বান এসেছিল রসাতলে
এই শহরের অনেক মানুষ যা জানে না, তা আমরা হাতে-পায়ে জানি। জলে-কাদায় মাখামাখি হয়ে জানি। আমরা কোটাল জানি, ভরা কোটাল জানি। আমরা এমন ইট, সিমেন্ট, লোহার শহরে থেকেও ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসবে বলে প্রস্তুত হই। কালীঘাটের লোক আমরা!
বাবার কাছে শুনেছিলাম, আদিগঙ্গা একসময় ছিল বিশাল ভাগীরথী। সেই নদীই চড়া পড়ে পড়ে এমন হয়েছে। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে এক ইংরেজ ক্যাপ্টেন টলি, ভাগীরথীর বুজে আসা চরের একটা অংশ খনন করেন। সেটা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে আলিপুর ও মারহাট্টা ডিচ পর্যন্ত। তাঁর নামেই এই অংশের নাম হয় টালিনালা। কিন্তু আমাদের কাছে ভাগীরথীর অংশ হয়েই থেকে যায় যা আদিগঙ্গা বা কালীগঙ্গা।
এর কুলেই ছিল ছোট্ট একটা কালীমন্দির। মাঝিমাল্লা থেকে বণিকরা এই কালীদেবীর ঘাটে এসে কালীপুজো করতেন সমুদ্রযাত্রার পথে। এদিকে বিস্তৃত অঞ্চলে জঙ্গল থাকলেও এই জায়গায় একটা গ্রাম ছিল। জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সেটাই আমাদের কালীঘাট। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে চৈতন্যদেব জন্মান নবদ্বীপে। তারপর তিনি অনেক পরিক্রমা করেছেন, কালীঘাটের দক্ষিণে ছত্রভোগ নামে এক গ্রামেও গিয়েছিলেন। সেসময় কালীক্ষেত্রের উল্লেখ ছিল। কিন্তু পরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত্যে কালীঘাটের কোনও উল্লেখ নেই। হয়তো এটা শক্তিপীঠ, ওঁরা বৈষ্ণব। ওই আমরা-ওরা কেস!
কালীঘাট আমাকে লাইন শিখিয়েছে! পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১২…
কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্য’-তে কালীঘাটের চারপাশের বর্ণনা দিয়েছেন।
‘ত্বরায় বহিছে তরি তিলেক না রয়।
চিৎপুর সালিখা সে এড়াইয়া যায়।।
কলিকাতা এড়াইল বেনিয়ার বালা।
বেতড়েতে উত্তরিল অবসান বেলা।।
ডাহিনে ভাড়িয়া যায় হিজলীর পথ।
রাজহংস কিনিয়া লইলা পারবত।।
বালুঘাট এড়াইল বেনের নন্দন।
কালীঘাটে গিয়া ডিঙ্গা দিল দরশন।।
তীরের প্রমাণ যেন চলে তরীবর।
তাহার মেলানি বাহে মাইন নগর।।’
(চণ্ডীমঙ্গল কাব্য/ ধনপতির নৌকারোহণ)
আচ্ছা এই নৌকার মাঝিমাল্লা বা বণিকদের জন্যই কি কালীঘাট বুকের ভেতর বারাঙ্গনা পল্লির পত্তন হয়? কালীঘাট নিয়ে লেখা বেশিরভাগ লেখকই কিন্তু এদিকে তাকান না, কেমন যেন রুমালে মুখ ঢেলে টপকে চলে যান।
কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকে চোখ খোলা ছিলাম।
আমি পড়তাম ভবানীপুরের সাউথ সাবার্বান স্কুল মেইনে। তখনকার স্কুলে এইট থেকে শারীরশিক্ষার সঙ্গে তিনটি বিভাগ জুড়ে থাকত আর্মি-নেভি-এয়ারফোর্স। অনেক স্কুল আবার সেসময় ব্রতচারীও করাত। আমি করতাম নেভি। সপ্তাহে একটা করে পিরিয়ড থাকত। বছরে একবার কাছেপিঠে ট্যুরেও গিয়েছিলাম। কখনও লেকের ধারে জলের ওপর ঝুলে ঝুলে ট্রেনিংও হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল নেভির পরীক্ষা। পরীক্ষা নিতে আসতেন নেভির লোকজন। তাঁরা সাদা জামা-প্যান্ট পরে। নানারকম প্রশ্ন করত। আমিও গিয়েছি সেই পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষার টেবিলে তিনজন। স্কুলের সুবোধবাবু এবং দু-জন নেভির প্রতিনিধি।
আমার সামনে ভারতের একটা ম্যাপ খুলে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ দেখাতে বলল। দেখালাম। এবার পশ্চিমবঙ্গের একটা ম্যাপ খুলে দিয়ে কলকাতা দেখাতে বলল। দেখালাম। এবার কলকাতার একটা ম্যাপ খুলে দিয়ে বলল স্কুলের অবস্থান দেখাতে। দেখালাম। তারপর টালিনালা। বেশ গর্ব হল, আমাদের টালিনালাকে নেভির লোকজন বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারপর— কালীঘাট কালীমন্দির— আলিপুর জেল। ব্যস, কমপ্লিট। আমার হাতে পেনসিল। আমি ম্যাপের আর একজায়গায় চক্কর কাটছি— যে দু-জন পরীক্ষা নিচ্ছিলেন— তাঁরা বললেন— এটা কী? আমার তখন দারুণ কনফিডেন্স। বুকের ভেতর আদিগঙ্গার বান ডেকেছে। কুল কুল করছে। বললাম— দ্যাট ইজ তবলা গলি। ফেমাস রেডলাইট এরিয়া। ফেমাস ব্রথেল।
আমার কথা শুনে একজন হা হা করে হাসলেন। একজন আমার হাড় জিরজিরে পিঠে বিশাল এক শাবাসির থাপ্পড় কষালেন। সুবোধবাবুর মুখ গম্ভীর হয়ে ঝুলছে। সেদিন পরীক্ষার্থীদের জন্য খাবার ছিল। আমাকে দুটো ডিম, আর একটা অরেঞ্জ ড্রিঙ্কের বোতল বেশি দাওয়া হয়েছিল। চারখানা ডিম খেয়ে আমি অনেকের ঈর্ষার পাত্র হয়েছিলাম। আর যিনি স্কুলের প্রতিনিধি ছিলেন, অঙ্কের টিচার সুবোধবাবু, পরের নেভি পিরিয়ডে আমাকে অহেতুক হাতে দুটো ইট তুলিয়ে সারা মাঠ দৌড় করালেন।
তখনই বুঝেছিলাম— দেখার চোখ আর রসবোধ সবার সমান হয় না। এই ঘটনার পরে আমি সুবোধবাবুর ম্যান মার্কিং-এ পড়ে গিয়েছিলাম।
আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল গঙ্গার ঘাট-লাগোয়া পাড়ায়। একতলা বাড়ি। ওদের চৌকির পায়া ছিল লম্বা লম্বা। বছরে বেশ কয়েকবার ভরা কোটালের জলের থেকে বাঁচতে ওদের ঘরসংসার উঠত চৌকির ওপর। ওইসব বাড়িগুলোর সেসময় দোতলা হওয়ার সুযোগ ছিল না। ওদের বাঁচার একটাই উপায় চৌকি বা খটের পায়ার নীচে ইট গুঁজে দিয়ে বানের জল এড়িয়ে থাকা। বানের জল এলে অনেক পাড়ার মুখে বাঁশ, কাঠের পাটাতন, ফলের প্যাকিং বাক্স দিয়ে রাখা হত, যাতে বাজারের আবর্জনা ভেসে ভেসে পাড়ায় না ঢুকে পড়ে।
সারা বর্ষাকালে কালী লেনের দিকের ছেলেরা, আরও অনেক নীচু নীচু পাড়ার মানুষ, গঙ্গার ঘাটের দিকের লোকজন কালীগঙ্গাকেও মার্কিং করত। আমরা ওখান থেকে জেনে যেতাম— পরশু ভরা কোটাল। মানে কালীঘাট ভাসবে। ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসবে। মানে কালীঘাট ডুববে।
আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল গঙ্গার ঘাট-লাগোয়া পাড়ায়। একতলা বাড়ি। ওদের চৌকির পায়া ছিল লম্বা লম্বা। বছরে বেশ কয়েকবার ভরা কোটালের জলের থেকে বাঁচতে ওদের ঘরসংসার উঠত চৌকির ওপর। ওইসব বাড়িগুলোর সেসময় দোতলা হওয়ার সুযোগ ছিল না। ওদের বাঁচার একটাই উপায় চৌকি বা খটের পায়ার নীচে ইট গুঁজে দিয়ে বানের জল এড়িয়ে থাকা। বানের জল এলে অনেক পাড়ার মুখে বাঁশ, কাঠের পাটাতন, ফলের প্যাকিং বাক্স দিয়ে রাখা হত, যাতে বাজারের আবর্জনা ভেসে ভেসে পাড়ায় না ঢুকে পড়ে।
আমাদের চক্রবর্তীপাড়া ছিল বেশ উঁচু। কখনও-কখনও গলির মুখ টপকে, হাবলিদার সোনার দোকান টপকে, ঘোষবাড়ির সামনে জল চলে আসত। ঘোষবাড়ির ছিল দুধের ব্যবসা। ওই বাড়ির ছোট মেয়েটিকে আমরা রাগাতাম— দুধে ভাল জল দিতে বলবি— বানের জল নয়। সে ঠোঁট ফুলিয়ে সবাইকে বিশ্বাস করাতে চাইত— তারা দুধে জল মেশায় না।
ঘোষবাড়ির পাশেই ছিল লম্বা টানা একটা বাড়ি। যার বাড়ির পাঁচিল ইটের, মাথা টিনের। তাদের বাড়ির সামনে বেশ একটা টানা রক ছিল। শোনা কথা, ওই বাড়ির একটা ছেলে প্রেম করে বিয়ে করে এল। তখন প্রেম করে বিয়ে মানে বেশ একটা ফিসফাস ব্যাপার। বউ নাকি দারুণ সুন্দরী। পাড়ার যুবকদের কাছে ছিল হেব্বি। বউ হেব্বি হওয়ার কারণে অচিরেই সেই রক ভাঙা পড়ে। যুক্তি ছিল— রাতে নাকি ওখানে বসে কেউ কেউ মদ খাচ্ছে।
বাইরের লোকজন পাড়ার ভেতর ঢুকে মধ্যরাতে বসে মাঝে-মাঝেই পানাহার করে যেত। সকাল হলেই দেখা যেত মদের বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে, মাটির ভাঁড়ে মাংসের ঝোল শুকনো হয়ে ম্লান চোখে তাকিয়ে আছে। কাগজের ঠোঙা, বাদামের খোলা উদ্বাস্তু হয়ে উড়ছে। বাড়ির লোকজন সেসব হটিয়ে বালতি-বালতি গঙ্গাজল ঢেলে দিত। পরিষ্কার করার জন্য যেমন, শুদ্ধ করার জন্যও। এইসব রকে টাইম বাঁধা থাকত। কারা, কোথায়, কখন বসবে।
এদিকেই চক্রবর্তীপাড়ার ভেতর একটা সোনার দোকান ছিল। হাবলিদার সোনার দোকান। ওই দোকানের কাছে পাড়ার অনেক-অনেক মানুষ, অনেক পরিবার কৃতজ্ঞ। কারণটা বলি, হাবলিদা সোনার কাজের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধকী কারবার করতেন। তাঁর বন্ধকী কারবার নিয়ে কাউকে কোনওদিন অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখিনি। খারাপ কথা বলতে শুনিনি। আমার মেজদির হাতে একটা লাল পাথরের সোনার আংটি ছিল। সেটা ছ’মাস মেজদির আঙুলে থাকত, পরের ছ’মাস হাবলিদার দোকানে। ওই আংটি-টি আসত আর যেত। আমাদের কারও অসুখ হলে, স্কুলের মাইনে, পরীক্ষার ফি, সব সব। আংটি-টি রেখে যে টাকাই দরকার, নির্দ্বিধায় সেই টাকা পাওয়া যেত। বড় ভরসা ছিল হাবলিদা আর লাল পাথরের সোনার আংটি। এ শুধু আমাদের পরিবারের নয়। ঘর ঘর কা কাহানি।
আমাদের বাড়ির বা পাড়ার কাউকে এই দোকানে সোনার জিনিস বানাতে দেখিনি। সোনার জিনিস বানাতে হলে ভবানীপুরে। ওদিকে পর-পর লক্ষ্মীবাবু কা আসলি সোনা চাঁদির দোকান। কোনটা যে আসলি লক্ষ্মীবাবু, তা বোঝা শিবেরও অসাধ্য ছিল। সবার সামনে লোহার গরাদ। ভেতরে একটা সিন্দুক আর কপালে টিপ দেওয়া পেটমোটা মানুষ। এই কিছুদিন আগেও তাঁরা ছিলেন। আমাদের দোকানের পাশেই ছিল জি সি দে। পয়লা বৈশাখে বাবার সঙ্গে যেতাম। বিজলী গ্রীলের আইসক্রিম সোডা খেতাম।
হাবলিদার দোকানে আমরা কেন সোনার জিনিস বানাতাম না? মনে রাখবেন, কালীঘাট মানেই কিন্তু ঘ্যাচাং করে পাঁঠা বলি দেয় না, ওখানে অনেক রসের মানুষ আছেন। সেই রসিক লোকেরা বলত— বানের জল নাকি হাবলিদার সিন্দুকের ভেতরও ঢুকে যেত। তাই সোনার ভেতর গঙ্গামাটি ঢুকে যায় খাদ হয়ে…। তবে গলির মহিলাদের নিয়মিত দেখা যেত হাবলিদার সোনার দোকানে। তারাই গয়না বানিয়ে হাবলিদার সোনার দোকানকে সচল রাখত। নইলে কেন মাঝে-মাঝেই দেখব— ছোট একটা পাত্রে অ্যাসিড দিয়ে নীল সবুজ গ্যাস ছড়িয়ে সোনা গলানো হচ্ছে? কেন দেখব, চৈত্রমাসে একজোড়া দম্পতি এসে দোকান ছোট্ট-ছোট্ট ঝাঁট দিচ্ছে, সামনের রাস্তা, নর্দমা ঝাঁট দিয়ে সামান্যটুকু ধুলোও তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ওখানে বসেই ধুলো ছাঁকনিতে চেলে-ধুয়ে ব্যাগে ভরছে। রসিকতার বাইরে এসে মনে হত, হাবলিদার সোনায় গঙ্গার পলি না মেশলেও, গঙ্গার পলিতে কিন্তু সোনার গুঁড়ো মিশে ছিল। নাহলে ওরা কেন এত পরিশ্রম করবে!
আমরা হাবলিদার সোনার দোকানকে বন্ধকী দোকান করেছিলাম, আর গলির মহিলারা সে দোকানকে স্যাকরার দোকানের মান্যতা দিয়েছিলেন।
চক্রবর্তীপাড়ার ঢোকার আগে ডানদিকে একটা দোকান ছিল, জহরলালের মুদিখানা দোকান। সেই দোকানের গায়ে একটা রকের মতো ছিল। সেখানে বানের জলের উচ্চতার দাগ আঁকা ছিল।
এমন বানের জলের উচ্চতার দাগ ছিল কালীঘাট বাজারের গেটের দেওয়ালে। আমি এমন অনেক বানের জলের উচ্চতার দাগ দেখেছি কালীঘাটের গঙ্গা-তীরবর্তী অনেক জায়গায়। এমনই এক উচ্চতা মাপার দাগ দেখেছি আমি কালীগঙ্গার ঘাটে, যেটা কালীঘাটের কালীর সদর ঘাট সেখানে। একটা থাম্বায় গভীর করে দাগ টানা আছে। বাংলা সন-তারিখও লেখা আছে। এই থাম্বার পাশে এক সাবিত্রী-সত্যবান দীর্ঘদিন ধরে শুয়ে আছেন। বান আসার আগে আগে কেউ নিশ্চয়ই সত্যবান-সহ সাবিত্রীকে তুলে উঁচু জায়গায় চালান করতেন।
সেই সময়কার মাতব্বর লোকজন এইসব দাগ দেখিয়ে গলা ভারী করে বলত— অমুক সনের অমুক তারিখে যে বান এসেছিল, তার জল এত্তদূর পর্যন্ত উঠেছিল। তেমন বান আর আসে কোথায়?
প্রিয় পাঠক, এই উচ্চতা মাপার জায়গাটা লক করে রাখুন। আবার আমি আসব, নয়া উচ্চতার মাপার এক রোমহর্ষক গল্প শোনাব। তার আগে বানের কথা হোক। মাতব্বর তো বলেই খালাস— তেমন বান আসে না, কিন্তু যা আসে তাতেই সেই সময়কার কাছাকাছি মানুষজনদের বাপের নাম খগেন হয়ে যেত। বান আসছে, বান আসছে— হইহই কাণ্ড। তোল তোল তোল— কী তুলবে, কোথায় তুলবে করতে-করতে কুলকুল করে জল ঢুকে পড়বে বাড়ি থেকে বাজারে। দোকান থেকে সিনেমা হলে।
বানের জল ঢোকার মতো সিনেমা হল কালীঘাটে কাছাকাছি কোথাও ছিল না, সেটা ছিল টালিগঞ্জ ব্রিজের পাশে প্রদীপ সিনেমা হলে। তখন সিনেমা ছিল না, ছবি ছিল না, ছিল বই—। প্রদীপ সিনেমা হলে বই চলছে— এমন সময় থেকে গিয়ে স্ক্রিনের ওপর একটা সাদা কাগজ থরথর কাঁপতে শুরু করবে— পা তুলিয়া বসুন বানের জল আসিতেছে। চটি জুতো হাতে নিয়ে সিটের ওপর পা তুলে বসতে হতো।
একটা সংসারে কম জিনিস মাটির কাছকাছি থাকে না, সব কি এত তাড়াতাড়ি তোলা যায়, ক্ষতি হত অনেক মানুষের। কিন্তু তারপরেও বলব— এরা তৈরি থাকত। বান বিদায় নিলেই অনায়াসে আওড়াতে পারত— ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি।’
সবার বাড়িতে কল নেই। রাস্তার চাপা কল ভরসা। অনেক চাপা কল মাটির নীচে খোঁদলে বসানো থাকত। তার কী হত? তারপর টিউবঅয়েল। তার কী হত? আশপাশের অনেক নর্দমা খোলা। সেই নর্দমা তো পায়ে-পায়ে উঠে আসত ঘরে। বান পিচের রাস্তার ওপর আমাদের মতো পাকা বাড়ির, দূরের মানুষদের হয়তো আনন্দ দিত। স্কুলফেরতা, ছুটির দিনে জমিয়ে জলক্রীড়ার সুযোগ করে দিত, কিন্তু যাদের বাড়িঘর দখল নিত— বান চলে যেত, তারপর, সেইসব ঘরদোর জুড়ে পলি আর পলি। বাড়ির মেয়ে বউরা লেগে পড়ত জল দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে কাদা বের করতে। ওদিকে, বাজারের দিকে দেখতাম ঝাঁটা হাতে পুরুষেরা কাদা সরাচ্ছে। গঙ্গার পলি— নরম, চিটচিটে, নলেন গুড়ের মতো সর্বত্র পড়ে আছে। রাস্তাঘাটে ছেঁড়া চটি, ডাবের খোলা, মরা বিড়াল, ফুলের মালা সব একসঙ্গে হাঁ করে মানুষ দেখছে। বান এসেছিল— তার চিহ্ন রেখে গেছে। চলো পাশ কাটিয়ে—
তবে পিচের রাস্তায় গঙ্গার পলি একটা মজা ছিল। ঘণ্টাখানেক পরে তার চিহ্ন থাকত না। সব পায়ে-পায়ে দূরে দূরে চলে গেছে—।
এই গঙ্গায় বানের জলে একবার একটা মরা তিমি-র বাচ্চা ভেসে এসেছিল। সে এক হইহই কাণ্ড। আসলে সেটা শুশুক ছিল। হোক শুশুক। আমরা নিজগুণে তাকে তিমি বানিয়ে কম আমোদ করিনি। আমরা কালীঘাটের লোক শুশুককে তিমি বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। সে টের নিশ্চয়ই পাচ্ছেন, না কি বলব সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে!
এবার সেই বানের জলের উচ্চতা মাপার রোমহর্ষক গল্পটি বলি— প্রেম এসেছিল হৃদয়ের মতো তা বান এসেছিল রসাতলে!
এক ছিল বিজুরি মাসি। খুব ফরসা। কটা-কটা দেখতে। বয়েস হয়েছে, কিন্তু ডাঁটো চেহারার খাঁজে-ভাঁজে টানাপোড়েন চলছে। মাসির চুল পাকেনি, লাল হয়ে গিয়েছিল। ঠিক কী করত, জানি না। তবে মনে হয়, নখ-কাটা, আলতা পরানো, চুলের তেল দেওয়া— এমনধারা কাজকর্ম করত। দেখতে-শুনতে বেশ ভালোই। পান খেত ঠোঁট লাল করে। বুড়ো আঙুলে টিপে ঠোঁটের কোণ থেকে ঝটকা মেরে পানের কষ তুলত। প্রচুর কথা বলত গবগব করে। কথার খুব বাঁধুনি ছিল। একবার পাড়ায় ঢুকলেই হল, এ-বাড়ির দরজায়, ও-বাড়ির দরজায় কথার গোঁত্তা মেরে মেরে চলত। এই মাসি থাকত কালীঘাটের পাথরপটির দিকে। পাথরপটির কথা যখন উঠল বলে নিই, পাথরপটি আদিতে ছিল কালীঘাটের পটচিত্র আঁকা পটুয়াদের আবাস। ওখানে তখনও পরপর বেশ কিছু পাথরের দোকান ছিল, ছিল পেতল-কাঁসার দোকান। আমি পটচিত্রের শিল্পীদের দেখিনি। দেখেছি পাথরের ওপর, কাঁসার বাসনের ওপর খোদায় শিল্পীদের। ওরা পাথরের বাটিতে ‘মা’ লিখত, ‘বৌমা’ লিখত। ওরা কাঁসার গ্লাসের গায়ে যত্ন করে লিখে দিত— ‘জামাইবাবু জল খাও’। বাটির গায়ে— ‘নাতিবাবা পায়েস খাও’। ওখানে টিনের বাক্স পাওয়া যেত। তাতে গোলাপি রঙের গোলাপি ফুল চমকাত। আমার স্কুলের অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেসে ওখানে থেকে আমার নামটি খোদাই করে এসেছিল। আমার দিদি-বোনদের এমন নাম খোদাই করা স্কুলে যাওয়ার অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস ছিল না। আসলে, বাবা হয়তো তখনই বুঝেছিল— এ ছেলে নাম খোদাই করে রেখে যাবে!
সেই বিজুরি মাসি ছিল পাথরপটির দিককার মহিলা। শিল্পী মানুষ। আঁটোসাঁটো গুছিয়ে শাড়ি পরত। সেই বিজুরি মাসি খুব ছোটবেলায় একবার প্রবল বান আসা দেখেছিল কালীগঙ্গায়। ওদের বাড়ির ভেতর হু হু জল ঢুকে পড়েছিল। মাসি তখন ছোট। মা-ঠাকুমারা সব জিনিস উঁচু জায়গায় তুলতে গিয়ে বিজুরি মাসির কথা ভুলে যায়। ঘরের ভেতর জল ঢুকছে। মাসির পায়ের পাতা গোড়ালি ছাপিয়ে, পায়ের ডিম ছাড়িয়ে, হাঁটু ছাড়িয়ে, উরু ছাড়িয়ে জল উঠেছিল। মাসি ভয় পেয়ে জোরে কেঁদে উঠতে সবাই বুঝল মাসি নীচে, ঘরের মেঝেয় জলে। মাসিকে ঠাকুমা ধরে তুলে দিল চৌকিতে। কিন্তু বিজুরি মাসি খুব সজাগ এবং হুঁশিয়ার মেয়ে— সেই বয়সেই সে মেপে রেখেছিল বানের জল কতদূর পর্যন্ত উঠেছিল। তা তার এখনও মনে আছে—
সেই বিজুরি মাসিকে বড়দের রকের সামনে, গুণীজন রসিকজনরা পেলে নাকি ডাকে। একথা-সেকথা বলে গঙ্গার বানের কথা তোলে।
—সেই সেবার কেমন বান এসেছিল, তেমন কী আসে?
বিজুরি মাসি ঘাড় নেড়ে দাপটের সঙ্গে জানায়— না, তেমন আসে না।
কেউ কেউ প্রবল তর্ক জোরে— এখনও আসে। আলবাত আসে।
বিজুরি মাসি বলে— থাম থাম, এখন আসে না। সেবার, আমার ছোটবেলায় যে জল এসেছিল, আর একটু হলে আমি ডুবে মরতাম।
রসিক গুণীজন প্রশ্ন ছোড়ে— কত দূর মাসি? জল কত দূর উঠেছিল?
বিজুরি মাসি তার কথার উত্তরে এবার শাড়ি তুলবে— শাড়ি তুলেই যাবে। পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে, পায়ে ডিম পেরিয়ে, হাঁটু টপকে, উরু ছুঁয়ে ছুঁয়ে উঠছে… সায়া সমেত শাড়ি উঠছে— শেষে কেউ না কেউ ভদ্রজন বলবে— স্টপ! স্টপ! কেউ না কেউ বিশ্বজ্ঞানী বলবে— আর তুলো না বিজুরি মাসি, আর তুললে কালীঘাট রসাতলে যাবে!
এটা বড়দের রকের গল্প। আমি এতটা ডেঁপো ছিলাম না। আমি যাবতীয় রসাতলে গিয়েছি পরে, আরও পরে।




