বন্দরের অন্দর
ঠিক দুক্কুরবেলা ভূতে মারে ঢেলা! গরমের দুপুরে ঘুমন্ত মায়ের পাশ থেকে পা টিপে-টিপে উঠে যাওয়ার সেরা দাওয়াই। আমরা সব্বাই ছোটবেলায় কখনও-না-কখনও এই ভূতের ভয়ে বাধ্য হয়ে ছাদ, চিলেকোঠা, বারান্দার হাতছানি উপেক্ষা করে সারাটা দুপুর বিছানা আঁকড়ে পড়ে থেকেছি। আর বড় হয়ে যখন বুঝেছি, ভূতেদের আসলে কোনও ভবিষ্যৎ নেই, তখন তো খেলা ভাঙার খেলা।
সে যাই হোক, তা-বলে ভর দুপুরবেলা বাল্টিমোরের রাজপথে এমন শিরদাঁড়া বেয়ে বরফজল বয়ে যাবে! প্রকাশ্য দিবালোকে তেনারা আসেন না ঠিকই, কিন্তু সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ তো আসে। আমরা নেহাত ছাপোষা বাঙালি, কাজের তাগিদে গেছি আমেরিকার ঐতিহাসিক সমুদ্র-বন্দর বাল্টিমোরে। সেখানে কিনা একটু হলে হাজতবাস হচ্ছিল, তাও আবার ড্রাগ-কেসে!
একটু আগেই লাঞ্চ সেরে বেরিয়েছি এক বিখ্যাত ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ থেকে। সঙ্গে মেয়ে আর সহকর্মী সুরজিৎ। ও এর আগে বাল্টিমোরে এসেছে এবং এই রেস্তোরাঁর খাবার তার এতই ভাল লেগেছে যে, আমাদের খাওয়াতে চেয়েছিল। খোশমেজাজে ফুটপাথ ধরে হাঁটছি, রাস্তার ওপারেই কনভেনশন সেন্টারে চলছে বঙ্গ সম্মেলন, যার পোশাকি নাম নর্থ আমেরিকা বেঙ্গলি কনফারেন্স। আমাদের কাজ সেখানেই। হঠাৎ আমার মেয়ে নীচু হয়ে কিছু কুড়োতে গেল, আর মুহূর্তে তাকে এক হ্যাঁচকা টানে সোজা করে দিল সুরজিৎ। আমরা তো হতভম্ব। তাকিয়ে দেখলাম, ফুটপাতে ছড়িয়ে পড়ে আছে কিছু সাদা ওষুধ। এর মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে আলো চমকিয়ে হাজির হয়ে গেছে পুলিশের প্যাট্রল গাড়ি। দু’জন অফিসার নেমে এসে বললেন, হাতের পাতা উল্টে দেখাও। ব্যাগের চেন খুলিয়ে উঁকিও মারলেন। আমি বা আমার মেয়ে তখনও বুঝছি না, কী ঘটছে। আমরা কোনও অপরাধ তো করিনি। তাহলে কি ভুল করে আমাদের দিকে তেড়ে এসেছে? দেখলাম, একজন জুনিয়র পুলিশ দস্তানা পরা হাত দিয়ে ওষুধগুলো তুলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে নিয়ে গেল। আর অফিসার আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বি কশাস। এনজয় ইওর স্টে।’
লটারি পেয়ে একাই বাংলাদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের এক গ্রাম্য বধূ! পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪২…
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম; তবে সত্যি বলছি, তখনও ভ্যাবাচাকা খেয়েই রয়েছি। পুলিশেরা গাড়িতে উঠে যেতে মুখ খুলল সুরজিৎ। আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী ভয়ঙ্কর ফাঁড়া গেল জানিস? ওগুলো ড্রাগ। একটু আগে কোনও পেডলার পুলিশের তাড়া খেয়ে পালানোর সময়ে ফেলে দিয়েছে। তুই যদি একবার তুলে ফেলতিস তো সর্বনাশ। দেখলি তো কেমন চোখের পলকে পুলিশ চলে এল। তোর হাতে ড্রাগ পেলে কোনও কথা শুনত না, সোজা জেলে। তার ওপর আবার আমরা বাদামি চামড়ার বিদেশি। জমিয়ে কেস দিত।’ এবার সত্যি হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমার মেয়ে বিস্ময়ের ঘোরেই বলল, ‘আমি তো ভেবেছিলাম কারও ব্যাগ থেকে ক্যালপল পড়ে গেছে। বঙ্গ সম্মেলনে কত বয়স্ক মানুষ আছেন। যে-কটা উদ্ধার করতে পারি, নিয়ে গিয়ে দেব।’
আটলান্টিক মহাসাগরের ইনল্যান্ড পোর্ট বাল্টিমোর ছবির মতো সুন্দর বললেও কম বলা হয়। এর ইনার হারবারের টানে ছুটে আসে দেশবিদেশের মানুষ। এখনও সেসব কিছুই দেখা হয়নি। প্রথম দুপুরেই পুলিশের শক। মোটামুটি সামলে উঠে আমি আর আমার মেয়ে হাঁটা লাগালাম ফোনের দোকান খুঁজতে। একটা লোকাল সিমকার্ড খুব দরকার। মিনিট পাঁচেক পরই পেলাম রাস্তার মোড়ে বড় দোকান। বাইরে ব্র্যান্ডেড সব মোবাইলের ছবি দিয়ে সাজানো। ভেতরে ঢুকে মন খুশ হয়ে গেল, দ্যাশের লোক পাইসি। দোকান-মালিক গুজরাতি, তবে অনেকদিনের প্রবাসী। ওঁর বাবা দেশ ছেড়ে এসে ব্যাবসা শুরু করেছিলেন বাল্টিমোরে। হিন্দিতে গল্প শুরু হল। একটু পরে একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না। ‘আচ্ছা, আপনার দোকানের ভেতরেও কেন শুধুই নানা লেটেস্ট মডেলের মোবাইল, ট্যাব, গ্যাজেটের ছবি? একটাও ডেমো মডেল রাখা নেই কেন? লোকে তো নেড়েচেড়ে দেখে তবেই দামি মোবাইল কেনে।’ জবাব শুনে আমি আরও একবার শক্ড। ‘একবার নয় ম্যাডাম, চার চারবার আমার দোকানে ডাকাতি হয়েছে। অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই মাল সব গোডাউনে রেখেছি। ছবি দেখে পছন্দ করলে সেই মডেলটা এনে দিই।’ নতুন সিম ভরে পথেই আমার মেয়ে গুগল সার্চ করে জানাল, অপরাধপ্রবণ শহর হিসেবে আমেরিকায় বাল্টিমোরের স্থান তৃতীয়। আর ড্রাগের খোলাবাজার, বিশেষ করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক নেওয়ার অভ্যেস এই শহরের নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তবে নয়ের দশকে যেমন প্রতি আটজনে একজন মাদকাসক্ত পাওয়া যেত বাল্টিমোরে, এখন অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হয়েছে।

ইনার হারবারে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। আসলে বাল্টিমোর চোখের, মনের, পেটের— সবরকম খিদে মেটানোর এক আশ্চর্য প্যালেট। নীল আকাশ, তার চেয়েও নীল জল আর সেখানে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে ছোট, বড় কত জাহাজ। ইনার হারবারে রণতরীতে উঠে ঘুরে দেখার ব্যবস্থাও আছে। সাদা পালতোলা ইয়ট ভেসে বেড়াচ্ছে, চারপাশে হাসিখুশি ট্যুরিস্টের মেলা। ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া’, এই গান এখানে কেই-বা জানে, তার বদলে কোনও জাহাজের ভেতর থেকে ভেসে আসছে জ্যাজ, এবং কী আশ্চর্য, বাজনা ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে খুব সুরেলা গলার গান, ঠিক সেই পুরনো দিনের মতো।
সামনে ছড়ানো যে নীল, তা কিন্তু সমুদ্রের নয়, নদীর, আর সেই নদী গিয়ে পড়েছে চেসাপিক উপসাগরে, যার সঙ্গে যোগ আটলান্টিকের। এই যে তুতো সম্পর্ক, তাতে অবশ্য কোনও কমতি পড়ে না বাল্টিমোরের সৌন্দর্যের। উতল নোনা হাওয়ায় স্পষ্ট শোনা যায় সাগরের ডাক। ‘আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে। আমাকেও সাথে নিও/ নেবে তো আমায়, বলো নেবে তো আমায়’— মৌসুমী ভৌমিক গেয়ে ওঠেন ভেতর থেকে।
কালো মানুষদের জায়গা এই বাল্টিমোর। এর ইতিহাসের পরতে পরতে জড়ানো ক্রীতদাসের শেকল ছেঁড়ার গান। এখানকার মোম মিউজিয়ামে (মাদাম তুসোর নয়) একশোরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মূর্তি আছে যাঁরা মানবাধিকারের দাবিতে, নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য লড়েছিলেন। আছে একদা ক্রীতদাসদের আমেরিকায় বয়ে আনা জাহাজও। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হল আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড কালো মানুষদের একসময়ের লাইফলাইন। এই গোপন পথে জল-স্থলের যে-কোনও যানবাহন যুক্ত থাকত। নদী, বন্দর, আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে সে এক প্রাণপণ উড়ান। মুক্তির খোঁজে মরিয়া সফর। যেসব আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাসেরা সাহস করে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখত, তারা পালাত এইসব পথ ধরে আমেরিকার সেইসব শহরে যেখানে দাসপ্রথা নেই অথবা আরও দূরে কানাডা বা মেক্সিকোতে।

আসলে বাল্টিমোর বরাবরই স্বাধীনতার কথা বলে। আমেরিকার জাতীয় সংগীতের জন্মভূমিও এই শহর। ১৮১২ সালে বাল্টিমোর যুদ্ধের সময়ে যখন ব্রিটিশ নৌবাহিনী বোমা ফেলেছিল এখানকার দুর্গে, তখনও পতপত করে উড়ছিল জাতীয় পতাকা। পনেরোটি স্টার আর পনেরোটি স্ট্রাইপ সমৃদ্ধ সেই পতাকার সগর্বে ওড়ার দৃশ্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবিতা লিখেছিলেন আইনজীবী ফ্রান্সিস স্কট কি। তাঁর সেই কবিতায় সুর দিয়ে পরে তৈরি হয় আমেরিকার জাতীয় সংগীত ‘দ্য স্টার স্প্যাঙ্গন্ড ব্যানার’ ‘ও সে, ক্যান ইউ সি, বাই দ্য ডনস আর্লি লাইট/ হোয়াট সো প্রাউডলি উই হেইন্ড অ্যাট দ্য টোয়াইলাটস লাস্ট গ্লিমিং?’
কোভিড যুগের কথা, সেই অভিশপ্ত ২০২০ থেকে ২০২২ ভুলে গেছিলেন তো? আমরা সবাই ভুলে যেতেই চাই। কিন্তু সেই ঘোর দুঃসময়ে যারা অতন্দ্র প্রহরী হয়ে আমাদের বোধবুদ্ধিকে জাগিয়ে রেখেছিল, তাদের কথা ভোলাটা নিশ্চয়ই অন্যায়। আমার ঠিক এই কথাটা মনে এল জন হপকিন্স-এর সামনে দাঁড়িয়ে। বাল্টিমোরের গর্ব আমেরিকার প্রথম রিসার্চ ইউনিভার্সিটি, ১৮৭৬ সালে যার যাত্রা শুরু। এর স্কুল অফ মেডিসিন ও হাসপাতাল বিশ্বসেরা, মানুষের জীবনযাপনকে নিরাপদ করে তোলা যাদের ব্রত। এবার মনে পড়েছে নিশ্চয়ই, যখন মোবাইল খুলে দিনে বেশ কয়েকবার চেক করতেন সারা পৃথিবীর, আপনার দেশের কোভিড চিত্র, মৃতের সংখ্যা, নতুন করোনা ভ্যারিয়ান্ট, ভাইরাস আক্রমণের দৈনন্দিন হিসেব, সেসব কে যোগাত? এই জন হপকিন্সের নামই ভেসে উঠত তথ্যসূত্রের জায়গায়। কোভিড নাইন্টিন ড্যাশবোর্ড তৈরি করেছিল, জন হপকিন্স করোনা ভাইরাস রিসোর্স সেন্টার। তারাই দিত অতিমারীর রিয়েল টাইম ডেটা।
আর-একটা জিনিস নিয়ে খুব গর্বিত বাল্টিমোর। ব্লু ক্র্যাব। নীল কাঁকড়া যদিও আমেরিকার পূর্ব উপকূলের আরও কিছু জায়গাতেও পাওয়া যায়, কিন্তু মেরিল্যান্ড ব্লু ক্র্যাব নামেই বিখ্যাত। দাঁড়াগুলো নীল রঙের হওয়ার কারণেই এরকম নাম, তবে রান্নার পর নীল রংটা লালচে বা কমলা হয়ে যায়। সেই নীল কাঁকড়ার স্বর্গীয় স্বাদের খোঁজে আমাদের মধ্যরাতের অভিযানে ঘটনার ঘনঘটা কম ছিল না। কাজের চাপে রাত বারোটার আগে বেরনো যায়নি। কনভেনশন সেন্টারের বাইরে অন্ধকার রাস্তা আর আগের দিনের অভিজ্ঞতা বলছিল, না গেলেই কি নয়? কিন্তু বেশ একটা দল পাকিয়ে ওঠার পর মনে বল এল। চল, সবাই মিলে রুটমার্চ করে যাওয়া যাক লেক্সিংটন মার্কেটের দিকে।


কে যেন আবার আগেই গুগল ঘেঁটে বার করেছিল ফেডলি’স রেস্তরার নাম। শদেড়েক বছরের পুরনো এই রেস্তরা নাকি আমেরিকার সেরা ২০ টি রেস্তরার একটি। বাল্টিমোরে এসে সেখানকার ক্র্যাব কেক না খেয়ে ফেরত গেলে নাকি অতৃপ্ত আত্মা হয়ে থেকে যেতে হবে এই পাপের দুনিয়ায়। অতএব ভয়ে অথবা ভক্তিতে এই মধ্যরাতের রেঁদেভ্যু। খুব কম নয় দূরত্ব, কিন্তু যেতে হবে হেঁটে কারণ এত রাতে এখানে উবের পাওয়া মুশকিল। তুমুল উৎসাহে হাঁটা শুরু এবং আমার সপাটে আছাড় খাওয়াতেও যাতে একটুও ভাঁটা পড়েনি। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় একটা জায়গা এমন পিছল ছিল যে, পতন অনিবার্য। নরম মাটিতে তেমন ব্যথা লাগেনি ঠিকই, কিন্তু জামার একদিকটা কাদা মাখামাখি হয়ে গেল। কুছ পরোয়া নেই বলে সেই অবস্থাতেই হাঁটা লাগালাম। পাছে বন্ধ হয়ে যায় ফেডলি’স। সত্যি বলছি, ক্র্যাব কেক না খেলে একটা বড় অভিজ্ঞতা মিস হয়ে যেত। কী যে আসামান্য সেই নরম তুলতুলে মাংস ডিম, মেয়োনিজ, আর নানারকম সসের সঙ্গে মাখামাখি ঠিকই, কিন্তু বাড়াবাড়ি বারণ। অথেন্টিক মেরিল্যান্ড কেকের ‘নো ফিলার রুল’ হল সেটুকুই উপকরণ মেশানো যা ক্র্যাব মিটকে ধরে রাখবে ভাজা বা বেক করার সময়ে। এই কাঁকড়ারা নাকি দীর্ঘ শীতঘুমে যায়, যে-সময়ে তাদের শরীরে মাংস জমে। তাই তাদের এত স্বাদ। নীল কাঁকড়াদের নিয়ে অনেক গানও বাঁধা হয়েছে। একটা বাজছিল রেস্তরায় ‘ডোন্ট ইউ ট্রাই টু গ্র্যাব মি, অর আই উইল পিনচ ইউ উইথ মাই ক্ল।’ হায় রে, তার আগেই সে এসে গেছে প্লেটের গাঢ় বেদনায়।




