সে অনেক বছর আগেকার কথা।তখনও মানচিত্রে কলকাতা কিংবা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়ার কোনও চিহ্নমাত্র ছিল না। সে-সময়ের বাংলায় হুগলি নদীর তীরের এক ছোট মফস্সল শহর ছিল চুঁচুড়া ।
তখনও ‘বণিকের মানদন্ড’ দেখা দেয়নি ‘রাজদন্ড’ হয়ে, তখন বাংলায় এক-এক করে আসতে থাকে পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসিরা। প্রথম যে ইউরোপীয় শক্তি ভারতে আসে বাণিজ্য করতে, তারা ছিল পর্তুগিজ। তার ঠিক পর-পরই বাংলায় আসে ডাচরা। চুঁচুড়া ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। আজও আধুনিক দিনের ঘরবাড়ির পাশাপাশি চোখে পড়ে ডাচদের রেখে যাওয়া নানা স্থাপত্য, যাঁরা এর আগে পর্তুগিজদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই জনপদটিকে গড়ে তুলেছিলেন নতুনভাবে।
ব্যান্ডেলের প্রতিবেশী শহর চুঁচুড়া, সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে ডাচ, ব্রিটিশ, আর্মেনীয়দের বাসস্থান ছিল। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ভেরেনিগডে ওস্ট-ইন্ডিশে কোম্পানি (VOC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০২ সালে, নেদারল্যান্ডস ও বিশ্বের অন্যান্য অংশের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে। ১৬০৬ সালে পূর্ব উপকূলে পেটাপুলিতে ডাচেরা প্রথম পা রাখে ভারতে এবং আনুমানিক ১৬১৫ সালের মধ্যে তারা বাংলায় পদার্পণ করে।
যে-ভাবে অলিতে-গলিতে যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল কালীঘাটে! লিখছেন জয়ন্ত ঘোষ…
১৬৩৫ সালের মধ্যে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে বাণিজ্যের জন্য একাধিক ফরমান পেয়ে যায় ডাচরা। ১৬৫৩ সালের মধ্যে তারা চুঁচুড়ায় নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করে এবং ১৬৫৫ সালে মসলা, চিনি, রেশম, আফিম, সল্টপিটার ও তুলোর ব্যবসার জন্য একটি স্বতন্ত্র বেঙ্গল ডিরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করে।
VOC-এর কাছে চুঁচুড়ার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কারণ এই শহরটি ছিল ডাচ সাম্রাজ্যের পশ্চিম রাজধানী আমস্টারডাম এবং পূর্ব রাজধানী বাতাভিয়া (বর্তমান জাকার্তা)-র মাঝামাঝি এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। তবে চুঁচুড়ার অধিকার নিয়ে বরাবরই টানাপোড়েন ছিল ডাচ ও ব্রিটিশদের মধ্যে। ১৭৮১–৮৪ সাল এবং পরে ১৭৯৫ সাল থেকে এটি ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। ১৮১৪ সালে আবার ডাচদের হাতে ফিরে এলেও, ১৮২৫ সালে ডাচরা সুমাত্রায় ব্রিটিশদের অধিকার পাওয়ার বিনিময়ে ভারতে থাকা তাদের সমস্ত এলাকা ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়। সেই এলাকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা এলাকা ছিল চুঁচুড়া । কিন্তু যে সময়কালটুকু ডাচরা চুঁচুড়া শহর অধিকার করে ছিল, সেই সময়কালের মধ্যেই তারা তৈরি করে বহু স্থাপত্য, চুঁচুড়াকে সাজায় নিজেদের মতো করে। ফলস্বরূপ, চুঁচুড়া হয়ে উঠেছিল এক অনন্য ডাচ-ইংরেজ-বাঙালি ঘরাণার সংমিশ্রণ।
আজকের চুঁচুড়া শহর এক নিতান্তই অগোছালো, ঘিঞ্জি একটা শহর। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক স্মৃতি। কিন্তু ডাচ ঐতিহ্যের কিছু নিদর্শন এখনও টিকে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হল সুজানা আনা মারিয়ার সমাধি, যা শহরের একটু বাইরে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে অবস্থিত।
সুজানা আনা মারিয়া… নামটা চেনা চেনা লাগছে…? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। Ruskin Bond-র বিখ্যাত গল্প ‘Susanna’s Seven Husbands’ এই সুজানা আনা মারিয়াকে কেন্দ্র করেই লেখা। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে— কে এই সুজানা আনা মারিয়া? কী তাঁর পরিচয়?
সুজানা আনা মারিয়া ভেরকার্ক ছিলেন অষ্টাদশ শতকের এক ডাচ মহিলা, বাসস্থান ছিল চুঁচুড়ায়। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন পিটার ব্রুয়েস, হুগলিতে ডাচ বসতির সিনিয়র মার্চেন্ট ও প্রধান প্রশাসক। ১৭৮৩ সালে তিনি ডাচ বসতির ডিরেক্টর হন। তার আগে ১৭৬৪ সালে তিনি কাশিমবাজারের মার্চেন্ট ও প্রধান প্রশাসক ছিলেন। তাঁদের তিনটি সন্তান ছিল— দুই কন্যা সুজানা জ্যাকোবা ও মারিয়া আনা দে ব্রুইস, এবং এক পুত্র লুই অ্যাড্রিয়ান দে ব্রুইস।
১৭৮৩ সালে পিটার ব্রুইসের মৃত্যুর পর সুজানা আবার বিয়ে করেন থমাস ইয়েটসকে। থমাস ইয়েটস ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারের বাসিন্দা। তাঁর পাত্রিক বিপুল সম্পত্তি তিনি ঘোড়ার দৌড়ে আর জুয়ার নেশায় হারিয়ে ফেলেন। আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি ১৭৭৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৭৮১ সালে লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। ১৭৮৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তিনি ১৭৮১ সালের মার্চ মাসে নরফোক থেকে মাদ্রাজ হয়ে কলকাতায় আসেন। সেনাবাহিনী ছাড়ার পর তিনি চুঁচুড়ার আশেপাশে একজন ব্যাবসায়ী হিসেবে বসবাস শুরু করেন, যদিও তাঁর ব্যাবসা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। একটি চিঠিতে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়— বব পট নামের এক ব্যক্তি স্যার এলিজা ইম্পেকে লেখা চিঠিতে থমাস ইয়েটসকে ‘L. Lyons Estate’-এর প্রশাসক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই L. Lyon সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুই প্রভাবশালী স্বামীর কারণে তিনি বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারিনী হন। সেই সম্পত্তির অন্তর্গত ছিল হুগলি নদীর ধারে ডাচ ফ্যাক্টরির পাশের একটি বাড়ি এবং তালডাঙায় (বর্তমান জি টি রোড) প্রায় ৬০ বিঘা জমিসহ আরেকটি বাড়ি, যার নাম ছিল আয়েশ বাগ।

তিনি তাঁর উইলের মাধ্যমে ৪,০০০ টাকা একটি ট্রাস্ট হিসেবে রেখে যান, যার সুদ তাঁর নিজের এবং তাঁর দুই স্বামীর সমাধির রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করার কথা ছিল। সেই ট্রাস্টের সুদ ব্যবহার করার কথা ছিল তাঁর নিজের এবং তাঁর দুই স্বামীর সমাধির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হত, ‘চুঁচুড়া পুওর ফান্ড’-এ। তিনি ডাচ ও ইংরেজদের জন্য কবরস্থান হিসেবে ব্যবহারের জন্য দান করে যান আয়েশ বাগ।
তিনি মারা যান ১৮০৯ সালে। তাঁকে আয়েশ বাগের বাগানেই সমাধিস্থ করা হয়, কিন্তু অতিরিক্ত জমিটি শেষ পর্যন্ত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, কারণ একটি ডাচ কবরস্থান আগে থেকেই ছিল এবং সেখানেই ইংরেজ বা ডাচদের সমাধির ব্যবস্থা ছিল। সেই সমাধিস্থলেই ছিল পিটার ব্রুয়েস ওরফে সুজানার প্রথম স্বামী পিটার ব্রুয়েসের সমাধি। আজও সেখানে তাঁর সমাধি ও পাথরের ফলক দেখা যায়।
তবে স্থানীয় মানুষদের মুখে শোনা যায় সুজানার সাতবার বিবাহের গল্প- সুজানা নাকি সাতবার বিয়ে করেছিলেন এবং প্রতিবারই তাঁর স্বামী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যেতেন। সেই কারণেই এই সমাধিটি পরিচিত ‘সাত সাহেবের বিবির কবর’ বা ‘মেমসাহেবের কবর’ নামে। যদিও তাঁর সাতটি বিয়ের পক্ষে কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এই লোককথার ভিত্তিতেই লেখা Ruskin Bond-এর ছোটগল্প ‘Susanna’s Seven Husbands’। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এমন কোনও নথি বা প্রমাণ নেই যে, তাঁর সাতজন স্বামী ছিল। বিভিন্ন সরকারি নথি, গবেষণা বা রিসার্চ পেপার থেকে এটা স্পষ্ট যে— তিনি মাত্র দু’বার বিবাহ করেছিলেন। কিছু সাম্প্রতিক নথিতে ফ্লোরিস কাপ নামে এক ব্যক্তিকে সুসান্নার তৃতীয় স্বামী বলা হয়েছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল। আসলে ফ্লোরিস কাপ ছিলেন সুজানার মাতা আদ্রিয়ানা রাটস-এর প্রথম স্বামী। অনুবাদের ভুল থেকেই এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।
১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে সুজানার মৃত্যুর পর তাঁকে আয়েশ বাগের জমিতেই সমাধিস্থ করা হয় সেটা তো আগেই উল্লেখ করা হয়ছে। তাঁর সমাধির ওপর গড়ে ওঠা ধবধবে সাদা রঙের অষ্টভুজাকৃতি সৌধ ইন্দো-ডাচ স্থাপত্যের আদর্শ নিদর্শন। দোতলা এই সমাধিসৌধটির নীচের তলায় চারটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। দোতলাতেও এই প্যাটার্ন বজায় রাখা হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথের দু’পাশে রয়েছে গ্রিক রীতিতে গড়ে ওঠা করিন্থীয় স্তম্ভ এবং উপরে একটি গম্বুজ— যার ফলে এটি নিও-ক্লাসিক্যাল ও বারোক স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এই গম্বুজে খোদাই করা রয়েছে সুজানার নাম :-
‘SUSANNA ANNA MARIA YEATS REBOORE VERKERK OBiIT 12 MAY ANNO 1809’
আজ কত বছর হয়ে গেছে। ডাচরা গেল, ইংরেজ এল। ক্রমে ভারত স্বাধীন হল। সে-সবের সাক্ষী এই ছোট মফস্সল শহরটিও। কিন্তু অনাদি অতীতকেও ভোলেনি সে। আজও সাদা পাথরের সমাধিসৌধ জমিয়ে রেখেছে সাতসাহেবের বিবির গল্প, একান্তে।




