নজরদারি : পর্ব ২

সাবধান, দেখছে

হস্টেলের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল, চব্বিশ ঘণ্টা বন্ধুরা ঘিরে থাকে। আর সবচেয়ে বড় বিপদ: চব্বিশ ঘণ্টা শিক্ষকরাও ঘিরে থাকেন। বা শিক্ষকস্থানীয়রা। যে-ছাত্র বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে, তারও হয়তো স্কুল যেতে জঘন্য লাগে— শিক্ষকরা মারেন, বন্ধুরা খেলতে নেয় না, পরীক্ষায় দুর্বোধ্য প্রশ্ন— তবু প্রতিদিন স্কুলটা শেষ হলে ফিরতে-ফিরতে সে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে, যাক, আজকের মতো এই বন্দোবস্তটা থেকে পালানো গেল, বাড়িতেও যতই বকুক-মারুক, তার ওপর সামান্য স্নেহের প্রলেপ থাকবেই, গরিবের টোস্টের মতো। হস্টেলে এই পরিত্রাণটা একদম বাতিল— স্কুল, বাসভবন, খেলার মাঠ, এমনকী, হাসপাতাল— সবই শুধু একই পাঁচিলের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেখানকার লোকগুলোও তো পরস্পরের চেনা। তাই পুরোটাই একটাই বাস্তুতন্ত্র। ভূগোল শিক্ষকের তড়পানির কথাটা ঠিক উপচে পড়বে ওয়ার্ডেনের কানে, আবার বাসভবনের গুরুজনের প্রহারের গল্প বিশদে জানবেন বাংলা টিচার। কখনও এই রোষগুলো পরস্পরকে পুষ্ট করে বাড়িয়েও তুলতে পারে, তুমি রাত্তিরবেলা প্রায়ই লুকিয়ে গল্পের বই পড়ো— এ-অনুযোগ তথ্যভাণ্ডারে থাকলে দুপুরে ক্লাসরুমে থিওরেম হেনে তোমার দিকে লাল চোখে ধেয়ে আসার সম্ভাবনা বেশি। দিন-মাস-বছর স্কুলেই থাকলাম-খেলাম— এই ব্যবস্থার প্রচুর স্বতন্ত্র মজা, চরিত্র গঠনের উপাদানও বিস্তর, কিন্তু শাসনের আশঙ্কাও সাংঘাতিক। কারণ ‘ছুটি’ জিনিসটা পারতপক্ষে নেই। রাত্তির দশটা পনেরোতেও বুক ধড়াসধড়াস করে, এই হয়তো কানে টান পড়ল, বা ‘রোববার বাবা এলে দেখা করতে বলিস।’ তাই হোস্টেলের নজরদারি (বা নজরদারির ভয়) সারাক্ষণের।

আমি যে হস্টেলে থাকতাম, প্রতিটি টানা বারান্দার একদম প্রান্তের ঘরটায় থাকতেন একজন শিক্ষক বা গুরুস্থানীয় কেউ। তাঁর কাজ: সেই বারান্দায় যে চারটে ঘর, তার খানবারো ছেলের ওপর নজর রাখা, শাস্তি দেওয়া, আর খুব বেয়াড়াপনা দেখলে ওয়ার্ডেনের কাছে নালিশ করা। এই শেষ ঘরের বাসিন্দা যদি হতেন ফুরফুরে ছোকরা গোছের শিক্ষক, যিনি হিন্দি সিনেমা দেখেন, শিস দিতে-দিতে সিঁড়ি ওঠার সময় একটা ধাপ ডিঙিয়ে যান, আয়না পেলেই চুল ফাঁপিয়ে নেন দ্রুত, তাহলে ছাত্রদের স্বস্তি, কারণ এঁরা সাধারণত নজরদারি নয়, নিজেদের জীবন নিয়েই মশগুল থাকতেন। হয়তো ঘরে বসে গিটার শিখছেন কিংবা বিয়ের ফ্যান্টাসি ভাবছেন। কিন্তু যদি তিনি হতেন সেডিস্ট, ছাত্রদের হাতের কাছে পেলেই কশকশিয়ে কান মুলে দিতে নিশপিশ, তাহলে ঝামেলা। সেই লোকটি অনুক্ষণ তক্কে-তক্কে, আজ কাকে কীভাবে শাস্তির আওতায় এনে ফেলা যাবে। সেক্ষেত্রে নজরদারি মহা-উৎসুক ও সক্রিয়। এবং গুচ্ছের ছোট ছেলে একসঙ্গে থাকলে ভুলচুক না-হয়ে যাবে কোথায়? তাই অবিলম্বে ছক্কা। তোর পায়ে লেগে ডাস্টবিন উল্টোল কেন, তোর মশারি টাঙাতে দেরি কেন, তুই ওর কানে কাগজ পেঁচিয়ে সুড়সুড়ি দিলি কেন, পড়ার সময় কথা বললি কেন। তিনি হয়তো হনহন হাঁটেন, শনশন চোখ চালান, টেবিলফ্যানের মতো তাঁর মুন্ডু নাগাড়-ঘুরন, চব্বিশ ঘণ্টাই তাঁর অ্যান্টেনার তলায় লাল আলো বিপবিপ জ্বলু-নিভু। ছেলেপুলেরা তাঁর নাম শুনলেই তটস্থ, রাত্তিরে খেতে বসে তিনি মিনি-বিচারসভা বসান এবং তারিয়ে-তারিয়ে ন্যায়ের ইস্ক্রুপ পেঁচিয়ে ঢোকান তাদের জীবনে, আর সেই টর্চারাধিকারের সুস্বাদ মিশে যায় তাঁর রুটি ও মুগডালে।

আরও পড়ুন : “‘বিগ বস’-এ গিয়ে আমার ঘুম পেত!” শিলাজিৎ-এর সাক্ষাৎকার…

স্কুলের বহু শিক্ষক ছিলেন, যাঁদের কাছে ছাত্রদের প্রকাণ্ড প্রশ্রয়, যাঁরা টেবিলের পিছনে দাঁড়িয়ে শুধু সিলেবাসের আটটা চ্যাপটার পড়াননি, জীবনদৃষ্টিও গড়েছেন। আর বাসভবনের শাসকশ্রেণির কোনও সদস্যের মধ্যে কি ছিল না বিস্তর প্রসন্নতা? কেউ-ই কি পিঠ চাপড়ে হেসে ওঠেননি? অবশ্যই। কিন্তু মূলত ছিল একটা অ-ক্ষমার পরিবেশ। যেখানে স্পষ্ট গণিত মেনে, দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে, এবং বহু সময়েই লঘুপাপে গুরু-থাপ্পড়। আশ্চর্য, বছর শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই হোস্টেলের গুরুজনদের হাতে একটা অদৃশ্য লিস্টি গজাত: ছাত্রদের মধ্যে কারা সু-বালক, কারা নিতান্ত ব্যাদড়া। এই দ্বিতীয় দলটায় একবার নাম লিপিবদ্ধ হয়ে গেলে, মহা-ইরেজার দিয়েও ঘষটে তোলা শক্ত। ভালদের গ্রুপ থেকে খারাপে পতন— এই জিনিস মাঝেমধ্যে ঘটলেও, খারাপ থেকে ভালয় প্রোমোশন প্রায় অসম্ভব। দাগিদের প্রতি নজরদারিটা হত বিশেষ ও বাড়তি। এমনকী, অন্য লোকের দোষেও তাদের শাস্তি হয়ে যেত মাঝে-মাঝে। এই ছেলেরা ভয়ে-ভয়ে থাকত, এবং আতঙ্ক থেকেই হয়তো ঝঞ্ঝাটও পয়দা হত অধিক। এরা প্রতি মুহূর্তে বহন করত গরম পুঁটলি, যা বলছে, সাবধান, শাসক-দল পূর্বেই খেরে আছে, তোর দিকে টানা তাকিয়ে, যদি একবার ধরে, চারটের জায়গায় ছটা থাবড়া, এবং গায়ের কাঁটাওলা লেবেলখানি ডবল-আঁটো। এবার, হাত থরথর কাঁপলে চা চলকে যাবেই। আম্পায়ার আমাকে আউট দিতে উদগ্রীব, এ-কথা অনবরত ঘাই মারলে ব্যাট হাঁকড়াতে পারে কজন? খেতে বসে ভাত ফেললেও যাকে ডাইনিং হল-এর বাইরে খড়খড়ে ভিজে মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়া হয়, সে নিজেই নিজের ওপর খুব চোখ পাকিয়ে নজর রেখে চলবে, এবং কিছুতে শেষরক্ষা হবে না। শুরুরক্ষাও না। এখানেই নজরদারির (এবং কর্তৃপক্ষের ব্যক্ত অপছন্দের) জয়।

অবশ্যই স্পাই থাকত। কয়েকজন ছেলে ওয়ার্ডেনের (বা ওই গোছের ক্ষমতা-প্রাপ্ত গুরুজনের) পাশে নিত্যি হাঁটত গদগদ পায়ে, তাঁর ঘরে বসে ঘাড় গুঁজে পড়ত ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, তাঁর রসিকতায় হেসে কুটি হত এবং বন্ধুদের নামে নালিশ করে পাটি। এটা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সুবিধেজনক, কারণ ভেতরের খবর সহসা পাওয়া গেল এবং পরে অপরাধীকে ফটাস গোপন ক্রাইমের কথা বলে দিয়ে বোঝানো গেল, মম নজর সর্বব্যাপ্ত। কারণ রাজা কর্ণেন পশ্যতি এবং সে-চাপেই প্রজাকে বশ্যতি।

এই নজরদারি এড়ানো কাঠ-কঠিন, আরও বাঁশ-শক্ত সেই ছুপা-তর বন্ধুদের মুখোশ-ভেদ, যারা তোমার কাছে সিমপ্যাথির সিন্ধু সেজে শুনে নিচ্ছে অঙ্ক স্যারের নামে তোমার প্রতিশোধস্পৃহা মাখা কাঁউকাঁউ, তারপর সেমিকোলনসুদ্ধু (বা নয়া প্যারাগ্রাফ সংযোজনান্তে) শত্রুশিবিরে তা রসিয়ে বর্ণনা করে দিচ্ছে। এই বিশ্বাসঘাতকতাই নজরদারির সেরা অর্জন। লাল্টু চাটুকারদের ঘেন্না করা হত প্রাণপণ, ফাঁকা ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁড়িয়ে মনিটর আমার নাম লিখে তার পাশে নানাবিধ ঢ্যাঁড়া অর্পণ করলে মেজাজ চড়ে যেত টঙে, কিন্তু এক (বা একাধিক) বন্ধু যখন বেইমান— ঠিক কোনজন জানি না, কান্না পেত খুব। নজরদারি তখনই সফল, যখন কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় সহ-প্রজার প্রতি নজরওলা হয়, টকাটক ইনফো বিলোয় ট্রফির লোভে।

হস্টেল-জীবনের আনন্দগুলো হিরের কুচি, আর যে ত্রাস ও বিপন্নতা, তার সবচেয়ে বড় অবদান: তা পরবর্তী, অনেক-পরবর্তী জীবনের রিহার্সাল ঘটায়। যে অফিসে কূটকচালি ও পিছন-ছুরি গুচ্ছের, বস মিটিং-এ হ্যারাস করে পুলকিত, তাও হস্টেলবাসীর পূর্ণ অচেনা নয়। যে-রাজ্যে শাসানি গর্জানি ও দমন-পলিসি আকাশ ভর করে চেপে আসছে, তাও হস্টেলছাত্রের চেনা ল্যান্ড। এমন নয় যে, হস্টেল প্রতিরোধ শিখিয়েছে। হয়তো পলায়ন শিখিয়েছে, বা আপোস, বা স্রেফ বিষাদটুকুই পরিচিত গৎ-এ বাজছে। আবার সাহসেও দীক্ষিত করতে পারে। হয়তো ভেতরে একটা বিদ্রোহ সে বহুদ্দিন ধরে পুষছে, হস্টেলে পারেনি, এবার, বৃহত্তর জীবনে সবাইকে চমকে ঝিকিয়ে দিল। তবে হস্টেলের দিনমানব্যাপী নানা নজরদারের বিশাল নিরীক্ষণের সামনে, মাইক্রোস্কোপের তলায় জীবাণুর মতো কুঁকড়ে যেতে যেতে, পরাধীনতাটা শিখে নেওয়া যায় লেপ্টেসাপ্টে, তৃতীয় বিশ্বের বাজারে এ-ই বা কম কী?