অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ৭

চোরচোট্টা বারফাট্টা

জোড়াবাড়ির গলি। এ-গলি সে-গলি নয়। খাতায়-কলমে এটা দেবনারায়ণ ব্যানার্জি রোড। সবাই চেনে জোড়াবাড়ির গলি নামে। এই গলিতে একটা সত্যি-সত্যি জোড়া বাড়ি ছিল। এ-মাথা থেকে ও-মাথা। দু’বাড়ি জুড়ে দিতে ওভারব্রিজ। অনেকটা সায়েন্স সিটির আগে ট্রাম্প টাওয়ারের মতো। খুব নকশাদার ছিল লাল রঙের রেলিংগুলো। নিচের থেকে দেখলে ওপরে কড়িবরগা আর তার সাদা অংশ সরীসৃপের পেটের মতো। রাস্তার ওপর টানটান সরীসৃপ ব্যালকনি।

এই জোড়াবাড়ির গলিতে আর-একটা বাড়ি ছিল— সামনে থেকে সেটা সম্পূর্ণ-বাড়ি। বেশ বনেদি বাড়ির দরজা যেন। দরজা খুলে ঢুকে যাও।  সেখান থেকে অন্য দিকে বেরিয়ে যেতে পারবে। আসলে ভেতরে ঠিক কোনও বাড়িই নেই। কালীঘাট অঞ্চলের অনেক চিটিংবাজ সেই বাড়ির সামনে এসে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে ভেতরে যেত ভাড়ার টাকা আনতে। কিন্তু সে আর ফিরত না। ওই দরজা তাই চিচিং ফাঁক, নয় চিটিং ফাঁক!

জোড়াবাড়ির গলি এই জায়গাটা আমার খুব ভাল লাগত।

নিষিদ্ধপল্লির ঘরে খালি মদের বোতলের পিছনে পেয়েছিলাম ‘দেবদাস’! জয়ন্ত দে-র কলমে ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৬…

আমাদের এক বন্ধু ছিল ভানু। ওদের অনেক বড় সংসার। কাকা, জ্যাঠা, ওদের পরিবার— সব মিলিয়ে রোজ প্রায় কুড়ি-কুড়িটি পাত পড়ত। তখন অত গুনিনি, এখন হিসেব করে দেখলাম আরও বেশিই হবে। ভানু পড়ত চেতলা বয়েজে। বুদ্ধিতে চৌখস। ওই ভানু কালীঘাট বাজার থেকে প্রায় দিন বাজারই করত না। ভানুই আমাদের শিখিয়েছিল কালীঘাট বাজার বড়লোকদের জন্য, সস্তায় কিছুই মেলে না। প্রয়াত নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ডায়লগ ছিল— বাজার করো ঘুরে-ঘুরে, মমতা করো দূরে-দূরে। এই থিওরি সুব্রতদার আগে ভানু-ই পেয়েছিল। তাই ভানু ঘুরে-ঘুরে বাজার করত। জোড়াবাড়ির গলির ভেতর বসা মাসিদের কাছ থেকেও বাজার করত। সত্যি-সত্যি ওখানে বেশ দাম কম। ভানুর বাজার করার টেকনিকই আলাদা। ও কোনওদিন লঙ্কা-ধনেপাতা কিনত না। সারা বছর যে দোকান থেকে যা-ই কিনুক, ফাউ হিসেবে হয় একটু লঙ্কা, শীতে ধনেপাতা চাইত। তখন ‘ফাউ’ বলে দারুণ একটা শব্দ ছিল।

বিকেলের দিকে সন্তোষদা বলে একজন আসতেন টিনে করে শুকনো ঘুগনি নিয়ে। কষা আলুর দমও থাকত। শালপাতার ওপর অদ্ভুত টানে ঘুগনির কার্পেট পেতে দিতেন, তার ওপর একটু শসা-নারকেলের কুচি, একটু তেঁতুলের টকের নকশা। সন্তোষদার কাছে পাঁচ পয়সার ঘুগনি নিয়ে যতবার ফাউ চাও, দেবেন। বিমুখ করবেন না। ওঁর যে একটা দই-কাটার চামচ ছিল, সেটা নিয়ে বাক্সের ভেতর ঘুরিয়ে এনে শালপাতায় ঠেকিয়ে দিতেন। শোনা কথা, ভানু আরও সস্তাতে বাজার করার জন্য কখনও-কখনও নাকি সাইকেল ম্যানেজ করে বাঁশতলা বাজারেও চলে যেত। বাঁশতলা বাজার সেই শ্মশান পেরিয়ে। আসলে, যত সস্তা, তত পয়সা ম্যানেজ, মানে বাজার থেকে পয়সা ঝাড়া যাবে। বাড়ির লোক কুমড়ো-ঝিঙের দাম কালীঘাট বাজারের সঙ্গে মেলাবে। শোনা কথা, ভানু নাকি কখনও কখনও ওজনেও মারত।

বাজারের পয়সা মেরে তখন আমরা সকলেই বড় হচ্ছি।

আমার মাসতুতো দিদি ছিল উচ্ছেদি। উচ্ছে ডাকনাম, ভাল নামও একটা ছিল। মাসির মেয়েদের নাম ছিল বেশ বাহারি— পটল-উচ্ছে-ভেন্ডি। তা উচ্ছেদি আমার থেকে সামান্য বড়। আমার সঙ্গে খুব ভাব। এক বাড়িতেই আমরা থাকি। ওদের অনেক বড় সংসার। মাসিদের পরিবারে উচ্ছেদিই বাজার সরকার। বারবার ওকে বাজার করতে যেতে হত। মাসিমা আর আমাদের রান্নাঘরের পাশে একটা কয়লা, কাঠ রাখার জায়গা ছিল। সেখানেই ছিল কিছু গাঁদা ফুল, একটা লঙ্কা-জবার সঙ্গে ছিল তুলসীমঞ্চ। একবার হঠাৎ দেখা গেল, তুলসীগাছটা দিন-দিন শীর্ণ হয়ে পড়ছে। বাড়ির তুলসীগাছ বাড়ির কল্যাণ-অকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কেন রুগ্‌ণ হবেন! চিন্তিত মা-মাসিমা মুক্তাকে বলতে ওর ভাই গঙ্গা থেকে একঝুড়ি মাটিও এনে দিল। কিন্তু তুলসীগাছটার কোনও উন্নতি হল না, দিন-দিন আরও শুকিয়ে যাচ্ছে…।

একদিন মুক্তা কোথা থেকে একটা তুলসীগাছ ম্যানেজ করে নিয়ে আমার মাকে দিল। বলল— মাসিমা ওটা তুলে এটা পুঁতে দাও। এক ঘনঘোর দুপুরে, সবাই যখন ইস্কুলে, সেই তুলসীগাছ বসাতে গিয়ে আমার মায়ের চক্ষু চড়কগাছ! গাছের মাটির নিচ থেকে এত্ত চার আনা আর আটআনা বেরিয়ে এল। যেন গুপ্তধন! যত মাটি খোঁড়ে, তত পয়সা উঠে আসে। মা মাটি ছেনে সব পয়সা আলাদা করল। কাউকে কিছু বলল না। এবার মায়ের লক্ষ করা, এই ব্যাঙ্কে কে টাকা রেখেছে? সন্দেহ দু’জনের ওপর— আমি, না উচ্ছেদি? আমার যেমন আমদানি ছিল, তেমন খরচও ছিল। বিশেষত খেলার মাঠে। আমার বাজার থেকে অত ঝাড়ার সুযোগ নেই, তবে কি আমি বাবার পকেট থেকে, বা মায়ের গোপন কৌটো থেকে জমানো টাকাপয়সা সরাচ্ছি? মা আমাকে সন্দেহের তালিকায় এক নম্বরে রেখেছিল।

মাসিমার পরিবারের মেসোমশাই, দাদাদের কালীঘাট উজ্জ্বলা সিনেমার ফুটপাথে চালু তিন-চারটে দোকান। যাকে বলে কাঁচা টাকা।

তবে কে?

উচ্ছেদি ইস্কুল থেকে ফিরে দেখল নতুন তুলসীগাছ। সে খাওয়া ভুলে দু-একবার তুলসীগাছের মাটিও পরীক্ষা করে এল। মা গাছ লাগিয়েছে, একসময় সে মায়ের কাছে আসতে মা বলল— সব পুরনো মাটি তুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মালাদি শুধু অস্ফুটে বলেছিল— ও! তা কোথায় ফেললে মাসিমা?

—গঙ্গায়।

উচ্ছেদি কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিল হয়তো। বুঝেছিল, তার সব আমানত গয়াগঙ্গা প্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু তখন শাহরুখ খান আসেননি, বলেনওনি— কাহানি অভি বাকি হ্যায়…

তার পরের পূর্ণিমায় আমাদের যৌথ বাড়িতে মা-মাসিমা মিলে সিন্নি দিল। ওই চুরি করে জমানো টাকায়। মা সেদিন বলল— মুক্তার ভাই গঙ্গা থেকে একঝুড়ি মাটি দিয়েছিল, ওই মাটির মধ্যে কিছু টাকা ছিল, সেই টাকায় পুজো হয়েছে। যারা গুপ্তধন পায়, তারা পুজো করে কি না জানি না, কিন্তু যারা চুরি করে, তাদের পুজোআচ্চার বহর বেশি হয়। মায়ের মনে হয়েছিল, পাপের টাকা পুণ্যে গেছে।

কিন্তু কীভাবে যেন সত্যিটা বেরিয়ে এল। তারপর সেই গুপ্তধনের খোঁজে আমাদের বাড়িতে যে গাঁদা গাছ, জবা গাছ ছিল— তার গোড়ায় আমরা মাঝেসাঝেই খোঁড়াখুড়ি করতাম। যদি কিছু পাওয়া যায়। আর কোনওদিন কেউ কিছু পায়নি। শুধু গাছগুলোকে আমাদের অত্যচার সহ্য করতে হয়েছিল।

তা বলে ভাববেন না, উচ্ছেদি বাজার থেকে পয়সা সরানো ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু লুকনোর জায়গাটা পালটেছিল। কিন্তু কোথায় সেটা আবিষ্কার করা যায়নি। উচ্ছেদির বিয়ের দিন সকালে আমি ফিসফিস করে বলেছিলাম— তুই চোট খাওয়ার পরে কোথায় টাকা লুকোতিস রে উচ্ছেদি?

উচ্ছেদি আমাকে খুব ভালবাসত। কেননা তার অনেক  চুরির আমি সাক্ষী ছিলাম। উচ্ছেদি অদ্ভুত টেকনিকে বড় দুধের জায়গা থেকে সূক্ষ্মভাবে সর তুলে নিত। কিন্তু কেউ টের পেত না। আমি, উচ্ছেদি, গোলু-পলু চিনি মিশিয়ে সেই সর খেতাম। কিন্তু সন্ধেবেলা মাসিমা বা বউদি দেখত— দুধের ওপর সুন্দর করে সর পড়ে আছে। উচ্ছেদি দুধের ওপর নকল সর বানিয়ে দিত। সেই চৌর্যবৃত্তির শাগরেদকে উচ্ছেদি বিয়ের দিন গোপন কথাটা বলেই দিল— গাছের গোড়াতেই রাখতাম।

সত্যি তখন তো আলাদা-আলাদা ঘর ছিল না। সব জায়গাই সবার। গোপনীয়তা, প্রাইভেসি শব্দগুলো আমরা জানতাম না। সবই ছিল হাটখোলা। তাহলে?

আমি বললাম— কীভাবে? আমি তো মাঝে-মাঝে সব গাছের তলায় খুরপি চালিয়ে দেখতাম। শুধু আমি কেন কেউ কেউ চামচ ঢুকিয়ে দেখত! কোথাও আটকায় কিনা!

উচ্ছেদি হেসে জবাব দিয়েছিল, বোকা ছেলে। এই করে করে তোরা সব গাঁদা গাছগুলো মেরে ফেলতিস, জবা গাছটারও খারাপ দশা করেছিস। আমি কত খোল, পচা সার দিয়ে দিয়ে ওদের বাঁচিয়ে রাখতাম।

—কিন্তু ঝাড়া পয়সা কোথায় রাখতিস?

—কেন জবা গাছের গোড়ায়, দইয়ের হাঁড়িতে খোল, পচা সারের জলে।

উচ্ছেদির স্বাস্থ্যকর পচা-বান্ধবীর ফ্ল্যাট ছিল না, খোল, পচা সারের হাঁড়ি ছিল। মনে হয় সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে।

ধোঁকা দাও। ধোঁকা খাও।

কালীঘাট মন্দিরের ঠিক উলটো দিকে, মহিম হালদার স্ট্রিটের মুখে, যেখানে অভিনেত্রী রাখী গুলজারের প্রাক্তন স্বামী অজয় বিশ্বাস বাটিক প্রিন্টের লুঙ্গি আর লাল-সবুজ টি-শার্ট পরে বেঞ্চে বসে আড্ডা দিতেন, ঠিক তার উল্টোদিকে হঠাৎ একদিন একটা তাঁবু পড়ল।

সেটা তাঁবুই, ফুটপাথের ওপর বাঁশ আর ত্রিপলের আস্তানা। একজন রোগা কালো, কাঠ-কাঠ পোড়া চেহারার লোক সেখানে উনুন বানিয়ে তার ওপর কড়াইয়ে তেল গরম করে বসে পড়ল। তার ঘোমটা দেওয়া বউ রাস্তায় বসে বড় শিলে ঘটঘট করে ডাল বাটছে। আর লোকটা ডায়মন্ড শেপের একটা কিছু বানাচ্ছে। তার নাম ধোকা।

তর্ক চলতেই পারে, তার আগে কে কোথায় ধোকা খেয়েছে। কিন্তু কালীঘাট চত্বরে সে-ই ছিল প্রথম ‘ধোকাদার’। ঘোষণা ছিল— শুধু ধোকা নয়, নিরামিষ ধোকা। মন্দিরের পুজো দিয়ে নিরামিষ ধোকা খান।

ট্র্যাডিশন চলছে!

আমি অজয় বিশ্বাসকে কোনওদিন শুকনো মুখে দেখিনি, তার পানাহারের অন্যতম সঙ্গী আমার এক জাঠতুতো দাদা।  পরের দিকে চিন্টুও অজয় বিশ্বাসের সঙ্গে আড্ডায় বসত। তখন চিন্টু বড়। চিন্টুর তখন দেখাদেখি হেব্বি বারফাট্টাই। গলায় সোনার চেন, আঙুলে সোনার আংটি, হাতে গোল্ড ফ্লেক। অবশ্যই বাটিক প্রিন্টের লুঙ্গি।

আমরা বলতাম— কী করিস ওই বুড়ো লোকটার সঙ্গে?

চিন্টুর শান্ত এবং গম্ভীর উত্তর— রাখীর টাচ পাই।

কভি কভি মেরে দিল মে খেয়াল আতা হ্যায়…

আমরা যখন এই গানের ঘোরে নিজেদের অমিতাভ ভাবতাম, চিন্টু তখন অজয় বিশ্বাসের সঙ্গে ঠেকাঠেকি করে বসে রাখীর টাচ পেত। চিন্টুর হয়তো অমিতাভ-ভাব ছিল না।

এই আমার কালীঘাট— চৈত্র সংক্রান্তি, নীল, গাজনে আমরা সবাইকে ‘টাচ’ করি, লর্ড ক্লাইভ থেকে ক্লাইভ লয়েড! আপনি বলতেই পারেন দুধের স্বাদ ঘোলে!

বিকেলের দিকে সন্তোষদা বলে একজন আসতেন টিনে করে শুকনো ঘুগনি নিয়ে। কষা আলুর দমও থাকত। শালপাতার ওপর অদ্ভুত টানে ঘুগনির কার্পেট পেতে দিতেন, তার ওপর একটু শসা-নারকেলের কুচি, একটু তেঁতুলের টকের নকশা। সন্তোষদার কাছে পাঁচ পয়সার ঘুগনি নিয়ে যতবার ফাউ চাও, দেবেন। বিমুখ করবেন না। ওঁর যে একটা দই-কাটার চামচ ছিল, সেটা নিয়ে বাক্সের ভেতর ঘুরিয়ে এনে শালপাতায় ঠেকিয়ে দিতেন।

দুধের কথা উঠল যখন, তখন একটু খাটালের কথা বলি—

আমাদের বাড়িতে কাচের বোতলে দুধ আসত। হরিণঘাটার দুধ।

কালীমন্দির থেকে বেরিয়ে কালীঘাট বাজার পেরিয়ে ট্রামলাইনের দিকে যাওয়ার আগে দেবালয়ের ঘুড়ির দোকানের পরে একটা বিখ্যাত খাটাল ছিল। সেখানে সকাল-বিকেল অনেকেই ঘটি-ক্যান নিয়ে হাজির হত। জল ছাড়া দুধ নেওয়ার জন্য। মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল— মাঝে-মাঝেই বলত, বোতলের দুধে কী থাকে, ছেলেটার গায়ে লাগে না। আমি ছোটবেলায় হালকা ফকফকে ছিলাম, বড় হতে সবাই বলত হ্যাঙারে পাঞ্জাবি ঝুলছে। তাই দুধ নিয়ে মায়ের দুঃখ থাকবেই।

বাবার কিন্তু ভরসা বোতলের দুধে। কারণ, খাটালের জলেও ভেজাল থাকে, কী জল মেশায় না মেশায়।

মায়ের প্রশ্ন ছিল— ওখান থেকে যারা দুধ নেয়, তারা সবাই চোখের সামনে দেখে নেয়।

বাবার উত্তর ছিল— তুমি গিয়ে দেখেছ কোনওদিন গোবর দিয়ে খাটালে ঢোকার রাস্তা ওরা বন্ধ করে রাখে। সবাই বিশ হাত দূরে ঘটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গোয়ালাদের পায়ের কাছে জলের পাইপ থাকে। লুঙ্গির মধ্যে জলের ঘটি থাকে।

মায়ের দাবি— আমার অসুবিধে নেই। আমি ঘেন্না পাই না। গোবর পেরিয়েই সামনে যাব।

বাবার উত্তর— তোমাকে দু’দিন সহ্য করবে, তৃতীয় দিনে গরুর গুঁতো খাওয়াবে। কোমর ভেঙে আসবে।

মা তারপর আর খাটাল থেকে সরাসরি দুধ আনার চেষ্টা করেনি। কালীঘাটে থাকতে আমারও গায়ে গত্তি লাগেনি।      

বাবা বলত— শোনো, ওদের চুরিটা শিল্পের পর্যায়ে…

বাবা ’৮৮ সালে মারা গেছেন। পরের চুরির শৈল্পিক রূপ তিনি দেখে যেতে পারেননি। থাকলে, দেখতে পেতেন, দুধ নয়, গরুতেই কীভাবে জল মেশানো যায়।

ঠিক আছে দুধ নয়, আমি গরুতে জল মেশানোর কথাই শোনাই। এটার কিছুটা দেখা, কিছুটা শোনা—

এটা আমার বড়দের কালীঘাট। তখন বেশ বড় হয়ে গিয়েছি। আমাদের বন্ধু চিন্টু তখন কালীঘাটের গলির কার্তিক। হরিদেবপুর থেকে মাঝেসাঝেই গিয়ে ওর কাছে গলির কথা শুনতাম। তা একটু-আধটু আপনাদেরও শোনাই— বেশি শোনালে সহ্য করতে পারবেন না।

অনেক হা-চোখে পুরুষ আছে, যারা সারাদিন ধরে গলির মুখোমুখি কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারা সারাদিন ধরে গলির মেয়েদের দেখে যায়। তাদের রূপ দেখে, রস দেখে। চোখ ভরে দেখে যায়, দেখে-দেখে চোখে পিচুটি পড়ে যায়। সহজ উদাহরণ, গার্লস স্কুলের সামনে যেমন কিছু ষাঁড় থাকে, অনেকটা তেমন।

গলির এই কাপ্তেনদের হয় পকেটে রেস্ত নেই। না-হলে পছন্দ করে উঠতে পারে না— কার কাছে যাবে? কে বেশি মজাদার, কে বেশি দমদার? এরা মোহিত হয়ে দেখে। মূলত নেশা করেই থাকে। নেশার রঙেই রঙিন থাকে। একটা সময় গলির কিছু পোষা ছেলে হঠাৎ এদের পিছনদিকে হইচই বাঁধিয়ে তাড়া করে। যারা গোলমাল পাকায়, তারা যেন শিকারপর্বে জঙ্গলের বন্য পশু তাড়া করার ট্রেনিং নিয়েছে। তাড়া খাওয়া, ছুটে যাওয়া পুরুষগুলো সামনের দিকেই যায়, তখনই রাস্তার ওপার থেকে বেরিয়ে এসে কোনও না-কোনও মেয়ে হাত বাড়িয়ে খপ করে তাদের হাত ধরে টেনে নিয়ে গলির ভেতর চলে যায়। তারপর দেখে এদের পকেটে কত টাকা আছে— না, কোনও চুরি-ছিনতাই কেস নয়। কেস দেবেন না প্লিজ। মেয়েদের পাওনা হিসেব মিটিয়ে ঘরে যাওয়ার যোগ্য করে তুলে তাদের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পকেটে যদি ঠিকঠাক টাকা না থাকে, তাহলে ওইটুকু টাকা মেয়েটির হাতে দিয়ে বিদায় নিতে হয়। কোমল হাত-ধরার যতটুকু সুখ, পকেট-খসার ততটুকু দুখ!

কিন্তু এর পরের অংশটিরও সত্যি মিথ্যে জানি না। শোনা কথা শোনালাম—

কেউ-কেউ গলির সামনে আসে টলমলো পায়ে, নেশায় চুরচুর। তখন তাকে ছলাকলা করে কেউ না-কেউ ডাকে। যে ডাকে, সে বেশ মনোহারিণী নেশাধরাণী। তারপর তাকে গলির ভেতর নিয়ে যায়। কিছু দূর এগিয়ে আধো অন্ধকারে গলির রাস্তায় একটু আগে-পরে হলেই যে তাকে চুম্বক লাগিয়ে টেনে নিয়ে এসেছিল, সে টুক করে সরে যায়। এখানে দ্বিতীয় জনের এন্ট্রি। দ্বিতীয় মেয়েটি এবার খদ্দেরের হাত ধরে নিয়ে ঘরের দিকে হেঁটে যায়। এভাবেই পেয়ারি পালটে যায় আলোআঁধারিতে, নেশার খোঁয়াড়িতে।

অথবা এমনই হয়, তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে সেই চুম্বক মেয়েটা উধাও হয়ে যায়, দ্বিতীয় মেয়ে এসে ছলাকলায় মজায়। পুরুষ বড় তরল জাত, গলতে আর কতক্ষণ!

এবার প্রশ্ন এমন কেন?

একটা হতে পারে চুম্বক মেয়েটির শারীরিক কারণ। সে দিনগুলোয় কি বসে থাকবে? দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, চিন্টু যা বলেছিল, একটা-একটা মেয়ে আছে, মাছ ধরতে উস্তাদ! ওদের চোখে বঁড়শি থাকে রে!

চিন্টু এমন এক বঁড়শিতেই ফেঁসে ছিল।