আরশোলারা টিকে যাবে?

‘বাতিল টায়ার আর পলিব্যাগ,
জড়ো করে ভিখিরিরা আগুন দিয়েছে,
সেই ক্যাম্প-ফায়ারে ডাইভ দিচ্ছে ন্যাংটো আরশোলা!
মড়ারা রোস্ট হচ্ছে বিদ্যুৎচুল্লির আঁচে,
সবকিছু ঠিক আছে গুরু,
সবকিছু ঠিক আছে!’

নবারুণ ভট্টাচার্যর কলমে ‘ন্যাংটো আরশোলা’-রা এভাবেই ক্যাম্প-ফায়ারে ডাইভ দিয়েছিল। কিন্তু এখন হয়তো সবকিছু ঠিক নেই। আর আরশোলারা সৃষ্টির সময় থেকেই চিরঅক্ষয়। তাই আত্মহননের পথ বেছে না নিয়ে থিকথিক করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ছড়িয়ে পড়ছে ইতিউতি। কারা যেন ভয়ও পাচ্ছে বেশ! বন্ধ করছে আরশোলা ঢোকার যাবতীয় রাস্তা। কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না ওদের। চারদিকে ছনছন, সারা গায়ে ঘিনঘিন। বেরিয়ে পড়ছে ওরা। তৈরি হচ্ছে ম্যানিফেস্টো। স্টেট দেখছে ডিপ স্টেটের চোখরাঙানি, আর সিস্টেম আরশোলার। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এমনকী, মুছে যাওয়ার পরেও এক্স-এ ট্রেন্ডিং ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। আপনি যদি বেকার হন, সঙ্গে খানিক অলসও— কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া স্যাভি ও সচেতন; তাহলে এই নতুন ‘রাজনৈতিক’ দল আপনাকে স্বাগত জানাবে, তাদের দাবি এই।  

১৫ মে, দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত শুনানি চলাকালীন খানিক রাগান্বিত হয়ে একটি মন্তব্য করেন, যা নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায় দেশব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়ায়। ঠিক কী বলেছিলেন তিনি?

আরও পড়ুন : তেলের দাম আকাশছোঁয়া! আসল কারণ কী?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

‘চিফ জাস্টিস অফ ইন্ডিয়া’ সূর্যকান্তর মন্তব্যটি ছিল, আমাদের দেশের যুব সম্প্রদায় খানিক আরশোলার মতো। যখন তারা চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী কিংবা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে যায়। এরাই সময়ে-অসময়ে সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে থাকে।

চাকরি পেতে ব্যর্থ যুবক-যুবতী ‘প্রতিবাদ’ ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারে! আমরা, এ-রাজ্যের মানুষও দেখেছি, আরশোলার মতোই কিছু মুখ জেগে থাকে ধর্মতলায়, কিছু বিকাশ ভবন চত্বরে। ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ন্ত তেলাপোকার মতোই ‘চাকরি পেতে ব্যর্থ’-রা দুঃস্বপ্নেও তাড়া করে বেড়ায় ‘চাকরি দিতে ব্যর্থ’-দের। তারপর আচমকাই কেউ মনে করিয়ে দেয়, তারা আদতে কিলবিল করতে থাকা পতঙ্গের দল। নিষ্ফলা ক্ষোভের আগুনে খানিক ঘিয়ের প্রলেপ। সমাজমাধ্যম ভরে যায় লালচে বাদামি আস্তরণে। ফ্যাত-ফ্যাত, সাঁই-সাঁই শব্দ তাদের পাখার।

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, তিনি দেশের সমগ্র যুব সম্প্রদায়কে আদতেও এমনটা সম্বোধন করেননি। তিনি সেই সমস্ত যুবক-যুবতীদের কটাক্ষ করেছেন, যারা আইন এবং মিডিয়ার মতো মহৎ পেশাকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করে চলেছে তাদের প্রশ্নের মাধ্যমে। যদিও মাননীয় প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য তাঁর নিজস্ব অবস্থান, কিন্তু এর নেপথ্যের মানসিকতা হিট স্প্রে-র মতো ছড়িয়ে পড়ে আস্তাকুঁড়ে। কিলবিল করে বাড়তে থাকে তেলাপোকার সংখ্যা। আমেরিকা-নিবাসী ৩০ বছরের অভিজিৎ দীপকে-ও নীরবে দেখছিলেন পুরো বিষয়টা, বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক রিলেশন নিয়ে স্নাতক। আম আদমি পার্টি-র প্রাক্তন সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট। আপাতত বেকার। খানিক মজার ছলেই ঘটনাক্রম উপলব্ধি করে একটি টুইট করেন। যেখানে তিনি বলেন, ‘কেমন হয়, যদি সমস্ত আরশোলারা একসাথে জোট বাঁধে?’ জনসমর্থন বাড়তে থাকে। আছড়ে পড়ে টুইটের পর টুইট। একসময় অভিজিৎ একটি ডিজিটাল পার্টি তৈরি করেন। ককরোচ জনতা পার্টি। তৈরি হয় ওয়েবসাইটও। একটি রাজনৈতিক দল, যারা দেশের বেকার, অলস ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারকারী সমস্ত যুবদের দাবি নিয়ে কথা বলবে।

এমনটা প্রথমবার নয় যে, দেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি নতুন দল তৈরি হচ্ছে। আম আদমি পার্টি-র উত্থানও খানিক এরকম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের প্রতিবাদকে সামনে রেখে তৈরি হয় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ঝকঝকে দলটি। প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব-সহ বহু মানুষ জুড়েছিলেন একসময়। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, সেই দল ছেড়েও গিয়েছে বহু মানুষ। কালের অবক্ষয়ে একসময় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির হাত শক্ত করেছে তারা। তেমনই, সোশ্যাল মিডিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিপ্লবেরও সূচনা এই প্রথম নয়। পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ বিপুল জনবিস্ফোরণের সাক্ষী। নেপাল হোক বা শ্রীলঙ্কা, বারবার ভাঙন ও বদলের ডাক এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই। আমাদের বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া আরজি করের মতো ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাত দখলও সোশ্যাল মিডিয়া-প্রসূত। আবার আরব বসন্ত থেকে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের মতো বিপুল সামাজিক-রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের নেপথ্য়েও সেই সোশ্যাল মিডিয়া।

কিন্তু সবক্ষেত্রে সমস্যা থেকেছে একটাই। ফ্যাসিজমকে শেষ করার চেয়ে অধিকতর কঠিন, বিকল্প সিস্টেম তৈরি করা। তাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রত্যেক প্রতিবেশী রাষ্ট্রই বহু ওঠাপড়ার সম্মুখীন হয়েছে। এক্ষেত্রেও তাই বহু প্রশ্নচিহ্ন ঘুরেফিরে ছুঁয়ে যাচ্ছে উড়ন্ত আরশোলাদের। সঙ্গে বেড়েছে তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রচার ও কুৎসাও। কিন্তু এত কিছুর পরেও, তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি বিন্দুবিসর্গ।

এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি। এক্স ও ইনস্টাগ্রামে তাদের মোট ফলোয়ার সংখ্যাকে ককরোচ-কুল ছাপিয়ে গেছে মাত্র ৪ দিনে। পেজ হ্যাক হয়েছে, গজিয়ে উঠেছে নতুন পেজ, অঞ্চলভিত্তিক, রাজ্যভিত্তিক পেজ। বিরোধী দল কংগ্রেসের মোট ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে তেলাপোকার অনুগামী সংখ্যা।

কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম, আরশোলা বাড়লে তাকে পিষে মারার মত লোকও বাড়বে। বাড়বে বিষাক্ত কীটনাশক প্রস্তুতকারী কোম্পানির সংখ্যা। তাই সাসপেন্ড হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি-র এক্স হ্যান্ডেল। বারবার হ্যাক করার চেষ্টা চলছে ইনস্টাগ্রাম। তৈরি হয়েছে অ্যান্টি-ককরোচ গ্যাং। যারা কখনও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ছদ্মবেশে, কখনও বা বাঁধাধরা মিডিয়ায় আওড়ে যাচ্ছে তোতাপাখিসুলভ কুৎসা। পাশাপাশি আবার, আল-জাজিরা থেকে শুরু করে বিবিসি-র মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রাসঙ্গিক আরশোলাকুল। আইটি সেলের তরফে লাগাতার অপপ্রচার চলছে। দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ডিপ স্টেটের ফাঁদ, দেশবিরোধী ফান্ডিং ইত্যাদি বলে। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে, আগে যে অ্যান্টি-বায়োটিক দিব্যি কাজ করত; এখন কিন্তু রোগের ওপর তার বিশেষ কোনও প্রভাব পড়ছে না। ভাইরাস তাদের চরিত্র বদলেছে। বা বলা ভাল, বদলাতে বাধ্য হয়েছে। ক্রমাগত বাড়তে থাকা দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অবনমন, শিক্ষার গুরুত্ব নিম্ন থেকে নিম্নতর হওয়া দেশে যুব-সম্প্রদায় তথা আরশোলারা আর পুরনো ওষুধে ভুলছে না।

বারবার বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পুরোটাই আপ-ফান্ডেড। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, সাধারণ মানুষের জনসমর্থন আপ-এর প্রতি হোক, কংগ্রেস বা সমাজবাদী পার্টির দিকে হোক কিংবা নিতান্তই সংবিধানমুখী হোক; এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কোনও ডিজিটাল মুভমেন্ট বিগত সময়ে ভূ-ভারতে হয়নি। যখন একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গও প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে, তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় ব্যঙ্গের আড়ালে থাকা রাজনৈতিক বয়ান। স্পষ্ট হয় দেওয়াল লিখন।

আরশোলা তাই হয়ে উঠছে একটি ভীতি প্রদর্শনকারী পতঙ্গ। পিষে মারলেও কেউ না কেউ বানাচ্ছে গান। কেউ এআই ব্যবহার করে তৈরি করছে পোস্টার। ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আরশোলার পোশাকে মানুষ বেরিয়ে পড়ছে যমুনা নদী পরিষ্কারে। গাড়িতে লাগছে ককরোচ জনতা পার্টি-র পোস্টার। অনুরাগ কাশ্যপ, দিয়া মির্জা, স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুনাল কামরা-র মতো সেলিব্রিটিরা শরিক হচ্ছেন এই ডিজিটাল অভ্যুত্থানের।

কিন্তু কেন ডিজিটালেই আটকে এই আন্দোলনের পরিধি? দেশে বিরোধী শক্তি কি কম পড়িয়াছে? উত্তর বোধহয়, হ্যাঁ!

বিগত সাত বছরে ৬০ বারেরও বেশি নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এ-বছর আবারও। ছাত্রছাত্রীরা আগেও বিক্ষোভ দেখিয়েছে রাজপথে। তবু কিচ্ছু বদলায়নি। হতাশ যুব সম্প্রদায় দেখেছে, বিরোধী শিবিরের ন্যূনতম কার্যক্রমে অপরিবর্তিতই থেকেছে তাদের ভাগ্য। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সামান্য কিছু মিডিয়া যখন প্রশ্ন রেখেছে রাষ্ট্রের সামনে, বিনা বাধায় এসেছে ডিজিটাল ব্রডকাস্ট বিল কিংবা পরিবর্তিত আইটি অ্যাক্ট। ককরোচ জনতা পার্টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে বাঁধনের চরম ফাঁসেও আওয়াজ আটকে থাকে না। দেশে সবকিছুই ঠিক পথে এগচ্ছে না, তা হলে হয়তো, এত বিপুল জনসমর্থন মিলত না এই আন্দোলনের। পাশাপাশি কংগ্রেস, আপ কিংবা তৃণমূলের মতো বিরোধী দলগুলোর কাছেও আরশোলাকুল একটি স্বচ্ছ দর্পণসদৃশ। একদল যদি রাষ্ট্রপ্রীতি ও সংখ্যাগুরুর রাজনীতিকে ক্রমাগত প্রাসঙ্গিক করে তোলে, অন্য পক্ষও আশ্রয় করেছে দুর্নীতি, ভোটব্যাঙ্ক বানিয়ে রেখেছে সংখ্যালঘুকে। এই বিপুল সরকার-বিরোধী যুবশক্তির কণ্ঠস্বর কোনওদিনই বিরোধী শক্তির কান অবধিও পৌঁছয়নি।

কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরই বোধহয় খানিক বীতশ্রদ্ধ যুব-সম্প্রদায়। একবিংশ শতাব্দীর এশিয়া তো খানিক সেই বয়ানই জারি করছে এই দশক জুড়ে। আদতে শাসক জানে, তাদের প্রোপাগান্ডার নির্দিষ্ট এক্সপায়ারি ডেট আছে। খুব শীঘ্রই এমন দিন আসবে, যেখানে ধর্মের চশমা খুলে দেশের যুবরাই চাকরির খোঁজ করবে। সেই নির্ঘণ্ট উপেক্ষা করা নিতান্তই মূঢ়তা। তাই শাসক আগেই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে। রোধ করে সত্যের কণ্ঠ।

গোটা বিষয়টি নিয়ে তর্ক চলতেই পারে, বলা যেতে পারে, এভাবে বিরোধী রাজনীতি হয় না! আদৌ এই ম্যানিফেস্টোটি বাস্তবিক কি? সেই প্রশ্নও নেহাত ফেলনা নয়। ডিজিটাল সীমারেখা পেরিয়ে ইট-কাঠ-পাথরের ভারতে এর প্রাসঙ্গিকতা আদৌ কতটা? কোনওটারই উত্তর নেই। তবে এর পাল্টা একটা প্রশ্ন অবশ্যই আছে। প্রধান বিরোধী বলে আমরা যাদের দাবি করি, সেই কংগ্রেসের প্রধান এমন পাঁচটি দাবি কি দেখাতে পারবেন, যা দেখে আমরা আগামী লোকসভায় তাদের নির্বাচিত করব?

কিন্তু, পরমাণু বিস্ফোরণেও টিকে যায় তেলাপোকারা। এক্ষেত্রে স্মর্তব্য, ইরানের বিকেন্দ্রীভূত মোজাইক ব্যবস্থার কথা। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটি বলেই রেখেছিল, সবকিছু যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তেহরান যদি অধিকৃত কিংবা ধ্বংসও হয়, তাহলেও থামা চলবে না। বিভিন্ন রাজ্যে ঠিক তেমনই জুড়ছেন বহু মানুষ, তৈরি হচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির রাজ্যভিত্তিক শাখা। এখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা তো কোনও পার্টি নয়! শুধুই একটা ভাবনা। একটা ভাবনা কী করে একটা সিস্টেমের অংশ হতে পারে? কোনও নিয়ন্ত্রণই তো সেক্ষেত্রে নেই। সত্যিই তো নেই। কিন্তু এই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ডিজিটাল আন্দোলন যুবসমাজের ভাবনার দর্পণই নয় কি?

তাদের ইস্তেহার কী বলছে? ১) কোনও প্রধান বিচারপতি অবসর গ্রহণের পরবর্তী সময়ে রাজ্যসভার সাংসদ বা পদপ্রার্থী হতে পারবেন না। ন্যায়সংগত দাবি। যুব সম্প্রদায় চাইলে মিলিটারি, পুলিশ, আমলা কিংবা ইলেকশন কমিশনের চেয়ারম্যান জাতীয় পদগুলোও যোগ করতে পারে উক্ত তালিকায়। ২) যদি ইলেকশন কমিশন ভোটের পূর্বে কোনও বৈধ ভোটারকে ডিলিট করে, তাহলে কমিশনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ চার্জ এনে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে হবে। যথেষ্ট যুক্তিপূর্ণ দাবি। দেশব্যাপী বহু মানুষের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে প্রয়োগ হয়েছে ইউএপিএ। এক্ষেত্রে খানিক পাপমোচন হলে সমস্যা কীসের? ৩) মহিলাদের জন্য ৫০% সংরক্ষণ। ৩৩ শতাংশর গাজর ঝোলানো আর চলবে না। ৪) সেই সমস্ত মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল হবে যাদের মাথায় রয়েছে কোনও ক্ষমতাশালী শিল্পপতি। আম্বানি-আদানির ভূমিকাও আতসকাচের নিচেই রাখা হবে। এবং সর্বোপরি, ৫) যে-সমস্ত বিধায়ক বা সাংসদ দল পরিবর্তন করবেন, তাঁদের ২০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে রাজনীতির আঙিনা থেকে। অর্থাৎ জনগণের ভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা নৈব-নৈব চ।  

এছাড়াও দাবি উঠেছে, নিট কেলেঙ্কারির মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। দাবি উঠেছে, যুব সম্প্রদায়কে রাজনীতির দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসতে হবে। মূলত জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের নিয়ে প্রয়োজন একটা ভার্চুয়াল সম্মেলন। সবটুকুই অত্যন্ত দূরদর্শী এবং যৌক্তিক দাবি।

গোটা বিষয়টি নিয়ে তর্ক চলতেই পারে, বলা যেতে পারে, এভাবে বিরোধী রাজনীতি হয় না! আদৌ এই ম্যানিফেস্টোটি বাস্তবিক কি? সেই প্রশ্নও নেহাত ফেলনা নয়। ডিজিটাল সীমারেখা পেরিয়ে ইট-কাঠ-পাথরের ভারতে এর প্রাসঙ্গিকতা আদৌ কতটা? কোনওটারই উত্তর নেই। তবে এর পাল্টা একটা প্রশ্ন অবশ্যই আছে। প্রধান বিরোধী বলে আমরা যাদের দাবি করি, সেই কংগ্রেসের প্রধান এমন পাঁচটি দাবি কি দেখাতে পারবেন, যা দেখে আমরা আগামী লোকসভায় তাদের নির্বাচিত করব? আচ্ছা, কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধীকে সরিয়ে দিন, বেকারত্ব চরমে ও ডলারের দাম ৯৫ ছাড়ানো দেশে এমন একটা রাজনৈতিক বিরোধীকে তুলে ধরুন, যাদের আগামী পাঁচ বছর সম্পর্কে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।  

আরশোলারা আরও দাবি করেছে, পিএম কেয়ার ফান্ডের হিসেব চাওয়ার, করদাতাদের পয়সায় বিদেশ ভ্রমণের হিসেব চাওয়ার। একটা দাবিও অগণতান্ত্রিক নয়। অথবা, আমাদের দেশে বিগত এক দশকে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটাই এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, এই সামান্য বিষয়গুলিও বৈপ্লবিক মনে হচ্ছে। এই সামান্য প্রশ্নগুলোই জমাতে-জমাতে একদিন কি নরওয়ে হয়ে যাবে পীতবর্ণ সাংবাদিকতার ভারত?

সম্প্রতি সূর্যকান্ত বলেছেন, তাঁর কথাগুলো খুব ‘সেন্টিমেন্টালি’ নেওয়ার কোনও কারণ নেই। আসলে আবেগ বা ক্ষোভ যা-ই হোক না কেন, তা উসকে দেওয়ার জন্য কেবল একটি অনুঘটকের প্রয়োজন হয়। সিজেপি-র নেপথ্যে কোনও মার্কিনি চক্রান্ত আছে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এত বড় একটা গণতন্ত্রে মানুষের ক্ষোভ কি একেবারেই অসংগত, অস্বাভাবিক? ৩০ কোটি বছর আগে জন্ম নিয়েছিল আরশোলারা, তুষার যুগ থেকে প্রস্তর যুগ পেরিয়ে তারা টিকে গেল ঠিকই, ডাইনোসররাও যা পারল না। একথা ককরোচ জনতা পার্টি নামক ডিজিটাল অস্তিত্বটিরও মাথায় রাখা দরকার, কোন ব্যাকরণে সব ঝড়ঝঞ্ঝা এড়িয়ে টিকে থাকা যায়, টিকে থাকতে হয়। বিলুপ্তির ঝোঁক এড়িয়ে গণতন্ত্রে মানুষের প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা কি টিকে যাবে আরশোলার মতোই? সময় বলবে।