আড্ডার মহফিল
সাতের দশকের একটি ঠিকানা, ‘49, Agrieo Main Road, Jam–831009’-এর সঙ্গে সমান্তরাল সাহিত্যজগতের অনেকেরই পরিচিতি ছিল। ঠিকানাটি কমল চক্রবর্তীর। সুবিমল বসাকের থেকে বছর সাতেকের ছোট তিনি। সুবিমলের লেখালিখির প্রতি তাঁর অবিমিশ্র শ্রদ্ধার ছাপ বহু চিঠিতেই। সাতের দশকের গোড়ায় প্রথম প্রকাশ পায় কমল-সম্পাদিত ‘কৌরব’। বেরোত জামশেদপুর থেকেই। আর সেই পত্রিকার সূত্রেই সুবিমলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর।
সুবিমলের সংগ্রহে কমল চক্রবর্তীর লেখা অসংখ্য চিঠি রয়েছে। বেশিরভাগই কৌরব-কেন্দ্রিক। সেসব চিঠির বিস্তৃতি ও সময়কাল সাতের দশক থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত। সেই বিপুল পত্রগুচ্ছের থেকেই সামান্য কয়েকটি তুলে ধরা হবে এই পর্বে।

18.11.73
পরমহৃদয়েষু, সুবিমলদা
দীর্ঘ অবকাশ শেষে আপনার প্রেম পাওয়া গেল। একান্ত এই প্রয়োজনীয় চিঠি বহুদিন পর হস্তগত। অথচ আপনি আরো একটু সচেতন হলে আমি উজ্জিবীত হবার অবসর প্রায়স পাই, অর্থাৎ এই চিঠি।
বাংলা ভাষার কেন্দ্রবিন্দু কোলকাতা— এ কথা বোবাও স্বীকার করবে, আমাদের দিল্লী পাটনা লক্ষ্নৌ নেই, তাই প্রতিরোধ এত তীব্র প্রতিযোগীতা বা প্রতিদ্বন্দ্বীতা নয়— যা সহজে বরণীয় এবং একমাত্র সুস্থতারই লক্ষণ। এখানে প্রতিরোধ প্রতিনিয়ত কড়া পাহাড়া নিয়ে অপেক্ষায়, তাই বলে ক্ষোভ নেই, অভিযোগও নেই, সমর্থ প্রতিরোধ দেখতে চাই, সিনার পাজর কত হিম্মত ধরে, এই তো একমাত্র দেখা যেতে পারে, কি বলুন। আমি আদৌ ধূমায়িত নই বরং অনেক বেশী গভীর হতে প্রয়াশ পাচ্ছি। এবং আপনারা যাদের প্রকৃত অর্থে সুহৃদ মনে করি, তাদের ছিটেফোটা ভালোবাসা আমাকে অসীম সাহসীই শুধু নয় মানুষ করে তোলে।
অনেক কারণে ‘কৌরব’ সময়মত প্রকাশ করা গেল না তবে ২/৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে পারব, এই বিশ্বাশ, সে যত পাতারই হোক, আর অপেক্ষা করা যায় না। আচ্ছা আপনার কথা অনুযায়ী, ‘আবহ’ প্রকাশিত তবে একটা কী আমি পেতে পারি। যদি অপরাধ না নেন তবে, একটা ‘আবহ’ পাঠাবেন, একটু দেখতে চাই।
ধূর্জটি, তুষার ওরা সব কেমন আছে। কোলকাতার সাহিত্যজগতের রোমাঞ্চকর কিছু, ভালোবাসা, শুভেচ্ছা।
বিনীত
কমল চক্রবর্তী

চিঠির তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ‘আবহ’ পত্রিকার শারদীয় ১৩৮০ সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন কমল। সে-সংখ্যায় তাঁর কবিতা ‘ঈশ্বরের প্রোষিতভর্তৃকা’ প্রকাশ পেয়েছিল। তবে তার আগে-পরেও একাধিক সংখ্যায় কবিতা লিখেছেন কমল। আবহ পত্রিকার সম্পাদক অসিত গুপ্ত হলেও, লেখা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতেন সুবিমলই। চিঠিতে উল্লিখিত ‘ধূর্জটি’ ও ‘তুষার’ যথাক্রমে ধূর্জটি চন্দ ও তুষার চৌধুরী।
11.3.74
সুবিমলদা ভালো আছেন তো? হ্যাঁ সেদিন ২৬শে জানুয়ারী যে কাজটা আমাদের ছিল তা প্রধান গল্পের অর্থাৎ লাগাতার আড্ডার মহফিল। যদিও খুব দুঃখের সঙ্গে সামান্য পরেই বুঝে যাই তরুণ কবির দল নাছোর এরা নিজ নিজ মুখ নিসৃত বাণী সকল জন গন প্রকল্পে বিনা দাদনে দান না করে ছাড়বেন না এবং সোনালী অক্ষরে লেখা, বার বার মহরা দেওয়া কবিতাও পাঠ না করে ছাড়বেন না। তখন একান্ত নিঃসঙ্গ বোধ করি, এবং এইসব ক্ষেত্রে আমি সামান্যতম ভেংগে পরাকেও আমল দিইনা। প্রয়োজনে তাই একাই মৌজ করতে চলে যাই। যদি কোন মতে বোঝা যেত আপনি এইসব থেকে রাই চান, তবে আমি তমলুকে কয়েক ঘণ্টা একা থাকতাম না। আর আমার মনে হোল ঐ দিকে গেলে আমি আবার ফসে যাবো, থাক, ও এক বিটকেল অভিজ্ঞতা, পৃথিবীতে কতরকমের চুতিয়া থাকে এবং তাদের তাণ্ডব।
আছেন ভালো? আর সব ছেলেপুলে বিখ্যাত লোকজনদের খবর কি?
কোলকাতার বর্ত্তমান বাজারদর কেমন? তেমন তাজা খবর যদি কিছু থাকে জানাবেন। অর্থ, প্রেস, কাগজ সব মিলিয়ে ‘কৌরব’ আবার কতকাল পরে প্রকাশিত হবে কে জানে। সময় হলে চিঠিপত্র দেবেন।
ভালোবাসার কাংগাল, কমল
পড়ে বোঝা যায়, ২৬ জানুয়ারির প্রসঙ্গটি আগের চিঠিতে সুবিমলই তুলেছিলেন। কী ছিল সেদিন? সুবিমলের ডায়েরি ঘেঁটে উদ্ধার করা গেল সেই তথ্য। তমলুকে আয়োজিত একটি আলোচনাসভায় শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুবিমল। ডায়েরিতে তিনি লিখছেন (২৬.০১.৭৪)—
সকালে সুভাষ সরকার, মৃদুল দাশগুপ্ত, পল্লব বন্দ্যো, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, রবীন মোদক, শ্যামলকান্তি— তারপর পূর্ণেন্দু ভরদ্বাজ, কমল চক্রবর্তী, মৃণাল বণিক সবাই।
আলোচনা: লিটল্ ম্যাগাজীনের সমস্যা (প্রথম পর্ব)
আলোচনা: সাহিত্যের উদ্দেশ্য (২য় পর্ব)
শ্রী বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সভাপতি হয়েছেন। SUCর মেয়েরা পত্রিকা বিক্রী করছিল। তাদের বক্তৃতাও হলো।
এই অনুষ্ঠান সম্পর্কেই ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিমত ওপরের চিঠিতে জানিয়েছিলেন কমল।
প্রিয় সুবিমলদা,
এখনও আপনি আমাকে চিঠি দিচ্ছেন অর্থাৎ খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং আমার বর্ত্তমান লেখালেখি যেমনই হোক আপনি যে লক্ষ্য করছেন, এটা ভাবতে ভালো লাগছে। আমার শব্দ প্রয়োগ আপনার ভালো লাগেনি, আসলে কোন লেখালেখিই ভালো লাগছে না তাই বারবার এটা সেটা রগড়া রগড়ি করে দেখছি লোহা সোনা হয় কিনা। আজকের বাংলাভাষায় যখন মোটেই লেখা হচ্ছে না, ভুল, ভটুল কলম চালিয়ে, বুঁদ হয়ে থাকার যথেষ্ট সুযোগ, সেই বাতাসে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকা এক সমস্যা। আমাদের কোন লেখাই থাকবেনা, কালিদাসের পর রবীন্দ্রনাথ এই ভারতবর্ষ, ভাষ, ভারবি আরো কত কত মস্তান তলিয়ে গেছে। আবার রবীন্দ্রনাথের পরে হয়ত তিনশ বা পাঁচশবছর পার করে কোন কবি আসবেন। তাঁর আসার জন্যই আমাদের জন্ম কোথায় যাবে বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব, শুধু নাম হয়ে বেঁচে থাকবে গবেষকের কাছে, আর ‘আনন্দশিশু’রা নিশ্চিত ‘ব্লু বেবী অচিরাৎ পথিমধ্যে রিকেট পলিও হয়ে মারা যাবে। তবু এই নিয়ে কানির কত রং তামাশা, মা বলেন, কে মরে কার রংএ, কানি মরে তার দু চোখের রংএ। যে কদিন পৃথিবীতে বেঁচে আছি একটা ঘোরের মধ্যে কাটুক, অভাব অনটন ব্যার্থতা ইত্যাদির প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে ছুট্কারা পেতে চাই তাই সাহিত্য, নইলে আমরা তো সেই মহামানব আসবেন তার পথ তৈরীর ধূলো…। শুভেচ্ছা নিন।
বিনীত কমল
৩/৬/৭৪
কমল চক্রবর্তীর পরের চিঠিটি ১৯৭৫ সালের, ফেব্রুয়ারি মাসের—
প্রিয় সুবিমলদা
কেমন আছেন গো বাবু। বহুকাল হোল কুটোটি দিয়েও নেড়ে দেখেননি মরে না বেঁচে, তবে দাদা এই চলছে, নিজের। সেই আপনার সাথে সম্মেলনে শেষ দেখা এবং সেই সময় দেখেছি আপনার চোখ, উরে বাবা আমি যখন উঠে অন্ধকারে দাড়ালুম আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছিল। তা যাই হোক এবার কোলকাতায় ভালই কেটেছে, আর কবিসম্মেলনে যদি ঐ সমস্ত ব্যবস্থা না থাকে তবে সত্যি দাদা বোরিং এবং শ্মশান সভা মনে হয়। তবে আপনি বহুৎ সেয়ানা লোক, অনেক বার বলেছেন কোলকাতায় গেলে এক আধটু প্রসাদ দেবেন, তাকি শুধু চিঠিতে। মেলার পর বকখালি, কাকদ্বীপ, পোষমেলা (আঃ), সিউড়ী, হেতমপুর, দুবরাজপুর এম্নি অনেক গা গেরাম ঘুরে বেড়ালাম। এখানে ফিরে আর চাকরীতে মন নেই। তো, আপনি আছেন কেমন, সমস্ত ছানাপোনা নিয়ে। মাঝে মাঝে খোঁজ খবর নিবেন গো বাবু, বড় শুখা রুখা দিন যায় কষ্টে। প্রেম।
কমল চক্রবর্তী
৭-২-৭৫

‘ঐ সব ব্যবস্থা’ কিংবা ‘প্রসাদ’-এর ইঙ্গিত সম্ভবত মদ্যপানের দিকেই। এ-প্রসঙ্গে ‘কৌরব’-এরই ‘খালাসিটোলা সংখ্যা’-য় (২০০২) সুবিমল বসাকের একটি গদ্যের অংশ তুলে ধরা যেতে পারে—
‘…কমল চক্রবর্তীর সঙ্গে তুষার চৌধুরীর একদা খুব কথা কাটাকাটি। দু-একদিন পূর্বে তুষারের আস্তানায় গিয়েছিল কমল, রাতে ছাদে বসে লেখা নিয়ে আলোচনা, আলোচনা থেকে তর্কবিতর্ক তারই রেশ ধরে কেটিতে, সেই সন্ধ্যায়। কমলের বক্তব্য হল বাংলা সাহিত্যকে ধনী করেছে বিহারের লেখকেরা। পরপর একগাদা নাম আউড়ে যায় কমল, আর তুষারের বক্তব্য হল— পূর্ববাংলার লেখকেরাই বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে বেশি। রাঢ়বঙ্গের লেখকদের এখানে টানা হয়নি তর্কের খাতিরে। তুষার যতই বলে, কমল হাসিমুখে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। গেলাসে ইশারা করে বলে খেয়ে নে, আরও জোশ পাবি। চুমুকে-চুমুকে পান করায় অভ্যস্ত ছিল না তুষার, গেলাস কানায়-কানায় ভরিয়ে চেয়ে থাকত কিছুক্ষণ, তারপর এক নিঃশ্বাসে পুরোটা গিলে ফেলত। আবার গেলাস ভরা হত কানায়-কানায়। আর কমল টুক টুক করে গিলে, কিছুটা ঠাট্টা কিছুটা পেছনে-লাগা, তুষারকে উপযুপিরি আঘাত করে চলে। আমি মাঝখানে। তুষার সহসা ‘ছাতামাথা’র উল্লেখ করতে কমল থতমত, সামলে নিয়ে ‘মহল্লা লোদিপুর’-এর পাত্তি ফেলে।’
পরবর্তী যে-চিঠিটি তুলে ধরা হবে, তা দীর্ঘ এক যুগ পর, ১৯৮৮ সালের। ‘কৌরব’ পত্রিকার ৫০ তম সংখ্যার প্রস্তুতি চলছে তখন।
প্রিয় সুবিমলদা
চিঠি পেয়ে চিঠি দিয়েছিলুম। তোমাকে কৌরব ৫০ লিখতে বলি। সব লেখা লি: ম্যা: বিষয়ক হবে বিভিন্ন এঙ্গেল নিয়ে।
লেখা এখনও আসেনি।
একটা কথা লজ্জার মাথা খেয়ে লিখি, আগামী সংখ্যায় ১৫/১৬ হাজার খরচ। ৪৫০/৫০০ পৃ:। কখনও তোমাদের কাছে ভিক্ষে করিনি। নীরবে একা কাজ করে গেছি। তোমাদের মজা দিয়েছি, অবাক করেছি, কিভাবে এত বড় কাগজ বিজ্ঞাপন ছাড়া হয় দেখিয়ে। বাজারে অনেক ধার। আর কোন হাততালি আমায় বাঁচাবে না।
তোমার পক্ষে কি কিছু টাকা দেওয়া সম্ভব। যা তুমি পার। তোমার ভিক্ষে। তা যত সামান্য হোক। আমি অপেক্ষা করব। তুমি কতদিন তোমার বাড়িতে যেতে বলেছ যাইনি গেলেও ৫০/৬০ টাকা খরচ হোত, সেই সব বাঁচিয়ে, দেবে! দেওনা!
আর যদি একটা বিজ্ঞাপন! একটাই মাত্র। ছাপার কথা ভাববে না। ছাপা হবেই। তবে টাকা আগে দিয়ে দেবে।
অনেক কথা লিখলুম। ভাববে জানি, কি সাহিত্য! তবু নিরুপায়, ৪৯ সংখ্যার পর, এই ভিক্ষে। রাগ কোর না সুবিমলদা, ভিক্ষে দিও।
শ্রদ্ধা নিও।
অনুগত
কমল
২৩/১১/৮৭

ওই চিঠির সঙ্গেই স্টেপল করে মানি অর্ডারের রিসিপ্ট রেখেছিলেন সুবিমল। সেখান থেকেই জানা যায়, কমলের অনুরোধমাফিক ১০০ টাকা পাঠান তিনি। ডায়েরিতে লেখা (৯.১২.৮৭)— ‘কমলকে চিঠি দিলুম— কিছু টাকা পাঠাচ্ছি বলে। লেখা তৈরী করিনি। …১০০ টাকা পাঠাবো ভেবেছি।’ ‘কৌরব ৫০’ প্রকাশ পায় জানুয়ারি ১৯৮৮-তে, ৯৬ পাতার পত্রিকা হিসেবে। তবে পরবর্তী সংখ্যাটি অর্থাৎ ‘কৌরব ৫১’ (জুলাই ১৯৮৮) ছিল চিঠিতে উল্লিখিত ‘লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা’। সুবিমল শেষাবধি তাতে লেখেননি।
শেষ একটি চিঠির উল্লেখ করেই এই পর্বে কমল-প্রসঙ্গে ইতি টানা যাক। চিঠিটি ১৪০৭ সালের বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে লেখা।
শ্রদ্ধেয় দাদা
শ্রীসুবিমল বসাক মহাশয়
নতুন বছর ১৪০৭ তোমার আরও কর্মময় হোক। তোমার লেখার সৎ ও সুন্দর মূল্যায়ন হোক, তুমি আমাকে একটু ভালোবেসো, এই হোল আগামী বছরে।
বইমেলার পর আর তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। কখনও ভেবেছি তোমার একটা নির্বাচিত গল্প হওয়া দরকার। ১৫/২০টী। খুবই নির্মমভাবে ছাঁটাই।
একটা সিরিজ বের করা যায়। তোমার, সুবিমল মিত্র, মলয়, অসীম রায়, অমিয়ভূষণ এরকম ১০টী নাম। বা ৬টী। একটা বড় টাকা পাওয়া যেত। লাখ খানেক। খুব কষ্ট হয়। কাজ করতে ইচ্ছে করে অথচ! হ্যাঁ, বাসুদেব দাশগুপ্ত। আমার অক্ষমতা, আমার স্বপ্ন দুই ক্ষমা কোর! শ্রদ্ধা নিও।
অনুগত
কমল
২১.৪.০০
‘কৌরব’-এর অপর স্তম্ভ বারীন ঘোষালের সঙ্গেও ছিল সুবিমলের হৃদ্যতা। সাতের দশকেই ‘আবহ’ পত্রিকায় বারীন-এর একাধিক লেখা ছেপেছেন সুবিমল। এমনকী, শেষের দিকে বারীন-সুবিমল ঘনিষ্ঠতার সাক্ষী ছিলাম আমিও। অথচ, সুবিমলের সংগ্রহে বারীন ঘোষালের কোনও চিঠি নেই— এ অ্যাক আশ্চর্য!
পরবর্তী যে-দুই ব্যক্তির চিঠি আলোচিত হবে, তাঁদের প্রত্যেককে নিয়ে স্বতন্ত্র পর্ব লেখা যায়। সুবিমলের ডায়েরির খণ্ডের পর খণ্ডে তাঁদের প্রসঙ্গ রয়েছে। বন্ধুত্ব-আড্ডা-মনোমালিন্য-ভুলবোঝাবুঝি-গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব-দূরত্ব সব। অথচ, তাঁদের চিঠির সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কম। তাও আবার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। নেহাত নথিভুক্তির কারণেই আলোচিত হবে। সুবিমল কি তাঁদের পত্রগুচ্ছ অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছিলেন? নইলে চিঠির এত কম সংখ্যা আশ্চর্যের। সেই দু’জন ব্যক্তি— কবি শৈলেশ্বর ঘোষ ও গদ্যকার সুভাষ ঘোষ।
সুবিমলের সংগ্রহে থাকা শৈলেশ্বরের মাত্র দুটি চিঠির প্রথমটি, তারিখ না-থাকলেও বোঝা যায়, ১৯৬৭ সালে লেখা। অবশ্য চিঠি না বলে চিরকুট বলাই শ্রেয়—
প্রিয় সুবিমল,
দেরী হয়ে গেল। দুটো কবিতা ‘জন্মনিয়ন্ত্রণের’ ১ম অংশ সহ দিলাম। গদ্যটা ছেপো। রবিবার সকালে এসো যদি সময় পাও। বিকেলে আমরা থাকবো না।
ভালোবাসা সহ
শৈলেশ্বর ঘোষ

‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক শৈলেশ্বরের কবিতা বেরিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায়, ১৯৬৭ সালে। সম্ভবত সেই প্রসঙ্গেরই উল্লেখ এই চিঠিতে। ওই একই বছরে, ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’ নামের কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ পায়।
প্রিয় সুবিমল,
তুমি কি সেই শনিবার এসেছিলে? আমি দুঃখিত যে যেতে পারিনি। ‘দন্দশূক’ বেরিয়ে গেছে। গোলমালও হচ্ছে, আবার বিক্রিও হচ্ছে। তুমি কি লেখাটা তৈরি করেছ? কিছু জরুরী কথাবার্তা আছে তুমি কি শনিবার ৬-৩০এ বসন্তে আসতে পারবে? আমি থাকব। না হলে পরদিন রবিবার বিকেল বা সকালে আমার এখানে এসো। বিকেলে এলে দুপুর ৩টার মধ্যে চলে আসবে।
প্রীতিসহ
শৈলেশ্বর
৬/৬/৮৩
এই চিঠি সম্পর্কে ডায়েরিতে সুবিমল লিখছেন (৭.৬.৮৩)— ‘দেখলুম, শৈলেশ্বরের চিঠি। সেদিন শনিবারে বসন্ত কেবিন-এ যেতে পারেনি। এ শনিবার যাবে। দন্দ্বশূক বেরিয়েছে— হৈচৈ হচ্ছে খুব মনে হলো। আমার কাছ থেকে লেখা চেয়েছে।’
পরের শনিবার দেখা হয়েছিল উভয়ের। ডায়েরিতে সেই সম্পর্কে লেখা (১১.৬.৮৩)— ‘…কলেজ স্ট্রীটে পৌঁছুতে প্রায় আটটা। শৈলেশ্বর চলে যাচ্ছিল— আবার ফিরল। জেব্রা-২ ওকে দিলুম। একটা কপি চেয়েছিল। বসন্তে সুভাষ ও সূর্য মুখো বসে। সূর্য আমায় Current দ্বন্দশুক দিল। অঞ্জনের কাছ থেকে নিয়ে ওটা সূর্য edit করছে। পরে পড়বো জানালুম। শৈলেশ্বর-সুভাষ দেখলুম খুব খাতির করছে। বাসুদেবের বই গত শনিবার (রন্ধনশালা) বেরিয়েছে এবং সেদিনই দ্বন্দশুক বেরিয়েছে। শৈলেশ্বরের interviewতে বাসুদেবকে সাংঘাতিকভাবে আক্রমণ করেছে। শৈলেশ্বর বলল, ঝিমিয়ে না থেকে লেখা-টেখায় মেতে ওঠো। রেগুলার এসো। আলাপ-আলোচনা হোক। শৈলেশ্বর বললো— হেঁটে হেঁটে শ্যামবাজার ওব্দি যেতে। …আমি দেরী করতে চাইলুম না। শৈলেশ্বর বলে— এবার ক্ষুধার্তে তোমাকে include করবো। একটা গ্রন্থের সমালোচনা লিখে দাও। আমার কেমন জানি সন্দেহ হলো, ওদের motive ভালো লাগলো না।…’


সুভাষ ঘোষের চিঠির সংখ্যাও মাত্র তিনটি। একটি নিতান্তই অনুল্লেখ্য, অন্যটি ত্রয়োদশ পর্বে ফালগুনী রায়-প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। তৃতীয়টিই কেবলমাত্র তুলে ধরা যেতে পারে—
বৃহস্পতিবার
প্রিয় সুবিমল,
তোমার কথিত লেখকদের পুরোনো printed লেখাগুলোর সংকলনে, ’২৯ ধারা ও আমার রক্তের পরিণতি’ include করতে পারো।
ছাপাগুলোর দিকে একটু নজর দিও অর্থাৎ ভুলভ্রান্তির দিকে—
আমার প্রস্তাব:
১) লেখাগুলোর প্রকাশের সময় তারিখের উল্লেখ করবে
২) Source
৩) লেখাগুলো প্রকাশের উদ্দেশ্য—
আমার লেখাটার সামান্য মুদ্রণ ভুল আছে— আমি একটা proof দেখে দেবো
মূল্য সাধারনের নাগালের মধ্যে রাখবে–
আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে, ‘গল্পকবিতায়’ প্রকাশিত ‘মিসিং লিংক’ দেয়া—
এ নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা হলে ভাল হতো— তোমার সময় না থাকলে দরকার নেই।
সুভাষ ঘোষ

চিঠিতে কোনও তারিখ না-থাকলেও, এটি ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লেখা। সুবিমলের ডাইরির এন্ট্রি (২৩.৯.৮০)— ‘সুভাষের চিঠি পেলুম। ২৯ ধারা সংকলিত করতে আগ্রহী।’ সেই সময়ে, ‘আবহ’ পত্রিকার তরফ থেকে একটি গল্প সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়; সম্পাদনার দায়িত্বে সুবিমল বসাক। নাম ঠিক হয়েছিল ‘উপদ্রুত এলাকা’। সেই কাজের জন্যেই বিভিন্ন লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সুবিমল (ইতিপূর্বে তৃতীয় পর্বে উদয়ন ঘোষের কাছে গল্প চাওয়ার প্রসঙ্গও আলোচিত হয়েছে)। সুভাষের এই চিঠিটিও সেই প্রয়াসেরই নিদর্শন। তবে সংকলনটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।
সুবিমল যখন থেকে হাংরি আন্দোলনের শরিক, শৈলেশ্বর-সুভাষের সঙ্গে তাঁর আলাপ-বন্ধুত্বও প্রায় তখন থেকেই। ফলে, তাঁদের নিয়ে লেখা আরও দীর্ঘায়িত হওয়াই উচিত ছিল। তবে তা হত ডায়েরি-নির্ভর; উপযুক্ত চিঠির অভাবে সেই প্রয়াসে বিরত থাকতে হল। এবং মূল প্রশ্নটি এখনও ভাবাচ্ছে— এই দু’জনের চিঠির সংখ্যা এত কম কেন?




