দেড়শো বছর আগে বাংলা তথা ভারতে প্রায় কার্টুনের চর্চা শুরু হয় গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পীদের হাত ধরে। পরবর্তীকালে রেবতীভূষণ, চণ্ডী লাহিড়ী, আর. কে. লক্ষ্মণ, মারিও মিরান্ডা কিংবা কুট্টি-র মতো আরও অনেক ভারতীয় শিল্পীরা সারা ভারতে কার্টুনশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
শান্তিনিকেতনের কলাভবন শিল্পশিক্ষার একটি ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। এখানে রামকিঙ্কর বেইজ, নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়দের মতো শিল্পীদের চর্চা ও শিল্পের ইতিহাস রয়েছে। কলাভবনের প্রধান বা শিল্পাচার্য হিসাবে নন্দলালের কিছু ছবি, যা আমাদের মনে ভাসে, তা রসিক-মজাদার-ব্যঙ্গপ্রবণ। সুতরাং, কলাভবনের পাঠ্যক্রমে কার্টুন বা ক্যারিকেচার বিষয়টির পঠনপাঠন না হলেও, বিদ্রুপ ও হাস্যরস সেখানকার মজ্জাগত। আর এই ব্যঙ্গচিত্রের আধারেই একটা দীর্ঘ সময়ে শান্তিনিকেতন কলাভবনে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের উন্মাদনা, যার সূত্রপাত হয়েছিল ছাত্রদের হাতেই, ‘আর্টডাস্ট’ নাম নিয়ে প্রকাশিত এক অসাধারণ বার্ষিকী পত্রিকার মাধ্যমে।
প্রথমেই আসা যাক ‘আর্টডাস্ট’ নামকরণের প্রসঙ্গে। পাবলো পিকাসো বলেছিলেন, ‘Art washes away from the soul the dust of everyday life’— হয়তো-বা এই ভাবনা থেকেই উঠে এসেছিল একদিন ‘আর্টডাস্ট’-এর নাম। প্রাক্তনীদের অনেকের মতে আবার ব্যাপারটা অতটা সাবেকি নয়। বোম্বের ফিল্মি পত্রিকা ‘স্টারডাস্ট’, যার অন্যতম উপজীব্য ফিল্মি দুনিয়ার গসিপ এবং পর্দান্তরালের খোঁজখবর, সেই নামের অনুকরণেই ‘আর্টডাস্ট’ নামের অবতারণা। কবে শুরু হয়েছিল এই পত্রিকা? সে-নিয়েও রয়েছে মতান্তর, কারণ ‘আর্টডাস্ট’ প্রকাশনার পুরো অধ্যায়টি ছিল গোপনীয়তার পর্দায় মোড়া। অর্থাৎ ছবি আঁকা, লেখা, তার সাজসজ্জা, মুদ্রণ— এসবের পিছনে যে-দলটি কাজ করত, ম্যাগাজিনের পাতায় থাকত না তার নামোল্লেখ। অন্য কোনওভাবেও এইসব আঁকিয়ে-লিখিয়েদের নাম জানবার উপায় ছিল না, এইরকম ছিল ছাত্রদের সেই নেটওয়ার্ক। কিন্তু বছরের পর বছর, অদৃশ্য এক সৃজনীশক্তির হাতে তৈরি হয়ে যেত ক্যারিকেচার আর তার সঙ্গে জুতসই লেখার এক অসাধারণ যুগলবন্দি, যা প্রকাশ পেত কলাভবনের নন্দনমেলায়, পয়লা ডিসেম্বরের সাঁঝবেলায়।

তবে কলাভবনে কার্টুন বা ক্যারিকেচার আঁকার একটা ট্র্যাডিশন আগেও ছিল। এর অন্যতম প্রদর্শনস্থল ছিল কলাভবনের ‘মামার ক্যান্টিন’। চা নেওয়ার অপরিসর জানালার পাশের দেওয়ালে রোজ কোনও-না-কোনও কার্টুন পোস্টার হয়ে শোভা পেত এবং তার বিষয়বস্তু ছিল সমসাময়িক কোনও ঘটনা বা ব্যক্তিবিশেষ। শিল্প-ইতিহাসের জনৈক শিক্ষক ছিলেন সাংঘাতিক কড়া ধাতের মানুষ। ক্লাস নিতে শুরু করলে তাঁর সময়জ্ঞান থাকত না। ছাত্ররা সকাল থেকে তাঁর লেকচার শুনে ক্লান্ত। খিদের জ্বালায় তারা মুক্তির পথ খুঁজত। তৈরি হল শিক্ষকমশাইয়ের ক্যারিকেচার, সঙ্গে মুক্তির উপায় হিসেবে তাঁকে সংসারধর্ম পালনের ইঙ্গিত। এখানেই শেষ নয়, কয়েক বছর পরে আরেকবার কার্টুনের বিষয় হন তিনি। সেবার দেখা গেল, নিজের বাড়িতে প্রচুর বইয়ের মাঝে তিনি আসীন এবং সেখানেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে তাঁর শিশুসন্তান। আটের দশকের কলাভবনের এক প্রাক্তনী শুনিয়েছেন আরেক মজাদার কাহিনি। কলাভবনে আগত প্রথম বর্ষের ব্যাচের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিত সিনিয়র ক্লাসের কোনও ছাত্র। ‘আমি তোমাদেরই লোক’ এই পরিচয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগত না বেশি। ধাপে-ধাপে শুরু হত খবরিয়া হিসেবে অন্দরের খবর নেওয়া। এবং সেই খবর কার্টুনের রসেবসে অচিরেই স্থান পেত মামার ক্যান্টিনের জানালায়।


কলাভবনের শিক্ষামূলক ভ্রমণ বা এক্সকারশন ছিল এই কার্টুনের আরেক জন্মভূমি। বেড়াতে গিয়ে প্রতিদিন অস্থায়ী বাসস্থানের কোনও দেওয়ালে শোভা পেত কার্টুন-আঁকা পোস্টার। ছাত্রছাত্রীর গোপন প্রেমপর্ব বা কোনও শিক্ষকের দাম্পত্যকলহ অথবা হঠাৎ-ঘটে-যাওয়া কোনও মজার ঘটনা— এই সবই হয়ে উঠত সেইসব কার্টুনকীর্তির বিষয়। শিল্পীদের নাম থেকে যেত অজানা। বেড়ানোর আনন্দের সঙ্গে মিলেমিশে যেত নিত্যদিনের এই বার্তাবহ ব্যঙ্গচিত্রের কৌতুকরস।
সুতরাং, ‘আর্টডাস্ট’ পত্রিকার বার্ষিক সংখ্যা আসলে কলাভবনের এই শৈল্পিক ভাবধারারই এক নিগূঢ় সংকলন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা হয়ে উঠত ছাত্রদের চোখ দিয়ে দেখা তাদের শিক্ষকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এক ধরনের রসসিক্ত বিশ্লেষণ। দেখা যেত, কলাভবনের নিত্যদিনের জীবনপ্রবাহে ছোটখাট কোনও ঘটনা যা হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে আপামরের, ‘আর্টডাস্ট’-এর শিল্পীদের জহুরির চোখ এবং হাতের জাদুতে তা বছরশেষে স্থান পেয়েছে পত্রিকার পাতায়। প্রত্যেক বছর ১ ডিসেম্বর নন্দনমেলার প্রথমদিনে ‘আর্টডাস্ট’ প্রকাশিত হওয়ার পর শিল্প-ইতিহাস বিভাগের স্টল থেকে প্রথম ১০০ কপি নিমেষে উধাও হয়ে যেত। তবে, প্রকাশের আগের মুহূর্ত অবধি গোপনীয়তার বেষ্টনীতে মোড়া থাকত পত্রিকা প্রকাশের প্রতিটি পদক্ষেপ। একটা সময়ে সিল্কস্ক্রিন পদ্ধতিতে ছাপা হত ‘আর্টডাস্ট’, সুতরাং তা ছিল বেশ খরচসাপেক্ষ। প্রতিলিপিকরণ প্রযুক্তি আসবার পরে খরচ কমে, ফলে আরও বেশি সংখ্যায় ছাপা হতে থাকে ‘আর্টডাস্ট’। কিন্তু কখনওই সংখ্যাধিক্যের কারণে ‘আর্টডাস্ট’-এর সীমিত সংস্করণের ট্যাগ খুলে দেননি তার অজ্ঞাতনামা প্রকাশকেরা।



আরেকটা মজার ব্যাপার হল, ‘আর্টডাস্ট’ পত্রিকা গড়নে-গঠনে প্রতি বছর বদলে গেছে। রঙিন বা সাদা-কালোয় আঁকা হয়েছে ছবি। ১০/১২ পাতার পত্রিকা পরিবেশিত হয়েছে কখনও বইয়ের আকারে, কখনও স্কেচ বুকের আদলে, আবার কখনও-বা রঙিন খামের আশ্রয়ে। ২০০২ সালের পত্রিকার পুরোটাই ছিল একটি কমিক স্ট্রিপের আদলে। অর্থাৎ, প্রতি বছরের ম্যাগাজিন বয়ে এনেছে সৃষ্টির এক নতুন ভাবধারাকে। এই নিয়ম ভাঙার বৈচিত্র্য ‘আর্টডাস্ট’কে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি।
ছাত্র ও শিক্ষক সম্পর্কের কৌতুকমিশ্রিত হাস্যরস কলাভবনের ছাত্রদের বার বার উদ্বুদ্ধ করেছে এই পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে। ছাত্র-শিল্পীদের দীর্ঘ ও কঠোর প্রয়াসে প্রতিটি চরিত্রকে ধরা ও হাস্যরসে পূর্ণ করে প্রকাশ করা এবং তার সঙ্গে কিছু বর্ণনামূলক লেখার যোগসাধন— সে এক আশ্চর্য অনুভূতি ও সৃষ্টি। কলাভবনের বহু প্রথিতযশা শিল্প-শিক্ষকদের নিয়ে ক্যারিকেচার ‘আর্টডাস্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁরাও তাঁদের মতো করে গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের এই অসাধারণ সৃষ্টিকে; উৎসাহ দিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার। পত্রিকার মূল ভিত্তি মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশ— যা শুধু কলাভবন নয়, সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রনাথ-সৃষ্ট শান্তিনিকেতন আশ্রমের মূল মন্ত্র।

তবে ‘আর্টডাস্ট’ও এক সময়ে দ্বন্দ ও সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কলাভবনের অভ্যন্তরে। জানা যায়, পত্রিকায় প্রকাশিত কোনও-কোনও কার্টুনচিত্র অপ্রস্তুত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে শিক্ষকদের, যেটা হয়তো একেবারেই কাম্য ছিল না। হয়তো এও বা এক ধরনের অবক্ষয়ের কারণ, যেখানে ভাষা ব্যবহারের উপরে ছাত্রদের যে-সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল তা থেকে খানিক বিচ্যুত হয়েছিল তারা। ২০০০ সালের পর দু’একবার বন্ধ হয়ে গেলেও ‘আর্টডাস্ট’ আবার ফিরে এসেছিল তার স্বমহিমায় কিন্তু অতিমারীর পরবর্তীকালে পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায় কলাভবনের ছাত্রদের হাতে তৈরি একান্ত নিজস্ব পত্রিকা, যার মৌলিক আধার ছিল ব্যঙ্গচিত্র।
ছবি সৌজন্যে: লেখক




