দুই উত্তম, এক চরিত্র

Uttam Kumar

যে বাড়ির নাম ‘উদাসীন’, সেই বাড়ির বাসিন্দারা— চারপাশের মানুষজন, তাদের বেঁচে থাকা না-থাকা, তাদের যাপন কিংবা মন, সব ব্যাপারেই আশ্চর্যরকম উদাসীন। বরং, ধনে-মানে তাদের থেকে নিচের তলার পাঁচপেঁচি লোকজনকে বাড়ির বারান্দায় উঠতে দিলেও, ‘উদাসীন’-এর আভিজাত্যের পারদ নেমে যায়। গরিব-গুর্বো, চাকরবাকর ক্লাসের প্রতি চরম উপেক্ষা আর উদাসীনতায় ‘উদাসীন’-এর গৌরব সুরক্ষিত থাকে। বাড়ির কর্তা, গিরিডির মস্ত উকিল চারুবাবুর গাড়িটা ‘উদাসীন’-এর গেট পেরনোর পরের কয়েকটা শটেই ব্যাপারগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়‌।‌ আর চিত্রনাট্য আরেকটু এগোতে না-এগোতেই আমরা বুঝে যাই, চারুবাবুর জীবনদর্শন খুব কড়া এবং সোজা। সে অন্যের উপকার করে না, কারও উপকারের ধারও ধারে না। কারণ, সে বিশ্বাস করে, এই দুনিয়ায় টাকা খরচ করতে পারলে, কাজের লোক থেকে বাড়ির জামাই, সবই কেনা যায়। 

আর চারুবাবুর একমাত্র মেয়ে যূথিকার জন্য জামাই হাসিল করার প্রকল্পের সূত্রেই ‘উদাসীন’-এর চৌকাঠ ডিঙোনোর সুযোগ ঘটে যায় লোহাপুলের কাছে দেহাতিদের ঝুপড়ি-ঝুগ্গি বস্তির একমাত্র বাঙালি বাসিন্দা ‘হোমিও হিমু’-র। এই হিমুর সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার আগেই আমরা চারুবাবু ও তার গিন্নির সংলাপ থেকে আমরা মোটামুটি আঁচ করে ফেলি যে, হিমু হল, এই গিরিডি শহরে, মোটামুটি সম্ভ্রান্ত, ভদ্রবিত্ত বাঙালি পরিবারের কুমারী কন্যাদের দূরপাল্লার রেল-সফরের অতি দায়িত্বশীল চলনদার।

এই মেয়ে-পাহারার একটা জুতসই নমুনা দিয়েই ছবিতে হিমুর সঙ্গে আমাদের আলাপ করানো হয়। গিরিডি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কোনও দূরপাল্লার ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে, ট্রেনের কামরা থেকে গন্ডাখানেক তরুণী কলকল করতে-করতে নামল‌।‌ তাদের পিছনে হাতে-মাথায় লটবহর নিয়ে জনাতিনেক কুলি। আর সবার শেষে মুখে কিছুটা উদ্বেগ, অনেকটা ব্যস্ততা নিয়ে কামরার দরজায় এসে দাঁড়াল এক সুদর্শন যুবক‌। উদ্বেগ, মেয়েদের অভিভাবকরা সবাই তাদের নিতে এসেছেন কি না। ব্যস্ততা, কারণ কুলিদের পাওনাগন্ডা মিটিয়ে মেয়েদের বাবা-কাকাদের পুরো হিসেবটা বুঝিয়ে দিতে হবে তো। অভিভাবকরা অবশ্য তক্ষুনি কেউই অত পাইপয়সার ফর্দ বুঝতে আগ্রহী নয়‌। তারা ‘মাল বুঝিয়া পাইলাম’ গোছের একটা মৌখিক সার্টিফিকেট দিয়ে, যে যার মেয়েকে নিয়ে, টাঙ্গা বা রিকশায় চড়ে বাড়ির দিকে রওনা হন। মেয়েরা যেতে-যেতে তাদের প্রিয় হিমুদাকে টা-টা করে। হিমুদা ঠোঁটের কোণে একটা পেশাদারি সৌজন্যের হাসি ঝুলিয়ে তার ‘ক্লায়েন্ট’-দের দিকে অভ্যাসের হাত নাড়ে। মেয়েরা চলে যায়‌। আরে হিমু তার চোখেমুখে, গোটা শরীরে একরাশ ক্লান্তি আর অবসাদ নিয়ে লোহাপুলের কাছে তার ঝুপড়িতে ফিরে আসে।

আরও পড়ুন: সমরেশ বসুর উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে নায়ক হতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন উত্তমকুমার!
লিখছেন গৌতম ঘোষ…

কিন্তু ওই মেয়েদেরকে কি তার ‘ক্লায়েন্ট’ বলা যায়? ওই মেয়ে-পাহারাদারির জন্য তো সে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে  রাহাখরচটুকু বাদে আর কোনও পারিশ্রমিক নেয় না। লোকে ভালবেসে, ভরসা করে তাকে মেয়েদের পৌঁছে দেওয়ার ভার দেয়। সেও খুশি মনে এই উপকারটুকু করে দেয়। হোমিও-হিমুর হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিসও প্রায় ওরকমই। কেননা, হিমুর রোগীরা প্রায় সবাই মহল্লার দিন আনি-দিন খাই স্থানীয় দেহাতি মানুষ।ভিজিট দূরের কথা, ওষুধের দামটকু দেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। মানে, সেই দাতব্য চিকিৎসালয়! সব মিলিয়ে হিমু লোকটা কে, কী, কেমন— গিরিডি শহরে কীভাবে তার বেঁচেবর্তে থাকা— এই পুরোটাই, হিমুর স্টেশনে নামা থেকে বস্তির ঘরে ফেরা, আবার জরুরি তলব পেয়ে ‘উদাসীন’-এ যাওয়া— এই পর্বটুকুর মধ্যেই দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এই কয়েকটা মাত্র দৃশ্যে, অল্প সংলাপ অনেকটা অভিব্যক্তি ও অভিনেতার বিজনেসে একটা চরিত্রকে দর্শকের মনে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়ার জন্য যেমন চিত্রনাট্যকার হীরেন নাগ ও পরিচালক অজয় করের যথেষ্ট ভূমিকা আছে, তেমনই, অনেকটাই কৃতিত্ব, হিমুর ভূমিকাভিনেতা উত্তমকুমারের।

সুবোধ ঘোষের একই নামের উপন্যাস থেকে ১৯৬০ সালের শেষের দিকে অজয় করের ‘শুন বরনারী’ যখন মুক্তি পাচ্ছে, উত্তমকুমার ততদিনে বাঙালি রোমান্সের অবিসংবাদী স্বপ্ন-অবতার। ‘শুন বরনারী’ মুক্তি পাওয়ার বছর খানেকের মধ্যেই অজয় করেরই পরিচালনায় মুক্তি পাবে ‘সপ্তপদী’। ওই ছবিতেই উত্তম সুচিত্রা জুটির রোমান্টিক অভিযান তার শিখর ছোঁয়। এরপরে এই রোমান্স-যুগলের কিছু ছবি হলেও, ‘সপ্তপদী’-র পর থেকেই দু’জনার দু’টি পথ দু’টি দিকে ক্রমশই বেঁকে গিয়েছিল। যাই হোক, ‘সপ্তপদী’-র নায়ক কৃষ্ণেন্দু ছিল সবেতেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। মেডিকেল কলেজের পরীক্ষা, ফুটবল খেলার মাঠ কিংবা নায়িকা রিনা ব্রাউনের সঙ্গে প্রাক-রোমান্স ছেড়ছাড়— সব কিছুতেই সে সেরার সেরা। এমনকী, একদিনও রিহার্সাল না-দিয়ে কলেজ সোশ্যালে ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতি’-তে ওথেলোর ভূমিকাতেও সে এমন দুরন্ত প্রক্সি দেয়, দেসদিমোনা রিনা ব্রাউনের পাষাণ হৃদয়েও রোমান্স উথলে ওঠে। 

‘শুন বরনারী’-র হিমু এই সর্ববিদ্যা পরাক্রম কৃষ্ণেন্দু নয়, এমনকী, তার ধারেকাছেও নয়। সে আসলে কেউ না— পাটনা স্টেশনে নেমে মামিমার কাছে প্রথমবার হিমুর পরিচয় দিতে গিয়ে যেমনটা বলেছিল যূথিকা। ছবির শুরু থেকেই উত্তমকুমার নায়ক হয়ে ওঠার উল্টো রাস্তায় এই ‘কেউ না’ হওয়ার চেষ্টায় মেতেছেন, বা ‘উত্তমকুমার’ হওয়ার থেকেও এই ‘কেউ না’ হওয়াটাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। একটা মানুষ, যার আস্ত অস্তিত্বটাকেই, এক রূপসী যুবতী বংশ আর আভিজাত্যের দেমাকে নস্যাৎ করে দেয়, বা তেমনটা করে দেওয়া যায়, তার কেমন হয়ে থাকা উচিত? বিশেষ করে, বাঙালিবাবুদের প্রিয় ‘ড্যাঞ্চিল্যান্ড’-এ এই বাবুবাড়ির ‘বিটি’-দের লম্বা রেলসফরকে একশোভাগ নিশ্চিন্ত তথা নিরাপদ রাখা এবং সেই সঙ্গে একধরনের ফাইফরমাশ খাটাটাই যখন তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে! হিমু কি তাহলে সদা-ত্রস্ত, সচকিত, অতিরিক্ত হাত-কচলানো টাইপ হবে— যার মেরুদণ্ডে আত্মবিশ্বাসের লেশমাত্র থাকবে না? অথচ সেটা তো সম্ভব নয়! কারণ, উত্তম‌কুমারের পর্দা- ব্যক্তিত্বের যেটা ব্র্যান্ড ইউএসপি, সেই কমনীয় বা আজকের ভাষায় যাকে বলে মেট্রোসেক্সুয়াল— সেই পৌরুষটুকু তো থাকতে হবে।

পর্দায় উত্তমকুমারের হিমু তাই নির্বিরোধী, কিন্তু গোবেচারা, নিরীহ নয়। নমনীয়, কিন্তু এতটা আপসপ্রবণ নয় যে তাকে মারিয়ে যাওয়া যাবে। সে পরোপকারী, কিন্তু নিজের শর্তে। চোখ রাঙিয়ে, মেজাজ দেখিয়ে তাকে দিয়ে কিছু করিয়ে নেওয়া যাবে না। তার মাধুর্য আর সৌজন্যবোধের আড়ালে তার স্বভাবে এমন একটা দৃঢ়তা আছে— তার ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাবলে সেই কঠিন দেওয়ালে ঠোক্কর খেতেই হবে। সেটা হিমু-র সঙ্গে প্রথম মোলাকাতেই ‘উদাসীন’-এর চারুবাবু মালুম পেয়েছিল। হিমু-র অন্দরে উত্তম-পার্সোনাকে তিরতির করে বইয়ে রাখার একটা সুচারু খেলা আছে চিত্রনাট্যে। চারুবাবু ও তার হবু জামাই নরেন যেখানে মনে করে, টাকা আর ক্ষমতার জোরেই দুনিয়াকে মুঠোয় রাখা যায়— সেখানে হিমু খালি-পকেট আর খোলা মুঠি নিয়ে, অর্থ আর ক্ষমতার অপ্রয়োজনের একটা পালটা কিস্‌সা, একটা উলটো ‘স্টেটমেন্ট’ তৈরি করে ছবি জুড়ে। আরেকজন নেই-মানুষের, কেউ না হয়ে থাকার একটা অন্যরকম পৌরুষই শেষ অবধি ভাসিয়ে নিয়ে যায় ‘উদাসীন’-এর গরবিনী কন্যা যূথিকাকে।

এখন হিমু-র নির্বিকার সন্তসুলভ পৌরুষ না কি তার যাপন ও জীবন ঘিরে হালকা কুয়াশার মতো রহস্য-রেখা— ‘উদাসীন’-এর মেয়েকে কোনটা বেশি আকর্ষণ করেছিল, অথবা দুটোর যৌথ অভিঘাত বা ডাবল অ্যাকশনেই মাপা হাসি, মাপা কথার ডাঁটিয়াল মেয়েটি অমন আলুথালু অভিসারিকা রাই হয়ে গেল, চিত্রনাট্যে ইচ্ছে করেই সেটা খোলসা করা হয়নি। আর চিত্রনাট্যের এই না-বলা বাণীকেই, পুরো ছবিজুড়ে তাঁর চোখের অভিব্যক্তি, ঠোঁটে হাসির আভাস বা তা গোপন করে নেওয়া, মুখের পেশিতে জড়িয়ে থাকা চাপা কৌতুক, কৌতূহল, বেদনায় ধারণ করে রেখেছিলেন উত্তমকুমার।

‘শুন বরনারী’ এমনিতে যূথিকা বা সুপ্রিয়ার ছবি। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতা হিসেবে সেই বছরেই বাঙালি দর্শকের বুকের তারে যে-গহন কাঁপন তিনি তুলেছিলেন, সেই আবেগের রেশ থাকতে-থাকতেই ১৯৬০-এর শেষে এসেছিল ‘শুন বরনারী’। এই সাদা-কালো ছবিতেও যূথিকার মন-মর্জির কত মেঘ-রোদ্দুর, অভিমান-অধিকারবোধ, এমনকী গোপন ঈর্ষারও কত রঙের পরত নিয়ে এসেছেন সুপ্রিয়া। আর তাঁর সমস্ত উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস, উদ্‌বেগ এমনকী তাঁর নিবেদন, সমর্পণ, আক্রমণ— সবটাই এক আশ্চর্য নৈর্ব্যক্তিক নীরবতায় গ্রহণ ও আত্মস্থ করেন উত্তমকুমার।

এভাবেই ‘শুন বরনারী’ হয়ে ওঠে এক আশ্চর্য প্রেমের উপাখ্যান। উত্তমকুমার এখানে এমন এক রোম্যান্স অবতার, যিনি রোম্যান্সকে ছোঁয়াচে রোগের মতোই বিপজ্জনক মনে করেন ও তার থেকে পালিয়ে বেড়ান। কিন্তু কেন হিমু এমন  করে, তার পিছনে পুরনো ব্যর্থ প্রেমের কী করুণ স্মৃতি আছে, সেসব আমরা ক্লাইম্যাক্সে জানতে পারছি। যূথিকার প্রেম ফিরিয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে তা কতটা দাঁড়ায়, একজন বড়লোকের মেয়ে তাকে ঠকিয়েছিল বলে সবাই ঠকাবে, এমন বোকা-বোকা সরলীকরণ করা যায় কি না, আমরা সেসব প্রশ্নেও ঢুকছি না। তবে গিরিডিতে যে-হিমুকে আমরা দেখছি, সেটুকুই যে আসল মানূষটা নয়, তার যে একটা পূর্বাশ্রম, একটা অন্য গল্প আছে, সেটা যূথিকার মতো আমরা দর্শকরাও আন্দাজ করছি, কৌতূহলী হচ্ছি। টান টান কোনও উত্তেজনায় আলোড়িত না হলেও, কিছু-একটা-মিলছে-না গোছের অস্বস্তিতে ভুগছি। আর পর্দার নেই-মানুষের ভাঁজে, না-জানা অতীতের একটা আবছা, প্রায় অস্তিত্বহীন অন্য মানুষটাকে লুকিয়ে রেখে উত্তমকুমার, সুপ্রিয়া বা যূথিকার পাশাপাশি আমাদের সঙ্গেও রহস্য-রহস্য খেলাটা খেলেন।

আর হিমু-র অন্তরালের রহস্য খুঁজে বের করার তাগিদেই যূথিকা বা সুপ্রিয়া, মেয়ে-পাহারাদার হিমু-র অন্দরে রোম্যান্টিক নায়ক উত্তমকুমারকে ক্রমশ আবিষ্কার করতে থাকে। গিরিডি-পাটনা যাওয়া-আসার মোট চারটি ট্রেন-সফরে, যূথিকা-হিমুর পরিচয়পর্ব থেকে প্রণয়— সবটাই ঘটে যায়। চিত্রনাট্য ও পরিচালকদের অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধ এই নিরুচ্চার রোম্যান্সের ফুলটাকে একটু-একটু করে পাপড়ি করে মেলতে দিয়েছে। অভিভাবকদের ঠিক করে দেওয়া সুযোগ্য, শাঁসালো পাত্র যাতে অন্য পাত্রীপক্ষের পাল্লায় পড়ে হাতছাড়া না হয়ে যায়, তাই চলনদার হিমু-র সঙ্গে প্রথমবার পাটনা গিয়েছিল যূথিকা। আর ‘মিশন নরেন’ সফল করে, বিয়ের দিন পাকা করে শেষবার যখন সেই হিমুর পাহারাদারিতেই গিরিডি ফিরছে যূথিকা, তখন হিমু-র জন্য তার বুকের ভিতর উথালপাথাল। ‘উদাসীন’-এর আভিজাত্যের মোড়কেও সেই আকুলতাকে গোপন করা যাচ্ছে না। অথচ যূথিকার অন্তরমহলের তুমুল ঝড়বাদলের সবটুকু আভাস পেয়েও হিমু, উত্তম একটা আপাত-পেশাদারি ভদ্রতা ও সৌজন্যের পর্দা টাঙিয়ে ইচ্ছে-মন-বাসনার সব অনুভূতিগুলো ঢেকে রাখেন, বা রাখার অভিনয় করেন। এই অভিনয়ের চেষ্টাটা যূথিকার সামনে লুকালেও, দর্শকের কাছে তিনি স্পষ্ট করে দেন।

এই ছবিতে অজয় কর প্রবাসী বাঙালি উচ্চ-মধ্যবিত্তর আধুনিকতার ঠুনকো বড়াইয়ের কাচের দেওয়াল কীভাবে ভেঙেছেন, দুই যুবকের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন বোঝাতে আলো-ছায়ার কী দুর্দান্ত ব্যবহার করেছেন, সেসব অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু যূথিকার চোখে হিমু-র রূপান্তরের প্রতিটা পর্ব, তাঁর ন্যূনতম সংলাপ, মুখের কমনীয় রেখায়, চোখের আর্দ্র কোমলতায় উত্তমকুমার কেমন লিথোগ্রাফ ছবির মতো করে ফুটিয়ে তুলেছেন— তা হাঁ করে দেখতে হয়। প্রথম দেখায় কেজো, বিরক্তিকর, অতিরিক্ত দায়িত্ববান যে-হিমু মালপত্র-খরচপাতির সব হিসেব নোটবইয়ে টুকে রাখে,  প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গপগপিয়ে অমার্জিত ভঙ্গিতে পুরি-সবজি খায়, বা ট্যাঁক থেকে গুনে-গুনে যূথিকাকে ছ-পয়সা ফেরত দেয়, আবার ছবির শেষে যে-হিমু হাত বাড়িয়ে একেবারে নায়কোচিত ভঙ্গিতে যূথিকাকে চলন্ত ট্রেনে তুকে নেয়— দুজনেই উত্তমকুমার। একইসঙ্গে আন্ডার অ্যাকটিং-এ অসম্ভব দক্ষ একজন চরিত্রাভিনেতা এবং একজন ম্যাটিনি আইডল— হিমু এই দুজনের যৌথ নির্মাণ।