ডেটলাইন : পর্ব ৩০

শরৎচন্দ্র ও সু চি

‘রোশনি, তুমি শরৎচন্দ্রের নাম শুনেছো?’ ইয়াঙ্গনে বাঁহাতি গাড়ি, তাই চালকের ডানদিকের আসন থেকে রোশনি জবাব দিল, ‘নো ম্যাম।’

রোশনি আমাদের দোভাষী, ইংরেজি জানা মুষ্টিমেয়দের একজন। রীতিমতো স্পোকেন ইংলিশ কোর্স করে শিখেছে। তিন প্রজন্ম আগে রোশনির পূর্বপুরুষ বিহার থেকে রুটি-রুজির খোঁজে এসেছিলেন বর্মা মুলুকে, যেমন বহু ভারতীয় আগত ব্রিটিশ আমলে।

‘শাহরুখ-ঐশ্বর্যার দেবদাস দেখেছ?’

এবার রোশনি ঘাড় ঘোরাল, ‘হ্যাঁ ম্যাম। স্পেকট্যাকুলার।’

‘দেবদাস নভেলটা লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাঙালি লেখক। তিনি একসময় থাকতেন রেঙ্গুনে।’

আদরের নাম সাদা পাখি, এই উপত্যকার সৌন্দর্য চমকে দেয়! পড়ুন ‘ডেটলাইন’ পর্ব ২৯…

শুনে যারপরনাই বিস্মিত হল তরুণী। হওয়ারই কথা। শুধু রোশনি কেন, তাঁর আশপাশের কেউ-ই জানেন না, এমন একজন কালজয়ী সাহিত্যিক একদা থাকতেন তাঁদের শহরে, এই পটভূমিতেই লিখেছিলেন অগ্নিযুগের দলিল ‘পথের দাবী’। ষাট-সত্তরের কোঠায় বয়স হলে আজকের ইয়াঙ্গনে পা রাখার আগে নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, কিশোরবেলার নায়ক বিপ্লবী সব্যসাচীর খোঁজে ঘুরে আসবেন শরৎচন্দ্রের পাড়া। সে গুড়ে বালি, কেউ আপনাকে এতটুকু হদিশ দিতে পারবে না! আর যদি গুগল দাদার ভরসায় বেরোন, যদি বা একটাও দাঁত না ভেঙে বারবার জিগ্যেস করতে করতে পৌঁছে যেতে পারেন সেই পাড়ায়, যার নাম বোতাতং পাজুনদং (সঠিক না হতে পারে আমার উচ্চারণ), তবু সেই কাঠের বাড়ির হদিশ পাবেন না। ল্যান্সডাউন রোড বলে একটা জায়গার নাম নেটে দেখে উৎসাহিত হয়েছিলাম, কলকাতার চেনা নাম হাজার হোক, কিন্তু সে আমি খুঁজে পাইনি। তবে শরৎচন্দ্রের রেঙ্গুন কেন ইয়াঙ্গন হল, তার ব্যাখ্যা পেয়েছি। বার্মিজ ভাষায় আর-এর উচ্চারণ উঠে গেছে, তার জায়গা নিয়েছে ওয়াই। আর সেজন্যই আমরা মায়ানমার বললেও, এদেশে বলে মায়ানমা।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সরকারি পূর্ত বিভাগের করণিক শরৎচন্দ্র আর তাঁর ‘মিস্তিরি’ বন্ধুরা কোথায় হারিয়ে গেছেন। হ্যাঁ, নানা কিসিমের মিস্ত্রিরা ছিলেন তাঁর প্রতিবেশী আর শরৎচন্দ্র ছিলেন তাঁদের মনের মানুষ। সমরেশ বসু যেমন নৈহাটি জুটমিলে কাজ করার সময় হয়ে উঠেছিলেন শ্রমিকদের ইয়ার-দোস্ত। মিম্বিদের দরখাস্ত লেখা থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দেওয়া পর্যন্ত কত উপকারে যে লাগতেন বোহেমিয়ান শরৎচন্দ্র! এই রেঙ্গুনেই এক মিষ্টি বন্ধুর মেয়েকে মাতালের সঙ্গে বিয়ে হওয়া থেকে বাঁচাতে নিজেই পিঁড়িতে বসেছিলেন, আর অল্পদিনের মধ্যে প্লেগে স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুর পর আবার এক মিস্ত্রি বন্ধুর অনুরোধে তাঁর কিশোরী কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর কত বিখ্যাত উপন্যাস যে লেখা হয়েছে এই রেঙ্গুনে বসে, কাঠের বাড়ি আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার পর পান্ডুলিপি খুইয়ে দ্বিতীয়বার লিখেছেন ‘চরিত্রহীন’। কমদিন তো নয়, দীর্ঘ তেরো বছরের ঘটনাবহুল রেঙ্গুনবাস সারাজীবনের জন্য খোদাই হয়ে গেছিল হাওড়ার ছেলেটির জীবনে।

ইয়াঙ্গন এসেছি একদম অন্য ধরনের কাজে। মানে এতকাল কখনও কট্টর সাংবাদিকতা, কখনও বা ট্রাভেল শোয়ের শুটিংয়ে যেমন ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবীর নানা প্রান্তে, এবারের কাজটা তার থেকে একদম আলাদা। জানতে হবে, মায়ানমারের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য ঠিক কোন পথ, কোন দেশ বেছে নিতে আগ্রহী? সামরিক শাসনের ফাঁসে স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা, সবই বেহাল। তাই পয়সাওয়ালা তো বটেই, মধ্যবিত্ত মানুষও দরকার হলে ঘটিবাটি বেচে ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে দিতে চায় বিদেশে। এই কাজে ঘুরতে হবে অনেকগুলো স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে। সঙ্গে ইংরেজি জানা রোশনি। কারণ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন সরকার ঠিক করেছিল, বার্মিজ ভাষাই হবে শিক্ষার মাধ্যম। ফলে রোজকার জীবনে ইংরেজির কোনও জায়গা রইল না। এমনকী, পাঁচতারা হোটেলেও রিসেপশন বলুন কি অভিজাত রেস্তোরাঁ, কোনও প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অপেক্ষা করতে হবে, ম্যানেজার গোত্রের কেউ কিংবা হাতে গোনা দু-তিনজন ইংরেজি জানা কর্মীকে ডেকে আনার পর পাবেন জবাব।

তবে এসব ভুলিয়ে দেয় বর্মীদের হাসিমুখ আর আন্তরিক ব্যবহার। আমাদের দেশে অনেক হোটেলে স্বাগত জানানো হয় গলায় মালা আর কপালে টিকা পরিয়ে। পাহাড়ের হোম স্টেতে পরানো হয় খাদা, মানে উত্তরীয়। ইয়াঙ্গনে দেখলাম লবিতে একটা টেবিলে রাখা আছে চন্দনকাঠের থেকে মোটা একটুকরো কাঠ, পাথরের পাটা আর একটা পিতলের বাটিতে জল। ইংরেজিতে লেখা আছে, ‘ইচ্ছে করলে ট্রাই করতে পারো মায়ানমারের দুহাজার বছরের পুরনো বিউটি ট্রিকস থানাখা।’ পাশে রাখা লিফলেট পড়ে জানলাম, থানাখা গাছ থেকে পাওয়া কাঠের টুকরো চন্দনের মতোই জল দিয়ে পাটায় ঘষে সেই মিশ্রণ গালে, নাকে আর গলায় লাগালে ত্বক উজ্জ্বল হয়, সানস্ক্রিনের কাজও করে। রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, অফিসে সর্বত্র মায়ানমারের মেয়েদের দু-গালে থানাখা লাগানো দেখেছি।

আন সান সু চি

শরৎচন্দ্র ছাড়াও আর যাঁর টানে মায়ানমার ‘ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে’, তাঁর নাম আন সান সু চি। গণতন্ত্রের মশাল হাতে যাঁর প্রকাশ্যে পথ চলা বন্ধ হয়েছে ২০২১ সালে মায়ানমারের সামরিক শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক নিদানে। সেই ফেব্রুয়ারিতেই গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিল সেনাবাহিনী। ‘দুর্নীতির দায়ে’ তেত্রিশ বছরের জেল হল নোবেলজয়ী রাজনীতিকের। বার্মিজদের প্রিয় ‘আন্ট’ (আদরের এই নামেই তাঁকে ডাকে দেশের লোক) এখন ঠিক কোথায়, সে প্রশ্নের জবাব মিলবে না। শোনা যায়, রাজধানী নেপিডোর জেল থেকে তাঁকে বের করে নিয়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে কোনও সেনাকর্তার বাড়ির একটা অংশে। প্রবল গরমে নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সু চি, তাই এই ‘মানবিক’ ব্যবস্থা। মিলিটারি জুন্টার মানবিকতা নিয়ে অবশ্য শুধু মায়ানমারের নয়, সন্দেহ আছে গোটা পৃথিবীর গণতন্ত্রকামী মানুষের। আরও অনেকের মতো আমারও মনের দেওয়ালে সাঁটা আছে মাথার একপাশে ফুল গোঁজা, প্রখর দৃষ্টির শীর্ণ মুখখানি, যেন সদ্য বিসর্জন দেওয়া প্রতিমা।

‘সবাই যদি সু চিকে এত ভালবাসেন আপনারা, তাহলে আন্দোলন, প্রতিবাদ হয় না কেন? কেনই বা বছরের পর বছর সামরিক বুটের নিচে মাথা নিচু করে থাকছেন আপনারা?’ আমার গরম প্রশ্নের জবাবে নেহাতই নরম জবাব দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক। ‘মুখ খুললেই প্রাণে মেরে দেবে।’ পাশ থেকে এক তরুণ যোগ করলেন, ‘এই যে ইয়াঙ্গনে এসেছেন, কিছু টের পাচ্ছেন? রোজ যে গৃহযুদ্ধে মৃত্যুর খবর দেখেন মিডিয়াতে, সেসব হয় প্রত্যন্ত এলাকায়। আপাতদৃষ্টিতে দেখুন, স্কুল-কলেজ, অফিস-কাছারি, ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল, শপিং মল, সব ঠিকঠাক চলছে। বলতে পারেন, সমৃদ্ধির চিহ্ন দেখছি না। সেকথা ঠিক, দেশটা এগচ্ছে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভাবছে, সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। খেয়েপরে তো বেঁচে আছি। এখন অপেক্ষা, ডিসেম্বরে নির্বাচন ঘোষণা হয়েছে। যদি কিছু বদলায়।’ বদলাবে যে না, সেকথাও জানে আমজনতা। মায়ানমারে বিদেশি ফান্ড আসা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন। তাই আন্তর্জাতিক চাপে নাম-কা-ওয়াস্তে ভোট হয়তো হবে, ক্ষমতায় বসবে সেনাদের পছন্দের লোকেরাই। এর ওপর আছে বাংলাদেশ সীমান্তে পুরনো রোহিঙ্গা সমস্যা। যার কিছুটা আঁচ প্রতিবেশী ভারতকেও পোহাতে হয়। এই যে ‘ডু নট ট্রাভেল’ সতর্কবাণীর বোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে গুগল, মায়ানমার ট্যুরের ইচ্ছে প্রকাশ করলেই যা ভেসে ওঠে স্ক্রিনে, এর থেকে মুক্তি পেতে কি ইচ্ছে করে না এদেশের?

শোয়েদাগন প্যাগোডা

ইংরেজি জানা গ্র্যাব (উবেরের বার্মিজ সংস্করণ) ড্রাইভার পেয়ে বর্তে গেলাম। যাব শোয়েদাগন প্যাগোডা দেখতে। এখানকার লোকেরা দাবি করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর প্রাচীন বৌদ্ধ প্যাগোডা এটি, আমি কিন্তু প্রমাণ খুঁজিনি। আসলে খুঁজতে চাইনি। এমনই বিশাল আর চোখধাঁধানো সেই প্যাগোডা যে আপনার মনে প্রশ্ন আসবেই না, প্রতিযোগিতার দৌড়ে এর র‍্যাঙ্ক কত? মোট ২২,০০০ সলিড সোনার বার দিয়ে তৈরি এর দু’টি স্তূপা (ভেবে দেখবেন, অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরের ৭৫০ কেজি সোনা এর কাছে কিছুই না)। আর আড়াই হাজার বছর কোনও ধর্মস্থানকে প্রাচীনত্বের মর্যাদা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কি না, সে-বিষয়েও আমি নিশ্চিত নই।

লোককথা বলে, দুই ব্যবসায়ী ভাই তাপুস্যা আর ভল্লিকা গেছিলেন গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করতে। উপহার হিসেবে নিয়ে গেছিলেন মধুর তৈরি মিষ্টি। বুদ্ধ খুশি হয়ে নিজের আটটি চুল দিয়েছিলেন। বর্মায় ফিরে সেই পবিত্র চুল তাঁরা দিয়েছিলেন রাজাকে। রাজা এর সঙ্গে বুদ্ধের পূর্ববর্তী তিন অবতারের স্মারক যোগ করে গড়ে তুললেন শোয়েদাগন। আসলে একটা নিচু টিলার ওপর এই প্যাগোডা। কিন্তু সেটা বুঝতে পারবেন না। রাস্তা থেকে সোজা সিঁড়ি উঠে গেছে। লিফটও আছে অনাদিকে। একটা নিয়ম আছে ইয়াঙ্গনে, এই প্যাগোডার থেকে উঁচু কোনও বাড়ি তৈরি হতে পারবে না শহরে। সব বাড়ির উচ্চতা বাঁধা ১২৭ মিটারের নিচে। ঘণ্টাখানেকের বেশিই লাগবে গোটা চত্বর ঘুরতে। ভেতরে মিউজিয়ামও আছে। চমকিত হবেন দেখে, বুদ্ধের কত অবতার আছেন, কত রূপে তাঁদের মূর্তি গড়েছে পৃথিবীর নানা দেশের ভক্তরা। আর বুদ্ধের আশপাশে যাঁরা বিরাজমান, তাঁদের নামই জানি না আমরা। বুদ্ধের ধ্যানস্থ আর শায়িত, এই দুটো রূপ আমাদের চেনা। অন্য বৌদ্ধ মন্দিরেও দেখেছি, সোনালি রংটি এদের বড় প্রিয়। সব জায়গায় যে শোয়েদাগনের মতো সোনা আর মণিরত্নর ছড়াছড়ি থাকবে— এমনটা ভাবা যায় না। কিন্তু সোনালি রঙের পোঁচ থাকতেই হবে। ভাবছিলাম, এই একটা গরিব দেশে যে পরিমাণ চুনি (রুবি) পাওয়া যায়, তাতেই তো এদের অবস্থা ফেরার কথা! দুপুরেই অফিসপাড়ায় স্টক এক্সচেঞ্জের মতো একটা জায়গায় অনেক ব্রোকারের ভিড় দেখে কৌতূহল হয়েছিল। জানা গেল, এখানে রোজ রুবি ব্রোকিং হয়।

রুবি ব্রোকিং

প্যাগোডায় খালি পায়ে ঘুরতে ভারি ভাল লাগছিল। বৃষ্টিতে পিছল হওয়া আটকাতে পাথরের অনেকটাই রাবার ম্যাট দিয়ে মোড়া, বাকিটা খালি। মন্দিরগুলোর সামনে ভক্তরা হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা করছেন। কলেজের ছেলেমেয়েরাও নিচু স্বরে মন্ত্র পড়ছে মোবাইল দেখে। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। বিভিন্ন কোণে সপ্তাহের বারগুলোর নাম দিয়ে লেখা আছে সানডে কর্নার, মানডে কর্নার ইত্যাদি। সেখানে রাখা বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করান সেই দিনের জাতকরা, তাতে মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস।

শেষ বিকেলের আলোয় ঝলমলে প্যাগোডার মুগ্ধতা কাটিয়ে বেরতে বেরতে সন্ধে নেমে গেল। আমি আর আমার অবাঙালি সহকর্মী ঠিক করলাম, খিদে পেয়েছে যখন, স্ট্রিট ফুড এক্সপেরিমেন্টটা এবার সেরে ফেলা যাক। কিছুটা হেঁটে গিয়ে দেখলাম ছোটখাট বাজারের মতো একটা জায়গা। সেখানে বেশ কয়েকটা খাবারের স্টলে দারুণভাবে সাজানো মাছ-মাংসের নানা পদ। খাওয়ার থেকেও বেশি ছবি তুলতে ইচ্ছে হবে। নারকেল খুব ব্যবহার করে এরা আর তাজা সবজি থাকে সবকিছুতেই। জায়গাটা আধো অন্ধকার, কেমন যেন আঁশটে গন্ধ। শুঁটকির মনে হয়। পরিবেশটা দেখে খাওয়ার হচ্ছে খুব একটা হল না। শুধু একবাটি করে খাও সোয়ে (নারকেল দেওয়া নুডলস স্যুপ) খেলাম আর ছবি তুললাম।

ইয়াঙ্গনের স্ট্রিট ফুড

এই রাস্তাটায় এসে ভুল করেছি, বুঝলাম একটু পরেই। যদিও জানি, বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ব, তবু যত এগচ্ছি তত অন্ধকার বাড়ছে। দোকানপাট শেষ হয়ে যেতে দেখলাম একদম নির্জন, ল্যাম্পপোস্টগুলোর একটাতেও আলো জ্বলছে না। মনে পড়ল, ইয়াঙ্গনে আমাদের কাজের পার্টনার শীতল কুমার, ওড়িশার লোক, তবে অনেক বছর প্রবাসী, সাবধান করেছিলেন, সন্ধের পর বিদেশিদের রাস্তায় না থাকাই ভাল। ছিনতাই হয়, বিশেষ করে পাসপোর্ট, সাবধান। আমরা দু-জন জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলাম।

এর মধ্যে ঝুপ করে সবটাই অন্ধকার হয়ে গেল, পাওয়ার কাট। মিনিটদুয়েক অবশ্য, তারপরেই আলো এল আর দেখলাম একটু দূরে একটা ছোট্ট গুমটি দোকান। ওখানে আলোয় দাঁড়িয়ে গ্র্যাব খুঁজতে হবে। তেষ্টা পেয়েছে, দোকানিকে ইশারায় দেখালাম কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল। খুব বৃদ্ধ মানুষ, একটু ঝুঁকে পড়েছেন, কিন্তু মুখে হাসিটি লেগে আছে। এদিকে গ্র্যাব পাওয়াই যাচ্ছে না। রাত বাড়ছে, টেনশনও বাড়ছে। কিন্তু এঁকে কীভাবে বোঝাব, আমাদের সমস্যাটা কী? হোটেলের কার্ড বের করে ইশারায় বোঝালাম, ওখানে ফেরার জন্য কিছু চাই। উনি আমাদের থেকেও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। দোকান ছেড়ে রাস্তায় নেমে অটোগুলোকে হাত দেখাতে লাগলেন। সেগুলোও দেখি থামে না। শেষমেষ একটা ট্যাক্সি দাঁড়াল। এবং যেতে রাজিও হল। এবার ভাগ্য আরও প্রসন্ন। শুধু ইংরেজি না, এই যুবকটি হিন্দিও জানেন। বেশ কিছুদিন বিদেশি এনজিওর গাড়ি চালিয়ে ইংরেজি শিখেছেন আর হিন্দি, সৌজন্যে কিং খান।

এই শাহরুখ খান অদৃশ্য থেকেও যে রণে-বনে-জঙ্গলে, থুড়ি বিদেশে কত বড় সহায় হতে পারেন, সে গল্প পরে কখনও বলব।