অলিগলির কালীঘাট: পর্ব ৪

Representative Image

মায়ের ভোগে, শাস্তি ভোগ

আমরা বড় হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে নানা দিকে ছড়িয়ে গেলাম। যেমন আর শুধু মনের আনন্দে ফুটবল খেলি না। ভেতর থেকে ভাগ হয়ে গিয়েছি। ফুটবল খেলা এবং ফুটবল প্র্যাকটিস। খেলা তো মনের আনন্দে খেলি, কিন্তু প্র্যাকটিশ ব্যাপারটা অন্য, আর কিছুই না, কোচিং ক্লাসের মতো। পড়াশোনাতে তেমন, গৃহশিক্ষক বা প্রাইভেট টিউটর কমছে, হয় বাবা মায়ের সামর্থ্য নেই, নয় বাবা মাকে ভুজুংভাজুং দিয়ে আমরা কোচিং ক্লাসের দিকে ছুটছি। ঠিক যেন মামার-বাড়ি ভারি মজা!

কালীঘাট বাজারের ওপর সাধনদার কোচিং-সেন্টার হয়েছে। সাধনদা কালীঘাট হাই স্কুলের টিচার, সবসময়ে পান খান, আর হাতে একটা ছপটি নিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু কাউকে কোনওদিন মারেননি। খুব ফর্সা মোটা গোলগাল মানুষ। মহিম হালদার স্ট্রিটে প্রণববাবু স্যারের ইংরেজি কোচিং। বোর্ডে ঘস-ঘস লিখে-লিখে, আর ঘন-ঘন নস্যি টেনে গ্রামার শেখান।

বেশ জমজমাট ব্যাপার। কেন না, কোচিং সেন্টার মানে শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও আছে। মেয়েদের জন্য আলাদা বেঞ্চ। তারা সামনে বসলে পেছনে আমরা।

কিন্তু কোনও কোনও সাহসিনী মেয়ে আমাদের সঙ্গেই বসত। কিন্তু প্রণববাবু মাঝে-মাঝেই নস্যি রঙের একটা রুমালে ফোঁ-ফোঁ করে নাক ঝাড়েন। প্রণববাবু নাক ঝাড়লেই অতি বড় সাহসিনী মেয়েগুলোও কেমন সিঁটকে যেত। ক্রিকেট ফুটবল প্র্যাকটিসের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের প্রেম প্র্যাকটিসও শুরু হয়ে গেল। জীবন যেন অনুশীলন সমিতি!

কালীঘাটের ছায়াপথের সূচনা হত পটুয়াপাড়ায়! পড়ুন: অলিগলির কালীঘাট পর্ব ৩

আগে ফুটবলের কথা একটু বলে নিই। তারপর নয় প্রেমের কথায় আসা যাবে। ফুটবল! এই চামড়ার গোল বলটার প্রতি এত মোহ এ জীবন ফুরিয়ে এলেও কাটল না। তখন ফুটবল কোচিং ছিল লেকের মাঠে বাবুদা, রবীনদা, কালীঘাট মন্দির পেরিয়ে নুটুদা। যতদূর মনে পড়ছে, নুটুদার একটা হাত নুলো। এঁরা কালীঘাট পার্কে, লেকের মাঠে ফুটবল কোচিং  করানোর সঙ্গে-সঙ্গে টুর্নামেন্টে টিম নামাত। বিভিন্ন হাইটের টিম ছিল। শোনা কথা, কেউ-কেউ আমাদের ভয় দেখাত, একদম লোহা তুলবি না, হাইটে খেলানোর জন্য তোদের লোহা তুলিয়ে তুলিয়ে বেঁটে করে রাখবে। আমি বেশিদিন ফোর টেন খেলতে পারিনি। লাফিয়ে লম্বা হয়ে গিয়েছি। মাঝে-মাঝে এই ফুটবল-দাদারা চোখ মুখ শুকনো দেখলে হাত চেপে ধরত। ওদের একটাই ধারণা, আমরা মাসটারবেট করে-করে এইরকম শুকিয়ে যাচ্ছি। আসলে সকালবেলা দুটো লেড়ো বিস্কুট খেয়ে মাঠে অত পাক দৌড়ঝাঁপে আমরা শুকনোই হতাম। দুপুরে সুতো দিয়ে অর্ধেক করা ডিমের ঝোল-ভাতে, আড়াইশো গ্রাম চারাপোনায় চার পাঁচজন খেয়ে আমরা অর্ধেকই থাকতাম। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে গরম-গরম রুটি আর ভেলি গুড়। রাতে বড়-করে আলুর দম বা কুমড়োর ছেঁচকি। না, এ দারিদ্রের কথা নয়, ভাববেন না আমরা খুব গরিব ছিলাম, আসলে সময়টাই এমন ছিল। বাইরের চার্জ বা চার্জারের দরকার ছিল না, যেটুকু চার্জ তা বুকের ব্যাটারিতেই ছিল। সঙ্গে এই মাঠের দাদারা।

এই দাদারা ছিলেন সব ‘কোনি’র ক্ষিদ্দা, এঁরা আমাদের স্বপ্ন দেখাতেন। কী স্বপ্ন দেখাতেন জানেন? আপনি কী ভাবছেন— ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন? ও-গুলো পরে, আগে ছিল ফার্স্ট ডিভিশনে কোনও ভাল ক্লাবে খেলা। ভাল খেলে ক্লাব পেলেই চাকরি। স্পোর্টস কোটা। এটাই বাস্তব। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান দেশ— সেগুলো স্বপ্ন। আমাদের মধ্যে অনেকের ফার্স্ট ডিভিশন ক্লাব ও চাকরি লেগেছে। বেশিরভাগের হয়নি। কিন্তু প্রেম যাইনি।

আমাদের কয়েকজন বন্ধুবান্ধব তখন অন্যপথে লড়ছে। কালীঘাট ব্যায়ামাগার, গঙ্গার ধারের ব্যায়াম সমিতি, জনকল্যাণ সমিতিতে লোহা তুলছে, বডি বানাচ্ছে। তারা সব মিলিটারিতে যাবে, পুলিশ-লাইনে দাঁড়াবে। ভেতর-ভেতর চাকরি তারমধ্যেই বেশ কয়েকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এরা সব গলির ছেলে। যত বড় হয়েছে, তত আলাদা হয়েছে। একটু বড় হতেই এদের পায়ে ফুটবল নেই, জুয়ার তাস আছে। মিলিটারি-পুলিশ লাইন নেই, মস্তানি করে গলির ভেতরে। সেখানেই মেয়েদের মারধর টাকা ছিনতাই করে নাম কামানো। এমনকী কোনও রাজনৈতিক দলেও এরা ভিড়তে পারে না। ব্যবসায়ী হলে গলিতে মাগির দালালি করো, কাজ পেলে তুমি কারও আন্ডারে টিকিট ব্ল্যাকার হও।   

গলির মেয়েরা ঋতুমতি হলেই পেশায় যাবে, সন্ধে হলে মুখে রং মেখে গলির মুখে দাঁড়াবে, কিন্তু ছেলেরা?

ওদের চোখের ভেতর বড় অন্ধকার। এই আমাদের পাশে পাশে ছিল, এই আলাদা হয়ে গেল। যারা বাজার-পাড়ার ছেলে, তারা বাবাকে সাহায্য করছে। বাবার দোকানে বসছে। কাঁচা পয়সা, দু’চার টাকা ঝেড়েও আনছে। আমাদের ‘অফিস করা’, ‘চাকরি করা’ বাবারা পকেটে গুনে পয়সা রাখে। তখন কেউ-কেউ বাড়ির বাজারের দায়িত্ব নিচ্ছে, সেখান থেকে চার চার আনা ম্যানেজ হতে পারে। পটুয়াপাড়ার ছেলেরা বাবা-কাকার সঙ্গে মাটি ছানছে। দেবীর কোমরের খাঁজ আর বুকের ঢেউয়ে মাটির প্রলেপ দিচ্ছে। ঠাকুর গড়া শিখছে। আমাদের কারও বাবা ব্যবসা করেন, কারও বাবা চাকরি করেন। আমরা পড়াশোনা এবং ভাবছি কী করব। পড়াশোনা ছাড়া জঙ্গল সাফ করার অস্ত্র নেই— কিন্তু ওরা, ওই গলির ছেলের দল— এ জীবন লইয়া কী করবি?

এসো নেশা করি!

ওদের সঙ্গে দুপুরে দেখা হলেই দেখি তাস খেলছে। জুয়া! জুয়া! আলতো গলায় জানতে চাই— জিতছিস?

আমাদের সঙ্গেই খেলত বাবলু, কীভাবে কবে যেন সিনেমার টিকিট ব্ল্যাকার হয়ে গেল। ও কালিকা সিনেমা হলের সামনে দিনরাত থাকত। পাক্কা সিগারেট ধরে নিয়েছিল। নরেশ ব্ল্যাকারের কাছে কাজ পেয়ে বাবলু টিকিট ব্ল্যাকার হয়ে গেল! যখনই দেখতাম, আঙুলে থুতু নিয়ে হাতের টিকিট গুনছে। এই ঠোঁট আর আঙুলের সংঘর্ষে ওর ঠোঁট দেখতাম কালচে মেরে মুখের থেকে ঝুলছে। 

আসলে বড় হতে-হতে আমরা জেনে গিয়েছে আমি বলাইদা ছেলে, ও মামার ছেলে, সে সান্যালবাবুর ছেলে কিন্তু গলির ছেলেরা— ওরা খানকির ছেলে! কানা খোঁড়াকে যেমন কানা খোঁড়া বলতে নেই, সেই ছোটবেলায় বাড়ির বড়রা শিখিয়েছে। ঠিক তেমনই ওদের খানকির ছেলে বলতে নেই।

কালীঘাটের অলিতে-গলিতে খিস্তির চল ছিল। আমাদের সেই সময়ে এত গালাগাল আর কোথায় চাষ হতো কি না জানি না। শালা বানচোদ খচ্চর হারামি শুয়োরের বাচ্চা এটা হরদমই চলত। বন্ধু বান্ধবদের মধ্যেও চলত। ফুটবল মাঠে খিস্তি ছুটত বলের সঙ্গে-সঙ্গে। কেউ কোনওদিন সেটা নিয়ে আপত্তি করেনি। কিন্তু সেই ভুলটা একদিন করে বসল শ্যামল—

সেদিন চিকনের পায়ে বল— কালীঘাট হকার্স কর্নারের সঙ্গে ম্যাচ। শ্যামল বল চাইছে। চিকন ড্রিবল করছে। চিকনের পায়ে দারুণ কাজ। শ্যামল চিৎকার করল— খানকির ছেলে বলটা ছাড়। হঠাৎ চিকন বল ছেড়ে দিল। থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর দৌড়ে এসে নিজের দলের প্লেয়ার, ছোটবেলার বন্ধু শ্যামলের মুখে ঘুঁষি মারল। ঘুঁষি মেরে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

কী হল? কী হল? আমরা কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। চিকনের মা-দিদি দুজনেই গলিতে দাঁড়ায়। পরেরদিন, তারপরের দিন আমরা চিকনকে ডাকতে গিয়েছি। শ্যামলও গিয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি চিকনের রাগ ভাঙেনি। আসলে তখন বুঝিনি, সেটা ছিল চিকনের কষ্ট। আমরা ভেবেছি রাগ। চিরদিনের জন্য চিকন আমাদের থেকে হারিয়ে গিয়েছে। ওর পায়ে ভাঁজ দেখে বলরাম ওর গলায় মালা দিয়েছিল, পি কে ব্যানার্জি ওকে এক জোড়া বুট দিয়েছিল। কিন্তু চিকন আর কোনওদিন ফুটবল মাঠে আসেনি। শ্যামলও মাঠে আসা ছেড়ে দিয়েছিল। শ্যামলও ভাল প্লেয়ার ছিল। কেউ-কেউ ওকে বোঝাত— চিকন বলেছে তোকে মাঠে পেলে টেংরি খুলে নেবে। শ্যামল নাকি সেই ভয়ে মাঠে আসত না। অনেক অনেকদিন পরে, একদিন টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে-দেখতে শ্যামলকে বলেছিলাম— তুই তো চিকনের ভয়েই আর মাঠেই গেলি না।

শ্যামল আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলেছিল— কবি তুইও অন্যদের মতো চিকনের ভয় ভাবলি? একবারও ভাবলি না, আমি ওর মতো একটা প্লেয়ারকে খুন করলাম— এটা আমার শাস্তি। দুটো খেলোয়াড়জীবন মায়ের ভোগে গেল!

শ্যামল বলেছিল— আমি ওকে কিছু ভেবে বলিনি। কিন্তু কেন যে খিস্তিটা দিলাম? এটা মুখের কথা মনের কথা নয়। চিকন বুঝল না। অথচ বল, তোর মনে আছে, ওর দিদির নথভাঙার দিন আমরা খেতে গিয়েছি।

হ্যাঁ মনে আছে। চিকনই আমাদের নেমন্তন্ন করেছিল। আমরা সাত-আটজন গিয়েছিলাম ওদের ঘরে। অনেকের সঙ্গে বসেই ঘুগনি আর বোঁদে খেয়েছিলাম। একজন মহিলা গান করছিল। সেই মহিলাই একটা গান ধরেছিল— সেই গানের কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কিন্তু চিকনের দিদিমা এসে তাকে বকল। —ঢেমনি মাগি এতগুলো বাচ্চা আছে— বসে-বসে নোংরা খেমটা ধরেছিস, ভাল গান কর।

চিকনের দিদিমার কথায় গানওলি হেসে গড়িয়ে পড়ল— এরা কেউ বাচ্চা নয় গো কমলামাসি, সবগুলো কলা গাছ! তোমাকে নিয়ে ঘরে দোর দিতে বলব না কি, বাচ্ছা কি না চেক করে নেবে!

তবু সে অন্য গান ধরল। খেমটা তো নাচ, গানও যেন ঘুরপথে খেমটা হয়! সেদিন আমাদের কানে কোনও নোংরা কথা যায়নি। হয়তো অর্থ বুঝিনি। 

বাড়ি ফিরে আসার আগেই, আমাদের পাড়ায় খবর চলে এসেছিল— আমরা চিকনের দিদির নথভাঙায় খেতে গেছি। তারপর, বসে-বসে গান শুনছি। তারপর, আমরা বাড়ি ঢোকার আগে আগেই এক একটা অভিভাবক হাত আমাদের টেনে নিয়ে গিয়ে উদোম ক্যালানি দিয়েছিল। অথচ, তার আগে আগে আমরা এরকম কত নথভাঙা খেয়েছি। বাড়ির লোক যদি জানতে পারে মারত না, বকাবকি করত। আমরা ছোট— আমরা কিছু বোঝে না বলে ছেড়ে দিত। কিন্তু চিকনের দিদির নথভাঙার ঘটনার সময়ে আমার তখন এইট-নাইনে পড়ি। পেকে আঁটি হয়ে গিয়েছি, ঝুনো নারকেল হয়ে গিয়েছি। তারপরও উৎসব করতে গেছি— তাই এই মার।

শ্যামল বলল— তারপরও চিকন আমার কথা সত্যি কথা মনে করল?

আসলে শ্যামল তো সত্যি কথাই বলেছিল। এটাই সত্যি কথা যেটা শ্যামল বলেছে। সেটা চিকনের মতো কেউ বোঝেনি। এই ছেলের দল ছিল ভেসে থাকা পানার মতো। এদের ছোট থেকেই খেলার সূত্র ধরে আমাদের পাড়ায় আসত। আমাদের বাড়ির সামনে আসত, কিন্তু কোনওদিন আমাদের বাড়ির ভেতর ঢোকেনি। দু’একজন ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু ওরাও জানত, ওরা বাইরের ছেলে। বাইরে মানে বেপাড়ার নয়। ওরা গলির ছেলে। ওরা আমাদের মা-দিদি-বোনদের সঙ্গে কথা বলত, কিন্তু আমরা প্রায় কেউই ওদের মা-দিদি বা বোনের সঙ্গে কথা বলিনি। তাদের অনেকসময় চিনতামও না। ওদের মাগুলোকে উদ্ভট লাগত। ওদের দেখলে মা-মা মনে হত না। ছেলের দল প্রথম থেকেই কেমন গুটিয়ে থাকত, ভয়ে-ভয়ে থাকত। আমাদের এই পাড়ার ভেতর দিয়ে ওদের মা-দিদিরা হেঁটে যেত না। ওরা বড় রাস্তা দিয়েই চলাচল করত। অথচ সময়-সুযোগ পেলেই ওদের বাড়িতে আমরা যেতাম। গেলেই কিছু-না-কিছু খাওয়াত। তবে ওখানকার যে-লোকগুলো থাকত, আসত-যেত, তারা আমাদের দিকে খুব বেয়াড়া চোখে তাকাত। ও হ্যাঁ, আর-একটা ব্যাপার ছোটবেলায় বা একটু বড়বেলায় কোনওদিন সন্ধের আলো জ্বললে ওদিকে যেতাম না। যদিও কখনও-কখনও ধারে-কাছে গিয়ে পড়েছি— ওরা বেশ জোরে ধমক কষাত,— এই এদিকে কী রে? যা ভাগ!

পরে আমাদের মধ্যে চিন্টুই সন্ধের পর ওদিকে যাওয়া শুরু করল।

চিন্টু মাধ্যমিক দেওয়ার পর-পরই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ফিসফিসানি হয়ে খবর এল— গলির একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে চিন্টু।

বন্ধু-বান্ধব প্রেমে করলে আমাদের আনন্দ হত, সত্যি বলছি ঈর্ষাও হত। কিন্তু চিন্টুর কথা শুনে, আমাদের সকলেরই মুখ শুকনো হয়ে গেল। গা হিম হয়ে গেল। চিন্টুর এক জ্যেঠতুত দাদা একদিন আমাদের সবাইকে দফায়-দফায় পুলিশের জেরা করল। চিন্টু অমুক দিন এতটার সময়ে কোথায় ছিল? তুই কোথায় ছিলি? সেই দাদা এমন করছিল যেন আমরা আট-দশজন সবাই পাণ্ডবভাই, আর চিন্টুর সেই অজানা গলির মেয়েটি দ্রৌপদি। আমরা চিন্টুর সঙ্গে-সঙ্গে সবাই তার প্রেমিক, সবাই তাকে ভাগ করে নিয়েছি। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, আমাদের আকাশে কালো মেঘ ঘনাচ্ছে। এবার কোনও-না-কোনও জায়গা থেকে আওয়াজ উঠবে— তোরা চিন্টুর সঙ্গে মিশবি না। কিন্তু চিন্টু যে ক্যাপ্টেন। তারওপর চিন্টুর পকেটে টাকা থাকে। কখনও-কখনও দশ-বিশ টাকার নোটও।

আসলে শ্যামল তো সত্যি কথাই বলেছিল। এটাই সত্যি কথা যেটা শ্যামল বলেছে। সেটা চিকনের মতো কেউ বোঝেনি। এই ছেলের দল ছিল ভেসে থাকা পানার মতো। এদের ছোট থেকেই খেলার সূত্র ধরে আমাদের পাড়ায় আসত। আমাদের বাড়ির সামনে আসত, কিন্তু কোনওদিন আমাদের বাড়ির ভেতর ঢোকেনি। দু’একজন ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু ওরাও জানত, ওরা বাইরের ছেলে। বাইরে মানে বেপাড়ার নয়। ওরা গলির ছেলে।

আমাদের এক বন্ধু ছিল, তার নাম সৌতম। তার বেশ অবস্থাপন্ন। অনেকদিন তার সঙ্গে হেঁটে গেছি, দল বেঁধে। কেন? তাকে তার বাবা টাকা দিয়েছে— সে মিল্ককোজ খাবে। তার জন্মদিন সে স্যাঙ্গুভ্যালিতে খাবে। আমরা হাজরা পর্যন্ত গিয়েছি। সে দুধের ডিপো মতো একটা জায়গা থেকে মিল্ককোজ কিনে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে চোঁ-চোঁ করে খেয়েছে। আমরা দেখেছি। কিংবা আমরা নীচে, সৌতম একা স্যাঙ্গুভ্যালির ওপরে উঠে গেছে জন্মদিনের মোগলাই পরোটা খেতে, আমরা তার জন্যে বসুশ্রী উজ্জ্বলার সিনেমা হলের ভেতরে সিনেমার ফোটো দেখতে-দেখতে ঘুরেছি। সে স্যাঙ্গুভ্যালি থেকে নেমে এসে মৌরি চেবাতে-চেবাতে মোগলাই পরোটার স্বাদের গল্প করেছে। আমরা তার গা থেকে মোগলাই পরোটা গন্ধ পেয়েছি। আমরা অনেকেই ভাগ করে মোগলাই পরোটা খেয়েছি পুজোর সময়ে। দিনগুলো এমনই ছিল। কোনও দুঃখ ছিল না, আনন্দেরই ছিল। কিন্তু আমাদের চিন্টু এমন ছিল না, ও পুরো দশটাকার নোট আমাদের জন্য খরচ করতে পারত, নিজের জন্য নয়।   

একদিন আমরা দল পাকিয়ে চিন্টুকে ধরলাম। চিন্টু আমাদের কথা উড়িয়ে দিল। বলল— ওসব কিচ্ছু নয়, কে রটাচ্ছে আমি জানি, সব ফালতু কথা। মা কালীর দিব্যি।

আমরা বিপদে পড়লে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে মা কালীকে হাজির করতাম। অবশ্যই কালীঘাটের কালী। এক্কেবারে তার নামে দিব্যি!

তাহলে চিন্টুর নামে কে রটাচ্ছে? কে রটাতে পারে? আমরা তখন কিরিটী থেকে শার্লক হোমস? কিন্তু ক্রমশ জানলাম, চিন্টুই মিথ্যে বলছে।

শেষ পর্যন্ত একটা গলির মেয়ে? অথচ চিন্টু যে ছাদে উঠে ওদিকে তিনতলা বাড়ির সুজাতাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ব্যায়াম করে! সুজাতার কী হবে?

একদিন চিন্টুর প্রেমিকার নামও জেনে গেলাম, চিনে নিলাম। তার নাম রুমি।

রুমিই একমাত্র বেলবটম প্যান্ট পরে, একটুখানি পেট বের করা ব্লাউজের মতো গেঞ্জি পরে গলিতে দাঁড়ায়। শার্ট পরলে সামনে গিঁট মারে।

গলির মেয়েরা শাড়িই পরত। ওদের প্রিয় রং ছিল লাল আর কালো। দু-চারজন পা পর্যন্ত স্কার্ট পরত, কেউ প্যান্ট পরত না। একমাত্র রুমি প্যান্ট পরত। একদিন গোপাল সুইটসের সামনে রুমি আমাদের সামনে চিন্টুকে ডাকল। দেখলাম চিন্টুকে ও টাকা দিচ্ছে?

সেদিন রুমি প্যান্টের ওপর আকাশি রঙের টেরিলিনের শার্ট পরেছিল, শার্টটা পেটের কাছে গিঁট মারা। ডান হাতে ঘড়ি।

চিন্টুর সঙ্গে আমরা কালীঘাট হাইস্কুলের দিকে যাচ্ছিলাম। চিন্টুকে চেপে ধরলাম— তোকে ওই মেয়েটা টাকা দিল কেন? চিন্টু নির্বিকার মুখে বলল— ওই মেয়েটার নাম রুমি।

—রুমি টাকা দিল কেন?

—কালীঘাট হাইস্কুলে সিনেমা হবে। সিজন টিকিট কিনে দিতে বলল, ওর কে যাবে।

কালীঘাট হাইস্কুলের মাঠে মাঝে-মাঝেই সিনেমা হত। উনিশ পয়সা টিকিট। আর সিজন টিকিট এক টাকা। তাদের চেয়ার দিত।

রুমি কালো রোগা। হিলহিলে চেহারা।

—তোর সঙ্গে ওর কী?

চিনটু বলল— ওই মেয়েটা একদিন মডেল হবে। মডেলিং করবে। ওর একটা ড্রিম আছে। ক্যালেন্ডারে ওর ছবি দেখবি, সিনেমার পোস্টারে ওর ছবি থাকবে। আমি ওকে হেল্প করছি।

পরে শুনেছিলাম, চিন্টু ওর কাছে টাকা নিয়ে সত্যদাকে দিত। কালীঘাটের সত্যদার রাস্তার ওপর কালীঘাট বাজারের পরেই একটা স্টুডিও ছিল। কালীঘাট মন্দিরে যারা বিয়ে করত— তারা এসে সত্যদার স্টুডিওতে ছবি তুলত। এছাড়া কালীঘাট মন্দির দেখতে আসা তীর্থযাত্রীরাও সত্যদার স্টুডিওতে এসে পেছনে ছবি আঁকা গাড়ি, বিশাল বাগানওয়ালা বাড়ি, তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলত।

চিন্টু নাকি সত্যদাকে দিয়ে রুমি দারুণ-দারুণ সব ছবি তুলিয়ে, সত্যদাকে দিয়ে স্টুডিও পাড়ায় পাঠাত। সত্যদা বলেছিল— একদিন না একদিন কোনও-না-কোনও পরিচালকের চোখে ঠিক লেগে যাবে।

সত্যদাকে মড়া মানুষেরও ছবি তুলত। আমাদের মধ্যে কেউ বলেছিল— রুমিকে একবার মড়া সাজিয়ে খাটে শুইয়ে ছবি তুলিস, ওটা নির্ঘাত লেগে যাবে।

আমরা সত্যদার কাছে কোনওদিন ছবি তুলিনি। পাসপোর্ট সাইজের ছবিও না। আমাদের ছিল রাসবিহারী মোড়ের শিশির স্টুডিও। যার বিজ্ঞাপন ছিল— এক ছবি বিয়ে।

আমারও ইচ্ছে ছিল রুমিকে হেল্প করার। আমাদের অনেকের মতো ওরও ড্রিম ছিল। কিন্তু বলতে পারিনি— চিন্টু ওকে শিশির স্টুডিওতে নিয়ে যা। শিশির স্টুডিও মানে— এক ছবিতে…

আসলে, ওটা তো ভদ্র জায়গা। আমরা দিদির বিয়ের জন্য ওখানে ছবি তুলেছে। ওখানে কি গলির মেয়েরা যায়?