লুবুকে জড়িয়ে ধরলেই দেবাঞ্জলির সব দুঃখ যেন একটু হালকা হয়ে যায়। কালো মেঘে ঢাকা মনটা কেমন করে যেন পরিষ্কার হয়ে যায়। লুবু ছুটে এলেই মনে হয় রোদ উঠেছে, তেপান্তরে পলাশ ফুটেছে। দেবাঞ্জলি আর লুবু— দু’জনেই যেন এক অদৃশ্য নাড়ির টানে বাঁধা। লুবু তার কাছে শুধু পোষ্য নয়, পরিবারের একজন সদস্য, অনেকটা সন্তানের মতোই।
প্রেম, বিয়ে, সন্তান— এই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে নিজেদের জীবনকে নতুন করে সাজাতে চাইছে আজকের প্রজন্ম, জেন-জ়ি। সমাজের তৈরি করে দেওয়া নিয়ম মেনে চলার বদলে অনেক যুগল নিজেদের মতো করে জীবন বেছে নিচ্ছেন। তাঁদের কেউ সন্তান নিতে চাইছেন না, কেউ আবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। তার বদলে পোষ্যকে সন্তানের মতো করে বড় করছেন। তাকে ঘিরেই তৈরি করছেন নিজেদের ছোট্ট পরিবার। লুবুর মতো এমন কত পোষ্যই আজ হয়ে উঠেছে ধ্রুবপুত্র। তাদের জন্য করা হচ্ছে জীবনবিমা, উইল, বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা—আরও কত কী।
দ্রুতগতির এই জীবনে সন্তান নেওয়ার অনিচ্ছা, কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্কের বদলে যাওয়া ধরন— সব মিলিয়ে অনেক দম্পতিই স্বেচ্ছায় পোষ্যকে বেছে নিচ্ছেন। দিনশেষে তাঁরা চাইছেন একটু সহজ, একটু স্বস্তির জীবন। এমন একটা জীবন, যেখানে সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার বদলে পোষ্যকে ভালোবেসে, আগলে রেখে বড় করে তোলাই হয়ে উঠছে পরিবারের মূল আনন্দ। লুবু আর দেবাঞ্জলি— দু’জনের সম্পর্কটা তাই নিছক পোষ্য ও মালিকের সম্পর্ক নয়। বরং একে-অপরের জীবনের একটা বড় জায়গা জুড়ে থাকা দুই সঙ্গীর সম্পর্ক।
আরও পড়ুন: নারীর সমানাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার রাজনীতিই এখন জিতছে?
লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…
নবপ্রজন্ম অর্থাৎ জেন-জি এবং মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই প্রবণতা এখন বেশি চোখে পড়ছে। অনেকের মনে হতে পারে, এটা একেবারেই আধুনিক শহুরে সংস্কৃতির ফল। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পোষ্যকে সন্তানতুল্য ভালবাসার চল একেবারে নতুন নয়। বহুদিন ধরেই, এমনকী ইতিহাস ঘাঁটলেও এমন তথ্য উঠে আসবে। মানুষ কুকুর বা অন্য প্রাণীকে পরিবারের সদস্যের মতো করে পালন করে এসেছে। তবে তফাতটা এখন অন্য জায়গায়। আগে সন্তানদের পাশাপাশি পোষ্যরাও পরিবারের অংশ ছিল। এখন অনেকের ক্ষেত্রে পোষ্যই হয়ে উঠছে সন্তানের বিকল্প।

বিভিন্ন সমীক্ষাতেও এই বদলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ যুগল সন্তান নেওয়ার বদলে পোষ্যকে, বিশেষ করে কুকুরকে, সন্তান হিসেবে ভাবছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও প্রায় ৬৬ থেকে ৭০ শতাংশ আধুনিক যুগল কুকুরকে নিজেদের ছেলে বা মেয়ের মতো করে বড় করতে চান। কারণটা খুব অস্বাভাবিক নয়। আজকের দিনে একটি সন্তানকে বড় করে তোলা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক সময়, অর্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর জন্যই বছরের পর বছর পরিকল্পনা করতে হয়।
তার সঙ্গে আছে কর্মজীবনের চাপ, অনিশ্চিত চাকরি, বাড়তে থাকা খরচ এবং নিজের জন্য একটু সময় রাখার ইচ্ছা। ফলে অনেক দম্পতিই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। অন্যদিকে পোষ্যকে বড় করা তুলনামূলকভাবে সহজ, খরচও কম এবং তার সঙ্গে তৈরি হওয়া আবেগের সম্পর্কটাও অনেকের কাছে খুব তৃপ্তিদায়ক। তাই সন্তান না নিয়ে পোষ্যকে ঘিরেই নিজেদের পরিবার গড়ে তুলতে চাইছেন তাঁরা।
আসলে পরিবার বলতে আমরা কী বুঝব, সেই ধারণাটাই বদলে যাচ্ছে। সন্তান ধারণ করা ও তাকে বড় করে তোলা এখন আর শুধু জীববিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়মের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে আবেগ, আর্থিক সামর্থ্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, জীবনদর্শন এবং মানসিক স্বস্তির মতো বিষয়ও। তাই সন্তানের জায়গায় পোষ্যকে বেছে নেওয়াকে শুধু জীবনযাপনের একটি বিকল্প হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরোটা বোঝা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারকে নতুনভাবে দেখার একটা চেষ্টা।
ভারতে ৫৭ শতাংশ নারী এবং ৪৩ শতাংশ পুরুষ কুকুরকে সন্তানরূপে গ্রহণ করতে আগ্রহী—এমন তথ্যও বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মাতৃত্বের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে পোষ্যকে সন্তানের মতো করে গ্রহণ করার প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে শুধু কুকুর নয়। বিড়াল, পাখি, মাছ এমনকী, অন্য অনেক প্রাণীকেও এখন মানুষ সন্তানের মতো করে বড় করছেন। অনেক সমকামী যুগলও তাঁদের পোষ্যকে নিজেদের সন্তান হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।
শহরাঞ্চলে এখন অনেক দম্পতিই বেছে নিচ্ছেন ‘ডিঙ্ক’ (DINK) জীবনধারা—অর্থাৎ ‘ডবল ইনকাম, নো কিডস’। দুজনেই কাজ করবেন, আয় করবেন, নিজেদের মতো করে জীবন কাটাবেন, কিন্তু সন্তান নেবেন না। এর সঙ্গে ভারতের কমতে থাকা জন্মহারের একটা যোগও রয়েছে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রজনন হার প্রায় ২-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে। অথচ জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজন প্রায় ২.১-এর প্রতিস্থাপনমাত্রা। শহরাঞ্চলে এই হার আরও কম, প্রায় ১.৬-এর আশেপাশে। পশ্চিমবঙ্গেও প্রজনন হার কমছে।
দেরিতে বিয়ে, কর্মজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার বাড়তে থাকা খরচ এবং বদলে যাওয়া জীবনদর্শনের কারণে অনেক দম্পতিই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সচেতনভাবেই নিঃসন্তান থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার মধ্যে পোষ্য অনেকের জীবনে হয়ে উঠছে এক ধরনের আবেগের আশ্রয়।
তাহলে কি পোষ্যকেন্দ্রিক এই নতুন জীবনধারা পরিবারের পুরনো কাঠামোটাই বদলে দেবে? সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য বিষয়টাকে এত সহজভাবে দেখেন না। কারণ পরিবার নিজেই তো চিরকাল একরকম ছিল না। একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের মূল কাঠামো। পরে সেই জায়গা নিয়েছে ছোট একক পরিবার। এখন সেই একক পরিবারের মধ্যেও নতুন নতুন বিন্যাস তৈরি হচ্ছে। সন্তানবিহীন দম্পতি, একা থাকা মানুষ, লিভ-ইন সম্পর্ক কিংবা পোষ্যকে ঘিরে তৈরি পরিবার—সবই ধীরে ধীরে সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে না, বরং তার চেহারাটা বদলে যাচ্ছে।
এই বদলের ছাপ শহরের জীবনেও বেশ স্পষ্ট। বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে পোষ্যবান্ধব ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল এবং ডে-কেয়ার। আবাসন প্রকল্পগুলিও নিজেদের ‘পেট-ফ্রেন্ডলি’ বলে প্রচার করছে। পোষ্যের জন্য আলাদা খাবার, গ্রুমিং, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যবিমা—সবই এখন সহজে পাওয়া যায়। এমনকি ট্রেন, বাস বা বিমানে পোষ্যকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এই বদলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল বিবাহবিচ্ছেদ। একসময় স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সন্তানের হেফাজত কার কাছে থাকবে। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের জায়গায় উঠে আসছে পোষ্য। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিচ্ছেদের পর পোষ্যের দায়িত্ব কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা এবং আইনি পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
অর্থাৎ, মানুষের জীবনযাপন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পোষ্যকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা। একসময় সন্তান ছিল সংসারের স্বাভাবিক কেন্দ্রবিন্দু। এখন অনেক পরিবারে সেই জায়গায় পোষ্যও উঠে আসছে— ভালবাসা, সঙ্গ আর নির্ভরতার প্রতীক হয়ে।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়— নগরজীবনের এই ব্যস্ততায় মানুষ কি রক্তের সম্পর্কের চেয়ে আবেগের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে? না কি পরিবার নামের বহু পুরনো প্রতিষ্ঠানটাই ধীরে ধীরে নতুন রূপ নিচ্ছে? ভবিষ্যতের কোনও কোনও সংসারে কি সন্তানের জায়গাটা সত্যিই নিয়ে নেবে লুবুর মতো কোনও পোষ্য?
এই বদলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল বিবাহবিচ্ছেদ। একসময় স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সন্তানের হেফাজত কার কাছে থাকবে। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের জায়গায় উঠে আসছে পোষ্য। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিচ্ছেদের পর পোষ্যের দায়িত্ব কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা এবং আইনি পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পোষ্যের সঙ্গে কার সম্পর্ক বেশি গভীর, কে তাকে বেশি সময় দেন, কে তার ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারবেন— এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থাৎ, অনেক মানুষের কাছে পোষ্য এখন আর নিছক গৃহপালিত প্রাণী নয়। সে পরিবারের এমন একজন সদস্য, যার ভবিষ্যৎ নিয়েও বিচ্ছেদের সময় টানাপোড়েন তৈরি হয়। অনেকটা সন্তানের ক্ষেত্রের মতোই।
পরিবারের এই বদল শুধু সম্পর্কের জায়গাতেই থেমে নেই। তার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। গত এক দশকে ভারতে দ্রুত বেড়েছে ‘পেট ইকোনমি’ বা পোষ্যকেন্দ্রিক অর্থনীতি। পোষ্যখাদ্য ও ওষুধের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে বিশেষ হাসপাতাল, গ্রুমিং সেন্টার, ডে-কেয়ার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যবিমা এবং বিলাসবহুল বোর্ডিংয়ের মতো নানা পরিষেবা। পোষ্যের জন্মদিন পালন, ফটোশুট, পোশাক, খেলনা— সবকিছুরই বাজার তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ছে পোষ্যবান্ধব ক্যাফে, আবাসন এবং ভ্রমণ পরিষেবাও।
অর্থাৎ, যে বাজার একসময় মূলত সন্তানকে ঘিরে তৈরি হত, তার একটা অংশ এখন পোষ্যকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে। ভালবাসার পাশাপাশি পোষ্য তাই হয়ে উঠছে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতারও অংশ।
পরিবারের সংজ্ঞা কোনও দিনই এক জায়গায় থেমে থাকেনি। সমাজ বদলেছে, অর্থনীতি বদলেছে, মানুষের জীবনদর্শন বদলেছে—আর তার সঙ্গে বদলেছে পরিবারের চেহারাও। একসময় রক্তের সম্পর্কই ছিল পরিবারের প্রধান ভিত্তি। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে যত্ন, সঙ্গ, দায়িত্ব আর আবেগের সম্পর্ক।
তাই পোষ্যকে সন্তানতুল্য ভাবার প্রবণতাকে শুধুই শহুরে ফ্যাশন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনযাপন এবং পরিবার সম্পর্কে ভাবনার একটা বড় পরিবর্তন। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কতটা বাড়বে, তা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় ক্রমশ পরিষ্কার—আগামী দিনের পরিবার হয়তো শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে সংজ্ঞায়িত হবে না। যে সম্পর্কে মানুষ ভালবাসা, নিরাপত্তা, সঙ্গ আর নির্ভরতা খুঁজে পায়, সেই সম্পর্কও পরিবার হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই ভবিষ্যতের কোনও এক সংসারে হয়তো লুবুর মতো একটি পোষ্যই হবে সবচেয়ে আদরের ‘সন্তান’।




