গণনা : পর্ব ৩

গণনার স্বর্গ-মর্ত্য

ভবিষ্যতের অন্ধকার গর্ভে আলো ফেলে কিছু দেখা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্ন নিয়ে আধুনিক পৃথিবীর একটা বিরাট সমস্যা বা কৌতূহল যা-ই বলুন— আছে। ভবিষ্যকথন মানেই যে ছদ্মবিজ্ঞান বা অপবিজ্ঞান— এমনকী, অ-বিজ্ঞানও বলা যেতে পারে তাকে— তাই নিয়েও যুক্তিবাদী সমাজের কোনও দ্বিমত নেই। আবার সমাজ-বইয়ের আর-একটু পাতা ওল্টালে এমন মানুষও প্রচুর পাওয়া যাবে, যাঁরা রাস্তার ধারে লাল বই আর টিয়াপাখি থেকে আলো-আঁধারি সালোঁয় ট্যারো কার্ড আর ক্রিস্টাল বল দেখলেই আসন পেতে বসে পড়েন। 

এই মতানৈক্য চলতেই থাকবে, কারণ যুক্তি ও বিশ্বাস সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না। কিন্তু এহ বাহ্য যে, ভাগ্যগণনার মধ্যে যে রহস্যময়তাটুকু রয়েছে, মানুষের কাছে তার মূল্য নেহাৎ কম নয়। বিপাকের সমুদ্রে পড়া মানুষের কাছে সেই মূল্য খড়কুটোর। আর কল্পনাপ্রবণ মানুষের কাছে সেই রহস্যময়তা এক বৃহত্তর জগতের দরজা খুলে দেয়। সে-জগতে লক্ষ যোজন দূরের আকাশে নক্ষত্রদের চলাফেরা কম্পাসের মতো নির্দেশ করে মরজগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবেরও ভাগ্য। সেই চলাফেরার খবর যে যত ভাল রাখতে পারবে, সে-ই ওই ভাগ্যকম্পাসের কাঁটা চিনবে, তত ভাল। আর সেই আকাশস্থ গতিবিধির খবর রাখার জন্য তার জানা চাই গণনা, অঙ্কের হিসেব। বস্তুত, গণনা করে ভবিষ্যৎ বলা যাক বা না যাক, তা যে বলা যেতে পারে— এই ধারণাকেই মানবসমাজের অন্যতম প্রকাণ্ড উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে আমার মনে হয়। ভবিষ্যতের মতো অন্ধকার, অজ্ঞেয়, অনন্ত, বিমূর্ত এক অস্তিত্ব যে আদৌ অনুমানযোগ্য তথা পরিমাপযোগ্য হতে পারে, এবং সেই অনুমান-পরিমাপ যে সংখ্যার দূরবিন দিয়ে সুদূর আকাশচারী গ্রহতারাদের গতিবিধি নজরে রেখে করা যেতে পারে, এ এক বিপুল অ্যাডভেঞ্চারাস চিন্তা। এই চিন্তা প্রথম যে হোমো সেপিয়েন্স করেছিলেন, তাঁর কল্প-যুক্তিতে সমৃদ্ধ উর্বর মস্তিষ্ককে অনুজ হিসেবে আমি কুর্নিশ জানাই। 

আরও পড়ুন : মানুষ গোনায় কোথায় গোলযোগ? কী বলছেন কাক্কেশ্বর কুচকুচে? লিখছেন যশোধরা রায়চৌধুরী…

গ্রহতারাদের গতিবিধি গণনার সঙ্গে কপাল গুনে কপালের গুণাগুণ বিচার করার সম্পর্ক অতি-সূক্ষ্ম এবং অতি-প্রাচীন। এইখানেই সেই দুই সহোদরার দিকে তাকাতে হয়, যাদের বিয়ে হল আকাশ-পাতাল তফাত রাখা ঘরে, সমাজে যাদের আসন হল আলাদা, যাদের পথ গেল আলাদা হয়ে— জ্যোতিষ আর জ্যোতির্বিজ্ঞান। জ্যোতিষ অর্থাৎ ‘অ্যাস্ট্রোলজি’ শব্দের উৎস হল গ্রিক ‘অ্যাস্ট্রো’ অর্থাৎ ‘নক্ষত্র’ এবং ‘লোগোস’ অর্থাৎ ‘জ্ঞান’; জ্যোতির্বিজ্ঞান বা ‘অ্যাস্ট্রোনমি’-র ক্ষেত্রে ‘লোগোস’-এর স্থানে আসে ‘নমস’ অর্থাৎ ‘নিয়ম’। অর্থাৎ, মূলগতভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান অঙ্কের হিসেবনিকেশ কষে গ্রহতারাদের চলাফেরার নিয়মকানুন-হালহকিকত জানায়, আর জ্যোতিষ হল সেই ব্যাপারের সার্বিক জ্ঞান— জ্যোতিষের কাজ শুধু গ্রহতারার চলাফেরার আঙ্কিক হিসেবের ওপর ভিত্তি করে শুধু ভবিষ্যদ্বাণী করে না। ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় ‘অ্যাস্ট্রোলজি’ ও ‘অ্যাস্ট্রোনমি’— দু’টি শব্দকেই প্রায় সমার্থকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা গিয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্তও। ভারতের বেদাঙ্গ জ্যোতিষ, গ্রিসের টলেমিয়ান অ্যাস্ট্রোলজিই হোক, কিংবা তারও আগের সুমেরীয়, মিশরীয় অথবা মায়া সভ্যতার জ্যোতিষশাস্ত্র, পার্থিব ভবিষ্যৎকে চেনার জন্য আকাশকে হাতের তালুর মতো চেনার কথা বলেছে সব সভ্যতাই। 

সূর্য আর চাঁদের গতিবিধির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই পৃথিবীতে ঋতুচক্র, জোয়ার-ভাটার মতো প্রাকৃতিক পরিবর্তন-আবর্তনগুলি হয় আর তার সঙ্গে একসূত্রেই জুড়ে থাকে জীবজগতের বংশবৃদ্ধি, এ-কথা প্রাচীনকালের মানুষ খেয়াল করেছিল। ২৫০০০-১০০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও আদিম মানুষ ম্যামথের হাড়ের ওপর আঁচড় কেটে চাঁদের হ্রাসবৃদ্ধির হিসেব করার চেষ্টা করেছিল। একেই বলা যেতে পারে, পঞ্জিকা প্রস্তুতির সূত্রপাতবিন্দু। ক্রমে এই প্রাকৃতিক ভবিষ্যঘটনার নির্দেশক পঞ্জিকা কৃষিভিত্তিক সমাজে এক বিরাট ভূমিকা পালন করবে। ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় রাতের আকাশ দেখা ও নক্ষত্রচর্চা রীতিমতো রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছে দেখতে পাচ্ছি। ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশপাশে রাজা সার্গন দ্য গ্রেটের নামে লেখা হচ্ছে মানব-ইতিহাসের প্রথম লিখিত ভবিষ্যদ্বাণী, একই সঙ্গে ব্যাবিলনের রাজজ্যোতিষীরা পোড়ামাটির ট্যাবলেটে প্রস্তুত করছেন গ্রহনক্ষত্রের গতিবিধির হিসেব লেখা প্রকাণ্ড পঞ্জিকা। মেসোপটেমিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানে গণনার ভিত্তি ছিল চাঁদ। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ সেখানে প্রথম আকাশকে ভাগ করা হল রাশিচক্রে, আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আজকের পরিচিত বারোটি রাশিতে। পরবর্তীকালে এই মেসোপটেমীয় আবিষ্কারই গ্রিক ও ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান-জ্যোতিষবিদ্যার প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে। 

সূর্যদেব রা

জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্যে ভবিষ্যদ্বাণী করায় যে, সূর্যদেব রা আর আকাশদেবতা হোরাসের পুরোহিতরা পিছিয়ে থাকবেন না সেটাই স্বাভাবিক। অলৌকিক, রোগ নিরাময় ও জাদুবিদ্যার ব্যাপারে মিশরের পুরোহিতদের খ্যাতি ছিল চিরদিনই। তাদের বিশেষ নামই ছিল ‘ইমি-উনউত’, বাংলায় যার কাছাকাছি মানে দাঁড়ায় ‘প্রহর-প্রহরী’। তাদের কাজ ছিল সময়ের হিসেব রাখা, নাক্ষত্রিক গণনা করে পঞ্জিকা তৈরি করা, গ্রহনক্ষত্রদের কোপ থেকে বাঁচার জন্য নিয়মমাফিক পূজার্চনা করা এবং বিশেষ করে সিরিয়াস বা লুব্ধক নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ করে ভবিষ্যদ্বাণী করা। মিশরের সবকিছুই যেহেতু নির্ভরশীল ছিল নীলনদের ওপর, তাই তাদের পঞ্জিকাও প্রস্তুত হত নীলনদে বান ডাকার হিসেবনিকেশের ওপরেই, কারণ সেই বন্যার পলিই সোনা ফলাত মিশরের মাটিতে। তারা খেয়াল করেছিল যে, আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধক সূর্যের কাছাকাছি এসে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়; তারপর আবার যখন সে হঠাৎই সন্ধ্যার আকাশে দৃশ্যমান হয়, তখনই আসে নীলনদের বন্যা।

চৈনিক জ্যোতিষের ছিল সূর্যের ওপর অটল বিশ্বাস। অত্যন্ত জটিল এই জ্যোতির্বিদ্যা-জ্যোতিষের ভুলভুলাইয়ায় গভীরে না ঢুকে এটুকু বলা যায় যে, আজও চৈনিক জ্যোতিষ সেই সৌরগণনারই প্রভাব মেনে এক-একটি সৌরবৎসরকে এক-একটি প্রাণীর নামে অভিহিত করে। গ্রিক বা ভারতীয় সৌরবৎসর-ভিত্তিক জ্যোতিষ যেখানে একটি গোটা বৎসরকে সূর্যের পরিক্রমণের হিসেবে বারো ভাগে ভাগ করে, সেখানে চৈনিক জ্যোতিষের সৌর আবর্তনচক্র চলতে থাকে বারো বছর ধরে। চিনা জ্যোতিষে সূর্যগ্রহণের হিসেব রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা ২১৩৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে হ্‌সিয়া বংশের সম্রাট চুং-কাংয়ের আমলের এক নথি থেকে বোঝা যায়। সেখানে বলা হচ্ছে, শি আর হো নামের দুই রাজজ্যোতিষীর ওপর দায়িত্ব ছিল সূর্যগ্রহণের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে হল্লা করে ‘সূর্যকে গিলতে উদ্যত ড্রাগনকে তাড়ানোর’। কিন্তু বেচারারা ঠিক সেই সময়েই নেশা করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফলস্বরূপ নেশা আর গ্রহণ, দুই-ই কাটার পর সম্রাট তাদের গর্দান নেন। চাঁদসূর্যের গ্রহণ যে প্রচণ্ড অমঙ্গলকারক, সে-ধারণা আজও মোটামুটি সব দেশ-ধর্মের সংস্কৃতিতেই আছে। ঠিক যেমন আছে আর-এক প্রাকৃতিক সত্তা ধূমকেতুকে অমঙ্গলের দ্যোতক হিসেবে দেখা। মহাভারতে একাধিক স্থানে পুষ্যা, স্বাতী ও চিত্রা নক্ষত্রে ধূমকেতুর আবির্ভাবকে প্রাণহানিকর বলা হয়েছে। রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজার, বাইজান্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টিন দ্য গ্রেট ও বিশ্বত্রাস হূণ নেতা অ্যাটিলার মৃত্যুর আগেও নাকি ধূমকেতু দেখা দিয়েছিল। তলস্তয় তাঁর ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’ উপন্যাসে ১৮১১-র ধূমকেতুর আবির্ভাবের সঙ্গে কালান্তক দুর্গ্রহ নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণকে সংযুক্ত করেছেন। এমনকী, হালের কোভিড-১৯ অতিমারীর সঙ্গেও জুড়ে গিয়েছে নিওওয়াইজ ধূমকেতুর নাম। নাসার টেলিস্কোপ এই ধূমকেতুকে দেখতে পেয়েছিল ২০২০-এর মার্চে, আর উত্তর গোলার্ধে সে দৃশ্যমান হয় জুলাইতে।

টলেমির ‘টেট্রাবিবলিওস’

গ্রহনক্ষত্রের চলাফেরা যে শুধুমাত্র সামাজিক-রাজনৈতিক বড়-বড় ব্যাপারকেই নয়, সাধারণ ব্যক্তিমানুষের জীবনকেও প্রভাবিত করতে পারে এই বিশ্বাস মোটামুটি দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের গ্রিক সমাজে জেঁকে বসেছিল। ততদিনে প্লেটোর শিষ্য ফিলিপ অফ ওপাস রোমান দেবদেবীদের নামে গ্রহেদের নামকরণ করে তাদের নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে দিয়েছেন। প্রথম শতাব্দীতে আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে বসে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ টলেমি লিখে ফেলেছেন পাশ্চাত্য জ্যোতিষের বাইবেল ‘টেট্রাবিবলিওস’। এই বইতে তিনি বিশদে ব্যাখ্যা করলেন জিওসেন্ট্রিক বা পৃথিবীকেন্দ্রিক এক সৌরজগতের, যে তত্ত্বের ওপর আজও জ্যোতিষ দাঁড়িয়ে আছে; পরবর্তীকালে ইয়োহান কেপলারের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্বের সঙ্গে যে বিশ্বদর্শনের প্রবল লড়াই বাধবে। টলেমি আরও বলেন যে, যে গ্রহনক্ষত্রের গতিপ্রকৃতি থেকে দেশের ভবিষ্যৎ বলা যায়, সেই একই জিনিসের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গতি থেকে ব্যক্তিমানুষের ভবিষ্যৎও বলা যাবে, এবং তাতে তাদের মঙ্গলই হবে। দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিসের সেরাপিস দেবতার মন্দিরে দেখতে পাচ্ছি রীতিমতো ব্যক্তিগত জন্মছক বা ‘নেটাল চার্ট’ তৈরি ও ব্যাখ্যা করা হত অর্থের বিনিময়ে। সেখানে গ্রহনক্ষত্রদের চিহ্নিত করা হত মণিরত্ন দিয়ে। মনে হয়, গ্রহরত্নের ধারণার এইখানেই সূত্রপাত। অর্থকরী ব্যবসা হিসেবে জ্যোতিষচর্চারও শুরু বোধ হয় এখানেই। 

ভারতীয় জ্যোতিষের শুরু বেদাধ্যয়নের ষড়ঙ্গের এক অঙ্গ হিসেবেই। শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দের মতোই জ্যোতিষও আর এক বেদাঙ্গ। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাগ্যগণনার সূত্রপাত পরাশর-লিখিত বৃহৎ পরাশরী হোরাশাস্ত্র দিয়ে। আরও পরে ষষ্ঠ শতাব্দীর জ্যোতিষাচার্য বরাহমিহিরের ‘বৃহৎজাতক’ ও ‘বৃহৎসংহিতা’ গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে, জ্যোতিষের প্রধান আগ্রহের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত ভাগ্যগণনাই। খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ভারতীয় জ্যোতিষের সঙ্গে যে গ্রিক জ্যোতিষের চেনা-পরিচয় ঘটেছিল, তাও বোঝা যায় বরাহমিহিরের রচনা থেকে। বরাহমিহির ‘যবনজাতক’ নামের এক যাবনিক জ্যোতিষতত্ত্বের গ্রন্থের উল্লেখ করছেন। এই পরিচিতির কৃতিত্বও নিশ্চয় আলেক্সান্ডারের ভারত আক্রমণেরই। ‘বৃহৎজাতক’ ব্যক্তিকেন্দ্রিক জ্যোতিষ গণনার কথা বলে। আর ‘বৃহৎসংহিতা’-কে ধরা যায় জ্যোতিষবিধি অনুযায়ী নানান করণীয়-অকরণীয়ের, ভবিষ্যৎকথন ইত্যাদির এক বিরাট কম্পেন্ডিয়াম হিসেবে। উল্লেখযোগ্য কথা হল, বরাহমিহির বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, যথাযথ ভাগ্যবিচার করার জন্য জ্যোতিষীকে হতে হবে নির্লোভ এবং তাঁর গণনা হতে হবে নির্ভুল। অর্থাৎ, ভাল জ্যোতিষী তিনিই হতে পারবেন যাঁর গ্রহনক্ষত্রের গতিবিধির অঙ্ক কষতে জুড়ি নেই, অর্থাৎ যিনি জ্যোতিষের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানও গুলে খেয়েছেন।

ভারতীয় জ্যোতিষের শুরু বেদাধ্যয়নের ষড়ঙ্গের এক অঙ্গ হিসেবেই। শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দের মতোই জ্যোতিষও আর এক বেদাঙ্গ। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাগ্যগণনার সূত্রপাত পরাশর-লিখিত বৃহৎ পরাশরী হোরাশাস্ত্র দিয়ে। আরও পরে ষষ্ঠ শতাব্দীর জ্যোতিষাচার্য বরাহমিহিরের ‘বৃহৎজাতক’ ও ‘বৃহৎসংহিতা’ গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে, জ্যোতিষের প্রধান আগ্রহের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত ভাগ্যগণনাই।

মুশকিলের শুরু এখান থেকেই। পথে-ঘাটে হোর্ডিংয়ে মুখ দেখানো লাল কাপড়, সিঁদুর ও রুদ্রাক্ষশোভিত স্বঘোষিত বাবাজি ও মায়েরা বরাহমিহিরের এই নির্দেশ কতখানি মানেন তা জানি না। গ্রহতারাদের অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে অঙ্ক কষার চেয়ে চেম্বারের স্থান পরিবর্তন তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায় নিশ্চয়। ছবিটা পাশ্চাত্যের বড় বড় শহরেও একই। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সর্বত্রই ফলিত জ্যোতিষ আর গণিত জ্যোতিষের পথ একেবারে আলাদা হয়ে গিয়েছে বহুকালই। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে ইউরোপে আলোকপ্রাপ্তির যুগ শুরু হয়, দর্শনচর্চায় নতুন জোয়ার আসে, রমরমিয়ে রাজত্ব করতে থাকে যুক্তিবাদ। আধুনিক অর্থে জ্ঞানবিজ্ঞান-চর্চা বলতে আমরা যা বুঝি, তার সুসংবদ্ধ রূপের এই হল প্রস্থানবিন্দু। এই বিজ্ঞানচর্চার সামনে ফলিত জ্যোতিষের মতো ভবিষ্যৎ কথনের ‘বিদ্যা’ প্রমাণাভাবাৎ তার পূর্বতন ‘স্টেটাস’-টি অচিরেই হারিয়ে ফেলে, কারণ বুধগ্রহের তুঙ্গস্থ হওয়ার সঙ্গে মানবশিশুর পড়াশোনায় ভাল হওয়ার কিংবা সপ্তম স্থানে মঙ্গল নীচস্থ হওয়ার সঙ্গে স্বামীর অকালমৃত্যুর কোনও সযৌক্তিক সম্পর্ক আদৌ নেই। তাছাড়া জ্যোতিষ এই আধুনিক বিশ্বদর্শনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেলিওসেন্ট্রিক বা সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণার আত্তীকরণ করেনি। জ্যোতির্বিজ্ঞান এ-কথা মেনে নেয় যে-সৌরজগৎ সতত সঞ্চরণশীল, ফলে খ্রিস্টজন্মের প্রায় দু-হাজার বছর আগে যে খ-বিন্দুকে ধরে সুমেরীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের সূত্রপাত, যে-বিন্দুকে রাশিচক্র ও সূর্যের সঞ্চারপথের প্রস্থানবিন্দু ধরে গ্রিক বা ভারতীয় জ্যোতিষের গণনা শুরু হয়েছিল, সেই বিন্দুই গিয়েছে সরে। অথচ জ্যোতিষের গণনা আজও সেই সমস্ত সূত্র ধরেই হয়ে চলেছে। সমালোচকদের দাবি— গণনার মূল ধ্রুবকে ভুল থাকলে ভাগ্যগণনা তো ভুল হতে বাধ্য! 

বৈজ্ঞানিক গণনার সঙ্গে ভাগ্যগণনার সংঘাত তাই লেগেই রয়েছে। অন্যদিকে ভবিষ্যৎকথনও নিজেকে কখনও অঙ্কের গণনার মধ্যে আটকে রাখেনি। পৃথিবীর হাজারো দেশ-ধর্ম-সংস্কৃতির ইতিহাসে ভবিষ্যতের পর্দার আড়ালে উঁকি মারার হাজার-হাজার তাকলাগানো উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। জন্মকুণ্ডলী, হরোস্কোপ, চার্ট দেখা গণিত-ফলিত জ্যোতিষেরই অঙ্গ, তারই আর-এক রূপ হাত দেখা। ট্যারো রিডিং, তাস বা ক্রিস্টাল বলের সাহায্যে ভাগ্যগণনা করা তো নেহাৎই পরিচিত। নিউমেরোলজি বা নম্বরের সাহায্যে ভাগ্য গণনা করা, পোষা পাখির সাহায্য নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাও অপরিচিত নয়। বইয়ের পাতা খুলে, জলের মধ্যে গলানো ধাতু ঢেলে, মুদ্রা মাটিতে ঘুরিয়ে কিংবা মৃত পশুর অন্ত্রের আকার-আকৃতি দেখেও না কি ভবিষ্যৎ বলা যায়। এমন আরও অনেক পন্থা আছে, বলা বাহুল্য, যুক্তিবাদী মন সেই সবগুলিকেই ছুড়ে ফেলে দেয়।

‘হত্যাপুরী’-র অলংকরণ

কিন্তু তবুও… তবুও এক আশ্চর্য গোধূলিজগৎ থেকে যায় মানুষের মনের সামনে। যুক্তি-বিজ্ঞান ‘ডেফিনিটিভ’, তারা নির্দেশ ও নির্দিষ্ট করতে ভালবাসে। মানবজীবন যে ‘ইনডেফিনিট’, অনির্দেশ্য, অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে ‘নির্দিষ্ট’ করার গর্ব যে চলে না। ঘটনাচক্রে আজ যখন এ-রচনা লেখা বা প্রকাশিত হচ্ছে, তখন সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। এহ বাহ্য, সত্যজিৎ তাঁর সাহিত্যে বারংবার এনে ফেলেছেন নানান গণৎকার ও জ্যোতিষী চরিত্রকে, বারবার সংঘাত ঘটিয়েছেন সেই বিজ্ঞান-যুক্তির ‘নির্দিষ্ট’ আর আবছায়া ‘অনির্দেশ্য’ জগতের। কখনও তারা ভণ্ড, ক্ষতিকর। যেমন ‘গোঁসাইপুর সরগরম’-এ আত্মারাম মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আশ্চর্য ভাবে সত্যজিৎ, স্বঘোষিত গডম্যান বা বাবাজিদের প্রতি যাঁর প্রচ্ছন্ন অসন্তোষই ছিল, সেই গণৎকারদের ‘ট্রিট’ করেছেন নরম হাতে। ‘হত্যাপুরী’ উপন্যাসে ফেলুদার হাতে লক্ষণ গণৎকার খুনের দায়ে ধরা পড়ে বটে, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ দর্শনের ক্ষমতা ভণ্ডামি বলে প্রমাণিত হয় না। বিশেষ করে, প্রোফেসর শঙ্কুর মতো বৈজ্ঞানিক চরিত্রের আশেপাশেই গণৎকারের ছড়াছড়ি দেখা যায়। শঙ্কুর বন্ধু সন্ডার্স ‘নো-ননসেন্স’ ব্রিটিশ সাহেব, সে কোনও মাম্বোজাম্বো বা তুকতাকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু শঙ্কু বা তার জার্মান বন্ধু ক্রোল তা নয়, কাজেই তারা প্রাচীন অ্যালকেমির বইয়ের নিশানা মেনে রাসায়নিক উপায়ে সোনা তৈরি করতে যাওয়ার আগে জিপসি মহিলার কাছে ভাগ্য গণনা করাতে যায় এবং সেই ভবিষ্যদ্বাণী সফলও হয় (‘শঙ্কুর সুবর্ণ সুযোগ’)। প্রাচীন মিশরীয় দৈবজ্ঞ মেনেফ্রুর করা ভবিষ্যদ্বাণী মেনে ধূমকেতু উদয়ের সূত্র ধরে শঙ্কু পৌঁছে যান সাহারা মরুভূমির মাঝে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, কারণ মেনেফ্রুর মতো তাঁরও বিশ্বাস— এতে মানুষের মঙ্গলই হবে (‘মহাকাশের দূত’)। তবে কি শঙ্কু তথা সত্যজিতের এই বিশ্বাস জ্যোতিষের ওপর টলেমির সেই মানবকল্যাণমুখী বিশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি? এ-কথাই বা কী করে ভুলি যে শঙ্কুর সবচেয়ে বড় শত্রুর পরিচয় দিতে গিয়ে এক জ্যোতিষীই রহস্য করে বলেছিলেন, ‘তুমি নিজে’ (‘শঙ্কুর শনির দশা’)? মানুষের জীবনের এত বড় সত্যি কথা সত্যজিৎ এক সামান্য জ্যোতিষীর চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তাঁর সৃষ্ট অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী চরিত্রটির উদ্দেশে বলালেন কেন? অনুমান করি, পাশ্চাত্য আলোকপ্রাপ্তির নির্দেশ শিরোধার্য করে বিজ্ঞান আর জ্যোতিষকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে বোধহয় পারেননি সত্যজিৎ। 

আসলে সেটা বোধহয় যায়ও না। যুক্তি আর অলৌকিক— এই দুইয়ের প্রতিই মরমানুষের আকর্ষণ বড় স্বাভাবিক, বড় প্রকৃতিগত। তাই তো দেখি নির্বাচনের ফলাফল বেরনোর আগে এক্সিট পোলের রিপোর্ট আর চিরকুটের সামনের টিয়াপাখির ওজন হয় একই দাঁড়িপাল্লায়, একই বাটখারায়।