হিম-অনীশ

Representative Image

হিমানীশ গোস্বামীর লেখা পড়ছি ছোটবেলা থেকে। কিন্তু সাক্ষাৎ আলাপ হয়েছিল বোধহয় ২০০০ সাল নাগাদ। আলাপ করিয়ে দিয়েছিল আমার অকালপ্রয়াত বন্ধু সিদ্ধার্থ ঘোষ। দেখলাম, আমাদের ‘কমন গ্রাউন্ড’ হল পি জি উডহাউস, শিবরামের কথার খেলা আর ধর্ম নিয়ে ফাজলামি। হিমানীশদা আমার নাম দিলেন ‘অধর্মযাজক’। ঢাকুরিয়ার বাবুবাগানে তাঁর ছোট্ট ফ্ল্যাটখানি সরগরম হয়ে উঠত প্রায় প্রতি শনিবার। বাল্যবন্ধু বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ শিশির সেন, বয়ঃকনিষ্ঠ মলিকিউলার বায়োলজিস্ট তুষার চক্রবর্তী, কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, ‘কালপ্রতিমা’ পত্রিকার সম্পাদক নলিনী চক্রবর্তী, আরও কত না গুণী মানুষ আসতেন সে-আড্ডায়। স্বভাবসিদ্ধ কথার খেলায় তিনি ‘কালপ্রতিমা’ শব্দটিকে কালো প্রতিমা বলে অভিহিত করতেন।

১৯৩৭-এ নিউ এম্পায়ার হল-এ ‘গোরা’ নাটক দেখতে-আসা রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত ফোটো সুন্দর করে বাঁধিয়ে তিনি বন্ধু আর স্নেহভাজনদের উপহার দিতেন। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। ছবিটি তুলেছিলেন তাঁর পিতা, কিংবদন্তি ফোটোগ্রাফার পরিমল গোস্বামী।

হিমানীশদার ‘অভি-ধানাইপানাই’ বইটি নির্মাণের কাজে আমার একটু ভূমিকা ছিল। সেসময় তিনি চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পেতেন না। আন্দাজে লিখতেন। লাইনগুলো একে-অপরের ঘাড়ে চড়ে বসত। আমার কাজ ছিল সেই জট ছাড়ানো।

আরও পড়ুন: হিমানীশ গোস্বামীর রসিকতার ধরন ছিল খানিক বিলিতি!
লিখছেন শান্তনু চক্রবর্তী…

চোখের সমস্যা ছাড়া ছিল তাঁর প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের সমস্যা। কিন্তু রসিকতায় খামতি ছিল না। তাঁর কন্যা হৈমন্তীর কাছে শোনা ‘চরম’ রসিকতাটি এইরকম। বায়োপ্সির রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে শুনে বলেছিলেন, ‘যাক, মরবার একটা নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া গেল!’ প্রস্টেট ক্যান্সারে ভুগে শেষ ক’টা দিন প্রচণ্ড যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে দেখা করতে গিয়েছিলাম, একটা বই দিয়ে আসার জন্য। দেখলাম, ম্লান মুখ, কিন্তু সাগ্রহে বইটা নিলেন। সেই শেষ দেখা।

ফরিদপুরের লোক পরিমল গোস্বামীর কাছ থেকে ক্যামেরাপটুত্ব ছাড়াও তিনি সরাসরি পেয়েছিলেন রসবোধ, বাংলা গদ্যের ওপর অনায়াস অধিকার, ইংরেজি রসসাহিত্যে গভীর রুচি আর বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবোধ। বাড়তি ছিল তাঁর কার্টুন-শিল্প, যার অনুরাগী ছিলেন স্বয়ং কার্টুন-রাজ কুট্টি। চিড়িমিড়ির বিখ্যাত লাহিড়ী পরিবার তাঁর শ্বশুরবাড়ি। স্ত্রী এণাক্ষী প্রয়াত হয়েছিলেন অকালে। কন্যা হৈমন্তী পিতার সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন কাঁধে।

পাঁচের দশকে বিলেতের ইন্ডিয়া হাউসে চাকরি করার সময় কিছুদিন ছবি আঁকার ইস্কুলে ভরতি হয়েছিলেন। যথারীতি শেষ করেননি। ওই সময়েই প্যারিস ভ্রমণে গিয়ে কুট্টির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল তাঁর। তখনকার মধ্যবিত্ত লন্ডনের ব্যতিক্রমী ছবি আঁকা আছে তাঁর ‘লন্ডনের পাড়ায় পাড়ায়’ বইতে। কোন্ স্টেশনের ধারে কোন ছোট্ট পাব-এ সস্তায় প্রচুর আলুসেদ্ধ আর বিফ স্টেক দিয়ে নাস্তা করে নিলে চট করে আর খিদে পাবে না, কোথায় সস্তায় পাওয়া যাবে বাসযোগ্য ঘর, হাইড পার্কের ঝিলে বরফ জমে হাঁসেদের পা আটকে গেলে কীভাবে পুলিশ তা ছাড়ায়, তার হাস্যোজ্জ্বল ছবিতে ভরপুর সে-বই। ছবি কথাটা উভয়ার্থে লেখা, ছবি, তোলা ছবি।

একনাগাড়ে বেশিদিন চাকরি করা তাঁর ধাতে ছিল না। শেষ চাকরি আনন্দবাজারে। বলতেন, ‘সাংবাদিকদের নাতজামাইদের মতো খাতির আর মাইনে পাওয়ার আগেই অবসর নিয়েছিলাম।’

হিমানীশদার হিউমারের ধরনটা ইদানীংকার প্রচলিত হিউমারের চেয়ে আলাদা। হিম-অনীশ বললেই যেন তার সঠিক পরিচয় দেওয়া হয়। ইংরেজিতে cold and godless. আবেগতপ্ত না হয়ে জগৎসংসারের মজাটুকু, তার অসংগতিটুকু, নির্লিপ্তভাবে ছেঁকে নেওয়া। সেই অর্থে হিমশীতল। আর তিনি ছিলেন একান্তভাবেই অনীশ, নিরীশ্বরবাদী। বলতেন, ‘সকলি তাঁহারি ইচ্ছা’ বললে ভাল-মন্দ বিচারের, বিশেষ করে মন্দ বিচারের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে যুক্তির দিক থেকে সমস্যা অনেক। বাস উলটে গেলে ব্যাটা মাতাল ড্রাইভারকে ঠ্যাঙাই, আর সেই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরে এলে বলি, ভগবানের কৃপা! এটাই তাঁর অনীশ হিউমারের সার কথা।

এ-ব্যাপারে তাঁর পূর্বসুরি ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, কিছু পরিমাণে বনফুল, সৈয়দ মুজতবা আলী, আর অবশ্যই শিবরাম চক্রবর্তী। এঁরা সকলেই আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক অর্থে সংশয়বাদী। আর এক-পা এগোলেই এঁদের ‘অনীশ’ বলা যেত। কোদালকে কোদাল, চামচকে চামচ বলতে এঁদের কলম কাঁপত না। রাজশেখর বসুর ‘প্রার্থনা’ লেখাটিকে ধরে এই সুরটা বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত গিন্নি রামের মা ছেলের চাকরির জন্য মা কালীর কাছে মানত করেছে। কালী দেবীর প্রশ্ন: ‘হ্যাঁ গা, রামের মা, ওই যে টাকাটা ছেলের মাথায় ঠেকিয়ে তুলে রাখলে, ওটা কার জন্যে?’ উত্তর: ‘তোমার জন্যে মা। শুধু একটি টাকা নয়, চাকরিটি হলে আরও অনেক কিছু দেব।’ মা কালী বলেন, কিন্তু যারা আরও গরিব, তাদেরই কাউকে চাকরিটা দিলে কি ভাল হয় না? উত্তর: ‘এ যে ছিষ্টিছাড়া কথা মা। হলই বা গরিব উমেদার, আমার ছেলে আগে, না যেদো মেদো আগে?’ মা কালী রামের মা-কে কোণঠাসা করে প্রশ্ন করেন: ‘ও, এই ফুলগুলি আমাকে ঘুষ দিচ্ছ?’ প্রায় জিভ কেটে রামের মা বলে, ‘ঘুষ বলতে নেই মা, বলো পুজো।’

কিংবা ধরা যাক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে-বিদেশে’। আফগানিস্তানের পাহাড়ি জমিতে লাঙল টেনে টেনে চাষার ছেলের তালুতে ‘অবশিষ্ট রয়েছে কুল্লে দেড়খানা রেখা’। আয়ুরেখা ইসপার-উসপার, হেডলাইন নেই, আর হার্টলাইন তেলোর মধ্যিখানে এসে আচম্বিতে ‘মরুপথে হারাল ধারা’। জ্যোতিষশাস্ত্রর কোনও হিসেবেই আসে না সেই প্রায় রেখাহীন খরকমল। হবেই তো, মুজতবার টিপ্পনী: “ডাকাত-গুষ্টির… সংস্পর্শে এসেছেন ক’জন বরাহমিহির, ক’জন কেইরো?”

ইদানীংকালে হিমানীশ গোস্বামীই ছিলেন এই ধারার ধারক ও বাহক। কয়েকটা উদাহরণ দিই। ‘অভি-ধানাইপানাই’ অনুযায়ী ‘খোলাখুলি’ মানে হল, খুলি খোলার কৌশল। বিস্তারিত ব্যাখ্যা: ‘উল্লেখ্য, কোনও এক সুপণ্ডিত বলেছেন, প্রাচীন কালেও খুলি খোলার বিকল্প ব্যবস্থা ছিল প্রমাণ, অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের রাম্ ধোলাই।’ ‘রাম’ কথাটির নানা তাৎপর্য। তাঁর এই অভিধানে ‘গোমেদ’-এর অর্থ গরুর চর্বি। যথা, ইউরোপ-আমেরিকার বহু হোটেলের রান্না হয় গোমেদের মাধ্যমে! ধর্মঘট মানে হল, ‘যে ঘট ধর্মে ব্যবহার হয়, পবিত্র ঘট’। যথা, পুজোর সময় মন্দিরে-মন্দিরে প্রচুর ধর্মঘট দেখা যায়। আর ‘যে কল থেকে ধর্ম প্রস্তুত হয় এবং মোড়কায়িত হয়ে পাইকারি দরে বিক্রয় হয়’, তাকে বলে ‘ধর্মের কল’। ‘যে ষাঁড় পবিত্রভাবে ধর্ম পালন করেন, তিনি ধর্মের ষাঁড়। ইং Papal Bulla.’ তিনি পবিত্র, তাই আপনি পদবাচ্য।

এই সুরে সুর মেলানোর লোক আজকের বাংলা হিউমার সাহিত্যে বিরল। আরেকটা জায়গাতেও তাঁর হিউমার আজকের বাঙালির থেকে একেবারে আলাদা। সেটা হল তাঁর শ্লীলতা-অশ্লীলতার বোধ। ওটা যেন কর্ণের কবচকুণ্ডলের মতোই সহজাত তাঁর।

আরেকটা আবেগের জায়গা ছিল বাঙালি ভদ্রলোকের বাংলা ভাষা। বলতেন, এ-ভাষা বন্ধ হওয়াটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এ-বিষয়ে তাঁর কিছু কিছু টুকরো লেখা নিয়ে ‘উৎস মানুষ’ পত্রিকা থেকে ‘বাংলা বনধ’ নামে একটি বই বেরিয়েছিল।

তাঁর আরেক অনবদ্য, কিন্তু অনাদৃত সৃষ্টি ‘আনন্দনগরী ও অন্যান্য দুঃখের কাহিনী’। ‘সিটি অব জয়’ বইতে যেভাবে কলকাতাকে ঘৃণিত এক কুষ্ঠনগরী প্রতিপন্ন করা হয়েছে, এবং দুধের শিশু বাঙালি ভদ্রজন যেভাবে অম্লানবদনে সেটাকে প্রশংসা ভেবে নিয়ে গদগদ হয়েছে, তার বিরুদ্ধে এমন তীব্র তথ্যনিষ্ঠ ব্যঙ্গোজ্জ্বল লেখা আর একজনও লেখেননি।

হিমানীশদা ছিলেন বাঙালি ভদ্রলোকদের বিলীয়মান আত্মসম্মানবোধের এক রসঘন প্রতীক। বহু দুঃখে লিখেছিলেন: বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পণ্য হউক, পণ্য হউক, পণ্য হউক, হে ভগবান।

আজ পণ্যায়িত বাঙালি সংস্কৃতির এই দুর্দিনে, হিমানীশ গোস্বামীকে জন্মের শতবর্ষে জানাই অন্তরের প্রণতি।