জীবনের জলছবি

Representative Image

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের পেশা বদলালেও, যাঁদের বংশগতভাবে যা কাজ, তাঁদের অনেকেই সেই কাজে কোনও-না-কোনও ভাবে থেকে যান। ভাবুন তো একবার, লম্বা জোব্বা পরে যেসব ‘কাবুলিওয়ালা’রা একসময়ে ‘হিং লেবে, সুরমা লেবে মেওয়া লেবে’ হাঁক দিয়ে কলকাতার অলিগলি দাপিয়ে বেড়িয়েছে, তাঁদেরই কেউ-কেউ আজ কলকাতা শহরের বড় প্রোমোটার। তবে এ-কথা স্পষ্ট করা ভাল যে, প্রোমোটারদের আদি পূর্বসূরি কিন্তু ‘কাবুলিওয়ালা’রা নন। হয়তো সময়ের ফেরে নিজেদের পেশাকেই কিছু মানুষ অভিযোজিত করেছেন মাত্র। তাহলে ‘কলকাতার কাবুলিওয়ালা’দের আদি পেশা কী? কেনই-বা তাঁরা কলকাতায় এলেন? ‘কলকাতার কাবুলিওয়ালা’ ‘মিথ’ হয়ে গেল কবে থেকে? তাঁদের ইতিহাস-সমাজ-বিবর্তনের সাক্ষ্য জানতে হলে, আপনাকে পড়তে হবে ‘মান্দাস’ প্রকাশিত তুহিন হক-এর ‘কলকাতার কাবুলিওয়ালা অভিবাসন, অভিযোজন ও জীবনচর্যা’ বইটি। এ-শহরের সামাজিক ইতিহাস চর্চায়, বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে এই বই।

কেন এই বই জরুরি? প্রথম উত্তর, বইটি একজন নিষ্ঠাবান গবেষকের আতস কাচের বিপরীতে রাখা এক খোঁজ, যে-খোঁজে উঠে এসেছে একটা সময়ের ইতিহাস-স্রোত। যে-স্রোতে আমরা জানতে পারি, ‘কাবুলিওয়ালা’ শব্দটা জনপ্রিয়ই হত না, রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্পটি  না লিখলে। লেখক এও জানান, আসলে কাবুলিওয়ালারা নিজেদের ‘পাখতুন’ জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। বাঙালিই তাঁদেরকে কাবুল থেকে আগত বলে, ‘কাবুলিওয়ালা’ বলে জনপ্রিয় করেছে।

আরও পড়ুন: জিরাফকে বাঘ ভেবে গুলিয়ে ফেলেছিলেন এক বাবু, তারপর যে মজার কাণ্ড ঘটেছিল! লিখছেন সৃজন দে সরকার…

কেন কলকাতায় এল ‘কাবুলিওয়ালা’রা? লেখক দেখাচ্ছেন, এঁদের আগমনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে, শুধুমাত্র উপনিবেশ-কালপর্ব বিচার করলে চলবে না; ফিরে যেতে হবে তুর্ক-আফগান যুগে।  অথচ মজার ব্যাপার, স্বনামধন্য সমাজ-ইতিহাসবিদদের অনেকেই— ‘আর্মেনিয়ান’, ‘ইহুদি’, ‘পার্সি’ প্রমুখ জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস লিখলেও, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, ব্রাত্য করলেন কাবুলিওয়ালাদের আগমনের ইতিহাসকে। লেখক সেই পথ ধরেই নিজের গবেষণা চালিয়েছেন। যার ফসল এই বই। লেখক দেখাচ্ছেন, আঠেরো শতকের দুই ও চারের দশক থেকে শুরু করে ১৮৯৩-এ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমানা নির্ধারক ডুরান্ড লাইন স্থাপন, কলকাতায় কাবুলিওয়ালা আগমন ও তাঁদের কলকাতার বাসিন্দা হয়ে যাওয়ার অন্যতম সময়। আসলে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমানা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরে, অনেকেই সীমান্তের এপারে আটকে পড়েন। তাঁদেরই অনেকে আর দেশে ফিরতে পারেননি এবং একটা অংশ ভারতে প্রবেশ করে, কলকাতায় চলে আসেন জীবিকার স্বার্থে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের রহমত ‘হয়তো’ এই কাবুলিওয়ালাদেরই একজন। ইতিহাস অন্তত তাই বলে।

বইটিকে লেখক আটটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। সেগুলি যথাক্রমে— ‘কাবুলিওয়ালা চর্চা: সাহিত্য ও ইতিহাসে’, ‘ঐতিহ্য থেকে উত্তরাধিকার’, ‘সংকট, বিপন্নতা, দেশান্তর ও আশ্রয়’, ‘অর্থনীতি দেশকাল ও সমাজ জীবন’, ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন’, ‘চলচ্চিত্রে কাবুলিওয়ালা ও আফগানিস্তানে বাঙালি নারী’ এবং ‘অভিবাসন প্রান্তিকতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট’। এছাড়াও, একটি পরিশিষ্ট অংশ রয়েছে। লেখকের অধ্যায় বিভাজন-পরিকল্পনা দেখলেই স্পষ্ট হবে, লেখকের খোঁজ শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সেখানে এসে যুক্ত হয়েছে, একটি জনগোষ্ঠীর বিকাশ ও বিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য শর্তগুলির বিস্তৃত আলোচনা।

প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখব, কীভাবে মুঘল-যুগে লিখিত ‘হুমায়ুননামা’, ‘আকবরনামা’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের গল্প পেরিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলির লেখাতে উঠে এসেছে ‘আফগানিস্তান-প্রসঙ্গ’। কটন, জেমস লং প্রমুখ বিদশিদের লেখা প্রবন্ধ-তথ্য ছাড়াও, কীভাবে নীহাররঞ্জন রায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রাধারমণ রায়, অতুল সুর, নিখিল সুরের লেখায় উঠে এসেছে— ‘কাবুলিওয়ালা’দের পেশার কথা। একটা সময়ের প্রতিচ্ছবি যেন। ‘কাবুলিওয়ালা’ মানেই কি শুধু মুসলমান? লেখক, রমানাথ রায়ের ‘আফগানিস্তান ভ্রমণ’ গ্রন্থটির সূত্র-উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, ‘কাবুলিওয়ালা’ মানেই মুসলমান-পাঠান নন, তাঁদের অনেকেই হিন্দুধর্মাবলম্বী। এছাড়াও নানা চমকপ্রদ তথ্য যথাযথ সূত্রের সঙ্গে পরিবেশন করেছেন লেখক।

একজন গবেষকের অন্যতম কাজ হল, তাঁর সংগৃহীত ও পরিবেশিত তথ্য যেন ‘একপেশে’ না হয়ে যায়, এ-বিষয়ে সচেতন থাকা। এই গ্রন্থের লেখক কোনও ‘বায়াসনেস’ ছাড়াই এ-কাজে নিষ্ঠাবান থেকেছেন।

কেন ভারত তথা কলকাতায় কাবুলিওয়ালাদের অভিবাসন ও সেই সঙ্গে আফগানিস্তানের ইতিহাস জানা জরুরি? এ-প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলিকে স্মরণ করেছেন লেখক। ‘আফগানিস্তানের ইতিহাস না লিখে ভারত ইতিহাস লেখার জো নেই।’ লেখক এই ‘জরুরিত্ব’কে প্রথমে ব্যাখ্যা করেছেন ভারত-আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান দেখিয়ে। বর্তমান ভারত-ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত  আফগানিস্তানের সীমান্ত না থাকলেও, একসময়ে কীভাবে হিন্দুকুশ পর্বতের খাইবার গিরিপথ ও সুলেমান পর্বতের বোলান গিরিপথের মধ্যে দিয়ে আফগানিস্তানের মানুষরা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করতেন তা দেখিয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে তপন সিংহ নির্মিত ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্রটির কথা স্মর্তব্য। সিনেমার একদম শুরুতে একটি ভাষ্যপাঠ চলে, সেখানে কাবুলিওলাদের ভারতে আসার পথটি বলেছিলেন পরিচালক, সেই পাঠে যেমন এসেছে হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতের কথা, তেমনই এসেছে গান্ধারের কথাও। এই বইতেও চলচ্চিত্রে কীভাবে ‘কাবুলিওয়ালা’ গৃহীত  হয়েছে তা নিয়ে বিস্তৃত একটি অধ্যায়ই রয়েছে। শুধু ভৌগলিক সীমানা নয়, পুরাণে কীভাবে আফগানিস্তান-প্রসঙ্গ এসেছে তাও এই বইতে বর্ণনা করেছেন লেখক। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ভারত-ইতিহাসে তুর্ক-আফগান যুগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্ব হিসেবে ধরা হলেও, আফগান অনুপ্রবেশের শিকড়ে পৌঁছতে গেলে, ‘মধ্যযুগ’ বলে ইতিহাসের যে-কালপর্বকে দাগিয়ে দেওয়া হয়, সেই ইতিহাস-অনুসন্ধান করতে হবে। তবে তার অনেকটাই সাম্রাজ্যবিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কীভাবে অভিবাসিত জীবন থেকে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আফগানরা, এবং পরিচিতি পেলেন ইতিহাসের ‘যোদ্ধাজাতি’ হিসেবে তাও চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। শের শাহের গৌড় বিজয় থেকে শহর-গলিপথে পেশার সূত্রে ঘুরে বেড়ানো আফগান-কাবুলিওয়ালাদের ইতিহাসের এক দলিল হয়ে উঠেছে এই বই। একটা কথা বিশেষ করে উল্লেখ্য। লেখক বলছেন, ‘আগ্রাসনের ইতিহাসে চোরা স্রোতে অভিবাসনের ইতিহাস হারিয়ে যায় না।’ ঠিক তেমনি গবেষণা গ্রন্থ হলেও, লেখকের স্বাদু ও স্বচ্ছন্দ গদ্যের চলনে এই বইতে নিহিত ইতিহাস উপলব্ধি করতে একবারের জন্যও হোঁচট খেতে হয় না।

ভারত-ইতিহাসে তুর্ক-আফগান যুগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্ব হিসেবে ধরা হলেও, আফগান অনুপ্রবেশের শিকড়ে পৌঁছতে গেলে, ‘মধ্যযুগ’ বলে ইতিহাসের যে-কালপর্বকে দাগিয়ে দেওয়া হয়, সেই ইতিহাস-অনুসন্ধান করতে হবে। তবে তার অনেকটাই সাম্রাজ্যবিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কীভাবে অভিবাসিত জীবন থেকে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আফগানরা, এবং পরিচিতি পেলেন ইতিহাসের ‘যোদ্ধাজাতি’ হিসেবে তাও চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।

কেন আফগানরা কলকাতায় আসতে শুরু করল? এর কারণ হিসেবে লেখক যেমন আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কারণকে চিহ্নিত করেছেন, তেমনই দায়ী করেছেন ভূপ্রাকৃতিক কারণকেও। বিশ শতকে আফগানিস্তানের জনগণনার যে-পরিসংখ্যান লেখক তুলে আনেন, তার মধ্যে মূল জনসংখ্যায় যাযাবদের সংখ্যাধিক্য কীভাবে অর্থনীতির অধোগতিকে নির্দেশ করে, তা দেখিয়েছেন। কিন্তু এই বিচার যে একমুখী নয়, তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। বলছেন, এর কারণ জানার জন্য জানা দরকার আফগানদের সামগ্রিক জনগোষ্ঠী ও তাঁদের যাপনের কথা।

আবার স্বাধীনতা উত্তর সময়ের ভারতে, আফগান জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন উভয় দেশের সরকারে মিত্রতার কথা। সে-সময় থেকে বর্তমানের কেন্দ্রীয় সরকার, অধিকাংশ পরিস্থিতিতেই আফগানিস্তানের পাশে থেকেছে ভারত। যার ফলে নানা সময়ে তৈরি হয়েছে আফগানি জনসংখ্যার অভিবাসনের চাপ। লেখক যে শুধুমাত্র হাওয়ায় নিজের মন্তব্য ভাসিয়ে দেননি, তার প্রমাণ সম্পূর্ণ বইটি জুড়ে সংযোজিত সেনশাস রিপোর্ট, কাবুলিওয়ালাদের বদলে যাওয়া পেশার তালিকা-সহ আরও নানা জরুরি তথ্যের সমাহার। সর্বোপরি পরিবেশিত প্রতিটি তথ্যেই প্রকাশ পেয়ছে একজন সচেতন গবেষকের সত্তা।

কাবুলিওয়ালাদের পেশা সব সময়ে এক রকম ছিল না। কলকাতায় নিজ-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে কীভাবে নিজেদের পেশা বদলে, সুদের কারবারে কাবুলিওয়ালারা এল তাঁর এক চমৎকার ছবি এঁকেছেন লেখক। অনেকেরই মনে থাকবে, তপন সিংহ নির্মিত ‘কাবুলিওয়ালা’তে রহমত বলেছিল, ধার-বাকির কারবার সে করে না। এই বক্তব্য কিন্তু কাবুলিওয়ালাদের বদলে যাওয়া পেশার যে-তথ্য আমরা পেলাম এই বইতে, তারই সমার্থক। ‘কাবলেদের থেকে ধার নেওয়া’ আজও বাঙালি সমাজে মুখে-মুখে ফেরে। এ-প্রসঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীও কীভাবে একবার কাবুলিওয়ালার থেকে ধার নেওয়ার চক্করে পড়েছিলেন এবং সেখান থেকে কীভাবে তাঁকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্ধার করেছিলেন সে-গল্প বলেছেন লেখক। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক কাবুলিওয়ালাই সুদের ব্যবসা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন, কারণ তাঁদের উত্তর প্রজন্ম মনে করেন, এই ব্যবসা ইসলামের পরিপন্থী। অনেক বদল পেরিয়ে, কলকাকাতার কাবুলিওয়ালাদের অধিকাংশেরই ব্যবসা দাঁড়িয়েছে, দুম্বার মাংস বিক্রি। একটা জনগোষ্ঠীর জীবনের সামগ্রিক চালচিত্র এই বইতে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন লেখক। আসলে এই বইতে অনেক তথ্য থাকলেও, কখনও তা ‘তথ্য-ভারাক্রান্ত’ হয়নি, লেখকের পরিকল্পনার গুণে হয়ে উঠেছে ‘তথ্য-সমৃদ্ধ’।

রবীন্দ্রনাথ ভারত সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শক-হুন-দল পাঠান মোঘল/ এক দেহে হল লীন’ আসলে সমগ্র ভারতে বিভিন্ন জনজাতির এই মিলে যাওয়ার শেষ নিদর্শনটুকু যে-শহর ধরে রেখেছে, তার নাম ‘কলকাতা’। এই কলকাতার বুকে এত সংস্কৃতির সম্মিলন আজও বাঁচিয়ে রেখেছে ভারতের সমন্বয় সত্তাকে। এই বই সেই সত্তার একটুকরো অংশ যেন, সেখানে যেমন ইতিহাসের যুক্তিক্রম এসেছে, এসছে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট। পোশাক-খাদ্যের সংস্কৃতিও বাদ পড়েনি। লেখক যেমন তুলে এনেছেন কলকাতার আফগান খাবারের তালিকা, তেমনি তুলে এনেছেন কাবুলিওয়ালাদের খানাকোঠির ধ্বংসাবশেষের ছবি। জীবিত-মৃত সব নিদর্শন মিলিয়েই একটা ‘জীবনের জলছবি’ হয়ে উঠেছে এই বই। পাঠক যে-জলছবিতে অবগাহন করলে, ইতিহাসেরই কল্যাণ হবে।   

কলকাতার কাবুলিওয়ালা অভিবাসন, অভিযোজন ও জীবনচর্যা
তুহিন হক
প্রচ্ছদ: সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়
মান্দাস
৬৫০.০০