প্রিয় সুবিমল: পর্ব ৯

Representative Image

সুবিমল কলিং সুবিমল

দুজনেই ‘সুবিমল’। একজন বসাক, অন্যজন মিশ্র। তবে নাম এক হওয়ায়, গুলিয়ে ফেলেন অনেকেই। সুবিমল মিশ্রকে বেশ কয়েকবার দেখলেও, তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়নি কখনও। অন্যদিকে সুবিমল বসাকের সঙ্গে কাটিয়েছি দীর্ঘ সময়। অনেকেই সুবিমল মিশ্রের সঙ্গে আমায় জুড়ে দেন। এই ভ্রান্তি যে অতীতেও ঘটেনি, তা নয়। ‘বাঘের বাচ্চা’ পত্রিকার সুবিমল মিশ্র সংখ্যা-য়, ‘সুবিমল বনাম সুবিমল’ শীর্ষক এক স্মৃতিকথায় সুবিমল বসাক লিখেছিলেন—

…সুবিমল মিশ্র দেখা হলেই, জানেন একটা ফোন এসেছিল আপনার ‘আত্মার শান্তি দু’মিনিট’ লেখার জন্য দারুণ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।
হজম করে গেলাম।
আমিও জানালাম, আরে এই একই অভিজ্ঞতা আমারও আছে। পাঠকের প্রশংসা শুনে ভুল ভাঙ্গাইনি।

দুটো বই আমার ইমোশনকে নষ্ট করে দিয়েছে? কে এই চিঠি সুবিমল বসাককে লিখেছিলেন? পড়ুন: প্রিয় সুবিমল পর্ব ৮

সুবিমল বসাক, লেখালিখির জগতে সুবিমল মিশ্রের কয়েক বছরের অগ্রজ। তবে তাঁর আসল নাম বিমল কুমার বসাক— পাঁচের দশকের শেষ দিক থেকে ‘সুবিমল’ নামে লেখালিখি শুরু করেন। উভয়ের আলাপ ১৯৬৫-তে, কফি হাউসে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সত্ত্বেও, সুবিমল মিশ্রের একটিমাত্র চিঠিই খুঁজে পেয়েছি সুবিমল বসাকের সংগ্রহে। ১৯৮২ সালের। বিবিধ প্রেক্ষিতে জরুরি সেই চিঠিটি তুলে ধরা হল—

সুজনেষু

   সুবিমল, সেদিন কফিহাউসে আপনি এমন জমে গেলেন যে আমার ডাকে আর বোধহয় পাত্তা দিতে চাইলেন না। ব্যাপারটি এমনটি নাও হতে পারে অবশ্য। হলেও দুঃখ পাবার কিছু নেই, এমনটিই হয়।
   লেখার ব্যাপারে যা বলে রেখেছিলাম, বেমালুম ভুলে গেছেন মনে হয়। যদি কোনকিছু হয় জানাবেন, বা আমিই জেনে নেব, একটু স্মরণ করিয়ে দিলাম মাত্র। শুধু অনুরোধ সংসার-টংসার নিয়ে পূরোটা মজে যাবেন না।
   এই মুহূর্তে একটা জরুরি দরকারে এই চিঠি দিচ্ছি। হারান মাঝি গল্প গ্রন্থটি আমি আবার ছাপছি। ছাপা শেষ হয়ে গেছে, প্রচ্ছদ নিয়ে ভাবনায় আছি। আমি চাই আগের প্রচ্ছদটি থাক। প্রথমত এটি আমার পছন্দ হয়েছিল, দ্বিতীয়ত অনেক খরচ বেঁচে যায়। পাঁচ ফর্মার একটা বই ছাপতে পুরো জিভ বেরিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আগের ব্লকটি যেটি আপনি আমাকে ধার দিয়েছিলেন সেটি যদি ৩/৪ দিনের জন্য একবার দেন তবে খুব বেঁচে যাই। না হলে যে কি অবস্থা হবে জানি না। তবে সেবার কমল সাহা যে গোলমাল করেছিল এবার তা হবেনা, এটুকু জানিয়ে রাখছি। যদিও জানি এ জানানোটুকুই বাহুল্য।
   কয়েক দিনের মধ্যেই যা করবার করতে হবে। শনিবার (২০/১১/৮২) সন্ধ্যেয় কফিহাউসে থাকবই। প্রয়োজনটা বড়ো বেশী।
   যদি একান্তই সম্ভব না হয় তাও জানাবেন। সব কিছুই তো আজকাল মেনে নিতে পারছি।
   কেমন দিনকাল যাচ্ছে আপনার?

বিনীত
সুবিমল মিশ্র
১৫/১১/৮২

আলোচ্য ব্লক, যেটি ব্যবহৃত হয়েছিল ‘হারাণ মাঝির…’ গল্পগ্রন্থের প্রচ্ছদে

সুবিমল মিশ্রের গল্প সংকলন ‘হারাণ মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া বা সোনার গান্ধীমূর্তি’ প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। বইয়ের প্রচ্ছদে কলকাতার একটি মানচিত্র— বাংলাভাষায়। সেই মানচিত্রের ব্লকটি সুবিমল মিশ্রকে ধার দিয়েছিলেন সুবিমল বসাক। এ-প্রসঙ্গে তিনি লেখেন— ‘…আমার অফিসে এসে বললেন— বই বার করছি। মাইনের টাকা দিয়ে, যা সে সময় সকলের পকেট, ছাপাটাপার কাজ শেষ হয়েছে। সমস্যা প্রচ্ছদের। আমার কাছে কলকাতা শহরের রোডম্যাপের জিঙ্ক ব্লক ছিল— সেটাই ব্যবহৃত হলো ‘হারান মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া বা সোনার গান্ধী মূর্তি’-র প্রচ্ছদ হিসাবে। জুন ১৯৭১। সেদিন বই সেলিব্রেট করার জন্য বারদুয়ারী— আমিই টেনে এনেছিলাম তাঁকে।

কলকাতার মানচিত্রের ব্লকটি এর আগে ব্যবহৃত হয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা ‘জেব্রা’-র প্রথম সংখ্যার (১৩৭২) প্রচ্ছদ হিসেবে। সেই থেকে সুবিমল বসাকের কাছেই ছিল ব্লকটি। পরবর্তীতে, সুবিমল মিশ্রকে তাঁর বইয়ের জন্য ব্যবহার করতে দেন সেটি। জুলাই মাসে, বইটি বসাককে উপহার দেন মিশ্র। ভেতরে লেখা— ‘সুবিমল বসাককে/ সুবিমল মিশ্র/ ১৭.৭.৭১’। এ ছাড়াও, বসাকের সংগ্রহে পেয়েছি মিশ্রের উপহার দেওয়া আরেকটি বইও— ‘নাঙা হাড় জেগে উঠছে’; লেখা— ‘সুবিমলকে/ সুবিমল/ ৭.১.৭৮’।

বসে – সুবিমল বসাক, মুহম্মদ খসরু ও সুবিমল মিশ্র, দাঁড়িয়ে – মৌলীনাথ বিশ্বাস, তাপস ঘোষ ও প্রচেতা ঘোষ, কলকাতা বইমেলা ২০০৯

আলোচ্য চিঠি ১৯৮২ সালের, যখন বইটি আবার ছাপার উদ্যোগ নেন সুবিমল মিশ্র। বসাকের কাছে পুরনো সেই ব্লকটি ধার চাইছিলেন তিনি। কফি হাউসে নিয়ে আসতে বলেছিলেন শনিবার (২০.১১.৮২)। সুবিমল বসাক সেদিন দিতে পারেননি। তবে এ-সংক্রান্ত ঘটনা-বিবরণী তাঁর ডাইরিতে পাওয়া যায়।

২১.১১.৮২
…সুবিমল মিশ্রকে চিঠি দিলুম, গতকাল দেখা হয়নি— আগামী শনিবার কফিহাউসে যেন দেখা হয়।

২৭.১১.৮২
…সাতটা বেজে যাওয়ায় আর কফিহাউস গেলুম না। সুবিমল মিশ্রকে আসতে লিখেছিলুম— কি ভাবলো কে জানে!

৪.১২.৮২
…কফিহাউসে গেলুম। নেশাগ্রস্ত ছিলুম। সুবিমল মিশ্রে’র সঙ্গে দেখা হলো। ব্লকটা প্রয়োজন। এসব ছেলে, প্রয়োজনে কেবল যেন মিশতে চায়। বুক ফেয়ার-এ আমাকে একেবারে avoid করে গেছিল। আমায় অবশ্য লেখার জন্য বলছিল বার বার। যাহোক— লেখা চালিয়ে যান।…

১৮.১২.৮২
…সন্ধ্যের বেলায় কফিহাউস গেলুম। সুবিমল মিশ্রের জন্য ‘ব্লক’টা বার করেছি— দিতে হবে। পৌঁছুতে ২ সাতটা বেজে গেল। ছিলুম সাড়ে আটটা অবধি— অথচো ওর দেখা পেলুম না।

২২.১২.৮২
…দুপুরে, সুবিমল মিশ্র হঠাৎ অফিসে এসে হাজির। ব্লকের জন্য। আমি অবশ্য অজয়ের প্রতীক্ষা করছিলুম। সুবিমল নিজেই এসে হাজির। ও আমাকে সর্বদা উৎসাহ দেয়— লেখার জন্য। কিন্তু লেখা তো আমার হয়ে উঠছে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে চিহ্নিত হয়ে গেলাম আমরা। একটা প্রবন্ধ সংগ্রহ বার করার জন্য বার বার বললো। দেখা যাক।

সুবিমল মিশ্র ব্লকটি কবে ফেরত দিয়েছিলেন, ডাইরিতে তা লেখা নেই। তবে সেটি বসাকের কাছে ফিরে এসেছিল যথাসময়েই। সুবিমল বসাকের সংগ্রহে, আরও অনেক উল্লেখযোগ্য ব্লকের সঙ্গে আলোচ্য ব্লকটিও পেয়েছি। ১৯৮৩-র জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘হারাণ মাঝির…’ গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের প্রচ্ছদেও শেষাবধি ব্যবহৃত হয় ওই ব্লকই।

একই নাম হওয়ার জন্য যে-গন্ডগোলের উল্লেখ করেছিলাম প্রথমে, তা একবার ঘটিয়েছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ও। ওঁর সঙ্গে সুবিমল বসাকের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা ছিল; শ্যামল যখন ‘অমৃত’ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত, তখন থেকেই। ‘অমৃত’-তে মৌলিক গল্প ও অনুবাদ গল্পও লিখেছেন সুবিমল। সুবিমলের সংগ্রহে খুঁজে পেয়েছি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ-কয়েকটি চিঠি। তিনটি তুলে ধরা যাক এই পর্বে। তার প্রথমটি, ‘অমৃত’ পত্রিকার লেটারহেডে—

সবিনয় নিবেদন,

   প্রতিবেশী হিন্দী সাহিত্যের নির্বাচিত গল্পের বাংলা অনুবাদ চাই অমৃতের জন্য। আপনি একদিন আসুন। সাক্ষাতে সবিস্তারে কথা বলা যাবে। নমস্কার নেবেন।

বিনীত
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
৭/১/৭৭

শ্রী সুবিমল মিশ্র
১৮, বিবেকানন্দ নগর
কলকাতা ৫৬

পুনশ্চ: লেখকের দক্ষিণা এবং অনুবাদের দক্ষিণা বিষয়েও আলোচনা করতে চাই।

ঠিকানা সুবিমল বসাকের, কিন্তু নামের জায়গায় ভুলবশত ‘সুবিমল মিশ্র’ লিখেছিলেন শ্যামল। খামের ওপরেও একই ভুল। যাই হোক, এই চিঠির পরবর্তী কার্যক্রম জানা যায় সুবিমলের ডাইরিতে, ১২.১.৭৭ তারিখে— ‘শ্যামল গঙ্গোকে টেলিফোনে যোগাযোগ করলুম, কজন লেখকের লেখা চাই? প্রায় ত্রিশজনের করেছি! না! তাহলে বারোজনের লেখা। সেই ভাবে চিঠি দেবো, নইলে আমাকে আবার ফলস্‌ পজিশানে পড়তে হবে। রাত্রে, বিশ্ববাণীতে শ্যামলের সঙ্গে দেখা, বললেন— তাড়াতাড়ি শুরু করে ফেল। হ্যাঁ, পাঠিয়ে দিচ্ছি চিঠি।

দ্বিতীয় চিঠিটি ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসের; নেহাতই কেজো। তবে অমৃতা প্রীতমের কারণে গুরুত্বপূর্ণ—

50/1, Protapaditya Rd
Calcutta – 26

প্রিয় সুবিমল,
   শ্রীমতী অমৃতা প্রীতম-এর সঙ্গে S.T.D.তে Phone-এ কথা বলে Verbal permission নিয়েছি। উনি চিঠিতে লিখিত অনুমতি পাঠাবেন।
   তুমি লেখাটি অবিলম্বে দাও। আর দেরি কোরো না। তোমায় অফিসে Phone করে পাইনি। ছবি আঁকাতে হবে। ভালবাসা নিও।

শ্যামলদা

পাঞ্জাবি ভাষায় লেখা অমৃতা প্রীতমের আত্মজীবনী ‘রসীদী টিকেট’ অনুবাদ করেছিলেন সুবিমল বসাক। পোস্ট অফিসের দেরির কারণে, লেখা জমা দেওয়ার পরদিন এসে পৌঁছোয় শ্যামলের এই চিঠিটি। এ-সম্পর্কে সুবিমলের ডাইরিতে নজর রাখলে, ঘটনাক্রম বুঝতে সুবিধে হবে—

১০.০৮.৮২
যুগান্তরে বিকেলে গিয়ে শ্যামলদাকে ‘রসীদী টিকেট’-এর অনুবাদ দিয়ে এলুম। যদিও দু-একটা শব্দ অনুদিত হয়নি— উর্দ্দূ শব্দ। শ্যামলদাকে বললুম— পরশু দেবো। তা শুনলেন না, হাতে পাণ্ডুলিপি এলে কখনও কি হাতছাড়া করতে আছে। আগামী মাসেই— পুজোর আগে সম্ভবত: বেরিয়ে পড়বে। রসীদী টিকেট-টা তিন সঙ্গী থেকে ছেপে বার করতে চান। ফলে, যে Chapter গুলি করিনি, সেগুলো করতে বললেন। জানালেন, অমৃতা প্রীতমকে telephone করেছিলেন— উনি চিঠি পাঠাচ্ছেন।…

১১.০৮.৮২
অফিস থেকে ফিরে শ্যামলদার পোস্টকার্ড পেলুম। অমৃতা প্রীতমের লেখাটার ব্যাপারে লিখেছেন। গতকাল, এরই সম্পর্কে বলেছিলেন— চিঠি পেয়েছো কি না? আমি বুঝতে পারিনি। আসলে telephone করে-করে না-পেয়ে চিঠি লেখা।

ডাইরিতে ইঙ্গিত থাকলেও, সুবিমল বসাক অনূদিত ‘রসীদী টিকেট’ পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়নি।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শেষ চিঠিটি ১৯৯৯ সালের, খানিক অভিমানভরা—

২৭/১০/৯৯

৭৯, দেশপ্রাণ শাসমল রোড্‌
ফ্ল্যাট – ১৪, কলকাতা – ৩৩
৪৭২-০৬২৬

প্রিয় সুবিমল,

   বিজয়ার চিঠি করণীয় কাজ নয়, প্রীতির চিহ্ন। মাত্র একটি লাইন লেখো কেন? হৃদয়ে কী কোন কথা নেই। গত ডিসেম্বরে সিউড়িতে আমার কথা তোমার মনোমত হয়নি— জানি। কিন্তু আমি আমার বিশ্বাস মত কথা বলেছি। তুমিও তোমার মনের কথা জানাবে— তা যদি আমার কাছে অপ্রিয় হয়— তবু।
   তোমার কিছু লেখা আমার ভাল লেগেছে। কিন্তু সেই লেখা স্বয়ংসম্পূর্ণ দর্শন হয়ে দাঁড়ায়নি। তাতে যায় আসে না। আমারও এমন অনেক ‘হয়নি’ আছে। তবু ‘শ্যামলদা’ নামক মানুষটি কী তোমাকে টানে না? বুকে হাত দিয়ে বল। ভালবাসা নিও।

শ্যামলদা

১৯৯৮-৯৯ সালের ডাইরি আমার কাছে নেই। ফলে, আন্দাজ করা গেলেও, প্রেক্ষিতটি আরও স্পষ্টভাবে ধরা গেল না।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে এখানেই ইতি টানা যেত। তবে, সুবিমলের ডাইরিতে ওঁর উল্লেখ অজস্রবার। সেখান থেকে একটি অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না; যেখানে চরিত্র হিসেবে হাজির সমরেশ বসুও—

৩০.১০.৮২

…কি করি, কোথায় যাই— গেলে সাক্ষাৎ পাবো কিনা— সাতপাঁচ ভেবে যুগান্তরে রওনা দিই। শ্যামলদার দেখা পাই, আমাকে একটা ‘অমৃত’ সংখ্যা বার করে দেন প্রফুল্ল রায়। দুটো আর দিলেন না। শ্যামলদা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। আমার ইচ্ছে ছিল মানিকতলায় যাবার। শ্যামলদা কিড স্ট্রীটে মহানগর দপ্তরে যাবেন। বার বার বলতে লাগলেন। মনে হলো কিছু কথা বলতে চান। আমরা মিনিবাসে ডালহৌসী এলুম— সেখান থেকে অন্য মিনিবাসে পার্কস্ট্রীটের মোড়। কিড স্ট্রীট পাশে। নানান ধরনের কথাবার্তা হলো। অমৃত ধারাবাহিক বার হচ্ছে— ‘সেবাসদন’টা করে দিতে বললেন। এটা পাঠক নেবে। মাস আস্টেক ধারাবাহিকভাবে চলবে মনে হয়। পাতা ৪০ করা আছে। ওটা দেবো।
আমার একটা লেখার টাকা উনি রেখেছেন, মঙ্গলবার নিয়ে আসতে বললেন।
মহানগর দপ্তরে সমরেশ বসু ছিলেন। কথাবার্তা হলো। শ্যামলদা আমার সম্পর্কে বললেন— এঁকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছি। ভারতীয় ভাষা পরিষদের উল্লেখ করতে চিনতে পারলেন। তারপর 1958 পাটনার ঘটনা বললুম। উনি বিভূতি মুখোর ভাইয়ের বাড়ীতে উঠেছিলেন। আমরা বিজয়ার প্রণাম সারলুম।

তৃতীয় যে-ব্যক্তির চিঠি তুলে ধরে এই পর্বের ইতি টানব, তিনি সন্দীপ দত্ত— ‘লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র’-এর প্রাণপুরুষ। সুবিমলের সংগ্রহে তাঁর তিনটি চিঠি ছিল— ১৯৮৫ সালের। প্রত্যেকটিই লাইব্রেরির লেটারহেডে লেখা। 

১০.৪.৮৫

মাননীয়,

   আমি ১৯৭৯ সাল থেকে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে একটি লাইব্রেরীর কাজ চালিয়ে আসছি। সংগ্রহে ৭০০০ এর মতো পত্রপত্রিকা আছে। এখানে সাহিত্যপাঠক ছাত্রছাত্রী অধ্যাপক গবেষক অনেকেই নানাসময় নানা বিষয়ে কাজ করে থাকেন। হাংরি জেনারেশনের ক্ষুধার্ত্ত স্বকাল আর্ত্তনাদ রোবট, কুরুক্ষেত্র ধৃতরাষ্ট্র এইসব পত্রিকা আছে। প্রথম দিকের বুলেটিনগুলি শ্রী মলয় রায়চৌধুরী আমাকে দেবেন বলেছেন। উনি আপনার কথাও বলেছেন। আপনি যদি এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন বাধিত হব। লাইব্রেরীতে আমন্ত্রণ রইল। খোলা থাকে শনিবার ২-৫টা মঙ্গলবার ৪-৬টা সোম বুধ শুক্র ৭-৯টা সন্ধ্যা। রবিবার ৯.৩০-১২.৩০টা।

ভবদীয়
সন্দীপ দত্ত

১৩ এপ্রিল, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টস হল-এ ছিল কবিসম্মেলন। সেখানেই সন্দীপ দত্তের সঙ্গে প্রথম মোলাকাত সুবিমলের। ডাইরিতে (১৩.০৪.৮৫) লেখা— ‘হলেই সন্দীপ দত্ত’র সঙ্গে আলাপ। ওর লিটল ম্যাগাজিন সেন্ট্রালে যেতে বললো এবং কিছু ম্যাগাজীন চাইলো তার সংগ্রহের জন্য।

সন্দীপ দত্তের পরের দুটি চিঠি, প্রাসঙ্গিক কারণেই, পর পর তুলে ধরা যাক। প্রথমটি—

৩/১/৮৫

মাননীয়েষু

   আমার মনের পরিস্থিতি খুবই খারাপ— কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। ‘কৃত্তিবাস’ ১ম সংখ্যা ও খেয়ালী পত্রিকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাচ্ছি না।
   আপনি কী ভুলবশতঃ আপনার ব্যাগে পত্রিকাটি নিয়েছেন? জানালে হ্যাঁ বা না খুব ভালো হয়। নিরুপায়ে এরকম অভদ্রতা করলাম বলে ছোট ভাইয়ের অপরাধ মার্জনা করবেন। অনেক কষ্টের এসব সংগ্রহ। ভুলবশত ঘটনা হলেও হতে পারে তাই এই চিঠি লেখা।

নিরুপায়ে ক্ষমাপ্রার্থী
সন্দীপ দত্ত

দ্বিতীয় চিঠিটি—

সুবিমল বাবু

   আপনার কাছে আমি একটি ‘অপরাধী’ চিঠি দিয়েছি। জানিনা পেয়েছেন কিনা। এর জন্য আমি লজ্জিত দুঃখিত। ঐ চিঠিটা যদি পান কুঁচিয়ে ফেলে দেবেন। পত্রিকাগুলি অন্যত্র ছিল, পরে পেয়েছি। আমার বিবেককে ক্ষমা করবেন কি! লাইব্রেরীতে আসবেন। মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে আসবেন।

সন্দীপ দত্ত
১৪/৬/৮৫

সুবিমলের ডাইরিতে, চিঠিদুটির সম্পর্কে কোনও উল্লেখ বা প্রতিক্রিয়া নেই। হিরণ্ময় নীরবতা। সুবিমল কি অপমানিত বোধ করেছিলেন? সে-সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না…

(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য