মেলাবেন তিনি, মেলাবেন!
কালীঘাট অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করত বাঘাদা। আমারই এক সম্পর্কিত জাঠতুতো দাদা। ওদের অনেকগুলো ভাই-বোন। সবার নাম হয়তো আমি বলতে পারব না। এদের সবার বড় বাঘাদা ছিল মস্তান। যুব কংগ্রেস। এশিয়ার মুক্তিসূর্য প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির ভাবশিষ্য। গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, মানে বক্তৃতা দিতে পারে না বলে রাজনৈতিক নেতা হয়নি, কিন্তু ভাল হাত চালাতে পারত বলে মস্তান হয়েছিল।
বাঘাদার নামের আগে গুণ্ডা কথাটা লাগানোই থাকত। যার কেউ নেই, তার বাঘাদা আছে। কালীঘাট বাজারের ওপর যুব কংগ্রেসের অফিস, আসলে বাঘাদার ঠেক। সেখান থেকে কাকে মারা হবে, কোথায় ভাঙচুর হবে, কোথায় বোম মারবে, তার ওয়ার রুম। সেখানে আমি কালেভদ্রে যেতাম। যখনই আমার বন্ধুদের গায়ে হাত পড়ত, তখনই তাদের নিয়ে আমাকে ওই ওয়ার রুমে হাজির হতে হত। বাঘা প্রথমেই জিজ্ঞেস করত, ‘কী রে, কোনও মেয়েলি কেস?’ আমি ঘাড় নাড়তাম, ‘না।’ তারপর বাঘাদার জিজ্ঞাসা— ‘কে?’ নাম বলতাম। আর এই নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে বাঘাদা একটাই কথা বলত, ‘ওর নামে রিপোর্ট আছে, ও খুব বেড়েছে।’ আমি থাকলে কী হয়েছে, না হয়েছে শোনার দরকার পড়ত না। বুঝত, অন্যায় হয়েছে।
আসলে তখন দুটো কারণে গোলমাল ছিল এ-পাড়ার ছেলে, ও-পাড়ার মেয়ে। আর ফুটবল। বাঘাদা বুঝত— আমি গিয়েছি মানে ফুটবলের গণ্ডগোল। আসলে যে আমরা তখন অন্য খেলায় ঢুকে পড়েছি, বাঘাদা বুঝতে পারত না। হয়তো চোখের পাতা পড়েছে, কেউ দাবি করল— চোখ মেরেছে। কারও মুখোমুখি হয়ে কোনও হাসির কথা মনে পড়ে গিয়ে, একটু হাসলেই— বলবে ওই দেখো, হাসছে। বা ভুল করেও পিছন-পিছন কয়েক পা হাঁটলে, পাড়ার দাদাদের কাছে কেস দিয়ে মার খাওয়ানোর চেষ্টা করত। আবার তারাই হয়তো ক’দিন পরে সেন্ট মাখিয়ে, গোলাপ ফুল এঁকে, চাড্ডি কাব্য, শ্লোক লিখে চিঠি ছুঁড়ত।
যাই হোক আমি প্রেমপত্র ছোড়ার গল্প বলব না, বরং সোডার বোতল আর বোমা ছোড়ার গল্পই বলি। কালীঘাট বাজারের ওপরে যুব কংগ্রেসের ওই ঠেকটির একই অঙ্গে অনেক রূপ।
টিকিট ব্ল্যাকার থেকে মস্তানরা ছিল আমাদের বন্ধু! জয়ন্ত দে-র কলমে পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৯…

সকালে গরিব শিশুদের জন্য দুধ ও পাউরুটি বিতরণ করা হত। তখন ওটা সেবা কেন্দ্র। দুপুরে তাস খেলা, রাতে ক্যারাম খেলা হতো। তখন ওটা ক্রীড়াক্ষেত্র। তবে একটা ব্যাপারে কড়া নির্দেশ ছিল, এখানে বসে মদ খাওয়া চলবে না। মদ খেলেই পেটে লাথি মেরে খোলা বারান্দা থেকে ফেলে দেওয়া হবে। মাতালরা মারের নয় বারান্দা থেকে টপকে যাওয়ার ভয় পেত। মরে গেলে তো ল্যাঠা চুকে গেল, কিন্তু পা ভাঙলে মালের ঠেক পর্যন্ত যাবে কী করে? তখন ওটা সমাজ সংশোধন কেন্দ্র। তবে প্রয়োজনে ওখানে বোমও বাঁধা হত। আমার কাছে ওটা ছিল ওয়ার রুম।
এই বাঘাদার রাজত্বে একদিন হঠাৎ এসে আর্বিভাব হল টুকরে। খুব শান্তশিষ্ট ভদ্র ছোটখাট গড়নের একটা বাচ্চা ছেলে। সম্পূর্ণ বাজার পাড়ার ছেলে। ওর দিদি ঝুনু পড়ত আমার মেজদির কাছে। সেই সূত্রে আমাদের চক্রবর্তী পাড়ায় টুকরের আগমন। ক্রমশ ঝুনুও আমাদের সর্বক্ষণের বন্ধু। সেই সাত-আটের দশকেও আমরা ছেলে মেয়েরা পাড়ার ভেতর সুকুদাদের বাড়ির উঠোনে একসঙ্গে ফুটবল ক্রিকেট ডাংগুলি খেলতাম। মেয়ে বলে তাদের আলাদা কোনও ছাড় দেওয়া হত না। বরং মেয়েদের কয়েকজনের গায়ে এতই জোর ছিল যে ওদের ধাক্কায় আমরা চিৎপটাং হয়ে যেতাম। আমাদের মধ্যে যে-তিনজন মেয়ে ছিল, তার মধ্যে দু’জন বাংলার খেলার জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সরকারি চাকরিও পেয়েছে খেলার সূত্রে। শান্তি মল্লিকের বাড়ি পাশের পাড়ায়। মৃদুলাদির বাড়ি ছিল আমাদের পাড়ায়। এছাড়াও এপাড়া-ওপাড়া করে বেশ কয়েকজন মহিলা ফুটবলার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন।
টুকরে খেলত না, আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ঘুর-ঘুর করত। খুব কম কথা বলত। কিন্তু কোনও দিনই জানতে পারিনি ওর মধ্যে এত রাগ, এত তেজ জমে ছিল। আমাদের বারো মাসে তেরোটা গোলমাল ছিল। বেশিরভাগ জায়গায় মার খেতাম। খুব বেশি ভয় পেলে, ঠ্যাং ভাঙবে, মাথা ফাটাবে শুনলে বাঘাদার শরণাপন্ন হতাম।
চক্রবর্তী পাড়া থেকে বেরিয়েই রাস্তার ওপর জহরলালের মুদিখানা দোকান ছিল। জহরলালের জিনিসের দাম একটু বেশি। কারণ ওই দোকানে মশলা ঝাড়াই বাছাই করে বিক্রি করা হতো। মা-বাবার পরামর্শ ছিল—জহরলালের দোকান থেকে সওদা করবি। একনম্বর জিনিস। আমরা যেতাম মামার দোকানে। মামার দোকানে জিনিস দামে কম। মামার নাকি মুগ মসুর পোস্তেও গোলমাল। মামা দু-নম্বর তিন নম্বর গ্রেডের জিনিস বিক্রি করত। কিন্তু আমরা সেই তখন থেকে ট্রেডমার্কা কালীঘাট— কাটমানির ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত! বাড়িতে ভেজাল মাল গছিয়ে বলতাম— জহরলাল।
আমাদের এই দুর্দশার সময়ে হঠাৎই একদিন টুকরে ফুঁসে উঠল। চিন্টুদাকে মেরেছে, ছাড়ব না বলে হুংকার দিল। গোলমাল লেগেছিল সরস্বতী পুজো নিয়ে। সেবার গড়মিল সংঘের বাইরে আমরা আলাদা একটা ক্লাব করে সরস্বতী পুজো করেছিলাম। মেঘদূত স্পোর্টিং ক্লাব। তো রে রে করে গড়মিল সংঘের দাদারা ছুটে এল। এই আমাদের তুলে আছাড় মারে মারে। কোনওক্রমে আমরা রক্ষে পেলাম। কিন্তু এই বছরই পুজো করব, পরে আর কোনওদিন করব না বলে প্রায় মৌখিক মুচলেকা দিয়ে সে বছরের মতো ছাড়পত্র নিলাম। কিন্তু টুকরে বলে দিল পরের বছরও সরস্বতী পুজো করব। পাড়ার বড়রা টুকরে বেপাড়ার ছেলে বলে ওকে পাড়াছাড়া করল। বলল, টুকরে ঢুকলেই তোদের ঠ্যাঙাব। টুকরেকে যেন পাড়ার ভেতর তোদের সঙ্গে না দেখি।
কালীঘাট বাজারে ছিল মামার বিশাল মুদিখানা দোকান। বাজারের সবার কাছে তিনি ছিলেন মামা। ফরসা গোলগাল ভুড়িওয়ালা একটা মানুষ। হাতে অনেকগুলো সোনার আংটি, গলায় সোনার চেন। ওঁর ছেলের নাম সোনা।
ওই দোকানের কাজ করত কানুকাকা। কানুকাকার খুব বদনাম, সব খেয়ে ফেলত। আগে দোকানের ভেতর কাজ করত। দোকানের ভেতর ফাঁকা পেলেই কাজু-কিশমিশের বয়ামে হাত ঢোকাত, যত না ওজন করত, তার চেয়ে বেশি মুঠো মুঠো মুখে ফেলত। চিনি খেত। পাটালি খেত, ভেলিগুড় খেত। কাচা ছোলা, বাদাম, ডাল সব মুখে ফেলত। আর সারাদিন ধরে চিবিয়ে যেত। মুদিখানা দোকানে সোডা-সাবান ছাড়া হাতের সামনে সবই প্রায় খাওয়া যায়। কানু কাকাকে একদিন মামার ছেলে সোনা মারল। খুব মারল। দুপুরবেলা। মেরে দোকান থেকে বের করে দিল। আমরা সবাই কানুকাকাকে খুব ভালবাসতাম। কানুকাকা আমাদের দারুণ সাপোর্টার ছিল। আমরা তিন গোলে হারলেও কানুকাকা একা সাইড লাইনের ধারে গায়ের জামা খুলে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের সাহস দিয়ে যেত। সেই কানুকাকাকে মারল সোনা।
আমরা স্কুল থেকে ফিরেই খবর পেলাম। বিকেলবেলায় আমাদের আর খেলার মাঠে যাওয়া হল না। আমরা বললাম— আর কেউ মামার দোকান থেকে জিনিস কিনব না। মামার দোকান বয়কট।
চক্রবর্তী পাড়া থেকে বেরিয়েই রাস্তার ওপর জহরলালের মুদিখানা দোকান ছিল। জহরলালের জিনিসের দাম একটু বেশি। কারণ ওই দোকানে মশলা ঝাড়াই বাছাই করে বিক্রি করা হতো। মা-বাবার পরামর্শ ছিল—জহরলালের দোকান থেকে সওদা করবি। একনম্বর জিনিস। আমরা যেতাম মামার দোকানে। মামার দোকানে জিনিস দামে কম। মামার নাকি মুগ মসুর পোস্তেও গোলমাল। মামা দু-নম্বর তিন নম্বর গ্রেডের জিনিস বিক্রি করত। কিন্তু আমরা সেই তখন থেকে ট্রেডমার্কা কালীঘাট— কাটমানির ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত! বাড়িতে ভেজাল মাল গছিয়ে বলতাম— জহরলাল। সেই মামার ছেলে সোনা এমন করল! সোনাকে সাদা শুয়োরের মতো দেখতে ছিল। এখনও চোখ বন্ধ করে দেখতে পাই ঘোঁত ঘোঁত করছে।
বিকেলে টুকরে কালীঘাট রোডের ওপর কালীঘাট বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল— সোনা খুব বেড়েছে। ওর নামে রিপোর্ট আছে।
ক’দিন আগে সোনা একটা ফুচকাওলাকে মেরেছিল। ফুচকাওয়ালার দোষ সে ফুচকা খাইয়ে পয়সা চেয়েছিল। আমরা শুনেছিলাম— গরিব ফুচকাওয়ালা। টুকরে এটা নিয়ে প্রতিবাদও করেছিল।
কানুকাকাকে মারার পরের দিন দুপুরে হইহই কাণ্ড। সোনার গালে খুর মেরেছে টুকরে। অল্পের জন্য চোখ বেঁচে গেছে।
খুর!
টুকরে খুর পেল কোথা থেকে? খুর মেরে টুকরে হাওয়া। তার দু-দিন পরে টুকরে ভেসে উঠল আমাদের ঘরের জানলার সামনে। বলল— দুটো রুটি দাও আর গুড় দাও। খিদে পেয়েছে।
টুকরেকে মা রুটি আর তরকারি দিল। বলল, খেয়ে দূরে কোথাও চলে যা তুই, কালীঘাটে থাকিস না বাবা।
টুকরে বলল, কাকিমা আমি দূরে যাব না, এখানেই আছি, এখানেই থাকব।
বাবার কাছ থেকে আগেই মা খবর পেয়েছিল— বাঘাদা টুকরেকে পেলে পিটিয়ে মেরে লাইট পোস্টে ঝুলিয়ে রাখবে।
মা বলল, বাঘা কিন্তু খুব খেপে আছে।
টুকরে হাসল, বলল, সব জায়গায় লোক লাগিয়েছে আমাকে ধরে নিয়ে আসতে। ওরা আমাদের বাড়ি গিয়ে ঝামেলা করে এসেছে। রাস্তার ব্যাপার, বাঘাদা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক করছে না। বাঘাদা খুব বেড়েছে। বাঘাদার নামে রিপোর্ট আছে।
টুকরে চলে গেল।

যাওয়ার আগে আমি অসীম কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— অ্যাই তুই খুর পেলি কোথা থেকে?
টুকরে পকেট থেকে খুর বের করে আমাদের দুই ভাই-বোনকে দেখাল।
এই খুর সেই খুর, যাকে চামড়ার ওপর ঘষে ঘষে ধার দিতে হয়। অথবা কালো পাথরে। ওই খুর আমাদের ইটালিয়ান সেলুনে যেমন ছিল, তেমনই সামনে বিশাল আয়না লাগানো মেট্রো সেলুনেও ছিল। আধভাঙা ব্লেড গোঁজা নকল ক্ষুর নয়। আমরা ভাই-বোন রোমাঞ্চিত অস্ত্র-সহ আসামিকে দেখছি!
ক’দিন পরে একদিন রাতে বাবার কাছে ঝুনু এল চোরের মতো। বলল, ‘বাঘাদা আমার বড়দাকে মারবে বলেছে, আমার বড়দা তো সাতেপাঁচে থাকে না কাকু। টুকরে সেই যে বাড়ি থেকে গেছে আর আসেওনি। কাকু তুমি আমাদের বাঁচাও।’
বাবা বলল— ‘বাঘা তোর দাদার গায়ে হাত দেবে না। আর তোদের বাড়িও যাবে না। আমি কালই বাঘাকে যা বলার বলে দেব। আর শোন, টুকরেকে ক-মাস অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বল। তেমন মনে হলে, তুই কাল এসে কাকিমার কাছ থেকে কিছু টাকাও নিয়ে যাস। ওকে বলবি, কালীঘাটে যেন না আসে। পরে সব ঠান্ডা হলে ভবানীপুর থানায় আমার চেনাজানা আছে, আমি ঠিক একটা না একটা ব্যবস্থা করে দেব।’
ঝুনু শান্ত হয়ে চলে গেল। মেজদি বলল— ‘ঝুনু কাল থেকে আবার পড়তে আসবি।’
ঝুনু খুব ভাল মেয়ে। সবসময় মুখে হাসি। পড়াশোনাতেও বেশ ভাল। এইট-নাইনে পড়ত তখন।
বাবা সকালবেলায় বাঘাদার সঙ্গে কথা বলে এল। মাকে বলল— বাঘাকে যা বলার বলে দিয়েছি, ও টুকরের দাদা কেন, টুকরের গায়েও হাত দেবে না। ওকে পেলে বড়জোর থানায় জমা করবে। তারপর আমি দেখব। ভাল ছেলে রাগের মাথায় একটা ভুল করে ফেলেছে। ওকে আবার সঠিক পথে নিয়ে আসতে হবে।
বাঘাদা থামল। কিন্তু টুকরে থামল না। তার পরের, কি তার পরের দিন টুকরে কালীঘাট বাজারের ওপর বাঘাদার পার্টি অফিসেই হামলা করে বসল। সরাসরি ওয়ার রুম অ্যাটাক! বাঘাদা তখন ছিল না। যারা ছিল তারা সবাই পালাল। ব্যাপক সোডার বোতল চার্জ করল। ওপরে ছিল মঙ্গলদা, বাঘাদার এক ভাই, টুকরে ওর পাছায় খুর মেরে চলে গেল। মঙ্গলদা পিজিতে চলল— চোখে জল, পাছা রক্তাক্ত।
তারপর থেকে টুকরে ত্রাস!
দু-একদিন ছাড়া ছাড়া টুকরে সাদা অ্যাম্বাসাডর নিয়ে চলে আসছে। তাতে ভর্তি ছেলে।
বাবা বলল—‘সব সোমেন মিত্রর ছেলে। টুকরে শিয়ালদায় থাকে।’
চিন্টু খবর আনল, টুকরে ওর বাড়িতে এসে বলে গেছে, সরস্বতী পুজো হবে। কোনও মাঈ-কে-লাল থাকলে ক্ষমতা থাকলে আটকাক। খুর খাবে।
চিন্টু বলল— এবার বড় করে সরস্বতী পুজো করব আমরা।
আমি চুপসে। আমার জ্যাঠার ছেলেকে টুকরে খুর মেরেছে। আমি এ-যুদ্ধে কোন পক্ষে যাব?
ক’দিন পরে জানলার সামনে টুকরে এসে দাঁড়াল। হালকা করে শিস দিল—
মুখ তুলে দেখলাম টুকরে। ভাবলাম, ওর খিদে পেয়েছে। হয়তো রুটি-গুড় চাইবে। মা কি ভাসুরপো’র পাছায় খুর মারা ছেলেকে রুটি তরকারি দেবে?
টুকরে জানলার গরাদের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বলল— মোগলাই খাবে শান্তিদা। এই নাও। আমার নাম ব’লো না কাকিমাকে, তাহলে কাকিমা খাবে না।
তারপর টুকরের কালীঘাটে আসা-যাওয়া বেড়ে গেল। যখনই আসত, সঙ্গে আরও দু তিনজন থাকত। ওদের সবার কাছেই রিভলবার। হয় বাইকে, নয় গাড়িতে। সবসময়ই সন্ধের পর রাতের দিকে। বাবা এসে একদিন মাকে বলল— টুকরে কালীঘাট রোডের প্রায় সব দোকান থেকে টাকা নেয়। গুণ্ডা সেলামি। তখনও তোলাবাজি কথাটা বাজারজাত হয়নি।
তারপর থেকে টুকরে সাফারি স্যুট পরত। ওর বুটের সামনে চকচকে পাত লাগানো। ব্যাপারই আলাদা! পকেট ভর্তি টাকা, কোমরে রিভলভার, সাফারির পকেটে খুর, বুক পকেটে ট্রিপল ফাইভ। প্যান্টের ঘের বিশাল, তার নীচে চেন দেওয়া। একদিনই আমার মেজদির মুখোমুখি পরেছিল, মেজদি ওর চুলের মুঠি ধরে গালে টেনে একটা চড় কষিয়ে বলেছিল— পড়াশোনা শেষ, এবার গুণ্ডাগিরি করে খাবি? টুকরের কাতর আর্তনাদ শুনেছিলাম— আমি আর করব না দিদি, ছেড়ে দাও।
কিন্তু ক্রমশ যেন টুকরে কালীঘাটের অ্যাংরি ইয়ংম্যান অমিতাভ বচ্চন। আমরাও কালীঘাটে টুকরে হাওয়ায় ফুলে ফানুস। এ-সময় টুকরে গঙ্গার ধরে একটা ছেলের কপালে গুলি করে মেরে দিল। আমরা যে কোনও সিনেমার ওপেনিং ডে ওপেনিং শোয়ের টিকিট হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরছি। চিন্টুর ভীষণ সাহস, যে কোনও গলির ভেতর রাতের বেলায় যাচ্ছে। রুমি সিনেমায় নামবেই নামবে। আর মডেল নয় রুমি এবার হিরোইন হবে! টুকরে দেখছে।
ঝুনু পালটে যাচ্ছে, পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলেই ঝুনু তাকে ফল-হরলিক্স দিচ্ছে। আমাদের সন্তোষদার ঘুগনি-আলুর দম খাওয়াচ্ছে। রঙিন সরবত খাওয়াচ্ছে। ঝুনু পড়াশোনা প্রায় ছেড়েই দিল। আমাদের সরস্বতী পুজো বড় হল। টুকরে-চিন্টু পাশের পাশের বাড়ির মেয়ে ললিতার মুখে খুর ঠেকিয়ে বলল— হয় আমার সঙ্গে প্রেম করবি, নয় খুর খাবি।
ললিতা প্রেম করতে শুরু করে দিল। টুকরে হিরো। সেই মেয়ের বড়দি নীতা আমার প্রাণের বন্ধু, সে কেঁদে হাপুস হয়ে গেল। কিন্তু বোন উড়ছে! তার সাজের বাহার বেড়ে গেল। সব সিনেমার মতো।
আমার বাবা মাকে বলল— কালীঘাট ছাড়তে হবে। এখানে পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেছে।
শুধু চিন্টু নয়, আমাদের আরও এক বন্ধুর নামেও কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে— গলির একটা মেয়ের সঙ্গে…।
বাবা মাকে বোঝাচ্ছে— কালীঘাট না ছাড়লে ছেলে বাঁচবে না, নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের ফুটবল গোল্লায় যাওয়ার মুখে। অথচ দুর্দান্ত জার্সি হয়েছে। স্পনসরড টুকরে। কোনও টুর্নামেন্টে আমাদের করা গোল বেফালতু আর বাতিল হয় না। আমাদেরও কেউ মাঠের ভেতর ফেলে ক্যালায় না। কেননা, সাইডলাইনে সবসময় টুকরে না থাকলেও কানুকাকা আছে— সে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে টুকরে আসছে…। টুকরে গব্বর সিং—
তখন শ্মশানে রাজত্ব করত ভীম। তারপর শ্মশান-স্বপন, সেই যে পুলিশ কমিশনার বীরেন সাহাকে— সত্যজিৎ রায়ের দাহকার্যের সময় ‘সাহাদা’ বলে ডেকে খবরের কাগজের হেডিং হয়েছিল। আর পদ হারিয়েছিলেন বীরেন সাহা। তারপরে শ্রীধর এলাকা সামলাত। তারপরে কুমার সাহার-যুগ চলছে।
তারই ধারে-কাছে ছিল মানবাধিকার কর্মী সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্য। উনি বন্দিমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এপিডিআর-এর সম্পাদকও হয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘সত্তরের দিনগুলি’। ছিলেন নকশাল, শেষে তৃণমূলি হয়েছিলেন। ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব নির্মল সাহা। চেতলা বয়েজ হাই স্কুলে কাস্তে কবি দীনেশ দাশ নেই, কিন্তু পড়াতেন কবি সমীর রায়। ছিলেন কবি সুমিত চট্টোপাধ্যায়। পরে পরে এঁদের জেনেছি, চিনেছি। তখন আমি আর প্রতিবেশী ছিলাম না।
টুকরে কোথায় থাকত বলত না। শুনেছিলাম শিয়ালদার দিকে। দু-একদিন পরপরই কালীঘাটে আসত। টাকা তুলতে। পুরো গব্বর সিংয়ের কায়দায়। টুকরের দিদি ঝুনু, বা ওর স্ত্রী ললিতার কথা এখানে লিখব না। ওরা সব উপন্যাসের চরিত্র।
তার অনেকদিন পরে আমাদের হরিদেবপুরের বাড়িতে টুকরের আগমন ঘটল সবাইকে চমকে দিয়ে। আমার জ্যাঠাদের কিছু জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছিল, তা উদ্ধার করতে বাঘাদা-বিশুদা এল বিশাল গুণ্ডাবাহিনী নিয়ে। সেখানেই দেখলাম বাঘাদার মূল সেনাপতি টুকরে। সঙ্গে আছে সোনা-মঙ্গলদাও।
সেই জমি পুনর্দখল হল। সেই জমি রক্ষার্থে মাঝে মাঝেই দাদারা আসত, ওদের সঙ্গে থাকত টুকরে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে কী কথা বলব— ঠিক তাল পেতাম না। টুকরে আমাকে মাঝে মাঝে দামি নামী রিভলভার দেখাত। তখন আর ‘তুমি’ ‘শান্তিদা’ নই, ‘তুই’ বলত। সম্পর্কে আমার ডিমোশন হয়েছে। বলত শান্তিদা, হাতে নে, দেখ কেমন ভারী! বাঘাদা আমাকে বলত— একটা ছিপ নিয়ে এখানে বস। আমি মাছ ধরব কী! আমি যে পুকুরের জলে বাঘাদা আর টুকরের দুটো মুখের প্রতিবিম্ব ভেঙেচুরে মিশে যেতে দেখতাম।
সুধীন দত্তর সেই কবিতাটি আমার তখন মনে পড়েনি, জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারিনি, এখন মেলাতে পারি — মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হাওয়া আর/ পোড়ো বাড়িটার/ ঐ ভাঙা দরজাটা।/মেলাবেন।
টুকরে পর্বের শেষ হল এভাবে— আমি তখন কালীঘাটের পাড়ায় রোজ যাই আড্ডা মারতে। মিলির দিকে গাঢ় চোখে তাকাই, ওর হার্ট ঠিকঠাক কাজ করছে তো! কিন্তু তখন আমি আমার হার্ট অন্য জায়গায় দিয়ে ফেলেছি, তবু…। তখনই একদিন উদভ্রান্ত ঝুনু এল। আমাকে আর চিন্টুকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, ‘তোরা কিছু জানিস?’ আমরা ঘাড় নাড়লাম— না। ঝুনু বলল, ‘আমাদের বাড়িতে পুলিশ এসে এক্ষুনি খবর দিল, বোম ব্লার্স্ট করে টুকরে… পিজি হাসপাতালে আমাকে যেতে হবে শনাক্ত করতে।
ঝুনু, ওর দাদা, আমি, চিন্টু আরও আরও কারা সব ট্যাক্সি ভর্তি হয়ে পিজি গেলাম। একটা ট্যাক্সিতে জনাআটেক উঠেছিলাম মনে হয়। আমি মর্গের ভেতরে ঢুকিনি, অত সাহস আমার নেই। কেউ কেউ গিয়েছিল শনাক্ত করতে। তারা সবাই কেমন অদ্ভুত চোখে মুখে ফিরে এল। কেউ কোনও কথা বলল না। কালীঘাটে ফিরে এসে এক কাঠের মিস্ত্রির ঠেকে গলায় ঢকঢক মদ ঢেলে চিন্টু ধাতস্ত হল। বলল, দুপুরেই কালীঘাটে উড়ো খবর এসেছিল, গুলি খেয়েছে।
তাহলে যে বলল— বোম ব্লার্স্ট!
চিন্টু ঘাড় নাড়ল— তাই হবে, ওর বডি কোথায়, টুকরেকে বেলচা মেরে তুলতে হয়েছে।
তার অনেক অনেক বছর পরে ঝুনুর সঙ্গে একদিন দেখা হল, সেই শিয়ালদায়! অফিস থেকে ফিরছে। শুনলাম চাকরি করে। রেলে। বললাম—কে দিল— সোমেন মিত্র? বলল— স্পোর্টস কোটায়। ওরা ভাল আছে। জানাল, কালীঘাট ছেড়েছে।



