১৯৬০-এর এক গ্রীষ্মের অপরাহ্ন। রবিবার। দক্ষিণ কলকাতায় ডিহি শ্রীরামপুর লেনের আঠারো নম্বর বাড়ির একতলায় লাল মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে তা ঢেকে দেওয়া হয়েছে সাদা চাদর দিয়ে। সেখানে উপবিষ্ট অভ্যাগতর দলে যিনি মধ্যমণি, তাঁর নাম জানকীনাথ সিংহ রায়। বইপাড়ায় তাঁর একটি প্রকাশন প্রতিষ্ঠান আছে— নাম ‘নিউ এজ’। স্ত্রী-কন্যাসহ প্রথমবার আঠারো নম্বরে এসেছেন প্রৌঢ় জানকীনাথ— সঙ্গে এনেছেন সন্তানসম দুই যুবককে। তাঁদের একজন কয়েক বছর হল ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘টেম্পল চেম্বার’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখে সাড়া ফেলেছেন; জানকীনাথ গ্রন্থাকারে প্রকাশও করেছেন সেটি ‘কত অজানারে’ নাম দিয়ে। যুবকের নাম মণিশংকর মুখার্জি, পেন নেম ‘শংকর’। দ্বিতীয়জন জানকীনাথ প্রকাশিত বিমল মিত্রর ‘সাহেব বিবি গোলাম’ বইটির প্রচ্ছদ এঁকে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন; ‘কত অজানারে’-র প্রচ্ছদটিও তাঁরই সৃষ্ট। নাম অজিত গুপ্ত।
গৃহস্বামীর জ্যেষ্ঠা পৌত্রী সুমিত্রার সঙ্গে একমাত্র পুত্রের বিবাহপ্রস্তাব নিয়ে এসেছেন প্রকাশক। পুত্রটি থাকেন দিল্লিতে, গৃহস্বামী তাঁর সম্পর্কে যথাবিহিত খোঁজখবর নিয়েছেন দু-জন মানুষের কাছে। একজন মনস্বী কবি-প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসু, অন্যজন লোকায়ত দর্শন-বেত্তা দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়— উভয় পরিবারেরই দুয়ার এঁদের জন্য অবারিত। বুদ্ধদেবের সানন্দ সম্মতি ছিল প্রস্তাবে। দেবীপ্রসাদ পাত্রর পরিবার সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, ‘জানকীবাবু এমন প্রকাশক, যিনি ধুলো মুঠো করলেও তা সোনা হয়’। আশ্বস্ত হয়েছিলেন তিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ গৃহস্বামী। জ্যেষ্ঠ পুত্র ধর্মদাস, চতুর্থ পুত্র অমিয়কান্তি (‘পটল’ নামেই যাঁর সমধিক পরিচিতি), অভিন্নহৃদয় সুহৃদ বিষ্ণু দে, দার্শনিক দেবীপ্রসাদের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেদিন সোৎসাহে ডেকে পাঠিয়েছেন গৃহকর্ত্রী আনন্দময়ী, ধর্মদাস-জায়া বিভারাণী এবং বিষ্ণু দে-র ঘরণী প্রণতিকেও।
আরও পড়ুন: হাসপাতালের বেডে শুয়েও শংকর চেয়েছিলেন বইয়ের প্রুফ!
লিখছেন শুভঙ্কর দে…

গৃহস্বামী তিয়াত্তর বছরের প্রবীণ শিল্পী, নাম যামিনী রায়। কয়েক বছর আগেই ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ নামে যে অসামরিক সম্মানটির প্রচলন করেছেন, তার প্রথম বছরের প্রাপক তিনি। দিল্লি গিয়ে সেই সম্মান গ্রহণ করতে তাঁর অপারগতা হেতু কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদল পাঠান ডিহি শ্রীরামপুর লেনের বাড়িতেই শিল্পীকে সম্মানিত করার জন্য। দিল্লি থেকে আগত সেই দলের সঙ্গে সস্ত্রীক শিল্পী ও তাঁদের জ্যেষ্ঠা পৌত্রীটির ছবি ইতিপূর্বেই পাঠানো হয়েছে জানকীনাথকে। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের পুত্র প্রবোধ মারফত কন্যার আরও একটি ছবি পৌঁছেছিল ঢাকুরিয়ায় সিংহরায় ভবনে। প্রকাশকের পরিবারে ঔৎসুক্য ছিল ছবিদু’টি নিয়ে। পাত্র নিজে ছবিগুলি না দেখলেও বন্ধু অজিত গুপ্ত এবং কাছের মানুষ মণিশংকরের মুখে তারিফ শুনেছেন কন্যার। বিশেষত শংকরের কথায় তাঁর অগাধ ভরসা। সেদিনের ঘটনাও শংকর সবিস্তারে পরে জানিয়েছিলেন তাঁকে— যামিনী রায়ের স্টুডিওর বর্ণনা দিল্লিতে বসে তাঁরই মুখে শোনেন শিবব্রত। চারপাশে সাদা রঙের চৌকি আর খাটো কাঠের টুলের ওপর ছবিগুলি দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ালে হেলান দিয়ে। শংকর খুঁটিয়ে দেখছিলেন— অনেকগুলিই কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হলেও সামনে কাচ লাগানো নেই। দীর্ঘকাল হাইকোর্টে কাজ করার সুবাদে সংসারকে যাচাই করার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শংকরের আয়ত্ত হয়েছে। সবিনয়ে শিল্পীকে প্রশ্ন করেন, ‘ছবিগুলি দেওয়ালে টাঙাননি?’ ‘বলো কী বাবা, ওদেরও যে প্রাণ আছে— এই বাড়ি তো ওদেরই। দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখতে পারি কি ওদের!’ শিল্পীর গলায় অপার সারল্যের সঙ্গেই মিশে ছিল গভীর জীবনবোধ। শুনে মুগ্ধ হন শংকর। সপ্রতিভ অথচ ধীর গলায় বলেন, ‘আর তাই বুঝি ফ্রেমে কাচ লাগাতে দেননি— ওদের শ্বাসরোধ হওয়ার ভয়ে?’ স্মিতহাস্যে মাথা নেড়ে সায় দেন যামিনী রায়।
দুই পরিবারের সম্মতিক্রমে সুমিত্রা ও শিবব্রতর বিবাহ-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় ১৯৬১-র অক্টোবরে। বরযাত্রীদের সঙ্গেই শংকর পুনরায় আসেন ডিহি শ্রীরামপুর লেনের বাড়িতে। ততদিনে বঙ্গীয় পাঠকসমাজকে তিনি পুনরায় সচকিত করে তুলেছেন তাঁর ‘তখন-তাজ্জবতম’ রচনা ‘চৌরঙ্গী’ দিয়ে। গ্রন্থাকারে ‘চৌরঙ্গী’-র প্রকাশনা নিয়ে উপন্যাস না হলেও একটি ছোট গল্প তৈরি হওয়া অসম্ভব ছিল না। এবং প্রথম প্রকাশক জানকীনাথের সঙ্গে শংকরের সম্পর্কের উষ্ণতা ‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশিত হওয়ামাত্রই শেষ হতে পারত। হয়নি, তার কারণ মুখ্যত দু’টি— শংকরের মাতৃভক্তি ও মূল্যবোধ এবং শিবব্রতর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা।

শংকর দিল্লি গেলেই স্টেশন থেকে ‘নিউ এজ’ মনোগ্রাম-করা উর্দি-পরিহিত বেয়ারা তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় করোলবাগে শিবব্রতর ঠিকানায়। সন্ধেবেলা আড্ডা জমে গোল মার্কেটে ‘নিউ এজ’-এর দোকানে। ততদিনে ‘কত অজানারে’-র একটি হিন্দি সংস্করণ দিল্লিতে ‘নিউ এজ’ থেকে প্রকাশ করেছেন শিবব্রত— ‘কিত্নে আন্জানে রে’। পরে রাজকমল ‘নিউ এজ’-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বইটি পুনঃপ্রকাশ করেন ‘ইয়ে আন্জানে’ নাম দিয়ে। ব্লার্বে লেখা হয়: ‘‘‘ইয়ে আন্জানে’ ১৯৫৪ মেঁ সুপ্রসিদ্ধ্ বঙ্গ্লা পত্র ‘দেশ’ মেঁ ধারাওয়াহিক্ রূপ সে প্রকাশিত্ হুয়া থা, জিস্কা ইনকী অপনী কৃতিয়োঁ মেঁ হি নহীঁ, বল্কি সম্পূর্ণ্ বঙ্গ্লা সাহিত্য মেঁ বিশিষ্ট্ স্থান হ্যায়।’’
কিন্তু শংকরের প্রতি শিবব্রতর অনুরক্তির মূলে ছিল আরও একটি কারণ— ইংরেজিতে শংকরের কনভার্সেশন স্কিল। কলকাতা হাইকোর্টে ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের অধীনে কাজ করতে করতে সাহেবের স্নেহ আর ট্রেনিং, দুই-ই সমপরিমাণে পেয়েছিলেন শংকর। আর সেই ট্রেনিং-এর অনেকটাই ছিল, আজকের যুগে যাকে বলা হয় সফ্ট স্কিল— মানুষ চেনার ক্ষমতা, পরিস্থিতি আগাম আঁচ করার দূরদর্শিতা, জীবনযাপনের বৌদ্ধিক ও সামাজিক রীতি। এবং অবশ্যই কমিউনিকেটিভ ইংলিশ— ভাষার ওপর ভাবের আদানপ্রদানের পর্যাপ্ত অধিকার। পত্নী ম্যারিয়নের সঙ্গে নোয়েলের সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অস্বচ্ছতা ছিল। সে-কাহিনি সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করে কদাপি রুচির সীমানা লঙ্ঘন করেননি শংকর। হয়তো সেই কারণেই শ্রীমতী বারওয়েলের অকৃত্রিম ভালবাসা পেয়েছিলেন। আর সেই প্রশ্রয়ের জোরেই শিবব্রতর সঙ্গে ম্যারিয়নের তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন রানিখেতে। ১৯৬০-এ সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই ‘নিউ এজ’ থেকে প্রকাশিত হল ম্যারিয়ন বারওয়েলের লেখা ‘ইন্ডিয়া উইদাউট সেন্টিমেন্ট’, যার উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল: ‘For Mani Sankar Mukherji who has written Kata Ajanare (So Many Unknown)’. বইয়ের প্রচারপত্রে লেখা হল: ‘This unusual autobiography is destined to become one of the most controversial books so far written on India. It narrates the experiences of the wife of the well-known British barrister Noel Barwell, who, till the time of his death in 1953, lived and practised in Calcutta.’ বলাই বাহুল্য লেখাটি শংকরের।

বইটি শংকরের পাশাপাশি শিবব্রতকেও আনে ম্যারিয়নের স্নেহচ্ছায়ায়। কাজ পড়লেই রানিখেত থেকে দিল্লি আসেন ম্যারিয়ন, খবর পেলেই ছুটে যান শিবব্রত। সন্ধেগুলি অনুপম হয়ে ওঠে অসমবয়সি দুটি মানুষের হার্দ্য আলাপচারিতায়। প্রায় সন্তানস্নেহে শিবব্রতকে ইংরেজিতে তালিম দেন শ্রীমতী বারওয়েল, উত্তর ভারতীয় প্রকাশনায়, বিশেষ করে ইংরেজি বইয়ের সম্পাদনার কাজে, উপযুক্ত করে তোলেন তাঁকে। পুরনো দিনের এসব কথা বহু বছর পর শিবব্রতর মুখে শুনে আপ্লুত হয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত স্যর মার্ক ট্যলি—কলকাতা বইমেলায়, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের আমন্ত্রণে এসে শিবব্রতর হাতে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের স্মারক-সম্মানটি তুলে দেওয়ার সময়। সেদিনই রাত্রে অসুস্থ শিবব্রতর কুশল সংবাদ নিতে ফোন করেন শংকর, অভিনন্দন জানান সম্মানপ্রাপ্তিতে। শিবব্রতর অনুরোধে তাঁর পৌত্রের নামকরণও করেন নিজেরই এক জনপ্রিয় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নামে— রমিত।

কর্তব্যে গাফিলতি করেননি শংকর। বন্ডেল রোডের রিপোজ নার্সিংহোমে জানকীনাথ যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন সস্ত্রীক শংকর বারংবার ছুটে গেছেন বাড়ির কাছেই, সেই আরোগ্যশালায়। বয়সের ভারে জীর্ণ, কর্কট রোগে শয্যাশায়ী প্রথম প্রকাশককে দেখতে। হয়তো-বা ‘ইয়ারো রিভিজিটেড’ হত তাঁরও, স্মরণে আসত মা অভয়ারাণীর কথা—জানকীনাথের ওপর তাঁর অকুণ্ঠ ভরসা ছিল।
লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক বিষয়ে উপমার অধিরাজ শংকরের দু’টি অভিমত ছিল: কোনও কারণে হতাশ হলে বলতেন, ‘শাশুড়ি-পুত্রবধূর মতো’; হতাশা কাটিয়ে উঠলে বলতেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর চেয়েও বেশি, মৃত্যুতেও শেষ হয় না’। তবুও না বললেই নয়, ভারতীয় গ্রন্থসংস্কৃতিতে লেখক-প্রকাশকের সম্পর্কটি চরিত্রগতভাবে বহুমাত্রিক— মোটের ওপর ট্র্যানজ্যাকশনালের চেয়ে বেশি রিলেশন্যাল। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সে-সম্পর্কের পরিণতি সুখস্মৃতি রেখে যায় না কোনো তরফেই। যৌবনের প্রথম বইটির প্রকাশককে শংকর আখ্যা দিয়েছিলেন ‘হিউম্যান ডায়ন্যামো’; তাঁর পরিবারের সঙ্গে শংকরের সম্পর্ক বঙ্গীয় প্রকাশনার ইকোসিস্টেমে সংযোজন করেছিল আরও একটি অতিরিক্ত মাত্রা— ইমোশন্যাল ডাইমেনশন— বাণিজ্যিক যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে যার তল পাওয়া কঠিন। দুশ্চিকিৎস্য রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা ১৯৭০ সালে দৃষ্টিহীন শিবব্রতকে ভারতীয় প্রকাশনা থেকে অকস্মাৎ অবসর নিতে বাধ্য না করলে সে-সম্পর্ক নিঃসন্দেহে আরও চিত্তাকর্ষক হতে পারত।
ছবি সৌজন্যে: লেখক




