নির্বাসিতর গান
কিছু ছবি হয়, যা নিটোল গল্প বলে না, কয়েকটা চরিত্রের অনুভূতির স্রোত মিলিয়েমিশিয়ে দেখায়। ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ (চিত্রনাট্য: এসকিল ভোট, হোয়াকিম ত্রিয়ার, পরিচালনা: হোয়াকিম ত্রিয়ার, ২০২৫) দেখে মনে হবে, এটা বাবা ও মেয়ের গল্প। বা, বাবা ও তার দুই মেয়ের গল্প। বা, শিল্প ও শিল্পীর গল্প। ছবিটায় ইঙ্গমার বার্গম্যানের প্রতি ঋণ আছে। যেভাবে মূলত সংলাপের মধ্য দিয়ে ছবি উন্মোচিত হয় এবং শিল্পীর একাকিত্ব ও প্রতিভার সহাবস্থানের, অর্থাৎ জীবনে তার ব্যর্থতার ও শিল্পে তার সাফল্যের যুগলবন্দি দেখানো হয়, তা বার্গম্যানের ভঙ্গি ও প্রিয় বিষয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। একটা দৃশ্যে তো কালো পর্দায় বাবা ও দুই মেয়ের মুখ বারে-বারে একে-অপরের মধ্যে মিশে যায়, যা স্পষ্টতই বার্গম্যানের ‘পার্সোনা’ ছবির উদ্ধৃতি।
ছবির শুরুতে আমরা জানতে পারি, নোরা ছোটবেলায় ‘নিজেকে একটা জড়বস্তু ভেবে রচনা লেখো’ হোমওয়ার্ক পেয়ে, নিজেদের বাড়ির আত্মকথা লিখেছিল। সেই বাড়ি কি ফাঁকা থাকতে ভালবাসে, না ভরাভর্তি? তার দেওয়ালে হাত বোলালে কি তার কাতুকুতু লাগে? এই বিবরণের সময় বিভিন্ন টুকরো দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা বুঝি, নোরার বাবা ও মা-র মধ্যে প্রায়ই প্রচণ্ড অশান্তি চলে, একসময় বাবা এই পরিবার ছেড়ে চলেও যায়। এর পরের দৃশ্যে, নোরা এখন বড়, আমরা দেখি অভিনেত্রী হিসেবে মঞ্চে ঢোকার ঠিক আগে, তার প্রচণ্ড টেনশন। দৌড়ে পালিয়েও যেতে চায় প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে। কিন্তু তারপর, শেষমেশ মঞ্চে ঢুকে, দুরন্ত অভিনয় করে। তারপরেই আমরা দেখি নোরার মা’র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরে বাড়িতে অনেক লোক ডাকা হয়েছে, সেখানে নোরার বাবা ভিক্টরও আসে। নোরা ও তার বোন আগনেস, দুজনেই একটু আড়ষ্ট হয়ে থাকে, বাবা নোরাকে যাওয়ার সময় বলে, তোর সঙ্গে আমি পরে একটু কথা বলব। একদিন ক্যাফে-তে সেই কথার সূত্রে আমরা বুঝতে পারি, ভিক্টর চলচ্চিত্র পরিচালক, পরের ছবিতে নোরাকেই নায়িকা হিসেবে নিতে চায়। নোরা চিত্রনাট্যটা অবধি পড়ে দেখতে রাজি হয় না, সে তার বাবার সঙ্গে কোনও কাজ করতেই রাজি নয়। বাবা যে তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সেই ক্ষত তার মধ্যে দগদগ করছে। আমাদের মনে পড়ে, ছবিটার নাম ফুটে উঠেছিল একটা চিড়-ধরা দেওয়ালের গায়ে।
আরও পড়ুন: সন্ন্যাসকে অন্যভাবে চিনতে শেখায় ‘সামথিং, এনিথিং’!
লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য…
নোরার দিদি আগনেস, কুড়ি বছর আগে, ছোটবেলায় অভিনয় করেছিল বাবার পরিচালিত ছবিতেই। কিন্তু এখন ইতিহাসচর্চা করে, তার স্বামী ও সন্তান রয়েছে। সে অনেক বুঝদার, গোছালো। ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দ্যাখে। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কম এবং সাধারণ বোধ অনেক বেশি। মায়ের মৃত্যুর পরের অনুষ্ঠানটায় তাকে সামান্য কাঁদতে দেখা যায়, নোরাকে নয়। নোরা যখন বাবা সম্পর্কে নালিশ করে, আগনেস বলে বাবারও হয়তো খুব অসুবিধে হচ্ছে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। নোরার কাছে ব্যাপারটা যেমন সহজ: যে-লোক তার সন্তানদের পরিত্যাগ করে তাকে ক্ষমা করা যায় না, আগনেসের কাছে অত সাদা-কালোয় জীবন বিন্যস্ত নয়। আমরা ধীরে জানতে পারি, নোরা প্রায়ই বিষাদের গর্তে পড়ে যায়, একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিল। নোরা প্রায়ই আগনেসের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়, ফোন তোলে না। কিন্তু আগনেস অভিমান করে না, গিয়ে খবর নেয়। আবার বোনের নাটকের প্রিমিয়ারের পর বোনকে যখন বলে আমাদের সঙ্গে খেতে চল, কিন্তু বোঝে বোন তা চাইছে না, পীড়াপীড়ি না করে চলে যায়। আগনেস সেই ধরনের নারী, যে বোনের বাড়ি অগোছালো দেখলে তখনই টেবিল পরিষ্কার করতে লেগে যাবে, জানলার পর্দাটা তুলে আলো আমদানি করবে। (বার্গম্যানেরও অভ্যাস, অশান্ত একা-শিল্পীর পাশে থিতু-চরিত্র স্থাপন)।

ভিক্টরের বয়স এখন ৭০, বহুদিন সে কাহিনিচিত্র করেনি, যদিও তার তথ্যচিত্রের একটা বাজার আছে, তাকে বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ডাকা হয়। তবু কাহিনিচিত্রের পয়সা জোগাড় করা তার পক্ষে শক্ত। নোরা প্রত্যাখ্যান করার পর হলিউডের বিখ্যাত এক অভিনেত্রী ভিক্টরের পুরনো ছবি দেখে তার সঙ্গে কাজ করতে চায়, তখন তাকে মুখ্য ভূমিকায় রেখে, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে ছবিটা তৈরির চেষ্টা চলে। নেটফ্লিক্সের প্রযোজনা আদৌ সিনেমা হল-এ দেখানো হবে কি তা নিয়েও ভিক্টর নিশ্চিত নয়, এইসব নতুন লোকেদের সঙ্গে কাজ করতেও তার অসুবিধে, এরা পরিচালককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার বদলে, ঘনঘন ‘মুড বোর্ড’ পাঠায়। আবার তার বহুদিনের সহকর্মী ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে কাজের কথা বলতে গিয়েও ভিক্টর দ্যাখে, সে এখন ভাল করে হাঁটতে পারে না, ভিক্টরের মনে হয়, একে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নেওয়াই ভাল। কী করে যে এতটা বয়স হয়ে গেল, তাও ভিক্টর বোঝে না (‘১৫ বছর আগেই আমি ৫৫ ছিলাম’, বন্ধু-প্রযোজককে বলে), মেয়েদের সঙ্গে কীভাবে আবার সম্পর্ক স্থাপন করবে, তাও ঠাহর করতে পারে না। নাতির ন’বছরের জন্মদিনে তাকে দেয় কতকগুলো ডিভিডি, যা তীব্র যৌনতা-সমন্বিত ছবির। মেয়েরা হাসে, ভাগ্যিস আগনেসের বাড়িতে ডিভিডি চালানোর যন্ত্র নেই। মাঝে-মাঝে মাতাল হয়ে নোরাকে খুব রাত্রে ফোন করে ভিক্টর, নোরা বিরক্ত হয়।
নোরার একটা সম্পর্ক হয়েছিল নাটকের এক সহকর্মীর সঙ্গে, সে বিবাহিত, কিন্তু তার যে ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে, সেটাও সে নোরাকে জানায়নি। দলের অন্য অনেকে জানে। নোরা তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলে, এই ডিভোর্সের জন্য নোরার কোনও দায় নেই। আবার নোরা তাকে চুমু খেতে গেলে সে সরে যায়। নোরা এমনিতে বলে (এই পার্ট-টাইম প্রেমিককেও বলেছিল), ভালবাসা, যত্ন করা— এই ব্যাপারগুলোয় তার অক্ষমতা আছে, খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তার আসে না। কিন্তু এই প্রত্যাখ্যানে নোরা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। বাবার সঙ্গে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে নোরার ভাল লাগে, বাবা সিনেমায় তার জায়গায় হলিউডের প্রখ্যাত অভিনেত্রীকে নিয়েছে বলে ভেতর-ভেতর রাগও হয়। ঘরোয়া আড্ডায় বাবা অভিনেত্রীদের সম্পর্কে অনেক কর্কশ কথা বলে: অভিনেত্রী যেহেতু নিজে কিছুই বেছে নিতে পারে না, ক্রমাগত অন্য লোক তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় (এজেন্ট বলে দেবে কোন ছবি করা উচিত, পরিচালক বলে দেবে কীভাবে চলতে-বলতে হবে), একসময় তার আর আত্মবিশ্বাস থাকে না এবং সারাক্ষণ মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার তৃষ্ণাও তাকে নিরাপত্তাহীনতায় নিয়ে যায়। এও বলে, আমি তো কোনওদিন কোনও অভিনেত্রীকে বিয়ে করতে পারতাম না। নোরা সঙ্গে সঙ্গে খটাস করে বলে ওঠে, কিন্তু তাদের সঙ্গে শুতে কোনও অসুবিধে নেই, তাই না? বাবা বলে, আজকাল শিল্পীগুলো হয়েছে সব পাতি-বুর্জোয়া। সারাক্ষণ ফুটবল খেলা আর গাড়ির ইনশিওরেন্স নিয়ে ভাবলে, ‘ইউলিসিস’ লেখা যায় না।… শিল্পীদের স্বাধীনতা প্রয়োজন। নোরা বলে, তাহলে বাচ্চার জন্ম দিও না। অর্থাৎ, শিল্পীর স্বাধীনতা মানে নিরপরাধ মানুষকে, ভালবাসার মানুষকে কষ্ট দেওয়ার স্বাধীনতা নয়। দায়িত্ব না-নেওয়ার স্বাধীনতা নয়। এবার নোরার বাবা মূল শেল হানে। যা বলে, তার মর্মার্থ: যার মধ্যে এত ক্রোধ, তাকে ভালবাসা সহজ নয়। এতে শিল্পটাও ভাল হয় না। নোরা নিশ্চয়ই সারাজীবন একা থাকতে চায় না?
এই যে নোরা কারও সঙ্গেই প্রাণের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না, অমন স্নেহময়ী বোনের থেকেও প্রায়ই দূরে থাকতে চায়, এর জন্য যে তার স্বভাবই দায়ী, এ সন্দেহ নোরারও আছে। আবার তার বিযুক্ত স্বভাবেরই অন্যপিঠ হয়তো তাকে এমন পর্যবেক্ষণশীল করেছে, যাতে সে অভিনয়-ঐশ্বর্যে ঝকঝক করছে। সে যে নিঃসঙ্গতায় দণ্ডিত, সেজন্যই কি সে প্রতিভার আশীর্বাদধন্য? না কি এর মধ্যে কোনও কার্য-কারণ সম্পর্ক নেই, বরং তার বাবা তাকে শৈশবে ত্যাগ করেছিল বলেই সে এমনভাবে প্রেম-প্রতিবন্ধী হয়ে গেল? যে কোনও ঘনিষ্ঠতাকে সে ভয় পায়, কারণ তার মনে হয় বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী? তার বোন তবে কীভাবে পারল স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে স্থির হতে? (একটা দৃশ্যে বোন তার উত্তরে বলে, তার তো নোরা ছিল, যে কিনা মা বিষাদগ্রস্ত থাকলে বোনকে যত্ন করে চুল আঁচড়ে স্কুলে পাঠাত। কে বলে নোরা ভালবাসতে জানে না?) কিন্তু নোরাকে নাছোড় বিষাদ এমন গ্রাস করে যে সে অভিনয়ও ক্যানসেল করে দেয়, যা চরম শারীরিক কষ্টেও করেনি।
ভিক্টর ও নোরা একইরকম, দু-জনেই শিল্পটা ভাল পারে, মানুষের সঙ্গে সংযোগটা পারে না। ভিক্টর যখন আগনেসকে বলে, তোর ছেলেকে আমার সিনেমায় একটা পার্ট দেব, আগনেস বলে, তোমার ছবিতে আমি যখন অভিনয় করেছিলাম, আমি ছিলাম তোমার সবচেয়ে যত্ন ও আদরের পাত্রী, মনে হত আমিই আছি মহাবিশ্বের কেন্দ্রে। যেই ছবি শেষ হয়ে গেল, আর আমি তোমাকে বহুকাল দেখতেই পেলাম না। পরের ছবির লোকেরা হয়ে গেল তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার ছেলেকে আমি তোমার ছবিতে অভিনয় করতে দেব না, তাকে আমায় রক্ষা করতে হবে। এ-কথা বলে কি আগনেস বাবাকে বোঝাতে চাইল, ছবিতে সুযোগ দিয়ে সন্তান বা দৌহিত্রের প্রতি কর্তব্য পালন করা যায় না? তার জন্য স্নেহ শিখতে হয়? শিল্প কখনও জীবনের বিকল্প হতে পারে না? এইজন্যই কি সে নিজে শিল্পের ধারকাছ না ঘেঁষে, ইতিহাস-শাস্ত্রে আশ্রয় নিয়েছে? হলিউডের অভিনেত্রী একসময় ভিক্টরকে এসে বলে, সে এই ছবিতে অভিনয় করবে না (কারণ রিহার্সালের সময় সে বুঝতে পেরেছে, ভিক্টর তার অভিনয়ে খুশি নয়। তাছাড়া বাধ্য হয়ে এই ছবিটা ইংরিজি ভাষায় করতে নিশ্চয়ই ভিক্টরের ভাল লাগছে না, নরওয়ের ভাষাতে করলেই ছবি খুলবে বেশি। আর ভিক্টর আসলে তার নিজের মেয়েকেই এই ভূমিকায় চায়, নইলে হলিউডি নায়িকার চুল কেন ভিক্টর নোরার চুলের রঙে ছুপিয়ে নিয়েছে?) ভিক্টর বোঝে, তার শেষ বয়সের এমন চমৎকার চিত্রনাট্যটাও জলে গেল, সে আর ছবি করতে পারবে না। বাড়ির বাইরে বাগান-মতো জায়গাটায় বসে, মদ খেতে খেতে, সে আকাশের দিকে অশ্লীল মধ্যমাঙুল তুলে ঈশ্বরকে খিস্তি বোঝায়। ঈশ্বর তাকে পরিবার দেননি, নিজের কন্যাদের কাছে তাকে ঘৃণ্য করেছেন, এবার শিল্পও কেড়ে নিলেন।
এই যে নোরা কারও সঙ্গেই প্রাণের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না, অমন স্নেহময়ী বোনের থেকেও প্রায়ই দূরে থাকতে চায়, এর জন্য যে তার স্বভাবই দায়ী, এ সন্দেহ নোরারও আছে। আবার তার বিযুক্ত স্বভাবেরই অন্যপিঠ হয়তো তাকে এমন পর্যবেক্ষণশীল করেছে, যাতে সে অভিনয়-ঐশ্বর্যে ঝকঝক করছে। সে যে নিঃসঙ্গতায় দণ্ডিত, সেজন্যই কি সে প্রতিভার আশীর্বাদধন্য? না কি এর মধ্যে কোনও কার্য-কারণ সম্পর্ক নেই, বরং তার বাবা তাকে শৈশবে ত্যাগ করেছিল বলেই সে এমনভাবে প্রেম-প্রতিবন্ধী হয়ে গেল? যে কোনও ঘনিষ্ঠতাকে সে ভয় পায়, কারণ তার মনে হয় বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী? তার বোন তবে কীভাবে পারল স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে স্থির হতে?
আগনেস খোঁজখবর করে জোগাড় করে তার ঠাকুমার, মানে ভিক্টরের মা’র ফাইল, যে নাৎসি-বিরোধী প্রচারের জন্য গ্রেফতার হয়েছিল এবং যাকে প্রচণ্ড অত্যাচার করা হয়েছিল, সেই অত্যাচারের বিবরণও ফাইলে আছে। কখনও সেই নারীকে রড দিয়ে প্রহার করা হয়েছে, কখনও গরম স্টোভের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কেউ জানে না কেন, ভিক্টরের সাত বছর বয়সে, এই নারী আত্মহত্যা করে। ভিক্টরকে টিফিন তৈরি করে দিয়ে, তাকে রওনা করে দিয়ে, গলায় দড়ি দেয়। তা কি ওই অত্যাচারের স্মৃতি সহ্য না করতে পেরে? ভিক্টর কি তার মা তাকে এভাবে পরিত্যাগ করে গেছে বলেই সারাজীবন সেই বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছে, আর সেই দহনেই কোনও মানুষকে আকুল ভালবাসতে পারেনি? আগনেস তো জানত, ঠাকুমার এই বিবরণ। তবে কেন সে আজ ফাইল পড়ে এতটা আলোড়িত হয়? বাবার আজন্ম ছটফটানি ভেবে? আগনেসের সনির্বন্ধ অনুরোধে নোরা চিত্রনাট্যটা পড়ে দ্যাখে। কারণ আগনেস বলে, এই চিত্রনাট্যটা সে পড়েছে (বাবা নাতির জন্য এনেছিল, মেয়ের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে চলে যাওয়ার সময় ফেলে গেছে), এটা ভিক্টর নিজের মা’কে নিয়েও লিখেছে, আবার নোরাকে নিয়েও। নোরার কাছে বাবা থাকেনি বটে, কিন্তু নোরাকে দূর থেকে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। নোরাও, আগনেসেরই মতো, চিত্রনাট্য একবার পড়তে শুরু করে, আর ছাড়তে পারে না। আগনেসের অনুরোধে সে একটু আগে একটা সংলাপ পড়ছিল, তার মনে হয়েছিল, কেউ তার মন-সংবাদই হুবহু লিখে রেখেছে। ছবির শেষে দেখা যায়, ওই ছেলেকে রওনা করে দিয়ে আত্মহত্যার দৃশ্যটায় অভিনয় করছে নোরা, তার ছেলের ভূমিকায় আগনেসের ছেলে। দৃশ্য শুটিং-এর শেষে ভিক্টর ‘কাট’ বলে, দেখা যায় তার পাশে তার বন্ধু-ক্যামেরাম্যান। নোরা ও ভিক্টরের মধ্যে তারপর বিরাট কিছু হইহই জড়াজড়ি হয় না, কিন্তু একটা স্বীকৃতির দৃষ্টি-বিনিময় হয়, একটা সমঝদার হাসির আভাস। শিল্পের মধ্য দিয়েই বাবা ও মেয়ে, বন্ধু ও বন্ধু, সাধ ও বাস্তবের মিলন হয়। এই মিলন কি বহুদূর যাবে? জীবনেও কি এগিয়ে দেবে শিল্পের এই চলাচল? আমরা জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তটারও মূল্য কম নয়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিঃসঙ্গতা ও সঙ্গতৃষ্ণার প্রবাহকে একটা মোহনায় মিলিয়ে দিল।




