আশা শুধু নাম নয়, এক ইতিহাস। একজন লেজেন্ড, একজন তারকা, যাঁর প্রতিভা সত্যিই বোঝার বাইরে। আশা ভোঁসলে আমাদের আত্মীয়। রাহুল দেববর্মণ, আমাদের টুবলুর মা ছিলেন আমার দিদি। আমরা একসময়ে হিন্দুস্তান রোডে যৌথ পরিবারে থাকতাম। পরে সাউথ এন্ড পার্কে যখন আমাদের নতুন বাড়ি হল, তখন একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। শচীন দেববর্মণ আর আমার বাবা নির্মল কুমার দাশগুপ্ত, দু’জনেই এক আর্কিটেক্ট দিয়ে প্রায় একরকম দুটো বাড়ি বানিয়েছিলেন। আজ সেই বাড়িটা ভগ্নপ্রায়। কিন্তু একসময়ে সেখানে কত স্মৃতি, কত গান, কত মানুষ ছিল! আশা কতবার যে সেই বাড়িতে এসেছেন, গুনে বলা যাবে না।
আমার বাবাকে টুবলু ডাকত ‘মণিদাদু’। তিনি ছিলেন ওর খুব আপন মানুষ। যখন আশা আর টুবলুর বিয়ের সিদ্ধান্ত হল, তখন একটা ফোন এসেছিল। অনুমতি চাওয়ার জন্য নয়, শুধু খবর দেওয়ার জন্য। কারণ সবাই জানত, মণিদাদু কখনও ‘না’ বলবেন না।
টুবলুর কিছু প্রিয় খাবার ছিল। মোচা, পটলের দোর্মা আর পাবদা মাছ। একদিন কলকাতায় বিমান থেকে নামার সঙ্গে-সঙ্গেই আমাদের বাড়িতে ফোন এল। মণিদিদা, অর্থাৎ আমার মাকে বলা হল, এসব রান্না করতে হবে। মা তখন ছুটলেন গড়িয়াহাট বাজারে— পাবদা মাছ কিনতে, আর সঙ্গে একটা রুপোর সিঁদুরদানি। নতুন বউকে তো ঠিকমতো বরণ করতে হয়।
আরও পড়ুন: ‘শোলে’ থেকে বাদ গিয়েছিল কিশোরকুমারের গাওয়া গান? লিখছেন জয়দীপ রাউত…
বিয়ের পর ওঁরা কলকাতায় এলেন। আশাকে দেখেছি একেবারে ঘরোয়া রূপে— সিঁদুর পরা, হাসিখুশি, খুব সহজ মানুষ। বড় তারকা বলে আলাদা কিছু মনে হত না। আমার একটা খুব প্রিয় স্মৃতি আছে। আমার মেয়ে তখন মাত্র এক মাসের। আশার কোলে বসে আছে, আর তিনি নিজে হাতে তাকে খাওয়াচ্ছেন। সেই ছবিগুলো আজও আমার কাছে আছে।

কিন্তু এই বাড়িটা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা ছিল না, ছিল সংগীতের এক জীবন্ত কেন্দ্র। এই বাড়ি দেখেছেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার— এমনকী সাক্ষী থেকেছে, বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, সুরকার আর শিল্পীদের অবাধ যাতায়াতেরও। এক অর্থে, এই বাড়ির দেওয়ালের মধ্যেই ভারতীয় সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছে। এই বাড়ির ভেতরে বসেই সুরের জন্ম হয়েছে, নতুন ভাবনার জন্ম হয়েছে। লোকসংগীত আর আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে, যা পরে ভারতীয় সিনেমার সংগীতকেও এক নতুন মাত্রা দেয়। শচীন দেববর্মণ এই ধারার ভিত্তি গড়েছিলেন, আর রাহুল দেববর্মণ সেই ধারাকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়।
রাহুলদেব বর্মণের সংগীতে যে-ছন্দের বৈচিত্র্য, কণ্ঠের ব্যবহার, পরীক্ষার সাহস— সেটা সম্ভব হয়েছিল কারণ তিনি নিজে যেমন অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন, তেমনই আশা ভোঁসলেও ছিলেন তাঁর এক বিশাল শক্তি। আশা শুধু গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘রিসোর্স’, এক সৃষ্টিশীল সঙ্গী, যাঁর মাধ্যমে টুবলু তাঁর সংগীতকে নতুনভাবে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন।


এই বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন সেইসব দিনের সাক্ষী, যেখানে গান তৈরি হত, সুর নিয়ে আলোচনা হত, হাসি-ঠাট্টা চলত, সর্বোপরি নতুন ভারতীয় সংগীত-ধারার জন্ম হত। কিন্তু আজ? আজ সেই বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা দেওয়াল, নিঝুম করিডোর আর অবহেলার ভার নিয়ে। যেন এক আহত স্মৃতি— যাকে আমরা ইচ্ছে করেই ভুলে যাচ্ছি।
স্মৃতির প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি একসময়ে গোটা দেশের সংগীতকে প্রাণ দিয়েছিল। আজ সেটাই ধীরে-ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু একটা বাড়ি নয়, এটা একটা মন্দির, ঐতিহ্য, উত্তরাধিকার। দুই প্রজন্ম— এস ডি বর্মণ এবং আর ডি বর্মণ— একই ঠিকানায় থেকেছেন, কাজ করেছেন, সৃষ্টি করেছেন। এই বাড়ি শুধু তাঁদের বাসস্থান ছিল না, ছিল সৃষ্টির কেন্দ্র।
এই বাড়ির ভেতরে বসেই সুরের জন্ম হয়েছে, নতুন ভাবনার জন্ম হয়েছে। লোকসংগীত আর আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে, যা পরে ভারতীয় সিনেমার সংগীতকে এক নতুন মাত্রা দেয়। শচীন দেববর্মণ এই ধারার ভিত্তি গড়েছিলেন, আর রাহুল দেববর্মণ সেই ধারাকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়।
তবু আজ সেটার কোনও দেখভাল নেই। না কেন্দ্র সরকার, না রাজ্য সরকার— কেউ যেন দায় নিতে চাইছে না। হয়তো মনে হয়, এই বাড়ি বাঁচালে ভোট বাড়বে না। কিন্তু প্রশ্ন হল— সব কিছু কি ভোট দিয়ে মাপা যায়? একটা দেশের সংস্কৃতি, তার সংগীত, ইতিহাস— এসব কি এতটাই তুচ্ছ?
বিশ্বের অন্যান্য দেশে দেখুন— মোৎজার্টের বাড়ি, বিটল্সদের বাড়ি, এলভিস প্রেসলির গ্রেসল্যান্ড— সবই সংরক্ষিত, যত্নে রাখা, মানুষের জন্য খোলা। সেখানে এগুলো শুধু স্মৃতিচিহ্ন নয়— এগুলো জীবন্ত অভিজ্ঞতা। আমরা কেন পারি না? ভাবুন তো, এই বাড়িটা যদি একটি আধুনিক, ইন্টার্যাকটিভ মিউজিয়াম হত, যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ অনুভব করতে পারতেন কীভাবে একটি গান তৈরি হয়, কীভাবে সুরের জন্ম হয়— ভার্চুয়াল রিয়ালিটি দিয়ে মানুষ ঢুকে পড়তে পারতেন সেই সময়ের ভেতরে।
কিন্তু আমরা কিছুই করছি না। প্রতি বছর টুবলুর জন্মদিনে মানুষ এখানে আসে, গান গায়, স্মরণ করে। কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট? ভালবাসা যদি কাজে না লাগে, তাহলে তার মূল্য কী? আর যাঁরা এই সংগীত থেকে আজও উপার্জন করছেন— তাঁরা কোথায়? কেন তাঁরা এগিয়ে আসছেন না? সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল এই নীরবতা। এই নীরবতা মানে উদাসীনতা নয়, এটা এক ধরনের দায় এড়ানো। এই বাড়ি ভেঙে গেলে আমরা শুধু একটা স্থাপত্য হারাব না, আমরা হারাব আমাদের সংগীতের একটা অংশ, আমাদের পরিচয়ের একটা অংশ। আমি আজ আশি বছর বয়সে দাঁড়িয়ে এটা দেখে লজ্জা পাই। কারণ আমি শুধু একজন নাগরিক নই, আমি একজন সাক্ষী। আমি সেই দিনগুলো দেখেছি, সেই মানুষগুলোকে চিনি, সে-সময়ের অংশ ছিলাম। তাই এই হারানোটা আমার কাছে ব্যক্তিগত। কিন্তু এখনও সময় আছে। এই বাড়িটা এখনও বাঁচানো সম্ভব। এটাকে একটি জীবন্ত, আধুনিক মিউজিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসে বুঝতে পারবে, অনুভব করতে পারবে আমাদের সংগীতের ইতিহাস। এটা শুধু দু’জন শিল্পীর সম্মান রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটা আমাদের দেশের মর্যাদার প্রশ্ন। কারণ যদি আমরা আমাদের ইতিহাসকে বাঁচাতে না পারি, তাহলে আমরা নিজেদেরকেই হারাব।




