অসীমদের পদবি রায়চৌধুরী। বলত, আমরা ছিলাম জমিদার। অসীমের বাবার কথা পরে বলার চেষ্টা করব।
এই পিসেমশাই মাঝেমধ্যে সবার জন্য খাবার আনতেন। কখনও সবাইকে একটা করে দানাদার, কখনও-বা একটা করে চকলেট।
দুর্গাপুজোর সময়ে, একদিন আমাদের সবাইকে নিয়ে চলে যেতেন বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মাঠে। ওখানে কুলপি-মালাইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিতেন— নে, সবাই একটা করে খা। কিম্বা ঢাকাই পরোটার দোকানে। সে-সময়ে রোল, চাউমিন এসবের আগমন ঘটেনি। রাস্তার কিছু খাবারের কথা বলছি। ওসব ছাড়াও ছিল ঘুগনি, আলুকাবলি, ঝালমুড়ি, ফুচকা, মামলেট— যা কিনা পরে ওমলেট হয়ে গেল, আর ছিল তেলেভাজা, ছোট-ছোট কেবিনে চপ-কাটলেট-ডেভিল পাওয়া যেত। এইসব কেবিনের সংখ্যা খুব কমে গেছে।
পিসেমশাইকে আমরা খুব বড়লোক ভাবতাম। অনেক পরে বুঝেছি, বড়মানুষ ছিলেন। কিন্তু বড়লোক ছিলেন না। এমন কিছু ধনী ছিলেন না তিনি। বিলাসিতা দেখিনি তেমন। ক্যাপ্সটান সিগারেট, আর মাথায় কলগেট তেল। ব্যস, এটুকুই। ধুতি এবং ফুলহাতা শার্ট পরতেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় এরকম পোশাকই পরতেন। আমার বাবাও। বাবাকে কখনও ফুলপ্যান্ট বা পাজামা পরতে দেখিনি। তবে পিসেমশাই ফুলপ্যান্ট পরতেন, যখন রেঙ্গুনে যেতেন। শীতকালে দু’একবার ফুলপ্যান্ট এবং কোট পরতে দেখেছি।
স্কুলের উঁচু ক্লাসে উঠেই লিখে ফেলেছিলাম একটি শ্রেণিসচেতন গল্প! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ৯
খুব ছোটবেলায় পিসেমশাইয়ের ঘরে একটা গ্রামোফোন রেকর্ড এবং ওটা বাজাবার মেশিন দেখেছিলাম। একটা বাক্স, পাশে একটা হাতল, হাতল ঘুরিয়ে দম দিতে হত। বাক্সটার ওপরে একটা কালো চাকতি রাখা হত। ওটাই ছিল রেকর্ড। আর বাক্সটার একপাশে ছিল গুটি-শুটি মেরে বসা কী যেন, ওটার মধ্যে পিন আটকে দিতে হত। তারপর ওটাকে টেনে চাকতিটার উপর বসিয়ে কী একটা টিপে দিত, আর বাক্সটার উপরে ছিল একটা চোঙা। সেই চোঙার মুখ দিয়ে গান বেরিয়ে আসত। তবে ওই যন্ত্রটা বেশিদিন দেখিনি। জানি না ওটার কী গতি হয়েছিল।

পিসেমশাইয়ের ঘরে একটা রেডিও ছিল। বাক্সটা একটু বড়ই। খুব ছোটবেলায় অনেকের মতোই আমারও বড় আশ্চর্য মনে হত। ভাবতাম কুটুদির পুতুলের মতো কিছু পুতুল মানুষ রয়েছে ওই বাক্সটার ভেতরে। ওইসব পুতুল মানুষেরাই কথা বলে, গান গায়। ঘরের একটা তাকের উপরে রেডিও-টা বসানো ছিল। এক বিকেলে আমি চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়িয়ে রেডিওটার পিছনের ডালা খোলার চেষ্টা করতে গিয়েছিলাম। তখন ঘরে কেউ ছিল না। রেডিওটা পড়ে যায়। দৌড়ে আসে বড়রা। রেডিওটার ভিতরে কিছু ভেঙে যায় বা সরে যায়। আমাকে কিন্তু কেউ বকেনি। পিসেমশাই ওর ছেলেক, মানে রাঙাদাকে বলেছিলেন খোকাকে রেডিও-র পিছনটা ভাল করে দেখিয়ে দে।
উনি একটু কম কথাই বলতেন। আমি একটু ভয় পেতাম। ওঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে, আমি খুব তোতলাতাম। হ্যাঁ, বলা হয়নি, আমি খুব ছোটবেলায় তোতলা ছিলাম। এতে আমার একটা সুবিধা ছিল, স্কুলে স্যারেরা পড়া ধরতেন না। কলেজে ঢুকে একটু এসএফআই করতাম, বক্তৃতাও দিতাম, তখনই তোতলামিটা চলে যায়। পিসেমশাই সকালবেলায় রেডিও-র খবর শুনতেন। তারপর রবীন্দ্রসংগীত। কারখানা খুলে যেত সকাল ন’টায়। তার আগেই উনি নীচে চলে যেতেন। সকালে পাঁউরুটি মাখন খেতেন, কিম্বা জেলি মাখানো। কখনও একটু হালুয়াও। কোনও রবিবার চ্যাঙারিতে কচুরি-জিলিপি আসত। একটু বেশি করেই আনতেন। তাতে কচুরি-জিলিপি থাকত। আমরাও জিলিপি পেতাম।
বেলা বারোটা নাগাদ কারখানা থেকে উপরে উঠতেন। স্নান করে একটার মধ্যেই খাওয়া শেষ। কিছুক্ষণ বিশ্রাম। সন্ধের পরই উপরে চলে আসতেন। মুড়িতে আলুসেদ্ধ, ছোলা থাকত। শীতের সময়ে কড়াইশুঁটি সেদ্ধ। ‘পল্লীমঙ্গল’ আসর হত রেডিও-তে। ওখানে কাশীনাথ, গোবিন্দ— এরা থাকত। ওরা ঝগড়া করত। আমিও মাঝে-মাঝে শুনতে যেতাম। রেডিও-তে শুক্রবার রাত আটটা থেকে নাটক হত, উনি শুনতেন। আমার মা মাঝে-মাঝে ওদের ঘরে গিয়ে শুনতেন। কিন্তু মায়ের সময় কোথায় পুরো একঘণ্টা নাটক শুনবার মতো।
আমি যখন ক্লাস ফাইভ বা সিক্স, তখনই পিসেমশাইরা দুর্গাচরণ স্ট্রিট-এ চলে যান। নতুন বাড়ি করেছিলেন। ও-বাড়ির দোতলায় থাকতেন, তিন তলায় রাঙাদা। ওই নতুন বাড়িতে স্নান করার জন্য নীচে নামতে হত না। দোতলাতেই বাথরুম ছিল। তখনও বাথরুমকে টয়লেট বলতাম না। এটা ১৯৬২/৬৩ সালের কথা বলছি। ও বাড়িতে খুব যেতাম। থাকতামও মাঝে-মাঝে। নইলে ও-পাড়ার গোবিন্দ, অলোক, জগাদা এদের মনে আছে কী করে? ওদের গলিতে ক্রিকেট খেলা হত। আমিও খেলতাম তো। আর গড়গড়ি বলে মেয়েটাকেও তো মনে পড়ল। ওদের বাড়ির উল্টোদিকে থাকত। মাথায় ছিল হেয়ার ব্যান্ড কী একটা রিং দিয়ে খেলত। রিংটা পা থেকে কোমর অবধি উঠে যেত। কোমর থেকে বুক। আবার কোমর ঘুরিয়ে নামিয়ে দিতে পারত। ওই খেলাটার মনে হয় হুলাহুপ বা এই রকম কিছু একটা নাম ছিল। গরিব ঘরের মেয়েরা এটা খেলত না। একটু বড়লোকের মেয়েদের খেলা ছিল এটা।
গ্যালিফ স্ট্রিট-এর যে-বাড়িতে থাকতাম, তার তিন দিকেই ছিল বস্তি। একদিকে রাস্তা। আমাদের বাড়িটাই ছিল একমাত্র ‘কোঠাবাড়ি’।


