বিভাজন-পূর্ব কালের অখণ্ড পঞ্জাব এবং সিন্ধ প্রদেশের অন্তর দিয়ে বহু নদী বয়ে গেছে দক্ষিণে সাগরের দিকে। সিন্ধু ছাড়াও রয়েছে ঝিলম, চেনাব, রাভি, বিয়াস, শতদ্রু। এইসব নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকায় একাদশ শতকের পরবর্তী সময় থেকে দীর্ঘ ছ’শো বছরে যে-সব সুফি ভাবধারার কবি ও সাধক কাজ করেছেন, তাঁদেরই মধ্যে থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের রচনার সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলাই আসলে লক্ষ্য।
ভক্তিবাদের এক তরঙ্গ অষ্টম থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ভারতের অন্য নানা প্রান্তে যেমন প্রান্তজনের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল পাখনা, কতক তেমনই, ভারতের এই অঞ্চলে সব ধর্মের মানুষের কাছে গিয়েছিল সুফিসন্তদের সুর। আজকের ভারতের ঘৃণালাঞ্ছিত রাজনীতির বয়ানে এসব অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবু মনে রাখা যাক, তৌহিদে আস্থাশীল সাধকের হাতে রাধা-কৃষ্ণ, সোহ্নি-মেহের, হির-রান্ঝা বড় সমাদরে এসেছিলেন। ইতিহাস খুঁড়ে সর্বদা মসজিদ বা মন্দির নয়, ‘রাশি রাশি দুঃখের খনি ভেদ করে’ প্রায়শই শোনা যায় ‘শত জল ঝর্ণার ধ্বনি।’ তার কিছু রেশ এখনও ঘুরে বেড়ায় হিন্দি-অবধি গানের সুরে। বাংলা ভাষাতেও তার কিছু ভাগ যদি পাওয়া যায়— এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসেছে এই কলাম— ‘সিন্ধুপারের সুফি’।
সুলতান বাহু-কে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ৪।
শাহ মাধো হুসেইন-কে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ৩।
বাবা ফরিদকে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ১ ও ২।
শাহ আব্দুল লতিফ
আমাদের আজকের পর্বে যাঁর সঙ্গে পরিচয় হবে সে কবির নাম লতিফ। গোড়ায় কবুল করি, এই লেখার অধিকাংশ আগেই মুদ্রিত, কিয়দংশ জুড়েছি এখন।
সিন্ধের মাতিয়ারি জেলার হালা নামক স্থানে শাহ্ আব্দুল লতিফের জন্ম। তাঁর নামে জুড়ে আছে ভিট্টাই— ভিট শহরের লোক। কেননা তাঁর জীবনের বেশিরভাগ কেটেছে ভিট শরিফ শহরে, এখন তাঁর মাজারটিও সেখানেই। কাছেই বয়ে গেছে সিন্ধু নদী। মাত্র বাষট্টি বছর, ১৬৯০ থেকে ১৭৫২ সাল পর্যন্ত তাঁর আয়ু। অর্থাৎ, ভারতে মুঘল শাসনের একেবারে শেষ পর্ব, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এসে গেছে তাঁর জীবৎকালেই, যদিও ‘ফিরিঙ্গি’ বণিকের শাসক হয়ে উঠতে আরও কয়েক বছর বাকি থাকতেই চলে যাবেন লতিফ। তাঁর পিতামহ শাহ্ আব্দুল করিমও ছিলেন বেশ পরিচিত সুফি সাধক।
আব্দুল লতিফের সমস্ত কাজ একত্রিত করে পরে প্রকাশ করেছিলেন ভক্তরা, নাম দিয়েছিলেন শাহ্ জো রিসালো।আরবি ‘রিসালাহ্’ থেকে এসেছে রিসালো, সিন্ধি এবং উর্দুতেও ব্যবহার আছে। এর অর্থ হল বারতা, বাণী, সন্দর্ভ। অর্থাৎ, লতিফের বই-এর নাম আসলে শাহ্-এর বারতা। কথিত আছে, প্রথমে এই রচনাসমূহ সংকলন করা পছন্দ হয়নি তাঁর। পরে ভক্ত এবং অনুরাগীদের চাপে মেনে নিতে হয়। সিন্ধি ভাষার কোনও স্বতন্ত্র লিপি না থাকায়, কাজ চলত আরবি কিংবা নাগরী— দুই লিপিতেই। পরে অবশ্য আরবি-ফার্সি লিপিতেই স্থিত হয় সেই ভাষা। লতিফের রিসালো প্রাথমিকভাবে এই লিপিতেই সংকলিত হয়েছে।
সমগ্র রচনার মোট ত্রিশটি অধ্যায়— যাকে পৃথক সব ‘সুর’-এর নাম-সহ গেঁথে তুলেছেন কবি। প্রায় সবগুলিতেই আছে আখ্যানের আভাস— কখনও কখনও গোটা আখ্যানই। এসব কিন্তু আগাগোড়াই কবির উদ্ভাবিত নয়, বেশিরভাগই পূর্ব-প্রচলিত। অধ্যায়গুলির শিরোনাম থেকেই বোঝা যাবে, গানের সঙ্গে জুড়েই আছে গল্প— আমাদের পরিচিত-অর্ধপরিচিত রাগের নাম এক-একটি গল্পের শরীর ছুঁয়ে থাকে। লতিফের গানের আশ্রয় পেয়ে সেইসব গল্পের চরিত্ররা অনেকেই বিখ্যাত হয়েছে পরে, অন্য কবিদের, সংগীতকারদের হাতে ঘুরে বেড়িয়েছে বহু দূরে দূরে।

২
লতিফের বাল্যকাল নিয়ে যেসব গল্পকথা রয়েছে— লোকশ্রুতিই সেসব কথার উৎস সন্দেহ নেই। তারই মধ্যে একটিতে পাওয়া যায়, ছোটবেলায় তিনি ইশকুলে আরবি শিখতে চাননি। আরবি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর আলিফ (আমাদের অ/আ ধ্বনির সমতুল) শেখার পর তিনি গোঁ ধরে বসেন, আর কিছুতেই তিনি শিখবেন না অন্য অক্ষরমালা। বাধ্য হয়ে তাঁকে ইশকুল থেকে ছাড়িয়ে বাড়িতে অন্যভাবে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেন তাঁর বাবা। ঘটনাটি এইভাবে ব্যখ্যা করতে চান অনেক ভক্ত— সেই বাল্যকালেই লতিফ আসলে অনুভব করেছিলেন আলিফের পরে আর কিছু নেই, আলিফেই সব নিহিত হয়ে আছে— সব জ্ঞান, সকল রহস্যের চাবি ওই আদ্য অক্ষরে সমাহিত। মহাপুরুষের বাল্যকালের নানা স্বাভাবিক ছেলেমানুষির মধ্যে ভবিষ্যতের গূঢ় ইঙ্গিত খুঁজে বের করে অনেকের আহ্লাদ হয়। আমাদের দেশের চৈতন্যদেবের
‘জীবনী’-লেখকরাও একই ধরনের কাজ করেছেন। অনেক পরে যখন লতিফের লেখাতেই পাব—
আলিফ্-ই প্রথম আর
আলিফেই শেষ হয় সব—
তবে আর অন্য কিছু কেন আওড়াবে?
প্রথম হরফ পার হয়ে
এগোতে পারি না কিছুতেই…
এমনকী এইটুকু শেখা
আয়ত্ত হল না আজও হায়—
সর্বস্ব আমার তুমি, তুমি-ই কেবল…
আর কিছুতেই কিছু যায় না, আসে না…
তখন এই কথাগুলির সঙ্গে বাল্যকালের উক্ত ঘটনাটিকে জুড়ে তাঁকে একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মহাপুরুষ বানিয়ে তোলা যায় হয়তো, কিন্তু তাঁর যন্ত্রণার্ত যাত্রাপথটিকে কার্যত অস্বীকার করা হয়। অলৌকিকে ঠেলে দেওয়া হয় তাঁকে। যেন তিনি গোড়া থেকেই, জন্ম থেকেই জানতেন, কী তাঁর কাজ, কী তাঁর বলার কথা, আপন জীবন দিয়ে সত্য অর্জন করার বদলে, আসলে তিনি নিয়ে এসেছিলেন এক দৈবী কালাম— যে বাণী ও বয়ান তিনি উপহার দিয়েছেন অপরকে, পথ দেখানোই যেন কাজ তাঁর। যা তিনি জানান, তা তাঁকে অর্জন করতে হয়নি বেদনার বিনিময়ে, তা গোড়া থেকেই তাঁর আয়ত্ত— এমনটি ভাবলে তাঁকে যে অর্থে ‘মহান’ ভাবা যায়, সন্ত ভাবা যায় ঠিকই, কিন্তু অন্য এক অর্থের সম্ভাবনাও তো আছে এইখানে। শিশুকালে লেখাপড়ায় অনাগ্রহ সত্ত্বেও লতিফ তো পার করেছিলেন শিক্ষার নানা স্তর, ‘আলিফ’ পেরিয়ে শেষ বর্ণ অবধি তিনি হেঁটেছেন আর কুড়িয়েছেন অভিজ্ঞতার ফসল, নিজের পিতামহ শাহ্ আব্দুল করিমের কবিতা মুখস্থ রেখেছেন, সঙ্গে রেখেছেন কোরআন এবং মহাকবি জালালুদ্দিনের মস্নভি । তারপরই তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে আদিম অক্ষরের এই প্রশস্তি। জ্ঞানের হাত ধরেই, জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করে নয়। জানতে জানতে, রক্তপাতে-রক্তপাতে ভিজে যেতে যেতেই তাঁকে শিখতে হয়েছে তুমি-র স্বরূপ। আর কিছুতেই কিছু যায়-আসে না— এই ধ্যানে পৌঁছতে নিশ্চিত নানা-কিছুর অকিঞ্চিৎকরত্ব আবিষ্কার করতে হয়েছে তাঁকে।
এও কথিত আছে, লতিফ তাঁর প্রথম যৌবনে প্রার্থিত এক কন্যার সঙ্গে বিবাহে বাধা পেয়েছিলেন, এবং বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন আরও ঘোর মরুভূমির দিকে। নাথপন্থী যোগীদের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয় এই পর্বে, তাঁদেরই সঙ্গে তিনি হিংলাজ মন্দিরের দিকে চলে যান। যোগীদের নিবিড় নীরব সাধনায় লতিফ মুগ্ধ ও বিস্মিত হন, তাঁর সেই বিস্ময় এবং শ্রদ্ধা ধরা রয়েছে সুর রামকলি অধ্যায়ের গীতসমূহে। এই গীতি-আখ্যানের মধ্যে লতিফ নাথ যোগীদের মধ্যে সুফি সাধকের ধরন লক্ষ করেছেন। পণ্ডিতের তর্ক এইখানে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠবে হয়তো একথা বোঝাতে: নাথযোগীদের সঙ্গে বেদান্ত দর্শন কিংবা সুফি অদ্বৈত মতের ফারাক তো বিস্তর, কীভাবে লতিফ এদের মিলিয়ে দিলেন? কীভাবে এই যোগপন্থের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন আমি-তুমির দ্বন্দ্ববিলাস? পণ্ডিত হয়তো খানিক তৃপ্তিও পাবেন এই বিবেচনায় যে, বেচারা লতিফ তাঁদের মতো যোগ এবং উত্তর-মীমাংসা দর্শনের যথেষ্ট চর্চা করেননি। কিন্তু তাতে গল্পের কী আসে যায়? রুমির মস্নভিতে নিমজ্জিত লতিফের গানে রহস্যময় যোগী ধরা দেন অফুরন্ত প্রেমের চিহ্ণ হিসেবে। তাঁদের আত্মনিগ্রহ প্রেমিকের আত্মনিবেদনের সঙ্গে একাকার হয়ে ওঠে। আমি-র প্রবল ভার, অস্তিত্বের বিপুল যাতনা বইতে বইতে লতিফ কি নিজেকেই শোনাতে চান কীভাবে প্রেমের সামনে অন্তরায় হয়ে ওঠে ‘আমি’? সুফি কিংবা যোগী হয়ে ওঠা তখন আসলে প্রেমিক হয়ে ওঠার সমতুল মনে হয় তাঁর? আমি-বিয়োগ ব্যতিরেকে যোগী হয়ে ওঠা, আর আত্মধ্বংস ছাড়া সুফি হয়ে ওঠা যে অসম্ভব— তা শোনাতে শোনাতে লতিফ জালালউদ্দিন রুমির রাস্তায় এসে দাঁড়ান।
কিংবা ধরা যাক তাঁর ‘সুর সারঙ্গ’ শীর্ষক গীতি-আখ্যানটির কথা। শোনা যায়, সারঙ্গ রাগ উদ্ভাবিত হয়েছিল স্বামী হরিদাসের (১৪৮০-১৫৭৩) হাতে। উত্তর ভারতের ভক্তি আন্দোলনের এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র স্বামী হরিদাস ছিলেন রূপ গোস্বামীর (১৪৮৯-১৫৬৫) সমসাময়িক। দক্ষিণের কর্নাটকী ঘরানার সংগীত-সাধক এবং মধ্বাচার্যের অনুগামী পুরন্দর দাস (১৪৮৪-১৫৬৫) ছিলেন তাঁর গুরু। তানসেন এবং বৈজু— দু-জনেই আবার তাঁর ছাত্র ছিলেন কিছুকাল—এমনও কথিত আছে। রাধা এবং কৃষ্ণের প্রণয়লীলা নিয়ে গানও লিখেছেন হরিদাস। ভক্তিমার্গের এই সাধক বৃন্দাবনে আশ্রম তৈরি করে সেখানেই বাস করতে থাকেন এবং সেখানেই তাঁর হাতে সৃষ্টি হয় কাফি ঠাটের রাগ বৃন্দাবনী সারঙ্গ। সাধারণভাবে দুপুর-বিকেল হল এই রাগের গায়নকাল। স্বামী হরিদাসের এই রাগ তাঁর মৃত্যুর শ’দেড়েক বছর বাদে সুফি মতের পথিক শাহ্ লতিফের গানের একটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে। মধ্বপন্থের ভক্তিবাদী পুরন্দরের শিষ্য, রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলাকে গানে উপস্থাপনকারী স্বামী হরিদাসের উত্তরাধিকার এক অর্থে বইছেন সিন্ধ অঞ্চলের সুফি ভাবুক লতিফ। লোক-আখ্যানের মধ্যে বহু যুগ ধরে বেঁচে থাকা সাধারণ দুখী মানুষের বিরহ-বেদনা ঠাঁই পেয়েছে রাধাকৃষ্ণের অলৌকিক প্রেমের কাহিনির পাশেই। বৃন্দাবনী সারঙ্গের সুবাস ভেসে গেছে সিন্ধের দিকে। সেইখানে লতিফের গানে এসে বসবেন হরি, সারঙ্গ রাগ স্পর্শ করবে রবাব। আমাদের উপমহাদেশের এই সুরপ্রবাহ আমাদের ইতিহাসের মধ্যযুগের একটি লক্ষণ বইকি।
‘সুর সারঙ্গ’-এ কৃষ্ণকথার স্মৃতিই কি কাজ করেছে এই সব টুকরো ছবির আড়ালে— যেখানে গোপালকদের প্রসঙ্গ আসে অনায়াসে? যাদের জীবনের নানা ধরনের অপেক্ষা, আর্তনাদ কিংবা উল্লাস নিয়ে গান এবং গল্প বাঁধেন শাহ্ লতিফ তারা খুবই সাধারণ লোক এই আখ্যানে, খুবই তুচ্ছ তাদের কুটির, তাদের দৈনন্দিন জুড়ে থাকে বর্ষার আকাঙ্ক্ষা, বৃষ্টি এলে তাদের উল্লাস ঝরে পড়ে, বর্ষার আর প্রেমিকের জন্য প্রতীক্ষা মিলেমিশে যায়। উত্তপ্ত দিনের ছবিগুলির মধ্যে ভরা থাকে কামনার আতপ। ফসলের দাম যেন ওঠে, যেন ঘরে ফিরে আসে প্রবাসী প্রেমিক, যেন তার যত্ন করে খুব, চেয়ে দেখে তাকে আর মরুভূমিতে যেন খুব বর্ষা নামে এইবার— এই প্রত্যাশা নিয়ে বসে থাকা মেয়েটির কথা যেমন দেখা যাবে এইখানে—
বর্ষা এসে গেছে,
এইবার গায়ে পরে নেব আমি আরক্ত বসন,
বৃষ্টিধারা হয়ে আজ এসেছে প্রেমিক।
বাছুরের জন্য বসে আছে
কিশোরী মেয়েটি,
চুল ভিজে যাচ্ছে তার ওই…
শাহ্-এর জবান—
এসো তুমি, প্রিয়তম, আমার কুটিরে এসে
চেয়ে দ্যাখো আমাকে এখন…
কিংবা, এই সব তুচ্ছ চাওয়া— তারাও আরক্ত করে রাখে কবিতার দেহ—
ওগো বৃষ্টিধারা,
আল্লার দোহাই, তুমি শোনো,
যারা খুব পিপাসায় আর্ত হয়ে আছে
তাদের কথাও ভেবো তুমি…
এই সমতলভূমি যেন জল পায় ঢের,
দানাশস্য যেন মেলে কিছু শস্তা দামে।
জলে ভরে যায় যেন জমি,
যেন খুশি মনে বেঁচে থাকে
গোপালক মানুষ-জনেরা…
লতিফের গানে যোগী কিংবা সুফি সাধকরা শুধু নয়, এইসব জনমানুষেরা ভিড় করে আছে।
৩
জালালউদ্দিন রুমির মস্নভি বইতে আশ্চর্য সব টুকরো গল্প আছে, সকলেই জানেন। সেসব গল্পের গূঢ় তাৎপর্য, অন্তরশায়ী সুফিতত্ত্ব ও দার্শনিকতা না বুঝলেও অনেক সময় নিছক কথার সৌন্দর্য এবং অনুভূতির মাধুর্য আমাদের মোহিত করে দেয়। এমনই একটি গল্পের কথা শোনাব এখানে। রুমির ইংরেজি অনুবাদক অনেকেই আছেন, ইদানীং পুবে-পশ্চিমে রুমি অনুবাদ প্রায় একটি হুজুগে পরিণত হয়েছে, অনেকেই টরে-টক্কা রুমি তর্জমা করে ফেলেন দেখি, এখানে আমরা রেনল্ড নিকলসনের অনেক পুরোনো একটি তর্জমার উল্লেখ করব। পুরোনো হলেও নিষ্ঠা এবং শিল্পসামর্থ্যে এখনও তা অন্যতম সেরা মনে করি। নিকলসনের তর্জমার ভিত্তিতে সেই কাহিনি কতকটা এইরকম—
নবী মুসা, ইংরিজিতে যাঁকে আমরা ‘মোজেস’ বলে চিনি, একবার পথে যেতে যেতে দেখতে পেলেন, এক রাখাল কাতর স্বরে বলছে আপন মনে, কোথায় তুমি প্রভু? কীভাবে তোমার এট্টু সেবা করি আমি? জুতো সেলাই করে দিই, চুল আঁচড়ে দিই মাথার? কাপড়ে কেচে দিই কীভাবে? মাথার উকুন সাফ করে দিই? দুধ এনে দিই একটু, খাও? কোথায় তুমি ওগো পূজনীয়?
এসব বোকা বোকা কথা শুনে মুসা বললেন, কার সঙ্গে এমন বকবক করছ তুমি? এ কেমন প্রলাপ? এ তো শির্ক— খোদার বিরুদ্ধতা। মুখে কাপড় গুঁজে রাখো হে। খোদা বা ঈশ্বর তোমার এসব তুচ্ছ জিনিস আদৌ চান নাকি? তাঁর কোনও অভাব নেই। তিনি তো খোদা…
মুসার কথা শুনে রাখাল চুপ করে গেল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গুছিয়ে নিল কাপড়চোপড়। তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল অরণ্যের দিকে। তখন মুসা শুনতে পেলেন দৈবী কণ্ঠস্বর— আমার কাছ থেকে আমার বান্দাকে সরিয়ে দিলে তুমি… আমি এক-একজনের জন্য এক-একরকম ইবাদতের ধরন তৈরি করেছি, বিচিত্র প্রকাশভঙ্গিমা দিয়েছি বিভিন্ন মানুষকে। আমার উপাসনায় হিন্দুস্তানের বাক্ভঙ্গি হিন্দুর জন্য যথার্থ বহন করে। সিন্ধের প্রকাশভঙ্গিমা সিন্ধের মানুষজনের জন্য যথাযথ।
রুমির কাহিনির সারকথা এক-একজন এক-একভাবে বুঝবেন। তবে মনে হয়, ভাষা নয়, ভঙ্গি নয়, পদ্ধতি নয়, উপাসনা কিংবা ইবাদতের আসল কথাটি হল সততার সঙ্গে সমর্পণ, সদ্দিচ্ছায় রত থাকা।
রুমির কাছে ঋণ লতিফের অনেক। কেবল সুফি সাধকের রাস্তাপ্রদর্শক বলে নয়, নিজের কবিতায় সরাসরি রুমির কথা লিখেছেন তিনি। এ-কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই যে, রুমির গভীরতা কিংবা শিল্পসিদ্ধি লতিফের লেখায় মিলবে না। রচনার পরিমাণেও দু-জনের তুলনা চলে না। রুমির উন্মত্ততা এবং চিন্তার মৌলিকতা শাহ্ লতিফের মধ্যে অনুসন্ধান করে লাভ নেই। কিন্তু হাল্লাজের প্রসঙ্গ তুলেছেন উভয়েই, স্বীকার করেছেন ঋণ, উভয়েই স্মরণ করেছেন তাঁর কথা। এমনও বলেছেন কেউ কেউ— মস্নভি হল ফার্সি কোরআন— আর এদিকে রিসালোকেও সিন্ধি কোরান বলা হয়েছে এক-আধবার।
লতিফের কাব্য জুড়ে যে আমি-তুমির সম্পর্ক ও লীলা— বিচ্ছেদ ও চিরমিলনের যে ধারণা সে কি রুমি থেকে পাওয়া?

৪
আমি নামক সজীব ও কাতর সত্তাটিকে নিয়ে ভাবুক মানুষের ভারি মুশকিল। আমি-আবিষ্কার হয়ে গেলেই তার ভাবনা, এই আমি নিয়ে আমি কী করি এখন? ‘আমি চলি, সাথে সাথে সেও চলে আসে, আমি থামি, সেও থেমে যায়।’ কখনও ‘তুমি’ বানিয়ে তাকে সামনে দাঁড় করাই, সাজাই, গোছাই, তার ভেতরে প্রবেশ করি, কখনও আবার ‘তুমি’-টির দেহে দেখি ‘আমি’র প্রচ্ছায়া। তুমির হাত থেকে ছাড়ান নেই, আমির থেকেও নিস্তার নেই কোনও। কে যে আদত, আদি, আর কে অন্তিম, কে যে আওয়াল আর কেই বা আখর— তা নিয়ে ধন্দ মেটে না। লতিফের প্রায় এক সমকালীন কবি, সিন্ধি সাহিত্যের মহীরূহ গোঁসাই বুল্লেহ্ শাহ্ লিখেছেন—
আওয়াল আখর আপ নুঁ জানাঁ
না কোই দুজা হোর পছানাঁ
মাইতোঁ হোর না কোই সিয়ানাঁ
বুল্লা শাহু খাড়া হ্যায় কওন
বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন…
আমিই আদত আর আমি সমাপন
অপর দ্বিতীয় কেউ নেই যাকে চিনি।
আমার মতন জ্ঞানী কেউ নেই আর।
এই যে দাঁড়িয়ে আছে, কে সে বুল্লা শাহু?
আমি কে জানো কি বুল্লা, আমি কে তা জানো?
আমি যদি আমারই আস্বাদ পেতে চাই কখনও, তাহলে তুমির আশ্রয় ছাড়া কীভাবে তা সম্ভব আর? তাই একটি তুমি প্রয়োজন, এবং সেই তুমিটির শরীর আর আত্মার অধিকার চাই আমার। তুমির দিকে চিরধাবমান এই আমির আকুলতা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। লতিফের কবিতায়, আরও অনেক সুফি ভাবুকের মতোই আমির এই তুমি-নির্ভরতার কথা, আমি-র এই তুমি-অভিমুখ বড় দরদের সঙ্গে, যত্নের সঙ্গে উপস্থিত আছে। তুমির জন্য চির-অতৃপ্ত এক বাসনালোক তাঁর প্রিয় এলাকা। বাসনাই কি তাহলে আমির পরিচয়?
বৈষ্ণব কবিদের কাব্যধৃত রাধার আখ্যানের মতোই লতিফের কবিতাতেও ফুটে আছে পিপাসার কথা, তৃষ্ণার বৃত্তান্ত। তৃপ্তি নেই, তৃষ্ণা আছে শুধু। বা বলা যায়, তৃষ্ণাতেই তৃপ্তি আসলে। যেমন, এই টুকরো দু’টিতে দেখা যাবে সাসুই তার প্রেমিক পুন্হুঁ-র উদ্দেশে বলছে—
পিপাসা চড়ুক আরও
খাও, আরও এক পাত্র পান করো তুমি…
আমাকে বরং তুমি পুন্হুঁ, নিজে হাতে
পেয়ালা ভরেই দাও পিপাসা খানিক…
পিপাসা দিয়েই আজ
মিটুক পিপাসা…
‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে রাধার জবানিতে ঈষৎ ভিন্ন এক কথা পাওয়া যাবে। সেখানে কৃষ্ণের মাধুর্য যেন অমৃতের মতো, যে সেই অমৃতমধুর রূপসুধা পান করে একবার, তার জীবনই হয়ে ওঠে তৃষ্ণালীন। কৃষ্ণরূপের পিপাসা তখন ডেকে নিয়ে আসে নতুন পিপাসা। কৃষ্ণদাস লিখছেন,
এ মাধুর্যামৃত পান সদা যেই করে ।
তৃষ্ণাশান্তি নহে, তৃষ্ণা বাড়ে নিরন্তরে ॥
পিপাসা এবং আর্তিই তাহলে প্রেমের নিশ্চিত অভিজ্ঞান। তৃপ্তি নয়, পিপাসাই জারি থাক— এই কথা লতিফের অন্য গানেও আছে।
৫
লতিফ যখন আনাত্মের কথা বলেন— আত্মকে চুরমার করে দেওয়ার কথা তোলেন যখন, তখন বৌদ্ধ দর্শনের অনাত্মবাদের প্রসঙ্গ মনে এলে, সযত্নে তাকে সরিয়ে রাখা উচিত। বৌদ্ধ অনাত্মবাদের সঙ্গে এই আত্ম-ধ্বংসতত্ত্বের উপর-উপর মিল নজরে এলেও অমিলই মুখ্য। আত্মার অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে ন্যায় দার্শনিকের সঙ্গে প্রবল তর্ক জুড়বেন বৌদ্ধ তার্কিক। রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান— এই পঞ্চস্কন্ধের ধারণায় আস্থা রেখে তাঁরা স্থায়ী আত্মার ধারণা নাকচ করতে চাইবেন। আমি-কে ছাঁটাই করা এই অনাত্মবাদের সঙ্গে লতিফের অনাত্ম মিলবে কী করে? লতিফের অনাত্ম-প্রসঙ্গ ঘিরে থাকে বহু এরোটিক বা শৃঙ্গারধর্মী মেটাফর। থাকে হত্যার অনুষঙ্গ। প্রেমের তুখড় আকাঙ্ক্ষা। তাঁর ইশারা মেনে ভেবে দেখা যেতে পারে, কেন শৃঙ্গারের সঙ্গে, প্রেমের সঙ্গে হত্যার এই সম্পর্ক গড়তে চান কবি? আত্ম-বিনাশই প্রেমের লক্ষ্য বলে কি? যদি তা-ই হয়, তাহলে এক ভাবে বোঝা যায় কেন লতিফের প্রেমের গানে বারবার ঘাতকের কথা, হত্যাকারীর প্রসঙ্গ, এমনকী, ধারালো সব অস্ত্রের কথা ভিড় করে আসে, কেন তিনি লেখেন,
কোথায় শিখেছ তুমি
কসাই-সদৃশ এই কুশলতা, বলো…
প্রিয়তম, আছে তো তোমার কাছে ধারালো ছুরিটি…
তবুও কেন যে তুমি ভোঁতা ছুরি দিয়ে
আমাকে এমন করে ছিন্নভিন্ন কর…
দ্যাখো, এই ক্ষতমুখগুলি…
ঝরে যাচ্ছে রক্তস্রোত, দ্যাখো
আঘাতে আঘাতে…
কিংবা এইসব পঙ্ক্তি—
খুলি
কন্ধ
মাংস
সব পুড়ছে, জ্বলছে
টুক্রো হয়ে যাচ্ছে চার ধারে
প্রেমের ব্যাপারে আজ কথা বলতে পারে শুধু তারা
কাটা মাথা
হাতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যারা…
৬
লতিফের কাব্যে অন্তর পাঁচ-জোড়া চরিত্রের কাহিনি পাওয়া যায়, যারা সুবিখ্যাত। এরা হল—
সাসুই বা সসি (শশী) এবং পুন্হুঁ
সোহিনী বা সোহ্নি এবং মেহের
মুমাল এবং রাণো
মারুই এবং খেতসেন (মারু)
লীলা এবং চানেসর
এদের মধ্যে আবার সাসুই-পুন্হুঁ এবং সোহিনী-মেহের— এই দুই যুগলের কাহিনিই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। সব গানে অবশ্য চরিত্রের নাম উল্লেখ নেই। ফলত সেগুলি প্রেমের, যাতনার, বিরহের, উল্লাসের সাধারণীকৃত বয়ান বা বিবৃতি হিসেবেই পড়া যাবে। কিন্তু অনেকগুলি কবিতায় যেহেতু সাসুই-পুন্হুঁ এবং সোহিনী-মেহের-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাই এই অবসরে তাদের কাহিনিটি সংক্ষেপে জানিয়ে রাখা দরকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, এই চরিত্রদের যেমন লতিফের আগেও দেখা গিয়েছে অন্য কবিদের লেখায়, পরেও তেমনই অনেকেই এদের কাহিনি নিয়ে রূপক-আখ্যান ফেঁদেছেন। এরা তাই জনমানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা লোক, কোনও কবির পৃথক অধিকারে এরা বন্দি নয়।
সোহিনী-মেহের কাহিনি— এই বৃত্তান্তের একাধিক ধারা আছে। তবে মূল কাহিনিটি কতকটা কৃষ্ণকথার অনুরূপ। সোহিনী এক গৃহবধূ— সামাজিক রীতি ও পদ্ধতি মেনে, পারিবারিক উদ্যোগে বিয়ে হয়েছে তার। তার স্বামী, দাম, আর পাঁচজন সাধারণ লোকের মতো পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করে। ওদিকে সোহিনীর ভালবাসার পাত্রটি অন্য এক গোত্রের লোক— তার নাম সহর। গল্পে তাকে মেহর/ মেহের হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। সে এক রাখালিয়া সংস্কৃতির মানুষ—গরু-বাছুর-মোষ চরিয়ে তাদের সমাজের লোক বেঁচে থাকে, গোপালন-নির্ভর এক জীবনে তার বসবাস। সোহিনী তার আকর্ষণে উন্মত্ত হয়ে ঘরদোর ফেলে বেড়িয়ে পড়ে মাঝে-মাঝেই। একবার মেহের তাকে দৈবী এক পানীয় খাইয়ে দিয়েছিল— তার পর থেকে এই তার অবস্থা। সিন্ধু নদী পার সাঁতরে পেরিয়ে তাই সে প্রায়শই দেখা করতে যায় প্রেমিকের সঙ্গে। নদীতে ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে বলে, সে সাঁতারের সময় একটি পোড়ামাটির কলসি নিয়ে যায়, সেই কলসি বা ঘড়া বুকে নিয়ে ঝাঁপ দেয় জলে।
দাম তাকে বারবার মানা করে, বোঝায়, ভয় দেখায় অসম্মানের। কিন্তু সে বেপরোয়া, সারাক্ষণই তার কেটে যায় মেহেরের অনুধ্যানে— দূর থেকে যখন গরুর পাল চলে যায়, তাদের গলায় ঘণ্টা বাজে মৃদু, সেই আওয়াজ তাকে পাগল করে দেয়। একদিন ধরা পড়ে যায় সোহিনী, তাকে শায়েস্তা করার জন্য বাড়ির লোক পোড়ামাটির সেই কলসিটি বদলে দেয়, একটি অ-দগ্ধ মাটির ঘড়া নিয়ে সিন্ধু নদীর দিকে চলে যায় সোহিনী। শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারে ঠিকই, কিন্তু তখন আর তার কিছু করার নেই, সে ভাবে দু-দণ্ড, কিন্তু কোনও পিছুটান, কোনও আশঙ্কা কি তাকে নিরস্ত করতে পারে? সেই কাঁচা মাটির ঘড়া নিয়েই সে ঝাঁপায় নদীতে, যথারীতি মাটি গলে যায়, স্রোতে ভেসে যায় সোহিনী। নদীর বিপদ এসে গ্রাস করে, ক্রমশ সে ডুবে যেতে থাকে। মেহের, প্রেমিক তার, ভেঙে পড়ে আকুল কান্নায়।


অপ্রাপনীয় প্রেমিকের উদ্দেশে প্রেমোন্মত্ত নায়িকার অভিযাত্রাই এই লেখার মূল বিষয়। বিধির সামাজিক (এবং শাস্ত্রীয়/ আনুষ্ঠানিক/ধর্মীয়) অভ্যাস অতিক্রম করে নিজেকে মৃত্যুর দিকে অনিবার্য ভাবে ঠেলে নিয়ে যাওয়া— এই-ই প্রেমের স্বরূপ— এ-কাহিনির বলার কথা এটুকুই। বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেমের স্বকীয়া-পরকীয়া ধরনের উপস্থাপনা স্মরণে আসতে পারে আমাদের। একই উদ্দেশ্যে পরকীয় প্রেমতত্ত্ব ব্যবহৃত হয় এখানেও। রাধা-কৃষ্ণ আখ্যানটির একটি শাস্ত্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পরে সংযোজিত হয়েছে, ‘স্বধর্মত্যাগ’-ও সেখানে ব্যাখ্যাত হয়েছে ঈশ্বরের অনুজ্ঞা হিসেবে। ঈশ্বরই বলেন স্ব-ধর্মাচরণ করতে, তিনিই আবার উৎসাহিত করেন স্বধর্ম ত্যাগ করতে; কুলধর্ম, লোকধর্ম, সংসারধর্ম ত্যাগ করে কৃষ্ণ-অভিমুখে যেতে। ফলে সেইসব ত্যাগের একটি সমর্থন জুটেছে ব্রজগোপীদের। কিন্তু বেচারা সোহিনীর সেই সুযোগ নেই, তাকে শেষ পর্যন্ত নিখাদ একাকী হেঁটে যেতে হয়, সকলের বিরোধিতা পার করে, কোনও ঐশ্বরিক অনুজ্ঞার সমর্থন কিংবা দোহাই ছাড়াই যেতে হয় মেহেরের দিকে। এবং ডুবে যেতে হয়। কেবল কবিই তার এই আত্মনাশের একটি নিজমনোমতো সার্থকতা রচে দেন।
সাসুই-পুন্হুঁ কাহিনি— এই কাহিনিবৃত্তটিও পাঞ্জাবি ভাষাতেও ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে প্রচলিত। লতিফ পাঁচটি সুর কিংবা অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন— সুর সাসুই-আবিরি, সুর মাজুরি, সুর দেশি, সুর কোহিয়ারি, সুর হুসাইনি। এখানে সাসুই এক ব্রাহ্মণকন্যা। ভাম্বোর নগরে তাদের বাস। ছোটবেলাতেই তার বাবা এক দৈববাণী শুনে ভীত হয়ে মেয়েকে কার্যত পরিত্যাগ করেন, পাঠিয়ে দেন দূরে— ভয় ছিল মেয়ে বংশের মুখে কালি দেবে। এদিকে মেয়ের রূপের প্রশস্তি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। কচ্ছ অঞ্চলের এক ছোট জনগোষ্ঠীর রাজার ছেলে পুন্হুঁ তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়— যেমনটি ঘটে থাকে লোককাহিনিতে। ভাম্বোর নগরে বাণিজ্যের কাজে এসেছিল সে, সঙ্গে ছিল বন্ধু, দলবল। তাকে দেখে সাসুই-ও মাতোয়ারা হয়ে ওঠে তার প্রেমে। তার বর্তমান পরিবারের লোকজন তাদের বিবাহে বাদ সাধতে পারে ভেবে, সাসুই সবার কাছে গোপন করে পুন্হঁর জাতিপরিচয়। নিজের পরিবারের চোখে সে ধুলো দিতে পারলেও পুন্হুঁর বন্ধু এবং সঙ্গী-সাথীরা এই বিবাহে অখুশি হয়, কারণ তাদের রাজপুত্রের সঙ্গে সামান্য এক ধোপা-পরিবারের কন্যা আবদ্ধ হবে পরিণয় সূত্রে— এ তারা মেনে নেয় কী করে। ফলে ষড়যন্ত্র করে বিয়ের রাতেই পুন্হুঁকে মাতাল করে দেয় তারা, তারপর সাসুই-পুন্হুঁ দু-জনেই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে রাতে, অন্ধকারে পুন্হুঁকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। উটের ওপর চাপিয়ে তাকে নিয়ে ফিরে যায় কচ্ছের দিকে। এই পূর্বসূত্রটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে লতিফের কাহিনির বাকি অংশ। দুর্গম রাস্তা, মরুভূমি, অরণ্য, পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে পুন্হুঁর খোজে হেঁটে চলে সাসুই— একের পর এক বাধা সামনে আসে তার, পা ক্ষতবিক্ষত হয়, কিন্তু তবুও তার যাত্রা ফুরয় না। কাহিনির শেষে, মরুভূমিতেই তার দেখা হয় এক মেষপালকের সঙ্গে। ক্লান্তিতে যখন সে ঢলে পড়ে মৃত্যুতে, তখন তার কবরের পাশেই আরও একটি কবর খুঁড়ে রাখে সেই মেষপালক। অবশেষে সেখানে এসে হাজির হয় পুন্হুঁও। পাশাপাশি সমাধিস্থ হয় দুই প্রেমিক।
দু’টি কাহিনিতেই নায়কের অনুসন্ধানে, তার সঙ্গে মিলনের উদ্দেশে নায়িকার দীর্ঘ অভিযাত্রা— এক অনিঃশেষ খোঁজ পরিসমাপ্ত হয় মৃত্যুতে। জানি তো আমরা, সব রাঙা কিংবা মলিন কামনারই শিয়রে জাগরুক থাকে মৃত্যু। দু’টি কাহিনির শেষেই মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে যায় প্রেমিক-যুগলকে। মানুষের বেদনার্ত আকাঙ্ক্ষাসমূহ সামাজিক পরিসরে বেশিরভাগ সময়েই মর্যাদাহীনভাবে, অপরের অমনোযোগে অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকে। তখন সেই মানুষ বাধ্য হয়ে গল্প গড়ে তোলে, নিজের অপ্রাপ্তি আর অক্ষমতাগুলি গল্পের ভেতরে চারিয়ে দেয়, জীবনে না হোক, গল্পের পাতায় যেন দূরের পাঠক-শ্রোতার অশ্রু এসে পড়ে কিছু কিছু। যেন তার চারপাশে পরিচিত জনদের নিষ্ঠুর অমনোযোগ গল্পে অন্তত কিছু সহনীয় হয়ে ওঠে, গল্পের চৌহদ্দিতে গিয়ে যেন বেঁচে থাকে না-পাওয়ার ব্যথাবেদনারা। জীবনের যাবৎ অমর্যাদা গল্পে যেন কিছু ভালবাসা পায়। মানবপ্রবাহ রচিত সেই গল্প শাহ্ আব্দুল লতিফ ব্যবহার করেন সুফি পরম্পরায়। মাশুক-আশিকের রূপক হিসেবে, ঈশ্বর-প্রেমের সংকেত-সহ, আমি-তুমির দার্শনিক সংকটের একটি অব্যর্থ চিহ্ন রূপে।
প্রেমিকের জন্য সব ভালবাসা, হাহাকার, জানি তো ঈশ্বর, তোমার দিকেই যায় অবশেষে।
৭
কিন্তু লতিফের লেখা তো কেবল তত্ত্বকথাকে সরল আকারে প্রচারের তাগিদ থেকে হয়ে ওঠেনি। সে লেখা এসেছিল, জনতার মাঝখান থেকে। সিন্ধ প্রদেশে কিংবা কচ্ছ অঞ্চলে শাসক-বিরোধী নানা প্রতিরোধে বারবার ব্যবহৃত হয়েছেন লতিফ। এগারো শতকের সুফি সাধক সরমদ কিংবা ঈষৎ পূর্ববর্তী শাহ্ এনায়েত ঝোক-এর মতো সরাসরি প্রতিবাদে সোচ্চার হতে তাঁকে দেখি না ঠিকই, কিংবা সমকালীন বুল্লে শাহ্-র মতো তাঁকে ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে চিৎকার করে নিজের পৃথক অবস্থান জানাতেও দেখি না তেমন। লতিফের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘ কাজ করেছেন যাঁরা, তাঁরা অনেকেই একটি গল্পের কথা বলেন— সত্যি যদি না-ও হয়, নেহাতই যদি একটি খুচরো অ্যনেকডোট-ই হয় এটি, তাতেও ক্ষতি কিছু নেই। লতিফের ভাব বুঝতে এই গল্প সহায়ক হবে— তাঁকে একবার কোনও ধর্মভীরু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার লেখা থেকে বুঝি না তো, কীরকম মুসলমান তুমি? তুমি কি শিয়া না সুন্নি? লতিফ বলেন, আমি ওই দুই-এর মাঝামাঝি আছি। তাতে আরও উদ্বিগ্ন হন প্রশ্নকর্তা, বলেন, কিন্তু মাঝখান বলে তো কিছু নেই ভাই; লতিফের উত্তর ছিল, আমি ওই নেই-টুকুতেই আছি শুধু। শিয়া-সুন্নির ভাগাভাগির বাইরেই থেকে গেছেন লতিফ, জনতার দৈনন্দিনে।
জনতার কাছে তাঁর গান আরামের মতো, আপ্যায়নের মতো, শুশ্রূষার মতো এসে পৌঁছয়। ধর্মীয় নেতাদের দেখানো ইসলামে তাঁর আস্থা নেই বোঝাই যায়, তিনি রুমির শিষ্য, মনসুর হাল্লাজের উত্তরপুরুষ, হাল্লাজের মতোই তিনি দৃঢ়ভাবে জানাতে পারেন, আমি-ই সব, আমরা-ই সমস্ত জুড়ে আছি, আমরা সবাই, সব আমি-ই আসলে তিনি। খুদা শব্দের খুব নিকটেই বাসা বেঁধে বসবাস করে খুদ্— যার অর্থ আমি— সে-কথা তিনি জানেন বলেই, তাঁর কবিতায় এই সব পঙ্ক্তি উঠে আসে—
সব বৃক্ষ, সব ফুলপাতা,
সকল জীবিত সত্তা, জলে ও ভূমিতে
এক সুরে বলে ওঠে
আমরাই তো খোদা,
আমরা তাঁরই আলো…
শরিয়া স্মরণে রেখে সকলেরই ফাঁসি হোক তবে…
হাল্লাজের অনুগামী এরা সকলেই,
কতজনকে খুন করবে তুমি?
শরিয়ত-অনুসারী বিধানদাতাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন লতিফ, তাঁর গানে যোগী আর সুফিদের কথা থাকবে পাশাপাশি, উপনিষদ আর মসনভির প্রজ্ঞা স্থান পাবে একে-অপরের প্রতি মর্যাদা রক্ষা করে, অন্য কোনও এক সম্প্রদায়ের প্রেমিকের জন্য সারা জীবন মরুভূমি ঢুঁড়ে বেড়াবে ব্রাহ্মণকন্যা, তাঁর গানে নাম না-জানা দরিদ্র রাখাল বধূটি অপেক্ষায় কাটিয়ে দেবে বছর, বৃষ্টি আর প্রেমিক উভয়েই এসে হাজির হলে অকস্মাৎ, নেচে উঠবে সুখে, নিচু গলায়, অচিৎকৃত জানাবে কীভাবে সে জেগে ছিল সারা, সারা রাত, এইরকম আশচর্য সুন্দর উপমায় সাজাবে নিজের ব্যথার সম্ভার—
বর্ষার জলের ধারা পেলে
নিচু জলা-জমির উপর মাথা তোলে
বহুবিধ সজীব আনাজ,
প্রেমিক যখন কাছে রয় না আমার
ব্যথারা তেমনই থরে থরে
ফুটে ওঠে বহুঅঙ্কুরিত…
কথা আপাতত শেষ। এইবার কবিতা। আজকের পর্বে লতিফের সুরসম্ভার থেকে আরও কিছু তর্জমা আপনাদের সামনে রাখছি। বাহুল্য হলেও আবার বলা উচিত, আমি সিন্ধি ভাষা জানি না। এ-সবই ইংরেজির মধ্যস্থতায় পাওয়া— অযথার্থ অনুবাদ।
১
যে-সকল লেখা তুমি কবিতা হিসেবে দেখে থাক,
আসলে কবিতা নয়, অজানা কারও কাছ থেকে
পাওয়া কোনও ইশারা সেসব…
এই শব্দরাশি প্রতিনিয়ত আমাকে
উসকে তোলে,
টেনে নিয়ে যায় প্রেমিকের কাছাকাছি…
২
নদীর স্রোতের দিকে প্রথমে সে চেয়ে দেখে স্থির,
নিজের কলসখানি দু-হাতে জাপটে ধরে
ঝাঁপ দেয় জলে…
‘সখার পায়ের কাছে এই দ্যাখো রাখি ছিন্নশির,
এই ভালো হল…’
এ এক পরীক্ষা, তার পুরস্কার প্রিয়-সম্মিলন।
গভীর আঁধার রাতে অভিসারে গিয়েছিল যারা,
তাদের মিলিয়ে দিও খোদা…
৩
নদী সরোবর কিংবা কোনও সমুদ্দুর—
সোহিনীর মরণে কেউ-ই দায়ী নয় এরা…
নিজের চোখেই ছিল বাসনা-বসত
মেহেরের জন্য সেই বাসনাই ডুব দিতে ডেকেছিল তাকে…
৪
‘এ সমস্ত’ তিনিই কেবল—
‘ওই সব’ তাও আসলে তিনি,
তিনিই জীবন এবং মৃত্যু দুই-ই নিজে,
প্রেমিকের দেহ, তার শ্বাসবায়ু— সবই তিনি, জানি মনে
মনে,
শুভাকাঙ্ক্ষী এবং অরাতি,
একই সাথে উপস্থিত রয়েছেন এখানে-ওখানে,
এমনকী, গোপনে হৃদয়ে–
নিজেরই আলোতে নিজ অভিমুখে তাকিয়ে আছেন…
৫
এইখানে এসো হে প্রেমিক, বসো চোখের ভিতর,
আঁখিপাতা বুজে আমি ঢেকে দিই তোমাকে এবার,
পৃথিবী তোমার দেখা পাবে না তাহলে…
অন্য কিছু দেখি না আমিও।
৬
‘চুপ করো, শব্দহীন হও’ ,
ঈষৎ সংযম আনো চোখে কানে ঠোঁটে,
খাও, কিন্তু ক্ষুধা রাখো জারি…
তখনই কেবল তুমি দেখতে পাবে
খোদার কামাল…
৭
‘আমি’, ‘তুমি’, ‘আমরা’, ‘তারা’— এই শব্দাবলি
মুছে দাও তোমার হৃদয় থেকে আগে…
তখন তোমাকে আর ছোঁবেই না দেখো
বেদনার খর অগ্নিশিখা…
৮
‘আমি’ এক আবরণ, যেন এক পর্দা ঘিরে
তোমাকে তোমারই কাছে আবছা করে দেওয়া…
ভাল করে দ্যাখো, জারি থাক চৌকিদারি,
মিলনের পথে ‘তুমি’ বাধা হয়ে রয়েছে দাঁড়িয়ে…
৯
দেহ এক জপমালা,
জপদানাটির মতো শ্বাস…
হৃদয় যোগীর কাছে তম্বুরার মতো বাদ্য কোনও,
পরম একের মন্ত্র কানে গেলে শিরা-উপশিরা
কেঁপে কেঁপে ওঠে অনুরণনে-রণনে।
ঘুমেও জাগ্রত-ভাব,
নিদ্রা তাঁর কাছে যেন এক উপাসনা…
১০
বৃষ্টি আর প্রেম যেন প্রতিধ্বনি একে অপরের,
বর্ষণের আগে মেঘ সাড়ম্বর হইচই করে,
একই ভাবে প্রেমিকেরও থাকে আর্তনাদ, ডাকাডাকি…
কাছাকাছি রয়েছ— জানাবে তুমি যখনি আমায়
বর্ষাভারাতুর এক মেঘ হয়ে যাব আমি ঠিক…
১১
ওগো মেঘ!
কিছু শিখে থাকো যদি আমার এই দু-চোখের কাছে,
শুষ্ক হয়ে উঠো না হে কোনওদিন তুমি…
১২
নিকষ আঁধারই বেশি ভাল—
কেননা তাতেই
সহজে হারানো যায় পথ…
তাতে শুধু এ জগৎ নয়,
এমনকী, আমি নিজে আবছা হয়ে উঠি…
মুছে যেতে থাকে
সব স্মৃতি আমার তোমার…
১৩
কেঁদে ওঠে তখন বধূরা,
দু-চোখ তাদের
জলে ভরে যায় শব্দহীন
যখন যখন তারা মেঘ দেখে ফেলে…
আহা, এই কুঁড়েঘরগুলি, স্বামীসঙ্গহীনতায় গাঁথা,
দেখো, যেন জলে ভিজে না যায় কখনও,
উত্তুরে বাতাস যদি ভেঙে দিয়ে যায় এই ঘর,
কোথায় তাহলে গিয়ে বিধবা মেয়েরা
কাঁদার সুযোগ পাবে বলো?
আহা, যেন ফিরে আসে স্বামীরা ওদের…
যেন ফের দেখ
১৪
গোপনে গোপনে কেঁদো মেয়ে,
প্রেমিকের বিরহ যাতনা রেখো অপ্রকাশ তুমি…
পদ্মপাতা কিনারায় যেমত কঠিন
নিদারুণ ক্লেশে তুমি দড় থেকো তেমনই তেমনই…
১৫
ভিতরে জ্বালাও প্রেম—
ধোঁয়ার নরম আঁচ পার করে
ধিকিধিকি পোড়াও প্রথমে,
দাউদাউ প্রজ্জ্বলিত হোক তারপর…
অতঃপর
এমন ভয়াল হোক সেই অগ্নি যাতে
তোমাকে গলিয়ে শেষে জল করে দেয়…
১৬
সারাক্ষণ হাজির সমুখে…
প্রেমিকের মুখ যেন তাঁদের মেহ্রাব হয়ে আছে;
যেন সারা পৃথিবীই বিরাট এক ইবাদতখানা…
যোগীদের কাছে
না আছে কোরান, নেই ঠিক-ভুল ভেদ…
এমন এক জ্ঞান তাঁরা পেয়েছেন খুঁজে
বুদ্ধি যার সামনে এসে স্খলিত, বেপথু।
বলো কোনদিকে ওরা তবে
সিজ্দা করবে মাথা নুইয়ে, জানাবে প্রণতি?
১৭
‘হও’ কিংবা ‘কুন্’ বলে কোনও ডাক আসেনি
তখনও…
না বায়ু না মাস,
না ছিল আদম কিংবা অন্য কোনও চেহারা-সুরত,
সেই ক্ষণে, সেই সুসময়ে
তোমাতে আমাতে দেখা হয়েছিল প্রভু…
১৮
আমার আর তার মধ্যিখানে
রয়ে গেছে
খর আর খাড়া এক বিরাট পাহাড়।
জীবনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে যারা
তারা ওই পাহাড়ের কাছে যেতে ভীত…
কিন্তু আমি মৃত্যুকে নিজেই
আমন্ত্রণ করে ডেকে আনি,
আর বলি, দেখাও আমাকে পথ,
চলো, ওই পাহাড়ের ওপারে আমাকে নিয়ে চলো…
১৯
দুঃখেরা আমাকে বড় যত্নআত্তি করে,
সেই যত্নে আছি বর্তে বেঁচে,
সুখের আকাঙ্ক্ষা নেই কোনও,
দুঃখের বাগানে আমি ফল হয়ে আছি…
২০
হে বেদনা,
তোমারই ভিতরে আমি বেড়ে উঠি যেন…
লাখ লাখ সুখের নিমেষ কিংবা নিজের মাথার বিনিময়ে
আমি শুধু ক্ষণমাত্র আলিঙ্গন চাই হে তোমার…
২১
পতঙ্গের মতো যদি পুড়ে যাও,
ধ্বংস হয়ে যাও যদি প্রদীপ শিখায়,
কিছুই তাহলে জানা হবে না তোমার…
দহন-সহনে তুমি অপারগ রয়েছে তাহলে…
২২
প্রণয়-তাড়িত হয়ে,
যদি না সে ঝাঁপ দিত নদীর ভিতর,
এ পৃথিবী সোহ্নিকে ভুলে যেত কবে…
মরণ তো হত তার ঠিকই এক দিন,
এই ডুবে যাওয়া তাকে পুনর্জন্ম এনে দিল ফের…
২৩
ঘাস কাটা হয়ে গেলে পর
যেমত খড়ের কান্না পড়ে থাকে মাঠে,
তেমন-ই আর্তনাদ করে এই হৃদয় আমার।
কেন যে এখনও তুমি ওহে চিকিৎসক
ওষুধ ঘষেই যাচ্ছ আমার বাহুতে!
২৪
এক বুক জলের ভিতর
দাঁড়িয়ে থেকেও কেউ তবু
রদ করতে পারে ভিজে-যাওয়া ?
হে পবিত্রতম,
এ রহস্য শেখাও আমাকে…
২৫
ঠিক দিকে যদি তুমি মুখ রাখতে পার,
প্রকাণ্ড মসজিদ হয়ে উঠবে দেখো গোটা পৃথিবীই।
যোগীরা পারেন সেই মহা উচ্চতায় উঠে যেতে,
জ্ঞানের চেয়েও বেশি উঁচু সেই ঠাঁই।
বলে দাও কোন্ দিকে এখন আমি নত করব শির,
সমস্তই যদি তিনিময় হয়ে থাকে…
২৬
এইবার, এসো হে বিরহ…
মিলন এখন
মিহি এক কাপড়ের মতো
তফাতে রেখেছে যেন আমাকে-তোমাকে…
সব ক্ষত শুকিয়ে গিয়েছে আজ,
ব্যথার সে সুখ আমি ফেলেছি হারিয়ে…




