দর্শক, সত্য, কল্পনা

সারা পৃথিবীজুড়ে নানা সময় নানা নাটক দেখেছি। নাটক দেখাই সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা নাট্যনির্মাণের জন্য। কেবল তো নাটক নয়, নৃত্যও বটে। পারফরমিং আর্টসের সব ক্ষেত্রই আদতে দেখতে হবে, প্রত্যক্ষ করতে হবে। কারণ থিয়েটারে সবধরনের পারফরমিং আর্ট-ই ব্যবহৃত হয়। থিয়েটার এই সবধরনের কৃষ্টির সম্মিলন, একধরনের ‘কনফ্লুয়েন্স’।

একটা বয়সে পৃথিবীর নানা কাজ হয়তো দেখেছি, কিন্তু শৈশবে বা কৈশোরে যে যে নাটক দেখেছি, এই বাংলা থিয়েটারে, তা বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আমি শম্ভু মিত্র বা উৎপল দত্তকে দেখেছি, কিন্তু যে-বয়সে দেখেছি, তখনও থিয়েটার শিল্প সম্পর্কে খুব ‘ক্রিটিকাল’ হয়ে উঠতে পারিনি, সেই দেখার চোখ তখনও জন্মায়নি। তবু ভেতরে-ভেতরে প্রচ্ছন্ন প্রভাব একটা রয়ে গিয়েছে। এক-একটা দৃশ্য যেমন হঠাৎ মনে পড়ে। উৎপল দত্তর ‘স্তালিন ৩৪’ বলে একটি নাটক ছিল। তা পূর্ণাঙ্গভাবে আমার মনে নেই। কিন্তু একটি দৃশ্য ভীষণভাবে মনে পড়ে। সেই দৃশ্যে স্তালিন সারাদিন পরিশ্রমের পর ইজিচেয়ারে বসে মিটিং করছেন। অনেকে আসছেন, কথা বলছেন। সকলের কাছেই অনুমতি চেয়ে নিচ্ছেন, একটু গা এলিয়ে কথা বলার জন্য। তারপর একটা সময় স্তালিন ঘুমিয়ে পড়ছেন। অভিনয়, আলো, মঞ্চ সব মিলিয়ে ওই দৃশ্যভাষা যে আবেগ বা অভিব্যক্তি তৈরি করেছিল, তা কোনওদিন ভোলার নয়। তখনও ভাবিনি থিয়েটার করব। কিন্তু কৈশোরের সেই অভিঘাত ভেতরে থেকে গিয়েছে।

দিনের পর দিন ‘জগন্নাথ’ দেখেছি। নাট্যনির্মাণের মুহূর্ত থেকে শুরু করে, ‘জগন্নাথ’ বা ‘মারীচ সংবাদ’ নিয়ে যখন শহর-মফসসল-গ্রামাঞ্চলে গিয়েছি, অন্য রাজ্যের অন্য শহরে গিয়েছি, বা কলকাতার নানা মঞ্চেও যখন দেখেছি— তখন দেখেছি, প্রতিটা অভিনয় কীভাবে পাল্টে-পাল্টে গিয়েছে, দর্শকের সমাবেশ বদলাচ্ছে, তাদের প্রতিক্রিয়াও কীভাবে বদলে-বদলে গিয়েছে। তারপর অভিনেতা হিসেবে মেরিবাবার গান গেয়েছি সেই নাটকেই। যখন ‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা’-তে অভিনয় করছি মাধবের চরিত্রে, তখন একেবারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অত্যন্ত মঞ্চসফল প্রযোজনা, নানা প্রান্তে অভিনয় করেছি সেই নাটক। পুরুলিয়ার প্রত্যন্তে অভিনয় করতে যাচ্ছি, যেখানে বাস চলে না, সেখানে সেট কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছি। শহরের মঞ্চেও অভিনয় হয়েছে। কলকাতায় হয়েছে, বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রামেও অভিনয় হয়েছে। অভিনেতা হিসেবে দর্শকের সঙ্গে আদানপ্রদানের জায়গার কথা এখন আমরা বারবার উচ্চারণ করি। থিয়েটার মানব সমাবেশ ছাড়া হয় না। প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু থিয়েটার দিনের শেষে জীবন্ত। একটা অভিনয় পৃথিবীতে একটা সন্ধেয় একবারই হতে পারে। তার কোনও অনুরূপ বা প্রতিরূপ হতে পারে না। দুটো অভিনয়ের মধ্যে পার্থক্য ঘটে যাবেই।

আরও পড়ুন: কোনওদিন ভুলব না, মাধব-মালঞ্চীর সংলাপের সময় কীভাবে বদলে যায় অঞ্চল থেকে অঞ্চল!
লিখছেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়…

সেই কৈশোরে যখন রমাপ্রসাদ বণিকের নাটক দেখেছি, বা ‘মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নিয়ে তৈরি হওয়া নাটক ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’, শম্ভু মিত্রর ‘দশচক্র’, ‘গ্যালিলেওর জীবন’ দেখেছি, তার মহড়ায় গিয়েছি— সেই সবই অবচেতনে থেকে গিয়েছি। দিনের শেষে যা মনে হয়, থিয়েটার একধরনের ‘সাবলিমিনিয়াল’ প্রকাশ, সেখানে ‘অটোটেলিং’ হয়, তা নাটক লেখা, নির্দেশনা, অভিনয়— সব ক্ষেত্রেই হয়। ভেতরে যে সঞ্জাত, সঞ্চিত জ্ঞান তা অবচেতনায় লুকিয়ে থাকে। কোথায় যে কোন প্রভাব লুকিয়ে থাকে, তা অবচেতন থেকে এসে কখন কাজে ধরা দেবে, তা বলা মুশকিল। এখানেই থিয়েটার দেখা জরুরি হয়ে ওঠে। তাকিয়ে থাকা আর দেখার মধ্যে তো পার্থক্য থেকেই যায়। দেখতে শেখার জন্যই এত প্রকরণ, এত তত্ত্বায়ন। কীভাবে একটা নাটক দেখব, তা শেখা জরুরি। তত্ত্ব আছে, কিন্তু পুরোটাই একটা অভিজ্ঞতাচালিত বিষয়। অভিজ্ঞতাই শেষত শিল্পকে গড়ে তোলে। কাজেই একজন নাট্যশিল্পী কীভাবে থিয়েটার দেখছে, তাঁর দেখার চোখ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটা সবসময়েই জরুরি।

‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা’-তে সুমন মুখোপাধ্যায়

আমি কেবলই কৈশোরে বাংলা থিয়েটার দেখার কথাই বলছি মূলত। তারপর যখন বিদেশে পড়তে গেলাম, তখন মঞ্চে দেখছি পিনা বাউশের নৃ্ত্য, অ্যান বোগার্টের নাটক, রবার্ট উইলসনের অপেরা। একটা বিস্ফোরণ ঘটল দেখার জগতে। ১৯৯১ সাল, তখন বেশ তরুণ। সেসব নাটক তখন ভাবনাজগতে অন্য বিস্ফার ঘটাল। শুধু বড়-বড় প্রযোজনা নয়, চার্চের ভেতর ছোট প্রযোজনা, পথনাটকে র‍্যাডিকাল রেভোলিউশনারি নাটক— সবই দেখেছিলাম।

একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। অ্যান বোগার্ট তখন আমেরিকান থিয়েটারে উদীয়মান নাট্য পরিচালক। কিছুদিন আগে অ্যানের সঙ্গে দেখা হল, অ্যান এখন প্রবীণা, এবং এখন প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছেন মার্কিন থিয়েটারে। অ্যান শুনে অবাক হয়ে গেলেন যে, আমি ১৯৯১ সালে ওঁর ওই প্রযোজনা দেখেছি। সেন্ট্রাল পার্কের পাশে একটা পরিত্যক্ত ক্যান্সার হাসপাতাল, সেটা ভেঙে ফেলা হবে। সেখানে গোটা বাড়িটা জুড়ে একটি প্রযোজনা করেছিলেন অ্যান। আমরা বাইরে থেকে বসে দেখছিলাম সেই প্রযোজনা। চারতলা বাড়ির বিভিন্ন তলায় নানা ঘটনার বিন্যাস ঘটে সেই নাটকে। একটি দৃশ্য একতলায় চললে হয়তো তিনতলায় অন্য দৃশ্য চলছে। শেষে আমরা ছাত্ররা যখন অ্যানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি, তখন আমি বলেছিলাম যে, আমার তো একটা অসুবিধে হচ্ছিল, কোন দৃশ্যটা ছেড়ে কোন দৃশ্যটা দেখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না, এত ঘটনার ঘনঘটা। তখন অ্যান বলেছিলেন, তুমি যখন রাস্তায় হাঁটো, তখন কি তুমি জিজ্ঞেস করো কোনটা দেখবে, কোনটা শুনবে? তুমি তো নিজেই বেছে নাও। লক্ষ লক্ষ দৃশ্যের জন্ম হয় চারপাশে, এত শব্দ চলে। তার মধ্যে থেকে তো কোন দৃশ্য, কোন শব্দের কাছে পৌঁছব, এটা বেছে নিতে হয়। থিয়েটারের তো সেই গণতন্ত্র আছে, কোনটা তুমি দেখবে সেটা তুমি বেছে নাও। সেই শিক্ষাটা আমার কাছে একটা বিরাট বাঁকবদল। যদিও প্রসেনিয়াম থিয়েটারে একটা বিন্দু থেকেই আমি নাটকটা দেখছি, কিন্তু এখন তো নানাবিধ পারফরমেন্স হয়, একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না সবসময়।

পিটার ব্রুক বলছেন, দর্শক একটা স্থানে প্রোথিত। সেই গ্রিক থিয়েটার থেকেই। স্থান বদলালে দর্শকের দেখার দিক থেকে একটা কৌণিক বদল ঘটে যায়। সেটাও যেমন সত্যি, তেমন কল্পনার প্রসারে আমরা কোণটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সিনেমা যেমন নানা কোণে দর্শককে নিয়ে চলে যেতে পারে, থিয়েটারে ওই একটি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রসারটা দর্শককেই ঘটাতে হয়। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে আমি যা দেখছি, তাই সত্য হয়ে ওঠে।