বাইরে থেকে আকাশের দিকে বরফি ছুড়ে দিচ্ছে জুতো, যদি জানলা দিয়ে দেখতে পায় ঝিলমিল। একচোখে জল, আর-এক চোখে পলক না ফেলা রুদ্ধশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করছে শ্রুতি। ঝিলমিল ফিরে এলে বরফিকে হারিয়ে ফেলবে সে। ঝিলমিল জানান দেওয়ার পরে বরফি ঘাড় নেড়ে শ্রুতিকে জানায় যেতে তাকে হবেই। তারপর দৌড়! অজস্র প্রেমের দৃশ্যর ভিড়ে মাথার মধ্যে থেকে গেছে অসামান্য এই দৃশ্যকাব্য। ভারতীয় সাহিত্য, চলচ্চিত্রর ধারায় প্রেমের বিন্যাস, আর্থ-সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই পথ চলেছে। বিপ্লব, বেকারত্ব, সাম্প্রদায়িকতার বার্তা— সবকিছুই বর্ণিত হয়েছে প্রেমের মোড়কে। দর্শক যতই ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিনেমা দেখে আসুক না কেন, সিনেমায় তাদের সবসময় কাজ করে এক অনিবার্য আবেগ— প্রেম। চলচ্চিত্রে যে আবেগ ফুটে ওঠে, তা কেবল কাল্পনিক নয়, বরং যুগের সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নৈতিকতার আলোচনার প্রতিফলন। বলিউডের প্রেমকাহিনিগুলো তাই আসলে আমাদের নিজেদেরই এক আয়না, যেখানে বৃহৎ ভারতের বিভিন্ন প্রথা, বিদ্রোহ, লিঙ্গবিন্যাস, আকাঙ্ক্ষা এবং ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্তি— সবকিছুই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পরের যুগে ভারত নতুন পরিচয় খুঁজছিল। সেই সময় বলিউডের প্রেমকাহিনি ছিল কাব্যিক, আধ্যাত্মিক এবং প্রায়শই ত্যাগের প্রতীক। ‘মুঘল-এ-আজম’ (১৯৬০)-এ সেলিম-আনারকলির প্রেম কেবল ব্যক্তিগত কাহিনি ছিল না, বরং ক্ষমতা, রাজনীতি ও সমাজের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রতিবাদ। আনারকলির সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ স্বাধীনতার পর সমাজে প্রেমকে এক নতুন আত্মবিশ্বাসী সুরে ঘোষণা করেছিল। গুরু দত্তর ‘পেয়াসা’ (১৯৫৭)-য় আবার প্রেম ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে এক সামাজিক হতাশার প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে নায়ক কেবল একজন প্রেমিক নয়, বরং যুগের হতাশ কবি। এই সময়ের নারীরা সাধারণত ত্যাগ ও পবিত্রতার প্রতীক, আর পুরুষরা বিষণ্ণ কবি বা বিদ্রোহী স্বপ্নদ্রষ্টা। স্বাধীন ভারতের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন আদর্শবাদই এই কাহিনিগুলোকে প্রভাবিত করেছিল।
আরও পড়ুন : পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও কীভাবে অমলিন ‘শোলে’? লিখছেন সপ্তর্ষি রায় বর্ধন…
সাত ও আটের দশকে এসে সমাজ পাল্টে গেল, আর প্রেমও বদলাল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, জরুরি অবস্থার মতো ঘটনাগুলি শহুরে জীবনে যে হতাশা তৈরি করেছিল, তার প্রতিফলন দেখা যায় চলচ্চিত্রে। পর্দায় উঠে আসে ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’। অমিতাভ বচ্চনের ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫)-এ প্রেম প্রায় গৌণ, শ্রেণিসংঘাত আর নৈতিক দ্বন্দ্বই মূল। তবু ‘কভি কভি’ (১৯৭৬) বা ‘সিলসিলা’ (১৯৮১)-র মতো চলচ্চিত্র প্রমাণ করে যে প্রেম এখনও জায়গা করে নেয়, তবে তা আর নিখুঁত বা অনবদ্য নয়, বরং আপসের, দ্বিধার এবং কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত। ‘সিলসিলা’-য় বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমের কাহিনি ভারতীয় দর্শকের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। এখানে প্রেম আর কেবল পবিত্র মিলন নয়, বরং বহুমাত্রিক এক আবেগ, যেখানে আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক নৈতিকতা মুখোমুখি হয়।


নয়ের দশকে উদারনীতি আর বিশ্বায়ন বলিউডের প্রেমকাহিনীকে অন্য দিকে নিয়ে গেল। চলচ্চিত্রের রোম্যান্স তখন বিদেশের প্রান্তরে পৌঁছে যায়। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ (১৯৯৫) একদিকে পশ্চিমা স্বাধীনতার প্রতীক, অন্যদিকে ভারতীয় পরিবারের কাঠামোর প্রতি আনুগত্য। শাহরুখ খান ও কাজলের প্রেম আজও কালজয়ী, কিন্তু এর ভেতরে ছিল পিতৃতান্ত্রিক অনুমোদনের চাপ। সিমরনের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা, অথচ তার প্রেম পূর্ণতা পেল কেবল বাবার সম্মতিতে। একই সময়ে ‘হম আপকে হ্যায় কৌন’ (১৯৯৪) প্রেমকে পুরোপুরি পরিবার ও প্রথার ভেতরে আবদ্ধ করে রাখল। পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব আর ঐক্যের মধ্যে প্রেম সেখানে উৎসবমুখর হলেও ব্যক্তিগত স্বপ্নকে প্রায়শই চাপা দিয়ে দিল। ফলে স্পষ্ট হল, ভারত বৈশ্বিক পরিসরে এগলেও সমাজে রক্ষণশীলতার প্রভাব তখনও প্রবল।

নতুন সহস্রাব্দে এসে শহুরে ভারতের চেহারা পাল্টে গেল। প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি এবং বিশ্বায়িত অর্থনীতি নিয়ে এল নতুন প্রজন্মের গল্প, যেখানে প্রেম আর কেবল মিলনের গল্প নয়, বরং ভাঙন, প্রশ্ন, আত্মঅন্বেষণ ও ব্যক্তিগত সুখের সন্ধানের কাহিনি। ‘দিল চাহতা হ্যায়’ (২০০১)-এ প্রেম ও বন্ধুত্ব মিলেমিশে যায় যুবসমাজের আত্মপরিচয়ের খোঁজে। ‘কভি আলবিদা না কেহনা’ (২০০৬)-তে পরকীয়া প্রেমের প্রশ্নে দাম্পত্যের অখণ্ডতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। সংলাপ ‘তুমনে মুঝসে শাদি কি হি নেহি, সমঝোতা কিয়া হ্যায়’, সেই সময়ের সম্পর্কের জটিলতা স্পষ্ট করে। নারীরা এই সময়ে আরও দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করে, কেবল প্রেমের আধার নয় বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে ওঠে। ‘জব উই মেট’ (২০০৭)-এর গীত চরিত্রের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা যেন নতুন প্রজন্মের নারীদের কন্ঠ। এছাড়াও ইমতিয়াজ আলিরই ‘লাভ আজ কাল’ ছবিটিতে প্রেমের সেকাল আর একাল যেন সমান্তরালে চলে বুঝিয়ে দিয়েছে সুপার-স্ট্রাকচারে বদল হলেও বেস স্ট্রাকচারে প্রেমের জন্য বুকের ভিতর একই রকম তোলপাড় হয়। চলচ্চিত্রই তুলে ধরেছে যে, অর্থনৈতিক উন্নতি ও নতুন নগর-সংস্কৃতি প্রেমের ধরনকেও গভীরভাবে পাল্টে দিয়েছে।

২০১০-এর পর থেকে বলিউড আরও সাহসী হয়ে উঠল। প্রেম আর শুধু ছেলে-মেয়ের মিলন নয়, বরং আত্মপরিচয়ের খোঁজ, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সামাজিক ট্যাবু ভাঙার গল্প হয়ে দাঁড়াল। ‘কুইন’ (২০১৪)-এ কঙ্গনা রানাউতের চরিত্র বিয়ের ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে খুঁজে পায়, আর ‘পিকু’ (২০১৫)-তে দেখা যায় এক নারীর জীবনে প্রেম পার্শ্বচরিত্র হলেও তার স্বাধীনতা, দায়িত্ববোধ ও স্বপ্নই মুখ্য। ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’ (২০১৬)-তে নারী আকাঙ্ক্ষা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে এসে নতুন শক্তি পায়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বোধহয় এনেছে কুয়্যার, এলজিবিটি ও সমপ্রেমের সপক্ষে আন্দোলন। ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা’ (২০১৯) সমলিঙ্গ প্রেমকে মূলধারার পারিবারিক গল্পের কেন্দ্রে এনে দেয়, যা ছিল এক বিরল এবং সাহসী পদক্ষেপ। ‘তুমহারা পেয়ার গলত নেহি হ্যায়’, এই সংলাপ যখন দেওয়া হয়, তখন কেবল চরিত্রের মুক্তিই নয়, দর্শকের মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেয়। ‘শুভ মঙ্গল জ্যাদা সাবধান’ (২০২০) আবার সমকামী প্রেমকে হালকা রসিকতা ও হাস্যরসের মাধ্যমে স্বাভাবিক করে তোলে, যা ৩৭৭ ধারা বিলোপের পর ভারতীয় সমাজের পরিবর্তনের প্রতিফলন।
এখানে একটা কথা না বললেই নয়, বিশ্বায়ন পূর্ববর্তী প্রেমের ক্ষেত্রে বিরহকে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করে দেখানোর একটা প্রয়াস ছিল। তার কারণ প্রেমের মানে কোথাও গিয়ে ছিল আত্মত্যাগ। পরবর্তী সময়েও ‘কাল হো না হো’-র শাহরুখ যে একবুক ভালবাসার ভার চেপে রেখে দেয় মারণ রোগের কাছে, নিজের ভালবাসাকে যত্ন করে সাজিয়ে তুলে দেয় অন্য বন্ধুর হাতে, সেখানে একলা হয়ে চোখের জলে ভিজে কান্না ভাগ করে নেয় দর্শকদের সঙ্গে। এই কষ্ট পাওয়ার বিপ্রতীপে পরবর্তীতে ‘আত্ম মুক্তি’ বা ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়া’ বলতে যে কথাগুলো বলা হয়, তার কিছু অংশে ‘ফ্যালাসি’ আছেই। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই, সিনেমার থেকেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে, এই ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়া’ ক্রমে আত্মকেন্দ্রিক-চিন্তাচর্চায় পৌঁছে গেছে।

মূলধারার বাইরে সমান্তরাল সিনেমাও প্রেমকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছে। শ্যাম বেনেগলের ‘অঙ্কুর’ (১৯৭৪), ‘নিশান্ত’ (১৯৭৫) বা ‘মন্থন’ (১৯৭৬)-এ প্রেম কখনও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ (১৯৯৬) সমলিঙ্গ প্রেমকে সরাসরি উপস্থাপন করে ভারতীয় সিনেমায় নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিল, যদিও তখন প্রবল বিতর্ক ও প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছিল। এইসব সিনেমা প্রমাণ করে, প্রেম আসলে কেবল আবেগ নয়, বরং সমাজের অন্দরে জমে থাকা নিপীড়ন, শ্রেণি-বিভাজন এবং পিতৃতন্ত্রের প্রতিরোধের শক্তি। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রেম বদলে গেছে। সাতের দশকে নারীরা কেবল প্রেমের অবলম্বন হলেও, নতুন সহস্রাব্দে তারা হয়ে ওঠে প্রেমের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী। প্রেমকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির বাইরে এনে নারীর আত্মপরিচয় ও স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আসবে ‘হাজারো খৌয়াশিও এইসি’ (২০০৩) ছবিটির কথাও। সুধীর মিশ্র পরিচালিত ছবিটি যেখানে ত্রিকোণ প্রেমের কথা বলে রাজনৈতিক আধারে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলির কনটেন্ট প্রেমকে আরও নতুন আঙ্গিকে সামনে এনেছে। এখানে প্রেম কেবল বড়পর্দার চমক নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি, জটিলতা ও বাস্তবতাকে তুলে ধরে। ‘মেড ইন হেভেন’ (২০১৯) বা ‘ফোর মোর শটস প্লিজ!’ (২০১৯)-এ প্রেম, বিবাহ, যৌনতা ও সমকামিতা সবই উঠে এসেছে অকপটে। সেন্সরশিপের বাধা কম থাকায় গল্পকাররা প্রেমকে আরও সাহসী, খোলামেলা ও বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন।
ফলে দেখা যায়, বলিউডের প্রেম এক চলমান স্রোত। পাঁচের দশকের কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক প্রেম থেকে নয়ের দশকের পরিবারকেন্দ্রিক রোম্যান্স, নতুন সহস্রাব্দের ভাঙাগড়া আধুনিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে আজকের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক প্রেম— সবই আসলে ভারতীয় সমাজের পরিবর্তনের প্রতিফলন। একসময় LGBTQ প্রেম অদৃশ্য ছিল, আজ তা মূল কাহিনির কেন্দ্রে জায়গা পাচ্ছে। ভারত এখনও প্রথা ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে লড়ছে, আর বলিউডের প্রেমও তাই রয়ে গেছে এক অনবরত সংলাপ— কখনও রক্ষণশীল, কখনও প্রগতিশীল, কখনও সাহসী, কখনও আপসকামী, কিন্তু সবসময়ই সমাজের স্পন্দনের প্রতিচ্ছবি। আমাদের কাছে প্রেম মানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নানারকম হলেও যারা নব্বইয়ের পর পর প্রেম বলে কিছু বুঝতে শুরু করেছি, তাদের কানে ভাসে ‘পহেলা নাশা’ আর চোখ বুজলে দেখতে পাই নায়ক দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সর্ষে ক্ষেতে। তার ছড়িয়ে থাকা দুই হাতের মাঝে যেন ভালবাসায় ধরে ফেলা যায় একটা আস্ত পৃথিবী।