নেপথ্যের নারীরা

OSCAR

১৫ মার্চ ভোররাত্তিরে তামাটে ত্বক এবং কালো চুলের এক আমেরিকান মেয়ে এলএ (লস অ্যাঞ্জেলেস)-র ডলবি থিয়েটারে সোনার পাতে মোড়া নাইটটিকে দুই মুঠোতে ধরে অডিটোরিয়ামের সব নারীকে উঠে দাঁড়াতে বললেন। দেখলাম, এক-এক করে বিশাল অডি-র অন্তত অর্ধেক অডিয়েন্স উঠে দাঁড়ালেন। অটম ডুরাল্ড অর্কপ তাঁর অস্কারটি প্রত্যেকটি উঠে দাঁড়ানো মেয়ে, যাঁরা সিনেমায় কাজ করেন— অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কারিগরি শিল্পী, এমনকী, সব মা, কন্যা, স্ত্রী, সাথী, বান্ধবী, যাঁরা কারও না-কারও সঙ্গী হয়ে এসেছেন— তাঁদের সবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। 

অডি-তে সেই মেয়েদের মুখগুলি তখন জ্বলজ্বল করছে— তীব্র আর্ক-লাইটের মতোই— তাদের চোখে চিকচিকে জল আর মুখে দারুণ এক হাসি। পর্দার নেপথ্যের জগতে বরাবরই পুরুষের রাজত্ব, অথচ অ্যালিস গাই ব্লাচে, পৃথিবীর প্রথম মহিলা চিত্রপরিচালক তাঁর প্রথম ছবি ‘দ্য ক্যাবেজ ফেয়ারি’ বানিয়েছিলেন ১৮৯৬-এ। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ অবধি ১০০০-এর বেশি সিনেমা বানিয়েছিলেন তিনি। তারপরে আমৃত্যু সিনেমার শিক্ষক ছিলেন প্যারিসে। তিনি ছিলেন একইসঙ্গে পরিচালক, চিত্রশিল্পী বা সিনেম্যাটগ্রাফার এবং পরবর্তী সময় প্রোডিউসার এবং স্টুডিও মালিক। অথচ তাঁর কাজগুলি এখন আর সংরক্ষিত নেই। সিনেমার কোর্সে অ্যালিস বা তাঁর বানানো মহিলা-কেন্দ্রিক ছবিগুলি জায়গা করে নিতে পারেনি আজকের দিনেও। অ্যালিস, পৃথিবীর প্রথম মহিলা চিত্রগ্রাহকও বটে। নিজের ছবির ক্যামেরা নিজেই করতেন তিনি; হয়তো এবং সম্ভবত কোনও পুরুষ ক্যামেরাপার্সন মহিলা পরিচালকের জন্য কাজ করতে রাজি ছিলেন না তাই, ঠিক যেমন প্রচুর পুরুষ পরিচালক মহিলা ক্যামেরাপার্সন নিয়ে কাজ করতে চান না।

অটম বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানালেন ‘সিনারস’-এর (যে ছবির জন্য অস্কার জিতে নিয়েছেন তিনি) পরিচালক রায়ান কাইল কুগারকে তাঁর ক্রু-এর সব ডিপার্টমেন্ট- এর প্রধান হিসেবে মহিলাদের নেওয়ার জন্য। এই পদক্ষেপ কোনও নজির সৃষ্টি করার জন্য নয়, কিন্তু প্রাপ্য সম্মানের ভাগীদারদের সেই শ্রদ্ধা দেওয়া এবং আরও প্রয়োজনীয় যা, যোগ্য মানুষকে সঠিক সুযোগটি দেওয়া। অটম সেইসব ক্যামেরার নেপথ্যে কাজ করা সিনেমার কারিগরদের হয়েই হয়তো বললেন যে, ‘আজকের দিনটি বিশেষ, কারণ, হয়তো আমার মতো দেখতে বেশ কিছু মেয়ে এই মুহূর্তে এই সম্প্রচার দেখছে এবং বুঝতে পারছে তাঁদের স্বপ্ন কোনও অসম্ভব স্বপ্ন নয়।’ 

আরও পড়ুন: ওয়াইফাই-এর চাবুক ও পিতৃতন্ত্রের নতুন খেলনা! লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…

অটম ডুরাল্ড অরকপ ‘সিনারস’ ছবিটির জন্য বেস্ট সিনেম্যাটোগ্রাফি-র অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডটি জিতে ১৫ মার্চ, ২০২৬-কে একটি বিশেষ তারিখ বানিয়ে দিলেন।  অ্যাকাডেমির ইতিহাসে অটম প্রথম মহিলা চিত্রগ্রাহক, যিনি ‘বেস্ট সিনেম্যাটোগ্রাফি’-র অস্কার পেলেন, তিনি প্রথম ‘কালারড’ নারী, যিনি এই বিভাগে মনোনীত ছিলেন। আর হ্যাঁ, বেস্ট প্রোডাকশন ডিজাইন-এর আকাডেমি অ্যাওয়ার্ডটিও পেয়েছেন আরেক মহিলা চলচিত্র-কারিগর, উওম্যান ফিল্ম-টেকনিশিয়ান, টামারা ডেভেরেল (যৌথভাবে শেন ভিউউ-এর সঙ্গে); ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ ছবিটির জন্য। সিনেমার কারিগরি বিভাগগুলিতে, বিশেষ করে ক্যামেরা, প্রোডাকশন ডিজাইন, সাউন্ড, মিউজিক এবং পরিচালনা— মহিলারা শুরু থেকেই ব্রাত্য। অবশেষে গল্প পাল্টাচ্ছে। অবশেষে মেয়েরা যোগ দিচ্ছে পর্দার পিছনের দৃশ্যপটে। তৈরি করছেন দেখা, শোনা আর গল্প বলার স্বতন্ত্র এবং দক্ষ ভাষা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, অবশেষে তাঁরা স্বীকৃত হচ্ছেন, তাঁদের কাজ জায়গা খুঁজে নিচ্ছে। 

অটম ডুরাল্ড অরকপ

সেই কলেজে পড়ার সময় যখন সিনেমা বানানর স্বপ্ন দেখতাম, সিনেমাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন  দেখতাম, তখন আমাদের স্বপ্ন-র কথা কাউকে বলতেও লজ্জা পেতাম। ফিল্মমেকার হতে চাওয়ার বা সিনেমা বানাতে চাওয়ার স্বপ্ন, ঠিক মেয়েদের দেখার স্বপ্ন না। যদিও এফটিআইআই, এসআরএফটিআই বহুদিনের প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশের অনেক স্বনামধন্য মহিলা পরিচালক ও কারিগরি শিল্পী বেরিয়েছেন এই দুই প্রতিষ্ঠান এবং আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে। তবু তাদের পথচলা খুব মোলায়েম কিছু ছিল না, আর সাধারণ সমাজের চোখে কোনও মেয়ের এই উদ্ভুতুড়ে ইচ্ছে বা স্বপ্ন আদপে ‘খোরাক’-এর মতো, অটম যেমন বলেছেন, তেমনই একটি হাস্যকর, অসম্ভব আকাশকুসুম কল্পনার মতো। 

আমরা যখন কাজে ঢুকি, সেই ২০০৩ সালে তখন সিনেমার ক্ষেত্রে মূলত অভিনয় ছাড়া কারিগরি বিভাগে মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট হাতে গোনা কিছু জায়গা ছিল, হেয়ার ড্রেসার, কস্টিউম ডিজাইনার, কস্টিউম অ্যাসিস্ট্যান্ট— এইসব, শুধু টালিগঞ্জ পাড়ায় না, মুম্বই বা তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতেও; পৃথিবীর মানচিত্রেও মহিলা টেকনিশিয়ান তখনও খুঁজে বের করতে হয়। মনে আছে, ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এ পড়ব বলে খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। অত্যন্ত শুভানুধ্যায়ী রেজিস্টার সাহেব বলেছিলেন, এডিটিং-এর পরীক্ষায় বোসো, ক্যামেরা, প্রোডাকশন ডিজাইন বা সাউন্ড মেয়েদের জন্য ঠিক যথার্থ না। এদিকে আমার ইচ্ছে ডিরেকশন বা ক্যামেরা নিয়ে পড়ার। ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেয়েছিলাম অনেকটা এই ধরনের কিছু— ভীষণ খাটনির কাজ, সারাক্ষণ ছোটাছুটি, সারাক্ষণ ট্র্যাভেল, খুব ধকল ইত্যাদি ইত্যাদি। বাড়ি ফিরতে-ফিরতে বাবাকে বলেছিলাম, ‘লোকটা কী অদ্ভুত! জানতেই চাইল না আমি এগুলো পারব কি না! আমার তো এগুলো সব ভাল লাগে!’ 

বাবা একটু হেসে বলেছিল, ‘উনি তো ভুল কিছু বলেননি। এইসব কাজে তোর ফ্যামিলিকে সময় দিতে পারবি না কোনওদিন। তোর ছেলেমেয়ের দেখাশোনা কে করবে। তাদেরও তো কিছু এক্সপেক্টেশন থাকবে তোর কাছে।’

আমার মুখ গোমড়া দেখে বাবা আরেকটু হেসে বলেছিল, ‘এইসব শুনতে যত রোমান্টিক লাগে, বাস্তবে ঠিক তার উল্টো। এখন মনে হচ্ছে ভাল লাগবে, পরে দেখবি কষ্ট হবে! আমার তো ইচ্ছে ছিল, তুই সিভিল সার্ভিস-এর পরীক্ষাটা দিস…’   

—তুমি কি এগুলো আমি মেয়ে বলে বলছ? 

—(হা হা হা) তাতে কি হয়েছে, মেয়েদের সব জায়গায় ছেলেদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে, সব জায়গায় এক হতে হবে তার তো কোন মানে নেই। মেনে নিলে ক্ষতি কী!

মনে-মনে বলেছিলাম, ‘কিন্তু আমি তো লড়াই করছি না, আমি তো শুধু যা ভালবাসি তাই করতে চাইছি। লড়াই তো করছ তুমি এবং তোমরা, বাধা দিয়ে, ছোট করে, পারব না, হবে না ভেবে নিয়ে— নিজেদের মতো বানিয়ে-বানিয়ে, শিখিয়ে দেওয়া কিছু অবান্তর গালগল্প খাড়া করে।’

লড়াইটা যে না করতে চাইলেও করতেই হয় বা হচ্ছে, সেটা বুঝলাম আরও পরে ‘বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রোডাকশনস’-এ কাজ করতে ঢুকে। তার আগে থেকেই সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা বেশ খানিকটা করেছি, সিনেমা তো প্রচুর দেখছি। বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় তিন ওয়ার্ল্ড সিনেমা মাস্টার, যাদের নাম ঘরে-ঘরে উচ্চারিত হত সেই সময়ে, বার্গম্যান, ত্রুফো, গদার-এর কাজ ছাড়াও ফেলিনি, কুরোসাওয়া, আন্দ্রে ওয়াইদার ছবি দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু কেউ বলেনি, কোন পত্রিকায় লেখালিখি হয়নি, কোন কলকাতার ফেস্টিভ্যালে তখনও দেখিনি ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের এদেরই আর-এক সমসাময়িক মাস্টারের কথা— অ্যাগনেস ভার্দা বা লিনা ওয়াটারমুলার-এর কথা। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বুদ্ধদা, আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাবড় সব মাস্টারদের সঙ্গে, যারা মহিলা। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে একটি ভিএইচএস ক্যাসেট বের করে বলেছিলেন, ‘এইটা দেখ সোহিনী’, প্রথম মহিলা ফিল্মমেকার, যিনি এই ছবিটার জন্য কানে পাম-ডি-ওর পান। আমার মনে আছে, যে শব্দবন্ধ বুদ্ধদেব ব্যবহার করেছিলেন ছবিটির ক্ষেত্রে, ‘মাই জ-স ফেল অ্যাপার্ট।’ সিনেমাটির নাম ‘দ্য পিয়ানো’, পরিচালক, জেন ক্যাম্পিয়ন। তারপর আরও কত কাজ, আরও কত মাস্টারদের— সেই কাজ, সেই সিনেমা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। ফিল্ম ইন্সটিটিউটগুলিতে— FTII, SRFTI-এর মতো জাত ইনস্টিটিউটেও মাস্টার্সদের নিয়ে যে কারিকুলাম-গত কোর্স, সেখানে জায়গা করে নেয়নি একজনও ফিমেল অত্যুর। না, এমনকী, আমাদের মীরা নায়ার, দীপা মেহতা বা অপর্ণা সেনও না। এবং আরও বিস্ময়কর, সিলেবাসে ঠাঁই পায়নি ভারতের প্রথম মহিলা ফিল্মমেকার ফাতমা বেগমের কথাও। ১৯২৬ সালে যিনি তাঁর প্রথম ছবিটি বানিয়েছিলেন, ‘বুলবুল-ই-পরিস্থান’। একাধারে লেখক, পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতার কাজ করতেন তিনি। শিক্ষিত এই উর্দু নাট্যশিল্পী, তিনটি কন্যাসন্তান-সহ স্বামীর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন সিনেমার জন্য। সিনেমা তৈরি করেছেন আজীবন, ট্রিক ফোটোগ্রাফির পায়োনিইয়ারদের মধ্যে তিনি ছিলেন, মেয়েদের সবাই পরবর্তী সময় সিনেমার জগতে এক-একটি নক্ষত্র হয়েছেন। এঁদের প্রত্যেকের বড়সড় ‘বডি অফ ওয়ার্ক’ রয়েছে, রয়েছে পুরস্কার এবং সর্বোপরি স্বতন্ত্র ভাষা, ভাবনা এবং পারস্পেক্টিভ। অথচ সময় পাল্টেছে, ‘পেডাগগি’ পাল্টায়নি আজও, এমনকী, সিনেমা পড়ানোর প্রতিষ্ঠানগুলিতেই। 

মনে-মনে বলেছিলাম, ‘কিন্তু আমি তো লড়াই করছি না, আমি তো শুধু যা ভালবাসি তাই করতে চাইছি। লড়াই তো করছ তুমি এবং তোমরা, বাধা দিয়ে, ছোট করে, পারব না, হবে না ভেবে নিয়ে— নিজেদের মতো বানিয়ে-বানিয়ে, শিখিয়ে দেওয়া কিছু অবান্তর গালগল্প খাড়া করে।’

তবে সত্যি যেটা আনন্দের, সারা বিশ্বে, বিশেষত বিশ্বমানের ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং অ্যাওয়ার্ড ফাংশনে প্রত্যেক বছর উঠে আসছে মহিলা ফিল্মমেকার, মহিলা কারিগরি শিল্পীরা ও তাঁদের কাজগুলি। পৃথিবী জুড়ে মহিলা চিত্রপরিচালক, মহিলা লেখক, মহিলা শিল্পীদের জন্য বিশেষ গ্রান্ট এবং আরও অনেক সহায়তা তৈরি হচ্ছে। সেই ১৮৯৬-এ যে দিশাহারা পথচলা শুরু হয়েছিল, তা এখন পিচরাস্তায় পরিণত হয়েছে, রাজপথ হতে এখনও সময় লাগবে। হয়তো এখনও কোনও বাবা তাঁর সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখা মেয়েকে অনেকটা মায়ায় আর চিন্তায় বলে থাকে, ‘এইসব কাজ করলে সংসার সামলাবি কী করে বল তো?’ হয়তো একদিন সব বাবা তাঁদের মেয়েদের বলবেন, ‘যে-কোনো স্বপ্ন দেখার অধিকার তোমার আছে আর সেই সব স্বপ্ন কোন আকাশকুসুম কল্পনা নয়, কারন তুমি আর কারো চেয়ে – তমার দাদা, ভাই, স্বামী, ছেলের চেয়ে কম নও”। 

ফাতমা বেগম

আমি জানি অটমের ডাকে সাড়া দিয়ে সেইদিন শুধু ডলবি থিয়েটার না, সারা পৃথিবী বিভিন্ন প্রান্তে উঠে দাঁড়িয়েছিল আরো অনেক বেমক্কা সিনেমাকে ভালবেসে ফেলা মেয়েরা। আমি জানি অটমের স্বামী, ছেলে, বাবা, ডিরেক্টর, প্রডিউসারদের মতই পাশে দাঁড়ান মেয়েটিকে মাথা উঁচু করে দেখতে দেখতে প্রাণভরে হাততালি দিয়ে উঠেছিল আরো অনেক পুরুষ।