়ি চলতেই থাকে। তাকে ঘিরে থাকে অসম্ভব লম্বা পপলার পাইন ও বার্চ গাছের জঙ্গল (যা ছবির পরবর্তীতে ক্লাইম্যাক্স এর সেই maze বা labyrinth-এর দ্যোতক হিসেবে আসে) একটা বিশাল সরোবর আর নির্বিকার রকি পর্বতমালার শৃঙ্গগুলি।
এই দৃশ্যটাই চাইলে অসম্ভব মনোরম লাগতে পারত, লাগেও তাই— কিন্তু ছবির সাউন্ড ট্র্যাক আমাদের সেই স্বস্তি দেয় না। বোঝাই যায়, এই যাত্রা মঙ্গলের নয়। তার অল্প পরেই আসে ৭০-এ ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা।
কিছুদিন পর সপরিবার হোটেলের পথে গাড়িতে যেতে যেতে একটি আপাতদৃষ্টিতে হালকা কথোপকথন হয়— ড্যানি জানতে চায় ‘cannibalism’ মানে কী। জ্যাক তখন হেসে হেসেই ডোনার পার্টির গল্পটা বলে— কীভাবে উনিশ শতকে একদল পথিক সিয়েরা নেভাদা পাহাড়ে তুষারের মধ্যে আটকে পড়ে, মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে শেষে বাঁচার জন্য সহযাত্রীদের মৃতদেহ খেতে বাধ্য হয়। কথাটা বলা হয় যেন নিছক তথ্য হিসেবে, কিন্তু সেই মুহূর্তেই ছবির ভেতরে ঢুকে পড়ে এক অদ্ভুত ছায়া— একটি পরিবার, একটি যাত্রা, এবং সামনে অপেক্ষা করে থাকা এক দীর্ঘ, অবরুদ্ধ শীত। জ্যাক জানায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি বন্ধ জায়গায় আটকে থাকা, বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, ধীরে ধীরে সামাজিক নিয়মের ভেঙে যাওয়া— এই অবস্থাকেই ‘cabin fever’ বলে।
আবার তার কিছুক্ষণ পরে ডিক হ্যালোর্যান যখন আবিষ্কার করে, ছোট্ট ড্যানি ঠিক তার মতোই shining-এর ক্ষমতা ধরে, তাদের সেই সংলাপ প্রায় গোটা ছবির কাল্পনিক আধার হয়ে থাকে—
Danny- Is there something bad here?
Halloran- Well, you know, doc, when something happens…It can leave a trace of itself behind. Say, if someone burns toast. Well, maybe things that happen leave other kinds of traces behind, not things that anyone can notice, but things that only people who shine can see… I think a lot of things happened right here, in this particular hotel, over the years. And not all of them was (sic) good.
এই ‘trace of a burnt toast’— ঘরের মধ্যে হালকা ভেসে থাকা একটা পুড়ে যাওয়া পাঁউরুটির গন্ধ, এটাকেই মানবসভ্যতার যাত্রার ওপরে প্রোজেক্ট করলে এই পোড়া গন্ধটি সম্পূর্ণ নতুন এক আভাস নিয়ে আসে দর্শকদের অভিজ্ঞতায়। এই burnt toast-এর ইঙ্গিতে কী কী ক্লু কুব্রিক তাঁর চিত্রনাট্য এবং ফিল্ম মেকিং-এ রেখে যাচ্ছেন, তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা করার চেষ্টা করি।
(ক) প্রথমত হোটেলের স্থাপত্য। ওভারলুক হোটেলের ভেতরের লে-আউট কোনওভাবেই যুক্তিসংগত নয়। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় হোটেলের ডিজাইনে এমন সমস্ত জিনিস রয়েছে, যা কোনওভাবেই বাস্তব নয়, বা বাস্তব দেখালেও সেখানে সেটার থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। ম্যানেজার উলম্যানের অফিসের পিছনের যে জানালা, আগের শটটা খেয়াল করলেই বোঝা যায়, ওখানে ওই জানালা থাকার সম্ভাবনা নেই। থাকলেও সেই জানালা দিয়ে কখনওই বাইরের কোনও দৃশ্য দেখা সম্ভব নয় কারণ আগের শটটা সত্যি হলে ওখানে একটি করিডর থাকবে। ঠিক সেইভাবে হোটেলের যে সেন্ট্রাল লবি, যাকে কলোরাডো রুম বলা হচ্ছে, তা এত বিশাল, যে বাইরে থেকে দেখা হোটেলের বহরের মধ্যে তা কিছুতেই সেঁধোতে পারে না। আবার করিডর দিয়ে যখন ড্যানি সাইকেল চালিয়ে যায়, খেয়াল করি করিডরের শুরুতেই ডানহাতে একটা সিঁড়ি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। সেই সিঁড়িটা যদি সত্যি হয় তাহলে করিডরের ডানহাতে কোনও ঘর থাকা সম্ভব নয়। অথচ করিডর জুড়ে প্রায় চারখানা বন্ধ দরজা রয়েছে, যা পরপর এমন ঘরের দিকে নির্দেশ করে, যার কোনও অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। ছবির শুরুর দিকে একটি ডিক হ্যালোর্যান যখন ওয়েন্ডি ও ড্যানিকে কিচেন এবং তার পাশে থাকা স্টোররুম ঘুরিয়ে দেখান, দৃশ্যের জ্যামিতি খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে, দুটো ঘর কখনওই একে-অপরকে ওভারল্যাপ না করে বাস্তবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এইরকম নিদর্শন ছবি জুড়ে ভূরি-ভূরি রয়েছে। যে সেট একবছর ধরে বানিয়েছেন কুব্রিক, এবং পরের এক বছর ধরে যে সেটে তিনি শুট করেছেন, সেই সেটে এই ধরনের ভুল যে তিনি অসাবধানতাবশত করবেন না, এটা তার ছবির দর্শকমাত্রই জানেন। এই ভুল ইচ্ছাকৃত এবং দিক-নির্দেশকারী ।
(খ) বস্তুর অনির্দিষ্টতা— এক শটে, যেখানে চেয়ার বা কার্পেট আছে, পরের শটে তা নেই; আবার তৃতীয় শটে সেটা ফিরে আসে। যেন জায়গাটা নিজেই নিজেকে বদলে নিচ্ছে। এটাও গোটা ছবি জুড়ে বারবার ঘটে। কোনও সাধারণ ডিরেক্টর এই কাজ করলে সেটাকে একটা নিম্নমানের কন্টিনিউটির ভুল বলে ধরা যেত। এসব ব্যাপারে কুব্রিককে হালকাভাবে নেওয়া সম্ভব নয়— তিনি কোনও দৃশ্য ত্রিশ-চল্লিশবারের কম শুট করেন না।
(গ) ক্রিয়ার ধারাবাহিকতা— ছবির শুরুর দিকে ওয়েন্ডি এসে টাইপরাইটারে কাজ করতে থাকা জ্যাকের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলার আগে জ্যাক টাইপরাইটার থেকে কাগজ বের করে নেয়, তারপর সে চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার করে ওয়েন্ডির সঙ্গে। ঘাবড়ে গিয়ে ওয়েন্ডি ফিরে যায়। জ্যাক তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর টাইপরাইটারের দিকে মন দেয়। টাইপরাইটারে আবার কোনও অজানা কারণে সেই কাগজ ততক্ষণ ফিরে এসেছে। ছবিতে এরকম বহু কাজ সম্পূর্ণ হয় না, বরং নিজেকে মুছে আবার শুরু করে।
বস্তুর ও কার্যকারণের অস্থিরতা আস্তে-আস্তে জারিয়ে যায় ওভারলুক হোটেলের ভেতরেও।
(ঘ) জ্যাক যখন প্রথম খালি বারে ঢোকে, যেখানে সে আগে কোনওদিনও ঢোকেনি— সেখানে হঠাৎ করেই বারটেন্ডার লয়েড উপস্থিত হয়— কিন্তু জ্যাকের প্রতিক্রিয়া একেবারেই অস্বাভাবিক; সে যেন তাকে আগেই চিনত, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলে, এমনকী, তার স্ত্রী ও তার দাম্পত্য-কলহ নিয়েও সে লয়েডের কাছে নালিশ করে এবং খুবই নিরীহভাবে পানীয় অর্ডার করে।
(ঙ) একইভাবে, একটু পরেই একটা দৃশ্যে বলরুম হঠাৎ করেই পূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষে, সংগীতে— পাত্র-পাত্রীদের চেহারা এবং পরিবেশ দেখলেই বোঝা যায় এই দৃশ্যটি সুদূর অতীতে স্থিত, কিন্তু এই ‘জেগে ওঠা’-র কোনও ব্যাখ্যা নেই, আর জ্যাকও তাতে বিস্মিত হয় না, যদিও পোশাক-আশাক-আচরণ সমেত সে নিজে থাকে বর্তমানে।
(চ) গ্রেডির পুনরাবির্ভাব— চার্লস গ্রেডির নাম আমরা প্রথম শুনি ম্যানেজার উলম্যানের মুখে— সত্তর দশকের সেই কেয়ারটেকার, যে তার পরিবারকে কুপিয়ে হত্যা করার পর আত্মহত্যা করে। তারপরে সেই ম্যাজিক্যাল বলরুমের দৃশ্যে যখন ওয়েটার-রূপি গ্রেডির সঙ্গে আলাপ হয় জ্যাকের, তখন তার নাম চার্লস থেকে ডেলবার্ট হয়ে গেছে। জ্যাকের কোটের ওপর অ্যাক্সিডেন্টালি পড়ে যাওয়া ‘অ্যাডভোকাট’ পরিষ্কার করতে দু-জনকেই ওয়াশরুমে যেতে হয় তখন তাদের সংলাপ এইরকম চলে—
Jack- Well, what do they call you around here, Jeevesy.
Grady- Grady, sir. Delbert Grady.
Jack- Grady?
Grady- Yes.
Jack- Mr. Grady, haven’t I seen you somewhere before?
Grady- Why, no, sir. I don’t believe so.
Jack- Mr. Grady, weren’t you once the caretaker here?
Grady- Why, no, sir. I don’t believe so.
Jack- You are a married man, are you, Mr. Grady?
Grady- Yes, sir. I have a wife and two daughters, sir.
Jack- And where are they now?
Grady- Oh, they’re somewhere around. I’m not sure at the moment, sir.
Jack- Mr. Grady, you were the caretaker here. I recognize you. I saw your picture in the newspapers. You chopped your wife and daughter up a little bit, and you blew your brains out.
Grady- That’s strange, sir! I don’t have any recollection of that at all.
Jack- Mr. Grady, you were the caretaker here.
Grady- I’m sorry to differ with you, sir, but you are the caretaker. You’ve always been the caretaker. I should know, sir; I’ve always been here.
এই প্রথম নাম, সময়, পরিচয় এবং চরিত্রের দায়িত্ব সব ওলটপালট হয়ে যায়। হোটেল এবং তার সমস্ত ভৌত বাস্তবতার মতো তার অতীত-বর্তমান এবং ভবিষ্যৎও কোনও নির্দিষ্ট বিন্দুতে আর থাকে না।
ওভারলুক হোটেল ও তার সমস্ত পাত্র-পাত্রী একটি অরৈখিক, অস্থিতিশীল প্রবাহের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
(ছ) ছবিজুড়ে আয়নার উপস্থিতি, বিশেষ করে জ্যাক যখন অতীত বা কোনও বিশেষ উন্মোচনের সামনে দাঁড়ায়। সেই মিরর ইমেজের হাত ধরে আসে দ্বৈত চিত্র— গ্রেডির যমজ মেয়ে, রিফ্লেকশন, একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি— সব মিলিয়ে একটি ‘double’-এর জগৎ তৈরি করে, যেখানে প্রায় কোনও কিছুর একক কোনও সত্তা নেই।
(জ) এর সঙ্গে যোগ হয় জ্যাকের সেই অদ্ভুত দৃষ্টি— কখনও কথার ফাঁকে হঠাৎ ক্যামেরার দিকে মুহূর্তের জন্য তাকানো—যার আপাত কোনও লজিক নেই। কিন্তু অবচেতনে তা যেন দর্শককেও সেই পরিসরের ভেতরে টেনে আনে।
(ঝ) হোটেলের ইন্টেরিয়রে এবং নানা বস্তুর ওপরে ছড়িয়ে থাকা অজস্র নেটিভ আমেরিকান মোটিফ— বিশেষ করে উলম্যানের অফিসের বাইরে থাকা ‘দ্য গ্রেট মাদার’ ইমেজটি— যা আর্কিটাইপ হিসেবে একই সঙ্গে লালন ও ধ্বংসের দ্যোতনা বহন করে— শুধু সেটের সাজসজ্জা নয়, বরং একটি চাপা ইতিহাসের ইঙ্গিত। ছবিতে উচ্চারিত ‘Indian burial ground’-এর সঙ্গে এই চিত্রগুলো মিলে গিয়ে এমন এক উপস্থিতি তৈরি করে, যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু স্থানের ভেতর থেকে— একধরনের অবদমিত স্মৃতির অবশিষ্ট ছাপ বহন করে।
এই তালিকা চাইলে অনেক দূর অবধি সম্প্রসারিত করা যায়। কিন্তু সম্ভবত তার প্রয়োজন নেই। মোটের ওপর কুব্রিক কী করছেন, আমরা আস্তে আস্তে হয়তো ধরতে পারছি। একটা স্থান-কালের অভিজ্ঞতা যার কোনও কন্টিনুয়াম নেই। কিন্তু এই amorphous, shape-shifting space time-এর ভেতর এক ভয়ানক ও অনন্ত ভায়োলেন্সের ইঙ্গিত ফাঁকগুলো থেকে উঁকি মারতে থাকে। এই ভায়োলেন্স ভৌতিক ছবির ভয় তৈরি করে না। কোনও ব্যাখ্যা ছাড়া যখন এলিভেটরের ভেতর দিয়ে ঝরনার রক্তের স্রোত নামে, তাকে ঠিক বিশেষভাবে ভৌতিক বলা যায় কি না, সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল। ড্যানি ও ওয়েন্ডির ওপরে তার একধরনের প্রভাব হয়… তা তাদের ভীত করে। জ্যাকের ওপর এর প্রভাব হয় ঠিক উল্টোটা। সে আকৃষ্ট হয়…ক্রমশ এই হোটেলের আত্মার দাসত্ব স্বীকার করে। ‘The trace of the burnt toast’ তার নাক দিয়ে ঢুকে তার মস্তিষ্ক দখল করে।
যদিও কুব্রিক সরাসরি কোনও ফ্রয়েডীয় গ্রন্থের উল্লেখ করেন না, তবু ছবিটির গঠন ফ্রয়েডের ‘uncanny’-র ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত— যেখানে পরিচিত জিনিসই অচেনা হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ডায়ান জনসনের গথিক সাহিত্য ও ইউরোপীয় রূপকথার প্রতি আগ্রহ ছবির ভয়ের কাঠামোকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে যুক্তি নয়, বরং স্বপ্নের মতো এক অযৌক্তিক ধারাবাহিকতা কাজ করে।
এতক্ষণ ধরে নানাভাবে যতই ছবিটার বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করি, এই দৃশ্য-শব্দের ধারাকে একটা লেখার মধ্যে আনা প্রায় অসম্ভব কাজ। যেমন অসম্ভব কুব্রিক এর দৃশ্যগ্রহণের অসম্ভব পরিশীলন-কে বিবৃত করা, তেমনই দুরূহ এই ছবির শব্দের দুনিয়ার আন্দাজ দেওয়া। কুব্রিকের সাউন্ডট্র্যাক প্রায় ছবির মতোই এডিট হয়। বিভিন্ন টুকরো জুড়ে-জুড়ে ছবির সঙ্গে সমান্তরালভাবে একটা মনস্তাত্ত্বিক জগৎ তিনি তৈরি করেন… প্রচলিত অর্থে যাকে ‘স্কোরিং’ করা বলে, ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একধরনের মিউজিক, যা দৃশ্যকে উত্তোলিত করে, কুব্রিক তার ধারে-কাছে যান না। ফলে হাজার পড়েও এই ছবির স্বাদ নেওয়া অসম্ভব।
এবার আসি এই ক্রাফটের ‘কেন’-র প্রসঙ্গে।
সহিংসতা কোনও ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি ধারাবাহিকতা—একটি সিভিলাইজেশনাল তাড়না, যার এক ধরনের irrational, প্রায় mindless গতি বারবার জ্যাককে তার দিকে টেনে নিয়ে যায়। একজায়গায় জ্যাক নিজের মুখেই রাডিয়ার্ড কিপলিং-এর “white man’s burden”-এর উল্লেখ করে—এক অদ্ভুত আত্ম-ন্যায্যতার ভাষা, যেখানে দখল ও ধ্বংস একধরনের দায়িত্বে পরিণত হয়।
এই ‘কেন’-র প্রশ্নে পৌঁছতে গেলে, আমাদের মনস্তত্ত্ব এবং অতিপ্রাকৃত থেকে একটু ইতিহাসের দিকে সরে আসতে হবে। এতক্ষণ ধরে যে অস্বস্তির অভিজ্ঞতার কথা বললাম— যেখানে স্থান, সময়, এবং ক্রিয়া নিজেদের নিয়ম ভেঙে দেয়— তা যেন একধরনের ‘uncanny’ পরিসর তৈরি করে, যেখানে পরিচিত জিনিসই অচেনা হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অচেনা হওয়া নিছক মানসিক নয়; এর সঙ্গে জুড়ে থাকে এক বিশাল, দমিত ইতিহাস। ইউং-এর ‘collective unconscious’-এর মতো করে ভাবলে, ওভারলুক হোটেল এমন এক স্থান, যেখানে সমষ্টিগত স্মৃতি স্তরে স্তরে জমা হয়ে আছে— কিন্তু সেই স্মৃতি নিরীহ নয়। ‘Indian burial ground’-এর ইঙ্গিত, হোটেলের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা নেটিভ আমেরিকান মোটিফ, এলিভেটর থেকে ঝরনার মতো বেরিয়ে আসা রক্তের অনন্ত স্রোত— এসব মিলিয়ে যে ইতিহাসের ছায়া তৈরি হয়, তা আমাদের অচেতনে নিয়ে যায় এমন এক অতীতের দিকে, যেখানে এক বিশাল জনসমষ্টি ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে মুছে গেছে। এই দমিত সহিংসতা সরাসরি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তার ‘trace’— burnt toast-এর গন্ধের মতো— এই স্থান-কালের ভেতরে ভেসে থাকে। ফলে হোটেলটি শুধু একটি মানসিক পরিসর নয়, বরং একধরনের আর্কাইভ, যেখানে সভ্যতার নামে সংঘটিত অযৌক্তিক সহিংসতা স্তরে স্তরে জমা হয়ে আছে।
চারপাশে তাকালে যে অস্বস্তিটা আমাদের সবচেয়ে বেশি তাড়া করে, তা হল এই হিংসার অযৌক্তিকতা। মানুষ নিরন্তর এই ধ্বংসের উৎসবে কেন মাতে, আমাদের যৌক্তিক মস্তিষ্ক তা ঠিকমতো ঠাহর করে উঠতে পারেনি হয়তো!‘দ্য শাইনিং’ দেখতে দেখতে মনে হয়, হয়তো প্রশ্নটাই আমরা ভুল করছি! এই ধ্বংসলীলা অযৌক্তিক, তাই হয়তো এটার অনন্ত ক্রম থামানো যায় না। ‘Its irrationality is probably the reason why it exists.’ বুদ্ধি ও যুক্তি যদি যায় সম্মুখপানে, তাহলে পিছুটান কোনদিকে যায়, তার থেকেই আন্দাজ করা যায়।
কিন্তু এই আর্কাইভ কোনও মৃত ভাণ্ডার নয়; এটি সক্রিয়, এবং তার কাজ পুনরাবৃত্তি। হাজার-হাজার আয়নার মধ্য দিয়ে প্রসারিত তার ইনফাইনাইট প্রতিফলনের সারি। সেখানে সহিংসতা কোনও ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি ধারাবাহিকতা—একটি সিভিলাইজেশনাল তাড়না, যার এক ধরনের irrational, প্রায় mindless গতি বারবার জ্যাককে তার দিকে টেনে নিয়ে যায়। একজায়গায় জ্যাক নিজের মুখেই রাডিয়ার্ড কিপলিং-এর “white man’s burden”-এর উল্লেখ করে—এক অদ্ভুত আত্ম-ন্যায্যতার ভাষা, যেখানে দখল ও ধ্বংস একধরনের দায়িত্বে পরিণত হয়। সে শুধু একজন ব্যক্তি নয়; সে এই ইতিহাসের ধারক। “You’ve always been the caretaker”— এই সংলাপ তখন ব্যক্তিগত নয়, বরং ঐতিহাসিক। জ্যাকের ভাঙন তাই নিছক মানসিক বিপর্যয় নয়; বরং সে ধীরে-ধীরে এই অনন্ত চক্রের অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে ব্যক্তি মুছে যায়, শুধু থেকে যায় পুনরাবৃত্ত, অর্থহীন, অথচ অব্যহত হত্যার এক প্রবাহ। ফলে যে ‘burnt toast’-এর গন্ধ ছবির মধ্যে ভেসে থাকে, তা কেবল কোনও অতীত ঘটনার অবশিষ্ট নয়— বরং এক নিরন্তর, সভ্যতাবাদী সহিংসতার চক্র, যা থামে না, শুধু নিজেকে নতুন দৃশ্যে পুনর্লিখন করে।
এই ছবির শাশ্বত উত্তরাধিকারের মধ্যে পড়ে থাকে সেই অলীক আয়নার সম্ভার, যা দিয়ে ছবির দৃশ্যপট ভরিয়ে দিয়েছেন কুব্রিক। যার মধ্যে জ্যাক নিজেকে বারংবার দেখতে দেখতে তার বর্তমান বিস্মৃত হয়। সেই আয়না, খেয়াল করলেই দেখা যাবে, কুব্রিকের ছবির অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই আয়না, যার সামনে কোনও এক ইতিহাস এসে দাঁড়ালে, প্রতিচ্ছবিতে বিপ্রতীপ কিন্তু সহোদর এক ইতিহাস ভেসে ওঠে— হলোকস্টের ওপাশে আল-নকবার মতো।
‘The Shining’ (দ্য শাইনিং) (১৯৮০)
পরিচালনা: স্ট্যানলি কুব্রিক
চিত্রনাট্য: স্ট্যানলি কুব্রিক, ডায়ান জনসন
মূল উপন্যাস: স্টিফেন কিং
প্রযোজনা: স্ট্যানলি কুব্রিক
চিত্রগ্রহণ: জন এলকট
সম্পাদনা: রে লাভজয়
সংগীত (সংগীত তত্ত্বাবধান ও ব্যবহৃত স্কোর): ওয়েন্ডি কার্লোস, র্যাচেল এলকাইন্ড
প্রোডাকশন ডিজাইন: রয় ওয়াকার
আর্ট ডিরেকশন: লেস টমকিন্স
অভিনয়: জ্যাক নিকলসন— জ্যাক টরেন্স
শেলি দুভাল— ওয়েন্ডি টরেন্স
ড্যানি লয়েড— ড্যানি টরেন্স
স্ক্যাটম্যান ক্রদার্স— ডিক হ্যালোরান
ব্যারি নেলসন— স্টুয়ার্ট উলম্যান
ফিলিপ স্টোন— ডেলবার্ট গ্রেডি

