চোখ-কান খোলা: পর্ব ৪০

বায়বীয় নারীবাদ?

দেওয়াল লিখনে লেখা হয়েছিল, ‘চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে, ছাদনাতলায় কে/ হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে, জ্যোতিবাবুর বে’, প্রত্যুত্তরে দেওয়াল লিখন হল, ‘ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস ভাই/ ইন্দিরাকে ছাদনাতলায় সাজিয়ে আনা চাই।’ এই জনশ্রুতি বা মৌখিক ইতিহাস তো এখনও যথেষ্ট বাজারচলতি। কিন্তু রাজনৈতিক ভাষ্য যদি এমনই হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, রসবোধের ঊর্ধ্বেও কি সংবেদনশীলতার প্রশ্ন নেই? শালীনতা-সংক্রান্ত বিতর্ক যদি বাদও দেওয়া যায়, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেবলই নারী বলে, তাঁর নারীত্বকে ইঙ্গিত করে সরাসরি আক্রমণ শানানো যায় কি?

ইন্দিরা গান্ধী থেকে জয়ললিতা হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত যতজন মহিলা রাজনীতিবিদ প্রশাসনিক ক্ষমতায় থেকেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মূলধারার রাজনীতিতেই সরাসরি নারীবিদ্বেষী কথা বারংবার উচ্চারিত হয়েছে। এমনকী, মহিলা প্রশাসনিক প্রধানরাও পিতৃতান্ত্রিক মন্তব্য করতে পিছপা হননি। ধর্ষণের মতো অপরাধকে ‘ছোট্ট ঘটনা’ বলে অভিহিত করতেও দেখা গিয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রবিশেষে। আর মূলধারার পুরুষ রাজনীতিবিদরা সচরাচর যে-ধরনের মন্তব্য করেছেন, তাতে সরাসরি পিতৃতন্ত্রর বিরোধিতা বিরল। কিন্তু সম্প্রতি রাহুল গান্ধীর একটি মন্তব্য ঘিরে উত্তাল হয়েছে জাতীয় রাজনীতি। রাহুল গান্ধী খাস সংসদের বিরোধী দলনেতা। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তিনি। সেই তিনিই কিনা প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, নারী বাবা, ভাই বা স্বামী— কারওরই সম্পত্তি হতে পারেন না। সরাসরি বললেন, ‘স্ম্যাশ প্যাট্রিয়ার্কি’।

নিঃসন্দেহে এই ঘটনা এই মুহূর্তের রাজনৈতিক ভাষ্যে জরুরি। যখন নারীবাদী বয়ানমাত্রই মূল স্রোতের রাজনীতির সমান্তরালে বা বিপ্রতীপে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে একজন মূল স্রোতের নেতার মুখে এত বড় একটি ‘স্টেটমেন্ট’ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এই ভার্চুয়াল ও ভাইরালের তাৎক্ষণিকতার যুগে রাহুল গান্ধীর এই ভিডিওটি ও তা ঘিরে বিতর্কের মেয়াদ কতটুকুই বা? তারপরে?

শিশুমন কেবলই ব্যবসায়িক উপকরণ মেটা-র কাছে?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৯…

সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন জি আন্দোলন নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। কিন্তু এই আন্দোলনে, মিছিলে এমন অনেক পোস্টার ও স্লোগান চোখে পড়েছে, যা সরকারবিরোধী যতটা, ততটাই নারীবিদ্বেষী ও সমস্যাজনক। আন্দোলনের নেত্রী নেহা বোরা একটি সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেছেন এই ‘মিসোজিনি’ কোনও নিরালম্ব বায়ুভূত নয়, এটার উৎস সমাজের গভীরেই লুকিয়ে। তাই রাজনৈতিক বয়ানে নারীদের প্রতি ঘৃণা উগরানো ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতার নির্মাণও আদতে আদ্যন্ত সামাজিক।

স্লাভোই জিজেক একবার মন্তব্য করেছিলেন, যাকে ‘পলিটিকালি ইনকারেক্ট’ কথা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তা একবার বলে ফেললে নাকি অন্তর্লীন হিংসা কমে যায়। তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রয়োগের দিক থেকে এই নিয়ে তর্ক চলতে পারে, তবে ভারতে পরিস্থিতিটা একটু অন্যরকম। এখানে এই ধরনের মন্তব্য মূলস্রোতে প্রতিষ্ঠা পেতে-পেতে আরও জেঁকে বসে। রাহুল গান্ধীর এই মন্তব্যের পরে খোদ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীই বিরোধিতা শানিয়েছেন মনুস্মৃতিকে সম্বল করে। এমনকী, রাহুল গান্ধীর দলের সদস্যও কেন্দ্রীয় শাসক দলের প্রাক্তন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে আক্রমণ করেছেন তাঁর নাচের বিভঙ্গকে কটাক্ষ করে, কখনও রাষ্ট্রপতিকে কোনও নেতা বলে বসেছেন, ‘রাষ্ট্রপত্নী’ বলে। সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে টিভিকে এবং ডিএমকে-র মধ্যে নারীবিদ্বেষী একটি মন্তব্য নিয়ে তরজা চলছে। মন্তব্যটি এসেছে ডিএমকে-র প্রতিনিধির তরফ থেকে। এমন উদাহরণ দেওয়া শুরু হলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হতে বাধ্য।

কিন্তু প্রশ্নটা কেবলই কয়েকটি মন্তব্য নিয়ে নয়। নারীবাদ বিষয়টির ওজন যথেষ্ট, তা যাপনে এবং প্রয়োগে না আনলে শব্দটি উচ্চারণও নিরর্থক। রাহুল গান্ধীর মন্তব্যটি পিতৃতন্ত্রকে আঘাত হানা, কিন্তু তা এই ভার বহনে সক্ষম কি? বিষয়টা এখানে লিঙ্গসচেতনতার ও সামাজিক অগ্রগতির। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাহুল গান্ধীর মন্তব্য কি তাঁর ব্যক্তিগত? রাহুল গান্ধী তাঁর নিজস্ব বোধ, নিজস্ব সংবেদন থেকে একটি মন্তব্য করে কি সত্যিই রাজনৈতিক ভাষ্যর মোড় ঘোরালেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, না। রাহুল গান্ধীর মন্তব্যটি কেবলই একটি ব্যতিক্রম, এবং ভারতের জাতীয় রাজনীতির পুরুষ প্রতিনিধির করা মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ্য। কিন্তু ইদানীং যাকে ‘ওক’ বলা হয়, অর্থাৎ, কী কী বললে প্রগতিশীল হওয়া যায়, তার সহজপাঠ যারা আওড়ায়, তারা তো এমনিই এমন মন্তব্য আকছার করছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির এমন বহু বক্তব্য পরের পর সাজিয়ে দেওয়া যায়, যা বারংবার প্রগতিশীল রাজনীতিকে আশা জুগিয়েছে, অক্সিজেন জুগিয়েছে। কাজেই পিতৃতন্ত্রকে খর্ব করো— এহেন একটি ঘোষণা হাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু ব্যক্তিগত অবস্থান যদি দলীয় রাজনীতির অবস্থানের সঙ্গে না মেলে, তাহলে এই বিশেষ মন্তব্যটিকে বাঁকবদলের সূচকও বলা যাবে না।

নারীর অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে ক্রমশ পিছিয়ে দেওয়াও একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, এবং বলা বাহুল্য, তা যথেষ্ট শক্তিশালী, তার ভিত এখনও মজবুত। সেই ভিতকে আন্দোলিত করতে গেলে, একটি বায়বীয় মন্তব্যমাত্র নয়, প্রয়োজন মূলধারার রাজনীতির আমূল সংস্কার, দল নির্বিশেষে। রাহুল গান্ধীর এই মন্তব্য কি তার মশাল হতে পারবে?