অধিকারের জন্য
আটের দশকে কলম্বিয়ার বোগোতা একবার উত্তাল হয়েছিল ‘চেম্বার অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস অফ কলম্বিয়া’-য় এক বিশেষ ব্যক্তির প্রবেশাধিকার নিয়ে। ব্যক্তিটির নাম পাবলো এসকোবার, মেডিলিন থেকে লিবারাল পার্টির হয়ে জিতে যে পৌঁছে গিয়েছিল কলম্বিয়ার সংসদ পর্যন্ত। সেই আলোড়ন শেষ হয়েছিল তুমুল রক্তস্নানে। ফোর্বস-এর বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তির তালিকায় তার নাম থাকলেও, দিনের শেষে পাবলো ছিলেন এক খুনে ড্রাগ লর্ড। কিন্তু কলম্বিয়ার সেনেটে সাম্প্রতিক যে ঘটনাটি ঘটল, তার মধ্যে আদতে রয়েছে সমাজের চোখে দীর্ঘদিন অপাঙক্তেয় থাকা এক ব্যক্তির যথাযোগ্য স্বীকৃতি পাওয়ার গৌরব। পাবলোর মতো অপরাধীরা আজও বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংসদে ছদ্মবেশে রয়েছে/রয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র ট্যাবুর কারণে সমাজের চোখে যে ত্যজ্য, সে যদি সোজা একটি দেশের আইনসভায় জায়গা পায়, তা আদতে এগিয়ে যাওয়ার চিহ্নক হয়ে ওঠে।
দেইসি আলেহান্দ্রা ওমানিয়া অর্তিজ, যাঁকে বিশ্ব চিনত আমারান্তা হ্যাঙ্ক নামে, তিনি, পেশাগতভাবে ছিলেন এক ‘পর্নতারকা’। এককালে সাংবাদিকতাও করেছেন ওমানিয়া, এখন, কলম্বিয়ার বাম ঐক্যজোটের প্রতিনিধি হয়ে তিনি কলম্বিয়ার সেনেটে এলেন ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের শ্রম-অধিকার, জনপরিসরে মানসিক স্বাস্থ্যর অধিকার ও যৌন নিগ্রহের বিচার নিয়ে কথা বলবেন তিনি। আলেহান্দ্রা ওমানিয়া অর্তিজ ২০২৬-এর মার্চে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন প্যাক্টো-হিস্টোরিকা বা ঐতিহাসিক জোটের হয়ে। ৩৩ বছর বয়সি অর্তিজ ২০১৭ সালে তথাকথিত ‘অ্যাডাল্ট ইন্ডাস্ট্রি’-তে যোগ দিয়েছিলেন। এখন সেই ইন্ডাস্ট্রির শিল্পীদের হয়েই কথা বলতে সেনেটে এলেন অর্তিজ।
ফ্রান্সের কাছে কোন কারণে ধমক খেল ইনফোসিস?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৭…
অর্তিজ বারবার করে বলছেন, তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ’ ছবির শিল্পী-কলাকুশলীরা কিছু সংস্কার, কিছু সামাজিক ছুঁৎমার্গিতার জন্য শ্রমিক হিসেবেই মান্যতা পান না। কাজেই, তাদের অধিকার রক্ষা প্রাথমিক কর্তব্য অর্তিজের।
উপমহাদেশে সানি লিওনকে নিয়ে প্রতি পলে যে আদিরসাত্মক মশকরা ও অবজ্ঞার আবহ ছিল, তা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তাঁর ১৯-২০ বছর বয়সের বিভীষিকা ভুলতে পারেননি সানি। তখন সবে কানাডায় অ্যাডাল্ট ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছেন সানি। ওদিকে হেট মেল থেকে হুমকিতে রোজ ভরে যাচ্ছে তাঁর ভার্চুয়াল ইনবক্স। সানি প্রায় ঠিকই করে ফেলেছিলেন, তিনি ফিরবেনই না ভারতে। যদিও সানি ফিরেছিলেন। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেছেন সানি তখন, ঠাঁই পেয়েছেন ‘বিগ বস’-এর মতো টেলিভিশন দুনিয়ায় ঝড় তোলা শো-তে। কিন্তু তাতে থেমে থাকেনি ট্রোলবাহিনী। সঙ্গে জুড়েছে রক্ষণশীল নানা গোষ্ঠী। হিন্দু জনজাগ্রুতি সমিতি দাবি করেছে, সানি লিওনকে ‘ডিপোর্ট’, অর্থাৎ দেশ থেকেই বিতাড়িত করা হোক। তারপরেও কাজ চালিয়ে গিয়েছেন সানি। যদিও তাঁকে দীর্ঘদিন বি-গ্রেড ছবির নায়িকা সাজিয়েই রেখে দিয়েছিল ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু আবার, অনুরাগ কাশ্যপের ‘কেনেডি’-র মতো আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন।

কিন্তু আজ যদি অর্তিজের দাবিগুলো নিয়েই সানি ভারতের সংসদে গিয়ে হাজির হন, দেশবাসীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী হবে? তিনি বা মিয়া খলিফা তো এখনও হাস্যরসের উপাদান, মিমের উপকরণ। অথচ অর্তিজ কিন্তু কলম্বিয়ার সেনেটে কোনও তারকা প্রার্থী হিসেবে যাননি। তিনি যা যা বলছেন, সেসবই রাজনৈতিক কথা। ইতালিতে এর আগে ইয়োনা স্টালার উঠে এসেছিলেন এই নিষিদ্ধ ছবির জগৎ থেকেই। তিনিও ইতালির আইনসভায় জায়গা পেয়েছিলেন। তাঁর কথা উল্লেখ করে অর্তিজ বলছেন, কেন এই ছবির তারকারা আকাঙ্ক্ষা করবেন না দেশের হয়ে কাজ করার?
নিষিদ্ধ ছবিতে কাজ করতে যাওয়া সবসময় খুব সহজে বা স্বেচ্ছায় হয় না। সেখানে কাজ করার অভিজ্ঞতাও নানাভাবে কণ্টকাকীর্ণ। অর্তিজ বলছেন, তাঁর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে শিখিয়েছে। অর্তিজের এই উত্থান আসলে চিনিয়ে দেয় সামাজিক লেন্সগুলোতে জমে থাকা ধুলো, চিনিয়ে দেয় কোথায় পিছিয়ে রয়েছে আমাদের মনন। একইসঙ্গে প্রগতির সুবাতাসও জেগে থাকে অর্তিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতের উচ্চতায়।



