শিল্পের পরিসরে সাধারণত আমরা দুই উপাদানের কথা ভেবে থাকি; প্রথমটি হল, শিল্পকর্ম এবং অপর উপাদানটি দর্শক, যার উপলব্ধিতে শিল্পকর্মটি নতুন এক জীবন পায়। হোয়াইট কিউব প্রদর্শনশালা, বিস্তৃত পরিমণ্ডলে সাজানো ল্যান্ড আর্ট, অথবা পারফরম্যান্স আর্ট— সবের মূলেই থাকে শিল্পের সঙ্গে দর্শকের নিবিড়, নির্জন এক সম্পর্ক। অনুধাবনের সম্পর্ক, অনুভূতির সম্পর্ক। তবে এই যে সহজ দ্বিমুখী সমীকরণ, তা তৈরি হওয়ার সময়ে থাকে আপাত-অদৃশ্য কিছু চালিকাশক্তি, সহজে যার ধারণা বোঝাতে গেলে বলা যায়, জহুরির চোখ। শিল্পের জগতে এই ‘জহুরির চোখ’-এর ভূমিকা যে পালন করে, তাকেই বলা হয় ‘কিউরেটর’।
কলকাতার, তথাপি বাংলার শিল্প প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কিউরেশনের ধারণা প্রবেশ করেছে অনেকটাই পরে; সাম্প্রতিক কালের বেঙ্গল বিয়েনাল যদিও ‘curated’ এক শিল্পপরিসর তৈরি করেছিল, তবু আন্তর্জাতিক স্তরের এই শিল্প সংগ্রহের ধারণা আপামর জনসাধারণের কাছে কিছুটা আবছা। বলতে গেলে, ‘curation’-এর ঠিক-ঠিক বাংলা প্রতিশব্দও নেই— সংগ্রহ অথবা নির্বাচন এর সবচেয়ে কাছাকাছি দুই অর্থ, কিন্তু কিউরেশনের সঠিক সংজ্ঞা বলতে গেলে, এর অর্থ হওয়া উচিত শিল্প-সম্পাদক। এই শিল্প-সম্পাদনের ধারণা, আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় ক্ষেত্রে বহমান কথোপকথন এবং দেশবিদেশের দশজন দিকপাল কিউরেটরদের এবং শিল্পচিন্তকদের নিয়ে শহর কলকাতার বুকে দুইদিনব্যাপী এক হাবের আয়োজন করেছিল কলকাতার আর্ট গ্যালারি ‘এক্সপেরিমেন্টর’।
এক্সপেরিমেন্টরের অভিভাবক প্রতীক এবং প্রিয়াঙ্কা রাজার সুপরিকল্পনায় শিল্পসম্পাদনা-কেন্দ্রিক এই কথোপকথন আজ শুরু হয়নি, এর গোড়াপত্তন হয়েছিল পনেরো বছর আগেই। তবে এক্সপেরিমেন্টরের পঞ্চদশতম এই হাব উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকল এই কারণে, তা শিল্পের দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে এই টালমাটাল সময়েও তৈরি করতে পেরেছে নির্ভীক মতপ্রকাশ ও কথোপকথনের এক গণতান্ত্রিক পরিসর, যা এই সময়ে দুর্মূল্য।
আরও পড়ুন: দক্ষিণী সিনেমা কি ছাপিয়ে যাচ্ছে বলিউডকে?
লিখছেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়…



হাবের প্রথম দিনে সূচনা-বক্তব্যে প্রতীকের বয়ানে উঠে আসে হিন্দ রাজাবের কথা, প্যালেস্টাইনের শিশুদের কথা, যার সুর বজায় রেখে প্রিয়াঙ্কা যোগ করেন অক্টাভিয়া বাটলারের হাইপার এম্প্যাথির ধারণা; অন্য মানুষের যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করার যে দুর্লভ ক্ষমতা, সেই সংবেদনশীলতাই এই বছরের কিউরেটরস হাবের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।
শিল্প এবং দর্শকের মধ্যে যে দ্বিমুখী সম্পর্ক, তা সিম্বল এবং সিম্বলের গ্রহীতার সম্পর্কের মতো; তবে শিল্পসম্পাদক বা কিউরেটররা এই দ্বৈত সম্পর্কে আনেন এক ত্রিকোণমিতি, যা শিল্পকে বৃহত্তর ভৌগোলিক রাজনীতি, দর্শন এবং মতবাদের অংশ করে তোলে, অর্থাৎ, শিল্প ও দর্শকের সংলাপের মধ্যস্থতার দায়িত্ব কিউরেটরের। এই বছর কিউরেটরস হাবে সঞ্চালকের ভূমিকায় পাওয়া গিয়েছিল রাত্তানমোল সিং জোহালকে, যিনি মুসিয়াম অফ মডার্ন আর্ট বা মোমার পূর্বতন সহকারী পরিচালক এবং বর্তমানে মিশিগান এন আরবর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। রাত্তানের সঙ্গে কথোপকথনে যোগদান করেছেন যাঁরা, তাঁরা হলেন সাবিহ আহমেদ, জোই বাট, গাবি নিয়ৰ, আর্নিকা আহলদাগ, সেপাকে অংমা, সাব্বির হোসাইন মুস্তাফা, তারিণী মালিক, নিখিল চোপড়া, এবং গ্রিডথিয়া গায়েঁবং।
রিয়াধের দিরিয়াহ বিয়েনালের চিন্তক সাবিহ আহমেদের কথায় উঠে এসেছে মিডল ইস্ট, নর্থ আফ্রিকা, এবং সাউথ এশিয়া, যার আপাত সরলীকরণ করে বলা হয় ‘মেনাসা’, সেই ভৌগোলিক পরিসরে অবস্থিত ভিন্ন ধারণার ভিন্ন পৃথিবীদের কথা; সাবিহ বলেন পাখিদের পৃথিবীর কথা, ফাংগির পৃথিবীর কথা, মানবদেহের অন্তর্গত বায়োম-এর পৃথিবীর কথা— যে-সকল পৃথিবী ‘টেকনোফেটিশিস্ট’, অর্থাৎ, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর সংজ্ঞায়নের আবডালে হারিয়ে যেতে বসেছে। আলোচনার মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে অনাগত ভবিষ্যৎ নয়, বরং গহিন এক বর্তমানের ধারণা, যাকে ‘ডিপ প্রেজেন্ট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।



থাইল্যান্ডের জোই বাট কিউরেটর হিসেবে তাঁর যাপনকে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধারণার প্রতি সংশয় রাখার ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতে চান। জোই বাট কাজ করছেন ভিয়েতনাম এবং তার যুদ্ধদীর্ণ পরিস্থিতি-পরবর্তী শিল্প ও শিল্পীদের নিয়ে। গাবি-র শিল্পধারণায় উঠে এসেছে ‘রেসিস্ট্যান্স’ হিসেবে ‘ডিজায়ার’-এর কথা, আবার ব্যাঙ্গালোর-ভিত্তিক মিউজিয়াম অফ আর্ট অ্যান্ড ফোটোগ্রাফির ডিরেক্টর আর্নিকা পত্তন করেছেন এমন এক শিল্প-সম্পাদনার ধারণা, যা ঘোষিতভাবে ফেমিনিস্ট। সাব্বির হোসাইন কাজ করেন ট্রপিক্যালিটি, মডার্নিটি, এবং সাউথ এশিয়ার দ্বীপভূমির শিল্প নিয়ে, যেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফ্যাবুলেশন্স’-এর ধারণা, যেখানে গল্প তৈরি করা হয়, বাস্তবের ঊর্ধ্বে উঠে। কল্পিত সংযোগের যে ধারণার মাধ্যমে সাব্বির তার শিল্পচেতনাকে পড়েন, তা একাধারে হাবের সূচনায় প্রিয়াঙ্কা রাজার বক্তব্যকে মনে করায়, যেখানে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এই হাবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পর্ক গড়ে তোলা ও তাকে লালন করা।
শিল্পের জগতের এই আন্তঃসম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে ক্ষেত্রনির্দিষ্ট মনে হলেও, এ-কথা ভুলে গেলে চলবে না যে শিল্পের দেশ-কাল-চরিত্র, আমাদের দেশ-কাল-চরিত্রের থেকে পৃথক না। তাই শিল্পক্ষেত্রে যে দায়বদ্ধতার কথা আমরা বলছি, সেই দায়বদ্ধতা আসলে সামাজিক। তাই হাবের কথোপকথনের মধ্যেই উঠে আসে সোনম ওয়াংচুকের কথা, উঠে আসে কর্মীদের যোগ্য মূল্যের দাবিতে প্রতিবাদরত সৃষ্টি গুপ্তার অন্যায্য গ্রেফতারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান। সাব্বিরের কথায়, পৃথিবীর বিনাশকাল নিয়ে যে দীর্ঘ আলোচনা আমরা করে থাকি, তার বিপরীতে এও সত্য যে, এই কয়েকজন, এই সমমনস্ক ধারণা নিয়ে একত্র হয়েছেন এই হাবে, যাঁরা জরুরি আলোচনার কথা ভুলে যাচ্ছেন না, চোখ সরিয়ে নিচ্ছেন না, বরং সোচ্চার হচ্ছেন এই নিরাপদ, এবং গণতান্ত্রিক পরিসরে।

আধঘণ্টার প্রেজেন্টেশন এবং পরবর্তী আধঘণ্টার কথোপথন মিলে একঘণ্টাব্যাপী সেশনে শিল্পের এই পরিসর তুলে ধরতে চেয়েছেন প্রত্যেক প্রবক্তা। এর মধ্যেই দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য রাখেন নিখিল চোপড়া, যিনি গোয়ার এইচ এইচ আর্ট একরের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্প্রতি হয়ে যাওয়া কোচি বিয়েন্নালের কিউরেটর। রাজনৈতিক ক্ষত নিরাময়ে উপশমকারী হিসেবে শিল্পের ভূমিকা মনে হতেই পারে অত্যুক্তি, তবে নিখিলের সম্পাদনায় কোচি মুজিরিস বিয়েনালে গড়ে ওঠে দুই শিল্পীর সমান্তরাল পরিসর। নিখিল তার প্রেজেন্টেশনে আমাদের পরিচয় করান শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা শিল্পী ভিনোজা থারমাঙ্গালানের সঙ্গে; কোচি বিয়েনালে ভিনোজার তাঁর ইনস্টলেশনের মাধ্যমে তৈরি করেছেন পরের পর বাঙ্কার, যা একদিকে তাঁর যুদ্ধত্রস্ত শৈশব এবং তাঁর কাছে তাঁর গৃহের ধারণা কী, তা জনমানসে তুলে ধরে।
নিখিল এই বিয়েনালে আনতে পেরেছিলেন আরও একজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে, যিনি পারফর্মেন্স-এর জগতে অনন্য, মারিনা আব্রাহামোভিচ। দেশকালের সীমানায় পৃথক মারিনা এবং ভিনোজার তেমন কোনও মিলই নেই, কেবল তাঁরা দু’জনেই শিল্পী। এবং দু’জনের শিল্পীসত্তাতেই মিশে আছে যুদ্ধময় এক শৈশব, যা ভিনোজা প্রত্যক্ষ করেছেন শ্রীলংকায় এবং মারিনা যার আঁচ পেয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পার্টিজান রাজনীতিতে যুক্ত তাঁর যুগোস্লাভ পিতামাতার মাধ্যমে। ভিনোজার ইনস্টলেশন ‘মাই লাস্ট ব্রেইথ উইথ অল মাই বার্ডেন্স’ এবং ‘এ ল্যান্ড ওভেন উইথ দা থ্রেডস অফ মেমোরিসের’ পাশেই মারিনার ইনস্টলেশন ‘অ্যাট দ্য ওয়াটারফল’ প্রদর্শিত হয়। মারিনার এই ইনস্টলেশন আসলে ১০৮ জন মহাযান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর হার্ট সূত্র চ্যান্ট করার অডিও-ভিসুয়াল এক অভিজ্ঞতা, যা মারিনা তিব্বতি এক মনাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন বসবাসের সময়ে রেকর্ড করেন, এবং যা জলপ্রপাতের মতো এক উপশমকারী স্বর তৈরি করে। হার্ট সূত্র বলে সেই শূন্যতার কথা, যা মারিনা, ভিনোজা, হিন্দ রাজাব, এবং যুদ্ধের অভিঘাতে বুক খালি হয়ে যাওয়া সমস্ত মানুষের হৃদয়ের স্বর। আপাত সম্পর্কহীন এই দুই শিল্পীর ক্ষেত্রে যেন হার্ট সূত্রের এই স্বর তৈরি করে উপশমের এক পরিমণ্ডল, আবার একই সঙ্গে সুস্পষ্ট করে তোলে দ্রোহকে। সম্পাদনার এই যে পরিমণ্ডল, যা সচেতনভাবে অথবা অনবধানেই তৈরি করে তৃতীয় এক পরিসর, তা তৈরি করাই একজন সার্থক শিল্প-সম্পাদকের কাজ।
তবে শিল্পের এই অন্তর্ধর্মী কথোপকথন যে সবসময় নির্বিবাদী, সরল হয়, এমনও না। এই প্রসঙ্গে সাব্বির মোস্তফা হোসাইন ভাগ করে নেন তাঁর এক কৌতুকময় অভিজ্ঞতার কথা। সাব্বির কাজ করছিলেন ইন্দোনেশিয়ান শিল্পী সুনারিও-র সঙ্গে, যিনি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন প্রকৃতিজ উপাদান, যেমন পাথর, গাছের গুঁড়ি, জল, আলো, ধাতু ইত্যাদি। এমনই এক শিল্পকর্মে মেহগনি গাছের গাড়িতে সুনারিও অ্যাক্রিলিকে এঁকেছিলেন, যা সংরক্ষিত ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুনারিওরই এক ছাত্র একদিন ঠিক করলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই করবেন এক ক্যাম্পফায়ার। কাঠ কম পড়তে তিনি টেনে আনলেন সুনারিওর সেইসব মেহগনি গাছের গুঁড়ি। সাব্বির বলেন, এরপর তিনি সুনারিওর সঙ্গে দেখা করতে যান। ভাবলেশহীন সুনারিও তাঁকে জানান যে, তিনি এই ছাত্রের বহিষ্কারের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন। এরপর সাব্বির তাঁকে জিজ্ঞেস করেন পুড়ে যাওয়া শিল্পকর্মের কোনও ছবি তাঁর কাছে আছে কি না, যদি বা সেটুকুই সংরক্ষণ করা যায়। আরও উদাসীনভাবে সুনারিও তাঁকে জানান যে ছবি কেন, খোদ শিল্পকর্মই তো তাঁর কাছে রয়ে গেছে। সুনারিও আগুনে পুড়ে যাওয়া সেই মেহগনি গুঁড়ি এরপর সাব্বিরকে দেখান। সাব্বির বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় দুই শিল্পীর এই ছকভাঙা কথোপকথনের প্রমাণস্বরূপ এই পুড়ে যাওয়া কাঠের গুঁড়ি যথাযোগ্যভাবে ‘ডায়লগ’ হিসেবে সংগ্রহ করে রেখেছেন।
হয়তো কিউরেশন শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্মকে সংরক্ষণের শিল্প, কিন্তু এটি শিল্পকেন্দ্রিকতার প্রথম পাঠও বটে, যা সম্পর্ক, সংঘাত, ভুল বোঝাবুঝি এবং অবশ্যই, কথোপকথনকে শিল্পের স্তরে উন্নীত করে।




