এককালে সেভিল রো থেকে দেশনায়ক চিত্তরঞ্জন দাশের স্যুট তৈরি হয়ে আসত। শুধু চিত্তরঞ্জন কেন, সেকালে বিলেত গেলে সাহেব দর্জিদের মোকাবিলা করতে হত অনেককেই। বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে সাহেব দর্জি রামমোহন রায়ের স্টাইলে চোগা চাপকান বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পোশাক প্রফুল্লচন্দ্রর বেজায় ঢিলে হলে দর্জি কৈফিয়ত-স্বরূপ বলেছিলেন, ‘মশাই আপনি এত সরু আর পাতলা যে আপনার শরীরের জন্য মাপসই জামা তৈরি করা খুব শক্ত।’ সব সাহেব দর্জি অবশ্য এমন হত না। ১৯২৯-এর বিলেত প্রবাসপর্বে টুইডের কোট করাবার জন্য গেলে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে যেমন সাহেব দর্জি মাপ নিতে নিতে বেশ প্রশংসার সুরে বলেছিলেন, “স্যার ডিড এনিবডি এভার টেল ইউ দ্যাট ইউ হ্যাভ এ ফিল্মস্টার’স ওয়েস্ট?” কলকাতাতেও স্যুট, কোট, প্যান্ট করানোর কেতাদুরস্ত দোকান ছিল বেশ কিছু। কিছু রাস্তা রয়ে গেছে পুরনো জমানার ওস্তাদ দর্জিদের স্মরণ করে। দর্জিপাড়া লেন, গুলু ওস্তাগর লেন, এখনও অতীতের ঐতিহ্যের গন্ধমাখা।
ওস্তাদ দর্জিদের কথা থাক। আগেকার জমানায় মেয়েদের সেলাই বোনায় পারদর্শিতাকেও গুণাবলির মধ্যেই ধরা হত। বিয়ের বাজারে মেয়েদের কদর বাড়ত। এখন থেকে চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর আগে মহিলারা কম বেশি সকলেই সেলাই বোনায় পারদর্শী ছিলেন। শ’খানেক বছর আগে, অর্থাৎ দুই প্রজন্ম আগের বিবাহযোগ্য মেয়েদের অনেকেই কার্পেটে বা আসনে রঙিন সুতোয় ফুটিয়ে তুলতেন, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ বা ওই জাতীয় কোনও বাণী, যা পাত্রপক্ষের সামনে হবু বউ হিসেবে তাদের কদর বাড়াত। যারা আরেকটু বেশি আধুনিকা, সাহসিকাও বটে, তারা সদ্য-পাওয়া রোমান্টিকতার পাখনায় ভর করে লিখে ফেলতেন, ‘যাও পাখি বলো তারে’-র মতো স্পর্ধাভরা বাক্য। তারও বেশ কয়েক দশক পরে, ছয় কিংবা সাতের দশকের যুবতী মেয়ে-বউরা পুরনো খোলা ইডেন উদ্যানে নরম শীতের রোদে গা এলিয়ে ধীর লয়ের গাভাসকর বা ওয়াদেকরের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মৃদুমন্দ গতিতে পশম বুনতে বুনতে সময় কাটাতেন। ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসের জমানার ধ্বংসলীলা দেখতে দেখতে মাদাম দেফার্জের সেই বিখ্যাত পশম বোনার চেয়ে একটু হলেও অন্যরকম৷ ইডেনে তন্দ্রালস দুপুরে উল বোনার মতো সামাজিক স্ট্যাটাস যারা অর্জন করতে পারেননি, সেইসব মেয়েরা হয়তো পাড়ার বা স্কুলের সেলাই দিদিমণি হতেন। তাঁদের নিয়েও কবিতা, গান কম লেখা হয়নি৷
আরও পড়ুন: মাঝবয়সে চশমা পরার আশীর্বাদ ও অভিশাপ! লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…
যে-সময় মহিলারা সেলাই-ফোঁড়াইয়ে অভ্যস্ত ছিল, আমার ছোটবেলা সেই সময়টাতেই কেটেছে। অথচ সেলাই-ফোঁড়াইয়ে প্রবল অনীহা ছিল আমার। বড়জোর, বড়-বড় করে টাক সেলাই দেওয়া পর্যন্ত ছিল আমার দৌড়। উল-কাঁটায় সোজা উল্টো বুনতে শিখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু দু-তিন ঘর বুনলেই আমার হাত টনটন করত। আমার এইসব অক্ষমতার জন্য আরেকজন মহিলা অংশত দায়ী ছিলেন৷ তিনি আমার মা। মার সূচিশিল্প আত্মীয়মহলে বহুখ্যাত ছিল। চেনা মহলে এমন পরিবার ছিল না যাদের মা এমব্রয়ডারি করা সূক্ষ্ম কারুকাজের টেবিলঢাকা উপহার দেয়নি৷ এমন শিশুর অস্তিত্ব ছিল না, যার জন্য মা মনোরম ডিজাইনের সোয়েটার বোনেনি। মা সেলাই বোনায় এমন তুখড় হওয়ার দরুণ, সীবন বা বুননশিল্পে উপযোগহীনতা-জনিত কারণে মেয়ের দক্ষতা অর্জন করা হয়নি৷

কিন্তু, মনে পড়ে, আমাদের কৈশোরে ওয়ার্ক এডুকেশন নামে একটি বস্তু ছিল, যেখানে ডবল উলের মাফলার নির্মাণ, কার্পেটের আসন তৈরি করা, ক্রুশের কাজের শায়া বা পেটিকোট তৈরি করা ইত্যাকার অ্যাসাইনমেন্ট থাকত। অথবা হাতে-কলমে মোগলাই পরোটা তৈরির মতো কোনও একটা রান্না। কিশোরী মেয়েদের ভবিষ্যৎ সংসারজীবনে সুগৃহিণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যাতে কোনও অসুবিধে না হয় সেই কথা ভেবেই নিশ্চয়ই স্কুলের কর্মশিক্ষার শিক্ষয়িত্রীরা এমন সব দুরূহ টাস্ক সেট করতেন৷ বলা বাহুল্য হাতেকলমে ডিম ঘুঁটে ময়দা মেখে মোগলাই পরোটা বানাবার মতো দুরূহ টাস্ক আমি কখনওই নিইনি, কারণ সূচিশিল্পে বাড়িতে মায়ের দৌলতে ভাল নম্বর ছিল আমার বাঁধা। সুতরাং, নিখুঁত শিল্পকর্মের নমুনা যখন কর্মশিক্ষার ক্লাসে পেশ করতাম, তখন এক আধবার দিদিমণিরা সরু চোখে তাকালেও ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল বলে ওপেনলি চ্যালেঞ্জ করতেন না কেউ। যেন এমন চমৎকার হাতের কাজ হওয়াটাই আমার পক্ষে স্বাভাবিক ও দস্তুর।
ছোটবেলা থেকেই মাকে অবসর সময়ে সেলাই করতে দেখেছি। শীতকালে হাতে উঠত উলকাঁটা। দেখতাম, আমার মাসিদের কাছ থেকে পাওয়া নতুন কোনও ডিজাইনে তৈরি হচ্ছে আমার সোয়েটার। বিভিন্ন অংশ জোড়া দেওয়া, গলা ফেলা, মাঝেমধ্যে গায়ে ফেলে মেপে দেখা, এসব চলতে থাকত। মাঝে-মাঝে বোনার জায়গা নিত ক্রুশের কাজ। অদ্ভুত নৈপুণ্যে একটি বেঁটে ক্রুশকাঠিতে দ্রুত সুতো জড়িয়ে জড়িয়ে লেস বুনত মা। সেলাইয়ের বাক্সে হরেকরকম সূচ-সুতো ছাড়াও রাখা থাকত হালে পাওয়া কোনও ফুল-পাতার নকশা, বা কলকা করা প্যাটার্ন মাখন-মাখন রঙের খড়মড়ে ট্রেসিং পেপারে। সেগুলো হাতের নৈপুণ্যে রিপ্রোডিউসড হত টেবিলের রকমারি ঢাকায়। বহুবর্ণ ও সূক্ষ্ম নকশার সেসব টেবিলঢাকাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাতা হত বিভিন্ন আকৃতির টেবিলে। তখনই চিনতে শিখি এমব্রয়ডারির নানা প্যাঁচপয়জার। কোনটা রান কোনটা বা হেম সেলাই। মাঝে মরশুমি ফুলের মতো উঁকি দিল ডেজিনেটরের ফুল। একটি ছোট্ট চাকতির ভেতর ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে উল দিয়ে রংবেরঙের ফুলের নকশা তোলার হিড়িক পড়ল। কখনও আমদানি হল ক্রসস্টিচের বই। ক্রসস্টিচের নকশা করা খুব সহজ। হালকা জালি-জালি কাপড়ে ঘর গুণে সমান করে গুণের মতো ক্রস চিহ্ন দিয়ে আমি অবধি ফোঁড় তুলে তৈরি করলাম আমার পছন্দমতো কতিপয় বেড়াল, কুকুর, খরগোশ ও তাদের পরিবারবর্গ। সন্তানসম্ভবা ছোটপিসি বাপের বাড়ি থাকার সময় হলুদ ক্রসস্টিচের কাপড়ে ড্রেসিং টেবিলের টেবিল ঢাকা বানাল। সে ঢাকায় ছানাপোনা-সহ হাঁস ও মুরগিরা শোভা পেত। মা কিন্তু লতাপাতা-ফুলের কারুকাজই বজায় রেখেছিল৷ তুলি আর রং দিয়ে ফেব্রিক করার সময়ও মার হাতের কাজে ঘুরিয়েফিরিয়ে আসত বহুবর্ণ লতাপাতা, কলকা বা ফুলের গুচ্ছ। হাতে সেলাইয়ের পাশাপাশি চলত মেশিনে সেলাই। নিত্য প্রয়োজনের পাজামা বালিশের ওয়াড়ের পাশাপাশি শাশুড়ির জন্য ছিল সেমিজ তৈরি করা। আমার ফ্রক অবধি মেশিনে বানিয়ে নিয়ে তাতে ছোট্ট লতাপাতার এমব্রয়ডারি করে দিত মা। এক ঘনঘোর বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ‘মেরিট’ নামক সেলাই-মেশিন কেনার স্মৃতি মনে এখনও উজ্জ্বল। কিশোরী বয়সে অন্যের বাড়িতে গিয়ে সেলাই মেশিনের কায়দা রপ্ত করেছিল মা। তারপর পয়সা জমিয়ে কেনা প্রথম সেলাই মেশিনটি বিয়ের পর ছেড়ে এসেছিল ছোট বোনের তত্বাবধানে। তার দশ-বারো বছর পর নিজস্ব মেশিন পেয়ে কী যে আশ্চর্য হাসি ফুটেছিল মায়ের মুখে!
সাধের সেলাই মেশিন, উলকাঁটা আর সেলাইয়ের বাক্স ফেলে রেখে কবেই চলে গেছে মা। সেলাইয়ের বাক্সের ওপর এক ছোট্ট ছেলের মুখের ছবি। অবোধ বিস্ময়ভরা চোখের সেই শিশুর গায়ের রঙে বসরাই গোলাপের আভা৷ চোখের মণি নীলবর্ণ। বোঝাই যায়, সাহেবদের দেশের সাদা শিশু সে। বাক্সটা বহুদিন হারিয়ে গেছে।

ইদানীং, কোনও পাড়ায় সেলাই দিদিমণিরাও আছেন কি না জানি না! কারণ এখন সেলাই বোনা, এমনকী, সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারিরও দখল নিয়েছে যন্ত্র৷ পাড়ায়-পাড়ায় অবশ্য সেলাই মেশিন নিয়ে কিছু মানুষ বসেন এখনও। ‘আলিবাবা’ নাটকে বাবা মোস্তফার মতো ওস্তাদরা হয়তো নেই, যারা কাটা শরীর বেমালুম জুড়ে দিতে পারে, তবু পাড়ায়-পাড়ায় কিছু টেলরিং শপ আজও ঠিকই রয়েছে এই রেডিমেডের যুগেও। লক্ষ করলে দেখা যায়, বাড়িতে ‘সেলাই জানা’ মেয়েদের মহিলাসুলভ গুণের মধ্যে ধরা হলেও বাইরে সেলাই মেশিন নিয়ে বসা দর্জিরা কিন্তু প্রায় সকলেই পুরুষ। অর্থাৎ, এ-ব্যাপারে সমাজের একটা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আছে, যেখানে বাইরের পেশাদার দর্জিমাত্রই পুরুষ। যদুবাবুর বাজারে সার দিয়ে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ জন পুরুষ দর্জি বসেন এবং তাঁদের হাত কখনও খালি থাকে না৷ এঁদের মধ্যে যে মানুষটির কাছে টুকটাক রিপু করাতে যাই, তিনি একবার সগর্বে বলেছিলেন, ‘ছেলে টিসিএসে চাকরি করছে। বলে তোমার কাজ করার দরকার নেই৷ আমি বলি, যাই একটু বসি গিয়ে দোকানে। হাত দুটো সচল থাক।’
হাত সচল থাকার থেকে মনে পড়ল আমাদের পাড়ার মোড়ে যে লোকটি পা মেশিন নিয়ে বসেন, কয়েক মাস আগে চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে তার বাঁ-হাতটি কাটা পড়েছে। পাড়ার সকলে বলেছিল, ওর ব্যবসা লাটে উঠবে। সকলের কথাকে মিথ্যে করে তিনি আবার বসছেন মেশিনে। একহাতেই তৈরি করে চলেছেন ফরমায়েশি জিনিস। অদম্য মনোবলে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন। তাঁর মেশিন চালুই আছে। শুধু আমাদের বাড়িতে পঞ্চাশ বছর আগের সেলাই মেশিনটা তিরিশ বছর আগেই থেমে গেছে৷ ওটা ঘরের এককোণে পড়ে থাকে মৃত দিনের গন্ধ মেখে।
বিয়াট্রিক্স পটার লিখেছিলেন ‘টেলর অফ গ্লস্টার’। আমাদের পাড়ায়, মোড়ের মাথায় তখনও মোটা ফ্রেমের চশমাপরা এক বুড়ো দর্জি একটু ঝুঁকে আপন মনে সেলাই মেশিনে কাজ করত৷ আমরা বলতাম, ওই বুড়ো দর্জি আমাদের টেলর অফ গ্লস্টার। তাকেও আর দেখি না বহুকাল!




