পাথর কথা বলে
কলকাতা শহরের দেওয়ালে, ইঁট-কাঠ-পাথরে কান পাতলে নাকি ইতিহাসের ফিসফিসানি শোনা যায়। তবে ‘যায়’ না কি ‘যেত’ এ-নিয়ে একুশ শতকে দাঁড়িয়ে সব গুলিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কারণ যে-হারে পুরনো বাড়ি ভেঙে পড়ছে, উঠছে বহুতল, আর কতদিন ‘হেরিটেজ’ তকমা এ-শহরের পুরনো স্মৃতি-চিহ্নগুলো বয়ে বেড়াবে তা নিয়ে সংশয় আছে।
তবুও অসিত পালের মতন কিছু মানুষ রয়েছেন আজও, যাঁরা ইতিহাস রক্ষার স্বার্থে— ধরে রাখার চেষ্টা করেন এ-সমস্ত ঘর-বাড়ির কিছু জীবন্ত দলিল। মুছে যাওয়ার আগে শেষ চিহ্ন আরকি!
বটতলা-সংস্কৃতি চর্চায় অসিত পালের নাম গবেষক-পাঠকমহলে সুবিদিত। সম্প্রতি তাঁরই একটি বই প্রকাশ করেছেন ‘মায়া বুকস’। বইটির নাম ‘বটতলার ঘরবাড়ি’। বইটির ভূমিকায় লেখক বলছেন, ‘আমি ছবি আঁকা জগতের মানুষ ইতিহাস আমার জন্য নয়, আমি খ্যাপার মতোই ঘুরে ফিরি আর ডাইরি লিখি;’ লেখকের এই ‘disclaimer’ কিন্তু বিনয়ের নামান্তর। ইতিহাস চর্চার যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ রয়েছে, তার অন্যতমই তো দিনলিপি, ছবি। এই বইটিও সে-রকম কিছু উপাদান দিয়েই সমৃদ্ধ হয়েছে।
আরও পড়ুন: কাঁটাতারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীও এই বইয়ের চরিত্র হয়ে ওঠে! লিখছেন বিজয় দে…
বইটি মোট পাঁচটি অধ্যায়ে বিবক্ত। সেগুলি যথাক্রমে, ‘কলকাতার শরীর জুড়ে এখনও রয়েছে সেইসব অহংকার’, “ইওরোপীয় স্থাপত্য ও ‘বাবু’ সংস্কৃতি”, ‘ধনী বাবুদের প্রতিযোগিতা ও বিলাসিতা’, ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত বাড়ি’, ‘ধর্মীয় স্থান’ এবং এর পর যুক্ত হয়েছে অজস্র ছবি।
বইটি মোট পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। সেগুলি যথাক্রমে, ‘কলকাতার শরীর জুড়ে এখনও রয়েছে সেইসব অহংকার’, “ইওরোপীয় স্থাপত্য ও ‘বাবু’ সংস্কৃতি”, ‘ধনী বাবুদের প্রতিযোগিতা ও বিলাসিতা’, ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত বাড়ি’, ‘ধর্মীয় স্থান’ এবং এর পর যুক্ত হয়েছে, বটতলা-সংলগ্ন অজস্র ছবি।

প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে শহরের মধ্যে একের-পর-এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য গড়ে উঠল, তারই একটা কাঠামো-কাহিনি ধরা রয়েছে।
চৌরঙ্গী, ফোর্ট উইলিয়াম সংলগ্ন অঞ্চল জুড়ে ‘হোয়াইট টাউন’ এবং সুতানুটি সংলগ্ন অঞ্চল জুড়ে ‘ব্ল্যাক টাউন’ গড়ে ওঠার নেপথ্য রাজনীতি ও তার ভৌগোলিক আর্থ-সামাজিক পটভূমি তুলে ধরেছেন লেখক। ঠিক এই জায়গা থেকেই আমাদের চলে আসতে হবে বইটির নাম প্রসঙ্গে। বইটির নাম ‘বটতলার ঘরবাড়ি’। অর্থাৎ বটতলা অঞ্চল জুড়ে যে-বাড়িগুলি গড়ে উঠেছিল সেটারই ছবি-কাহিনি সংকলিত হয়েছে এই বইতে। বইয়ের মূল বিষয়মুখ বটতলাকেন্দ্রিক হলেও, যেভাবে লেখক ঔপনিবেশিক সমাজের পটভূমি আলোচনা করে মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করেছেন, সেখানেই এই কাজটি স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। কেন ও কীভাবে চিৎপুর ও তার সামগ্রিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বটতলা-সাহিত্য জন্ম নিল তা সংক্ষেপে হলেও নিপুণভাবে দেখানো হয়েছে।
আসা যাক দ্বিতীয় অধ্যায়ে। প্রতিযোগিতা বড় বিষম জিনিস। কলকাতার বাবু-সমাজের হাতে যখন দালালি, মুৎসুদ্দি এই পেশাগুলির জন্য হঠাৎ করে প্রচুর টাকা চলে এল, তার ভিত্তিকে তাঁদের মানসিক পরিস্থিতিকে আমরা দুটো ভাগে দেখতে পারি। এক, বাবুরা চাইলেন, নিজেদের মধ্যেই অর্থ-প্রতিপত্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে কীভাবে একে অন্যকে টেক্কা দেওয়া যায়। দুই, কীভাবে ‘ইংরেজ প্রভু’দের মনজয় করে, ‘আধা সাহেব’ সাজা যায়। এই ‘আধা সাহেব’ সাজার প্রচেষ্টার ফল যেমন পড়ল বাবুদের সাজ-পোশাক আচার-আচরণে, তেমনি প্রভাব পড়ল বাবুদের বাড়িতেও। কলোনিয়াল স্থাপত্য কীভাবে হোয়াইট টাউন পেরিয়ে ব্ল্যাক টাউনে প্রবেশ করল তার চমৎকার ছবি এঁকেছেন লেখক। এই সূত্র ধরেই এসেছে ‘বেঙ্গল বারোক’ প্রসঙ্গ। যেখানে দেখানো হচ্ছে কীভাবে এ-দেশীয় স্থাপত্যকলার মধ্যে এসে মিশেছে ইওরোপীয় স্থাপত্যকলার বৈশিষ্ট্য। এক শ্রেণির সাহেব তো আবার মনে করতেন— এদেশে কোনও ‘ভাল’, ‘পেশাদার’ স্থপতিই নেই, যিনি স্বতন্ত্র রীতির এক নকশা তৈরি করবেন।
তবে একথা ঠিক, একদিকে ইওরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণ, আরেকদিকে দেশীয় সংস্কৃতির প্রভাব বাবুদের বাড়ির গঠনকে এক স্বতন্ত্র চেহারা দিয়েছিল। এই প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছিল বাবুদের বাড়ির অন্তঃপুরে। এই প্রসঙ্গ ধরেই এসেছে অন্দরমহল, বাহিরমহল, কাছারি এই ধরনের বিভাজনগুলির কথা।
এই বইতে যে-বিভাগগুলি রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বেশকিছু উপবিভাগ, যা এই বইয়ের কেন্দ্রীয় বিষয়কে বহুমুখে চালিত করেছে।
ধনী বাবুদের মধ্যে বিলাসিতা-প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ এর আগেও আলোচিত হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় বিষয় এটিই। এখানে লেখক দেখাচ্ছেন— কীভাবে রাজা নবকৃষ্ণ দেব পলাশীর যুদ্ধের পর, শোভারাম বসাকের প্রাসাদ কিনে দিল্লি থেকে কারিগর এনে, তার অভ্যন্তরীণ নকশা ‘দেওয়ান-ই-আম’ ও ‘দেওয়ান-ই-খাস’ রীতিতে নির্মাণ করেন। একইসঙ্গে এসেছে দ্বারকানাথ ঠাকুরের বেলগাছিয়া ভিলা নির্মাণের পেছনে ২০ লক্ষ টাকা খরচের প্রসঙ্গ। বাবুর বাড়ির দরজা বা মূল প্রবেশপথ যত উঁচু হবে, মানুষকেও তত ঘাড় উঁচিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ততই বেশি বাবুর প্রতিপত্তি, বাবুর ক্ষমতা। এরকম ভাবেই মার্বেল প্যালেস, লাহাবাড়ি, চোর বাগানের মিত্র বাড়ি, গোকুল মিত্র হয়ে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির মতো বটতলা অঞ্চলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বহু বাড়ির গল্প শুনিয়েছেন লেখক।
আসলে উনিশ শতকে সারা কলকাতা জুড়ে যে-বাবু সমাজের প্রতিপত্তি গড়ে উঠেছিল, বিশেষ করে বটতলা অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই যার বিকাশ, এই বই সেই বাড়িগুলির ‘হয়ে ওঠা’র নেপথ্যকথা। এই ‘কথা-কাহিনি’তে প্রাণ জুগিয়েছে ‘মায়া বুকস’-এর কর্ণধার। বাংলা ভাষায় কোনও ছবিসমৃদ্ধ বই হলেই অধিকাংশ কাজই খুব নিম্নমানের হয়। বিশেষ করে ছবি ছাপার কাগজের নির্বাচনই প্রকাশনাটিকে দুর্বল করে দেয়। মায়া বুকস সে-পথে হাঁটেননি। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও পেশাদারিত্বর সঙ্গে তাঁরা এই বইটি নির্মাণ করেছেন। এই বইতে লেখার সংখ্যা কম, ছবির সংখ্যাই বেশি। এই বই মূলত ছবির-ই বই। যে-ছবিকথার পূর্বে সংযোজিত অসিত পালের লেখনি ছবিগুলিকে প্রাণ জুগিয়েছে। বাংলা প্রকাশনার জগতে এই বই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
তবে হ্যাঁ, পাঠক যদি আশা করেন এই বইতে কলকাতার বটতলা সংলগ্ন বাবুদের বাড়িগুলির ছবি পাশে রেখে একটা সামগ্রিক ইতিহাস-চিত্র তাঁরা পাবেন, তাহলে কিন্ত ভুল করবেন। এই বইতে কখনওই বাড়িগুলি তৈরি হওয়ার সামগ্রিক ইতিহাস পাবেন না। যা পাবেন, বাড়িগুলি নির্মাণের পেছনে থাকা কিছু সমাজ-অর্থনৈতিক নেপথ্যকথা। তবে এই বই কি একেবারেই ইতিহাস বলে না? বলে। কিন্ত যা বলে তা সামগ্রিক নয়, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এটি কিন্তু বইয়ের কোনও ত্রুটি নয়। এটি বইয়ের গুণ। আসলে এই বইয়ের কেন্দ্রীয় বিষয় তো ছবি, সেই ছবিরই দোসর সংক্ষিপ্ত লেখাগুলি। সাদাকালো ছবিগুলি যে অসামান্য রঙ-বিন্যাসে সাজানো হয়েছে, তা সত্যিই ইঁট-কাঠ-পাথরের নীরব ইতিহাসের কথা বলে। হতে পারে সেই ইতিহাস বাবুদের অর্থ ও প্রতিপত্তির এক প্রতিচ্ছবি কিন্তু ইতিহাস তো বটে। লেখক কিন্তু এই এই জৌলুসের উল্টো দিকে থাকা মানুষগুলোর কথাও এড়িয়ে যাননি। দেখিয়েছেন কীভাবে সরু রাস্তার উপরে থাকা বড়-বড় বাড়ির আশেপাশেই গড়ে উঠেছে, বস্তি ও এক অন্য অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষ জীবন কথা। এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। সামগ্রিকভাবে এই বইয়ের স্বর বিচিত্র রূপে, বহুমাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে, যে-ইতিহাস সময়ের, যে-ইতিহাস মানুষের। একইসঙ্গে ইঁট-কাঠ-পাথরেরও।
বটতলার ঘরবাড়ি। অসিত পাল। মায়া বুকস । ৭০০ টাকা



