উল্টো দূরবিন : পর্ব ৬

ভাড়াটে স্মৃতি

আমাদের পাড়ার কাকেদের পটি কখনও-কখনও লালচে হয়ে যেত। কারণটা ভারি মজার। ওই যে বলেছিলাম, ডেকস্ট্রিনের গুঁড়ো, যেটা মূলত আলুর গুঁড়ো, ওটা কাকের প্রিয় খাদ্য। আর লাল রংটা বিষাক্ত নয়। যে-কারণে ওই মণ্ড ছাদে শুকোতে দিলে, কাকেরা ঠুকরে খেত। দুটো কাকতাড়ুয়া রাখা থাকত যদিও, কাকেরা কেয়ার করত না। নীল, কালো বা সবুজ রঙ থাকলে কাকেরা খেত না। ওই রঙগুলো সম্ভত বিষাক্ত ছিল। লালরঙটা তো বিষাক্ত ছিল না, তাই ওই কালির বড়ি ঠোঁট রাঙাতে ব্যবহার করত মণিপুর, বার্মা অঞ্চলের গরিব মেয়েরা, যাঁরা লিপসস্টিক কিনতে পারত না। লালবড়ি জলে চুবিয়ে ঠোঁটে ঘষত। লাল রঙের ঠোঁট রাঙানোর বড়িগুলি ছিল সুগন্ধি। গোলাপ, যুঁই, এসবের সুগন্ধি সেন্ট মেশানো হত রঙের সঙ্গে।

আমার দাদু নস্যি নিতেন দাদুর একটু সেন্ট চেয়ে নিতেন রাঙাদার কাছে। কারখানার অফিসঘরে একটা আলমারির মধ্যে সেন্টের বোতল রাখা থাকত। নিশ্চয় বেশি দামি। একটা ছোট্ট শিশিতে রাঙাদা সেন্ট ঢেলে দিয়ে আসত।
দাদু খবর-কাগজ পেতে তার উপর নস্যি ঢেলে, তাতে দু-তিন ফোঁটা সেন্ট মিশিয়ে দিয়ে হ্যান্দেল কলম দিয়ে ঘষে-ঘষে সুগন্ধ যুক্ত করতেন নস্যিতে। সে-সময়ে একটা সুগন্ধি নস্যি পাওয়া যেত। নাম ছিল, ‘পরিমল নস্য’ এমনি নস্যির তুলনায় দাম যথেষ্ট বেশি, দাদু খরচ বাঁচাতেন।

বাবার পকেটের চক দিয়ে লিখতাম মায়ের কষ্টকথা! পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৫…

কালির কারখানার আরও কত স্মৃতি! যখন কালির ঢেলাগুলো মেশিনে ফেলে পাউডার করা হত, কখনও সেই মিহি গুঁড়ো বাতাসে মিশত। সাদা জামা, শাড়ি বা ধুতি শুকতে দিলে, রঙের ছোপ লেগে যেত। এটা খুব স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়া হত।

আমাদের পরিবার না-হয় আশ্রিত পরিবার বলা যায়, পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আসা দাদুকে সপরিবার আশ্রয় দিয়েছিলেন আমার মেজপিসেমশাই, যাঁর এই কালির কারখানা। কিন্তু অন্য ভাড়াটেরাও তো ছিল ও বাড়িতে, কিন্তু কালির গুঁড়ো ওড়া নিয়ে কিছু বলতে শুনিনি।

ওই বাড়িটা বহু পুরনো। কতটা পুরনো জানি না। যত বছর ছিলাম, রঙ করা হয়েছে মনে পড়ে না। কখনও প্লাস্টার হয়েছে এমন স্মৃতিও নেই। কিন্তু প্লাস্টার খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে এমন ছবিও নেই। তবে দেওয়ালের চুনকাম খসে গিয়ে নানারকম আকৃতি তৈরি হত দেওয়ালে। কখনও এক পায়ে দাঁড়ানো বক, কখনও উড়ন্ত চিল, কখনও কুমড়োপটাশ। আর ছিল কড়িকাঠ। চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িকাঠ গুনতাম।

বাড়িতে কাঁকড়াবিছে ছিল। উনুনের তলায় কেন জানি না, কাঁকড়াবিছে ঢুকে থাকত। আমার ঠাকুর্মাকে দু’বার আমার মাকে দু’বার কামড়েছে। কামড়েছে মানে ফুটিয়েছে। একটা দরজার পিছনে দুটো ইট খসে যাওয়া ছোট্ট একটা খোপে আমি আমার সম্পত্তি রাখতাম, যেমন রাবারের বল, ব্যাডমিন্টনের ফেদার, গুলির কৌটো এইসব। একবার ওই খোপে হাত ঢোকাতে গিয়ে কাঁকড়াবিছের কামড় খেয়েছি। প্রচণ্ড যন্ত্রণা।

বিছের কামড়ের জন্য নানাবিধ টোটকা প্রচলিত ছিল। যেমন পেঁয়াজের রসের প্রলেপ দেওয়া, হিং আর মধুর প্রলেপ দেওয়া ইত্যাদি। বড়দের কামড়ালে সরষে-পরিমাণ আফিম খাইয়ে দেওয়া হত। তখন আফিমের দোকান ছিল। অনেকে আফিমের নেশা করত। বোধহয় ডাক্তারের সার্টিফিকেট থাকলে আফিম কিনতে পাওয়া যেত। আমার বড় পিসেমশাইয়ের আফিমের নেশা ছিল।

বিভিন্ন ভাড়াটেদের কথা আগে একটু বলেছি ওই বাড়ির। এক মাস্টারমশাইয়ের কথাও বলেছি, যাঁর একটা পা ঠিক ছিল না, খুঁড়িয়ে হাঁটতেন, কিন্তু সাইকেল চালাতেন। আমি ওর সাইকেলের প্যাডেল হাত দিয়ে ঘোরাতাম, সাইকেলের চাকা ঘুরত। খুব ভাল লাগত দেখতে। বেশ ছোটবেলার কথা বলছি। উনি একটা জিনিস দেখাতেন, দুটো কাচের উপর দু’চোখ রেখে দেখতে হত। আর সামনের দিকে একটা ছবি আটকে দিলে ছবিটা অনেক বড় দেখাত। পাহাড়-পর্বত, বাঘ-ভাল্লুক ছাড়াও মানুষের ছবিও দেখা যেত। ততদিনে মেয়েমানুষের শরীর কেন আলাদা জেনে গিয়েছি। মানুষের শরীরের যেসব অংশ জামা-কাপড়ে ঢাকা থাকে সে-সব খোলাই থাকত অনেক ছবিতে। লোকটা আমার ছোট্ট হাতটা টেনে ওর তলপেটে দুইপায়ের ফাঁকে রাখতেন। লোকটা ধুতি পরত। ধুতির ভিতরে আমার হাতটা টেনে নিয়ে যেতেন। আমার হাতে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হত। এরকমও হয়? মুঠিতে ধরেছি। কী গরম!

একদিন ধুতি সরিয়ে দিল। আমি আরও অবাক। ওখানেও চুল হয়? মুখেও চুল হয়, ওগুলো দাড়ি। মেয়েদের মুখে চুল হয় না, বাবা, দাদু, এঁদের বগলে চুল দেখেছি। কিন্তু পেটের তলায় এত চুল হয়? ওর ওই জিনিসটা এমন? নাড়াচাড়া করেছি। ভয়-ভয় করেছে। লোকটা নাড়াতে বলছে। সে-সবও করেছি।

মাঝে-মাঝেই ওই লোকটার ঘরে যেতাম। উনি একা থাকতেন। বাবা বোধহয় কিছু বুঝেছিলেন। বাবা বলেছিলেন, কোনওদিন তুই ওর ঘরে যাবি না। তারপর মনে হয় আমার মেজপিশেমশাই মাস্টারমশাইকে কিছু বলেছিলেন। এবং কিছুদিনের মধ্যেই উনি ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওঁর কাছেই প্রথম মানুষের শরীর বুঝেছিলাম শৈশবেই। বড়দের এবং ছোটদের অঙ্গগত প্রভেদের জ্ঞান হয়েছিল। সাইকেল কীভাবে চলে বুঝেছি। প্যাডেল, চেন ও চাকা। একটা ইকমিক কুকার দেখেছি, যেখানে জ্বলন্ত কাঠকয়লা ঢুকিয়ে, তার উপরে পরপর তিনটে বাটি বসিয়ে দেওয়া হয়। সবক’টা বাটিতে জিনিসপত্র সেদ্ধ হয়ে যায়। আরও পরে সাধারণ জ্ঞানের বইতে যখন পড়েছি ইকমিক কুকারের আবিষ্কর্তার নাম ইন্দুমাধব মল্লিক, তখন ওই মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়েছিল।

বাড়িতে কাঁকড়াবিছে ছিল। উনুনের তলায় কেন জানি না, কাঁকড়াবিছে ঢুকে থাকত। আমার ঠাকুর্মাকে দু’বার আমার মাকে দু’বার কামড়েছে। কামড়েছে মানে ফুটিয়েছে। একটা দরজার পিছনে দুটো ইট খসে যাওয়া ছোট্ট একটা খোপে আমি আমার সম্পত্তি রাখতাম, যেমন রাবারের বল, ব্যাডমিন্টনের ফেদার, গুলির কৌটো এইসব। একবার ওই খোপে হাত ঢোকাতে গিয়ে কাঁকড়াবিছের কামড় খেয়েছি। প্রচণ্ড যন্ত্রণা।

এরপর ওই ঘরে এক নতুন ভাড়াটে আসেন। বাবা-পিসেমশাইরা ডাকতেন মনমোহনবাবু। লিলি বিস্কুট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সে-সময়ে ছোট-ছোট গোল-গোল এক ধরনের বিস্কুট পাওয়া যেত— লিলি বিস্কুট। চার আনায় একঠোঙা ভরতি বিস্কুট পাওয়া যেত। এক আনার লিলি কিনলে দু’জনে চারটে করে পেত। ওঁর এক মেয়ে, এক ছেলে। বাবলুদা আর কুটুদি। বাবলুদা মাঝে-মাঝেই কী যেন চিবোত, জেনেছিলাম, ওটা ‘চুনকাম’। আমাকে একদিন একটা ‘চুনকাম’ উপহার দিল। সাদা মতো দেখতে। বলল, প্রথমে চুষবি, তারপর চিবোবি। চিবিয়েই যাবি। তাই করলাম। এ তো ভারি আশ্চর্য জিনিস, চিবিয়েই চলেছি, অদ্ভুত লাগছে। দাঁতে আটকে যাচ্ছে, বের করে নিচ্ছি জিভ দিয়ে। আবার চিবোচ্ছি। বাবলুদা বলেছিল, এটা চিবুলে দম পাওয়া যায়। বড়-বড় প্লেয়াররা খেলার সময়ে চুনকাম চিবোয়। পরে জেনেছিলাম, এটার নাম চুইংগাম।

আরও কিছু আশ্চর্য খাবার জিনিসের কথা মনে এল। যেমন, ইলেকট্রিক নুন। হজমিওয়ালাদের কাছে থাকত। জিভে লাগালেই কেমন শিরশির করতে উঠত। রঙটা ছিল একটু কালচে। আজও জানি না ওটার কী রহস্য!