ওসিডি, বা ‘অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার’ বিষয়টি আপাতভাবে খুব লঘু করে দেখার একটা প্রবণতা রয়েছে। মাঝে-মাঝেই লোকজনের একটু গুছিয়ে রাখা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার বাতিককে ‘ওসিডি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ, কিন্তু ব্যাপারটা কি অতটাই সহজ? কথায়-কথায় ‘আমার একটু ওসিডি আছে’ বলার মধ্যে যে তারল্য রয়েছে, আদতে কি বিষয়টা ততটাই সহজ? মানসিক অসুখ হিসেবে ওসিডি-কে আদৌ ভাবা হয় কি? সাজিয়েগুছিয়ে রাখার প্রবণতা, গোছালো বা খুঁতখুঁতে হওয়াই ‘ওসিডি’?
ওসিডি-র জটিল মনস্তত্ব নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রাম বলছেন, “ওসিডি ৫০ জনে একজনের হয়। এটা একটা বেশ জটিল মানসিক অসুস্থতা, যা ব্রেনে কেমিক্যাল ইমব্যালেন্সের জন্য হয়। সব বয়সেই এটি হতে পারে। আমরা ‘অবসেশন’ কথাটা খুব লঘুভাবে ব্যবহার করি। ধরা যাক, আমার ক্রিকেটের প্রতি অবসেশন হয়ে গেছে, ওই মেয়েটার প্রতি আমার অবসেশন হয়ে গেছে, যেমন ‘ডিপ্রেশন’ কথাটা ব্যবহার করি— নট ইন দ্য সেন্স যে, ওটা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, সেই অর্থে অবসেশন কথাটাও ওরকমভাবে ইউজ করা হয়। অবসেশন হওয়া মানেই সেটা অসুখের পর্যায়ে এবং সেটা ক্ষতিকারক তা নয়, বা সেটা কোনও মানুষের জীবনে বাধা সৃষ্টি করছে, তা নয়। আমরা সেই অবসেশনটাকে অসুস্থতার পর্যায় বলি, যখন তা কোনওভাবে গতানুগতিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করছে। ‘শুচিবাই’ ইজ অলসো আ ফর্ম অব অবসেশন, ভীষণ প্রচলিত, ইস্টার্ন ইন্ডিয়ায় কমন, ক্রমাগত হাত ধুয়ে যাচ্ছি, বাথরুম পরিষ্কার করে যাচ্ছি, এঁটোকাঁটা পরিষ্কার করে যাচ্ছি।”
যৌন হেনস্থা থেকে ওসিডি-র উৎপত্তি হতে পারে? এই প্রশ্নের কারণ, সৌকর্য ঘোষালের সাম্প্রতিক ছবি ‘ওসিডি’। সেই ছবির প্রধান চরিত্র শ্বেতার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, চাইল্ডহুড ট্রমা, বা শৈশবে যৌন নিগ্রহের থেকে জন্ম নেওয়া যে আতঙ্কমিশ্রিত অস্বস্তির স্মৃতি, তার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে সর্বক্ষণ পরিচ্ছন্ন থাকার ও পরিচ্ছন্ন রাখার প্রবণতা। জয়রঞ্জন রাম বলছেন, “আমার যদি সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ হয়, তাহলে খুব ভায়োলেটেড মনে হতে পারে নিজেকে, অপরিচ্ছন্নও মনে হতে পারে। এবং তখন নিজেকে কী করে পরিষ্কার করব— কারও-কারও মধ্যে এই রিঅ্যাকশনটা আসতে পারে। সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ হলে অনেকেরই ওরকমভাবে ওসিডি ডেভেলপ করে। সেক্সুয়াল অ্যাবিউজের অনেকগুলো আউটকাম হতে পারে, তার মধ্যে এটা একটা। আবার সেরকম ওসিডি-রও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তো অ্যাবিউজ আবার তার একটা কারণ, এবং যদি বাড়ির লোক ওরকমভাবে ব্যাপারটাকে ইন্টারপ্রেট করে, যেটা আমাদের সমাজে মেয়েদেরই, যারা অ্যাবিউজড (মেয়ে বা ছেলে, আমাদের ভারতের ছেলেরাও ইকুয়ালি অ্যাবিউজড, সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না বা কম কথা বলে), তাকে বাড়ি থেকে যদি বলে যে, না তুই ওরকম একটা লোকের সঙ্গে মিশলি কেন— অর্থাৎ, যেখানে দ্য ভিকটিম ইজ বিয়িং ব্লেমড, সেইখানে তার মনে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তার মানে দোষটা আমারই। তো সেইজন্য এরকম ধরনের মানসিক অসুস্থতা বা ওসিডি ক্যান হ্যাপেন।”
আরও পড়ুন: বাল্যবিবাহর বিরুদ্ধে এই বিশেষ প্রতিরোধ কেন জরুরি হয়ে উঠল?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ২৩…
মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ উপাসনা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে বলেন “ওসিডি মানে শুধু পরিষ্কার করার বাতিক নয়, যেটা আমরা আপাতদৃষ্টিতে মনে করি, এটা হল অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার, মানে কিছু অবসেসিভ থটস, যেটা কিছু বিহেভিয়ারাল বাধ্যতা তৈরি করে। এই অবসেসিভ থটস নানা ধরনের হতে পারে এবং সেটার বেশিরভাগটাই মনগড়া, যেটার জন্য মানুষ বিভিন্ন কম্পালসিভ বিহেভিয়ার দিয়ে এটাকে কাউন্টার করার চেষ্টা করেন। এবার প্রশ্ন, কীরকম অবসেসিভ থটস? এই যে ধরুন যিনি বারবার হাত ধুচ্ছেন… আমি আমার একজন ক্লায়েন্টের উদাহরণ দিয়ে বলি, তার শাশুড়ি তাঁকে শেখান যে, বৃহস্পতিবার কিন্তু অমুকটা খাওয়া যাবে না, শুক্রবার কিন্তু তমুকটা খাওয়া যাবে না। কেন? তুমি যদি ওখানে অমুকটা করো, তাহলে সংসারের অমঙ্গল হবে। তো মেয়েটির এখন এরকম অবস্থা যে, ও ঘুমোনোর আগে পা না ধুলে ভাবে আমার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। ওর ঘুমোনোর আগে পা ধোওয়ার সঙ্গে বাবার হার্ট অ্যাটাকের কিন্তু কোনও সম্বন্ধ নেই। এই ভাবনাটা তাঁকে বাধ্য করছে বারবার করে পা-হাত ধুতে। তিনি হাত না ধুলে তাঁর হাজব্যান্ডের কেরিয়ারের ক্ষতি হয়ে যাবে— এইটা তাঁর মনে হচ্ছে।
অবসেসিভ ভাবনাটা হচ্ছে, আমি হাত না ধুলে অমুক ক্ষতিটা হবে, কম্পালসিভ বিহেভিয়ারটা কী? আমি হাত ধুচ্ছি। ওসিডি মানেই নোংরা দেখলেই পরিষ্কার করা, কিছু একটা বাঁকা হয়ে আছে, মানেই সোজা করে দেওয়া নয়। সেটা তো শুধু বিহেভিয়ার, বিহেভিয়ারে আমি ওটা হতে দেখতে পাচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ হল, কোন অবসেসিভ ভাবনাটা নেপথ্যে কাজ করছে? এবার বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন জিনিস থাকে। বিভিন্ন মানুষ কাউন্ট করেন— সেটাও ওসিডি-র পার্ট। আমি হাত ধোওয়ার প্রেক্ষিতেই যদি বলি, আমাকে কুড়িবার হাত ধুতে হবে বা আমি যদি মুখ ধুই, তাহলে আমায় মুখে তিনবার বা চারবার বা সাতবার ঝাপটা দিতে হবে। কারও-কারও কম্পালশন থাকে জোড় সংখ্যা, বিজোড় সংখ্যা নিয়ে। মানে ইভেন নাম্বার ডেটে আমার ভাল হয়, অড নাম্বার ডেটে আমার খারাপ হয়। অনেকের আবার কোনও বিশেষ সময়ের উপর একটা অবসেশন থাকে। তো যে-কোনও অবসেসিভ থট যখন আমাকে কোনও কম্পালসিভ বিহেভিয়ারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা ওসিডি। এবার এই অবসেসিভ ভাবনার মাত্রাটা যা ইচ্ছে হতে পারে।”
একজন মানুষ ওসিডি-র ক্ষেত্রে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়? উপাসনার মতে, ‘এক্সট্রিম ওসিডি-র ক্ষেত্রে একজন মানুষ সারাক্ষণ একটা অ্যালার্ট স্টেটে থাকে। সাতদিন, চব্বিশ ঘণ্টা হাইপার অ্যালার্ট এবং একটা নিয়ত অ্যাংজাইটির মধ্যে থাকে কিছু মানুষ। ওসিডি-র সঙ্গে অ্যাংজাইটি আসবেই। ওসিডি থাকা মানেই সেই মানুষটার অ্যাংজাইটির সমস্যা রয়েছে এবং এক্সট্রিম অ্যাংজাইটি রয়েছে। তাহলে এবার বুঝতেই পারা যাচ্ছে, অ্যাংজাইটি থাকলে একটা মানুষের দৈনন্দিন জীবন কেমন হয়।’

প্রসঙ্গত বলতে হয়, সৌকর্য ঘোষাল পরিচালিত বাংলা ছবি ‘ওসিডি’ বেশ কিছুদিন হল মুক্তি পেয়েছে; বাঙালি দর্শকের মন জয় করেছে এই ছবি। ছবির ঘরানা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার। ছবিটি বিভিন্ন সময়ে ‘দ্য সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বস’ এবং ‘শাটার আইল্যান্ড’-এর কথা মনে করায়, তবে সেগুলি খুবই পরোক্ষভাবে। একটি নিপাট বাংলা থ্রিলার হিসাবে বাংলা তথা ভারতীয় (টক্সিক) মূল্যবোধ এবং নীতিকথাকে অন্যভাবে চিহ্নিত করে এই ছবি। যেহেতু মুক্তির পরে বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেছে এবং অনেক মানুষ সিনেমাটি দেখে ফেলেছেন ইতিমধ্যে, তাই আমরা গল্পের কিছু অংশ নিয়ে কথা বলব এই লেখায়, যারা এখনও ছবিটি দেখেননি, তাদের জন্য একটি হালকা স্পয়লার অ্যালার্ট দেওয়া থাকল।
ওসিডি, পিডোফিলিয়া এবং হোমোসেক্সুয়ালিটি— এই তিনটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়কে গল্পে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন পরিচালক। সেই প্রক্রিয়া কেমন ছিল? এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলি পরিচালক সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে। সৌকর্যের কথায়, “ওসিডি বিষয়টি এসেছে ওই পরিচ্ছন্নতার জায়গা থেকে। আর্শিয়া-র চরিত্রটিকে (শ্বেতা, বা জয়া আহসানের ছোটবেলার চরিত্রাভিনেত্রী) ওর ঠাকুমা শিখিয়েছিল ‘Cleanliness is Godliness’। পরিষ্কার না থাকলে ঈশ্বর তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। পরিচ্ছন্নতার একটা দৈব জায়গা থেকেই ওর ওরকম একটা ঝোঁক তৈরি করা হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। এবার ওসিডি রয়েছে কি না, অর্থাৎ সেই পরিচ্ছন্নতার ঝোঁক যেটা কেবল বাহ্যিক নয় আত্মিক পরিচ্ছন্নতাও বটে, সেই ঝোঁকটাকে ওসিডি বলা যায় কি যায় না— এটা নিয়েই ছবি। তাই জনই দেখবে ছবির লোগোটায় তৃতীয় অক্ষর ‘D’ তে একটা প্রশ্নচিহ্ন আছে। সুতরাং এই চরিত্রটার সেটাই আসল খোঁজ যে, আমার কি ওসিডি আছে? যে জন্য বারবার প্রশ্নগুলোকে ফেস করতে হয়। ওই জায়গা থেকে ওসিডি বিষয়টাকে ধরা হয়েছে, কারণ ওসিডি তো অনেকটা বড় বিষয়, জটিল বিষয়। সেইভাবে দেখতে গেলে ওসিডি-কে এই ছবিতে অ্যাড্রেস করা হয়নি। বরং ওসিডি-র মতো একটা গম্ভীর বিষয়কে আমরা খুব মোটা দাগের আলোচনায় যত লৌকিক করে যত ট্রিভিয়ালাইজ করে দিয়েছি সেইটাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এবং পিডোফিলিয়ার জায়গাটা তার নিচের লেয়ারে আছে, যেটা শ্বেতার শৈশবকালে ঘটেছিল। আত্মিক পরিচ্ছন্নতার জায়গায় দাঁড়িয়ে যে মানুষ পিডোফাইল বা যে মানুষ এরকম একটি কাজ করতে পারে, তার মন নোংরা, সুতরাং তাকে পরিষ্কার করতে হবে সমাজের বুক থেকে। তো এই দুটো সূত্র যোগ করে থ্রিলারটা তৈরি হয়েছে। নাহলে থ্রিলার হত না। যদি একজন পিডোফাইলের মতো নোংরা মনের মানুষকে সমাজ থেকে পরিষ্কার করে দেওয়ার ঝোঁক মাথায় না চাপত ওসিডি-র নাম নিয়ে, তাহলে থ্রিলারটা তৈরি হত না।
আর হোমোসেক্সুয়ালিটির জায়গাটা এসেছে এক সমপ্রেমী মেয়ের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে। সেই চরিত্রটি প্রথমে ভেবেছিল, জয়ার চরিত্রটির ওই সমস্ত আচরণ বোধহয় কোনও সেক্সুয়াল প্রেফারেন্সের জায়গা থেকে তৈরি হচ্ছে। ওর আগে একটা প্রেম ছিল, যা তিনমাসও টেকেনি, এই যে একাকিত্বের বোধটা, তাকে ও বিচার করেছিল সেক্সুয়াল প্রেফারেন্সের জায়গা থেকে। তারপরে গিয়েও যেটা শুনে ধাক্কা খায় সেটা সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স নয়; সেক্সুয়ালিটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার জন্য সম্পর্ক থাকেনি জয়া-র চরিত্রটি। সেখানে কোনও নারী, পুরুষ, ট্রান্স চয়েসই আসে না। সেক্সুয়ালিটি বিষয়টার প্রতি ওর ওরকম একটা অসম্ভব বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল কারণ ছোটবেলা থেকে ও পিডোফাইলের শিকার হয়েছিল। যেহেতু পিডোফাইলের ওরকম যৌন তৃষ্ণাকে ছোট থেকে ওর মনে হয়েছিল নোংরা, তাই সার্বিকভাবে যে-কোনওরকম যৌন তৃষ্ণাকেই ওর আর প্রেম মনে হয় না, নোংরা মনে হয়। সেই জায়গা থেকে ওর মাথায় এটা চেপে বসেছিল।”
সিনেমাটিতে জয়া-র চরিত্রটির ঠাকুমা সিনেমার সম্পূর্ণ গতিপথ নির্ধারণ করেন, এই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন অনসূয়া মজুমদার। কীভাবে এই চরিত্রটি গড়ে উঠল? সৌকর্যের কথায়, ‘দেখো অনসূয়া মজুমদারের চরিত্রটার মানসিক অবস্থা গোটা সিনেমাটার গতিপথ নির্ধারণ করে। তার কারণটা হচ্ছে, এই চরিত্রটাকে তুমি যদি লক্ষ করে দেখো, গোটা ছবিটাতে বারবার মেটেরিয়াল এনক্লোজমেন্টের থেকে একটা ফ্লাইট নেওয়ার জন্য লার্ক করে। ধরো ফুলের প্রসঙ্গে যদি আমরা আসি, গাছের মন খারাপ থাকলে ফুল ফোটে না। এটা ছবির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। ঠাকুমা যখন ওকে বলছে যে, মন খারাপ, এমন মানুষ ছুঁলে তোমার মন নোংরা হয়ে যাবে, তোমার মনেও ভগবান থাকবে না— এরকম একটা বিষয়কে বিশ্বাস করার কারণ ওর ঠাকুমার বলতে পারেন যে গাছের মন খারাপ থাকলে ফুল ফোটে না কারণ ফুল হচ্ছে গাছের হাসি। এরকম একটা তত্ত্ব, একটা এত নরম তত্ত্ব যিনি দিতে পারছেন, তিনি যখন বলছেন যে খারাপ মানুষ ছুঁলে তোমার মনে ভগবান থাকবে না, তখন সেই ছোট্ট মেয়েটি সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। আসলে আমার এই ডায়লগটা লেখার সময় রবীন্দ্রনাথকেই মনে পড়েছে। ‘বিশ্বকমল ফোটে চরণ চুম্বনে/সে যে তোমার দিকে মুখ তুলে চায় উন্মনে’। সেখানে বিগ ব্যাং-এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমি ফুলের কথাই ধরি যদি, সেখানে আমি বোঝানোর চেষ্টা করছি যে ফুল অবশ্যই একটা রিপ্রোডাক্টিভ এলিমেন্ট এবং সেটা সৃষ্টি সবসময় সুখের হয়, সৃষ্টি সবসময় আনন্দের জন্য তৈরি হয়। সৃষ্টি যখন আনন্দের জন্য তৈরি হয় তখন ধরেই নেওয়া যেতে পারে ফুল গাছের হাসি। এবং সেখান থেকেই ছবিটায় ফুল বারবার ফিরে ফিরে আসে এবং একদম ছবির শেষে এসে যখন ও ভালকাকুকে সত্যি প্রাণে মারতে পারে, তখন বাড়িতে ফিরে এসে ঠাম্মার দেওয়া ছোটবেলার ওই বেলফুলের গাছটায় ও হ্যালুসিনেট করে যে, ফুল জন্ম নিচ্ছে।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, সৌকর্য ঘোষাল পরিচালিত বাংলা ছবি ‘ওসিডি’ বেশ কিছুদিন হল মুক্তি পেয়েছে; বাঙালি দর্শকের মন জয় করেছে এই ছবি। ছবির ঘরানা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার। ছবিটি বিভিন্ন সময়ে ‘দ্য সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বস’ এবং ‘শাটার আইল্যান্ড’-এর কথা মনে করায়, তবে সেগুলি খুবই পরোক্ষভাবে। একটি নিপাট বাংলা থ্রিলার হিসাবে বাংলা তথা ভারতীয় (টক্সিক) মূল্যবোধ এবং নীতিকথাকে অন্যভাবে চিহ্নিত করে এই ছবি।
ঠাম্মা যখন চলে যাওয়ার আগে ওকে ফুলগাছ দিয়ে গেল, এবং বলল যে ফুলগাছের সঙ্গে কথা বলবে, আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে ঠাম্মা ঠিক সেই জিনিসগুলোই বলছে, যেগুলো আক্ষরিক মোটা দাগের পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান-ধারণায় খুবই এক্সেন্ট্রিক, কিন্তু আমাদের প্রাচ্যের স্পিরিচুয়াল ধারণায় প্রত্যেকটার একটা খুব গভীর আত্মিক যোগ আছে। আত্মিক যোগ শব্দটা যে বারবার বলছি, আত্মিক পরিচ্ছন্নতা বাহ্যিক নয়, বারবার আত্মিক শব্দটা আসছে— এখানে ছবিটা খুব প্রাচ্যের ছবি। এখানে দেখবে গোটা ছবিটাই ওয়েস্টার্ন মেটেরিয়াল অ্যাসপেক্টের, সাইন্টিফিক মেটেরিয়াল অ্যাসপেক্টের সমস্তরকম ফিউটাইল ফ্রেমওয়ার্ককে ভেঙে দেয় ছবিটা। সেইটার একটা টোটেম ঠাম্মা। ছবিটা যে আসলে কতটা প্রাচ্যের শিকড়ে প্রোথিত, তার টোটেম ঠাম্মা।”
সৌকর্যের ছবির প্রসঙ্গে যদিও উপাসনা সামান্য ভিন্ন মত পোষণ করেন, ওঁর মতে “অবসেসিভ কমপালসিভ বিহেভিয়ার-এর ক্ষেত্রে দ্য কমপালসিভ বিহেভিয়ারটাই প্রতিক্রিয়া। প্ল্যান করে অমুককে খুন করব— এ়। ইন কেস অফ ওসিডি, হোয়াট হ্যাপেনস, আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু আমি একটা একদম ছক করে প্ল্যান করে এই ক’টা লোককে আমার খুন করতে হবে, এটা হবে না। প্ল্যানিংটা আসবে না হয়তো, এক্সট্রিম অবসেশনের ক্ষেত্রে বলছি না একদম অসম্ভব, কিন্তু এর মধ্যে একটা নাটকীয় আখ্যানধর্মিতাও রয়ে যায়। সাধারণভাবে অবসেসনের জন্য যে কমপালসিভ বিহেভিয়ারটা হয়, সেক্ষেত্রে যে করছে সে নিজেও জানে না তো যে খুনটা সুপরিকল্পিত হতে হবে, সেক্ষেত্রে সেটা ওসিডি-র জন্য শুধু হওয়া সম্ভব নয়। অবসেসিভ ভাবনা রয়েছেই, কিন্তু সেটাকে বাস্তবায়িত করাটা শুধুমাত্র ওসিডি-র রেসপন্সে হওয়া পসিবল নয়।”
ছবিতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি বারেবারে ফিরে এসেছে, ছবির মেরুদণ্ড বলা যায় এই কবিতাটিকে। ঘটনাচক্রে ২০২৬ সুকান্ত ভট্টাচার্যর জন্মশতবর্ষ। এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার যতটা সত্যি, ওসিডি নিয়ে সচেতনতার প্রসার ঘটাও ততটাই জরুরি। ওসিডি কেবলই কথায়-কথায় উচ্চারিত হওয়ার অসুখ নয়, তার ভিত আরও গভীরে, সেকথা এখনই ভাবা আবশ্যিক।




