চোখ-কান খোলা: পর্ব ২৭

বিধি বাম, অথবা রাম

বারোয়ারি পুজোর ‘মাইক’ যা করেছে এখনকার সম্প্রীতি রক্ষার পদযাত্রা তার ধারে কাছে আসতে পারবে না। সত্তরের দশকে কলকাতার ‘নব-সংস্কৃতি’-র যুগে পুজোপ্যান্ডেল থেকে যখন শোলের গব্বর সিংয়ের ‘আবে এ শ্যামা…’ ভেসে আসতে লাগল, তখনও দেখেছি, মন দিয়ে বয়স্ক মানুষও তা শুনছে। তাদের আমি উপহাসের যোগ্য বা করুণার যোগ্য বলে একদমই মনে করি না। আমাদের যা প্রাপ্য, তাই-ই তো আমাদের পাওয়ার কথা।”

কলকাতায় দুর্গাপুজোর বিবর্তন নিয়ে লিখতে গিয়ে এমনটাই লিখেছিলেন মতি নন্দী। নয়ের দশকের গোড়ায় এই কথা যখন তিনি লিখছিলেন, তখন বেশ কিছু বছর হল রামরথযাত্রা শুরু হয়ে গেছে। আর এক বছরের মধ্যেই ঘটে যাবে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, এই তারিখের তাৎপর্য বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই অংশে মতি নন্দী যা লিখছেন, তার প্রথম পঙ্‌ক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পদযাত্রা তখনকার কলকাতায় বেশ জোরকদমেই চলছে, ঠিক যেমন ২০০২-এও হয়েছে, গুজরাত গণহত্যার সময়ে। ২০০১-এ ৯/১১ ঘটার পর যখন বাগদাদে যুদ্ধ শুরু হল, তখন শান্তি মিছিল-ও হয়েছে কলকাতায়, পাড়ায়-পাড়ায়।

আরও পড়ুন: দুনিয়ায় কী হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ চিন্তাব্যয় করে কেন?
লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য…

সহজ কথায় বলে দেওয়াই যায়, বামপন্থী রাজনৈতিক আবহেরই ফসল ছিল এসব কর্মসূচি। তা ছিল, ঠিকই, কিন্তু এই প্রতিটি মানবিক উদ্যোগের প্রতি মধ্যবিত্তর মনোভাবও কি আদতে আন্তরিক ছিল না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখতে গেলে, আবারও মতি নন্দীর লেখাটির কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। সত্যিই কি, মাইকের প্রাবল্যে কোথাও ঢাকা পড়ে গেছে শান্তি-সম্প্রীতি নিয়ে সংবেদনশীলতা? ‘শোলে’-র প্রসঙ্গ তুলে জনপ্রিয় সংস্কৃতি নিয়ে মতি নন্দীর কটাক্ষটির আড়ালে বোধহয় এই সত্য কোথাও লুকিয়ে, যে, বোধ এবং চেতনার আহ্বানকে ‘আখ্যান’ অথবা ‘ন্যারেটিভ’-এর অমোঘ টান সহজেই হারিয়ে দিতে পারে। মতি নন্দীর উদ্ধৃতিটির শেষ বাক্য তুলে তাই এই প্রশ্নও তোলা যায়, আমাদের আসলে এই লঘুতা, এই চটুলতাই কি প্রাপ্য ছিল?

নির্বাচন এসেছে। নির্বাচন চলেও যাবে। ফলাফল প্রকাশিত হবে। সঙ্গে-সঙ্গে চলে যাবে ইলেকশন কমিশনের ‘কোড অফ কনডাক্ট’-ও। বাংলায় যার পোশাকি নাম আদর্শ আচরণবিধি। তিনদিন ধরে পানশালা বন্ধ, বাইকে সঙ্গী নিয়ে ওঠা যাবে না, পাবলিক স্কুল-কলেজ থেকে পাবলিক বাসের দখল নেবে জলপাই রঙের উর্দিরা, টহলদারির দিনরাত্রির মধ্যে সিঁটিয়ে থাকবে নাগরিক, আর রাজনীতির কান্ডারিরা কীভাবে যেন, এন্তার আচরণবিধি ভেঙেও দিব্য পার পেয়ে যাবেন। তারপরেও আমরা সেসব মেনে নেব। নির্বাচনের কয়েকটা দিন একটু বিরক্ত থাকব, কারণ ডাকলেই সুইগি-ব্লিঙ্কইট এসে পৌঁছচ্ছে না, আমাদের ঘরবাড়িতে গৃহকর্মে যাঁরা সহায়তা করেন, তাঁদের থেকে ঠিকঠাক পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে না। যেই ভোট শেষ হবে, যে-ই ক্ষমতায় আসুক, আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাব তাদের। অথচ গণপরিবহণে ঠোকাঠুকি লাগলে সহনাগরিককে দুরমুশ করব, গৃহসহায়করা বেতন বাড়ানোর কথা বললে, দেখব, সে যেখানে থাকে, ওই বস্তি থেকেই আরেকটু কম বেতনের গৃহসহায়ক পাওয়া যায় কি না। শব্দদূষণ চলবে দুদ্দাড়, পুজোআচ্চা, রক্তদান শিবির, মিটিং-মিছিলে। আমরা ভুলে থাকব, কারণ আমাদের নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন আছে।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর সেই দৃশ্য

এই আমরা কারা? ব্রাত্য বসুর ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকে এক প্রাক্তন অতি-বামপন্থী কর্মী আরেক প্রাক্তন বামপন্থী কর্মীকে বলেন, মধ্যবিত্ত আসলে পাওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কারণ কিছু পেলে তারা চুপ করে যাবে। এবং এই চাওয়া-পাওয়ার রাজনীতিকেই ‘পাওয়ার’ বা ক্ষমতাতন্ত্র ব্যবহার করে তার মতো করে। শহুরে মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি উদাসীন প্রশ্ন তোলার ব্যাপারেই। ন’মাসে-ছ’মাসে একটা করে গণআন্দোলনের ঢেউ উঠলে কর্পোরেট অফিসফেরত পাবে না গিয়ে অবস্থান বা অনশনে যাবে, গম্ভীর মুখে স্লোগানে গলা মেলাবে, ছুটির দিন বা রোববারে মিছিল হলে পা-ও মিলিয়ে নেবে। তারপর বসন্ত যাবে, কোকিলও যাবে। ভোটের সময়ে প্রত্যয়ী মুখ করে, ‘সেই যে এককালে আন্দোলন করেছিলাম’ বলে কলার তুলে ভোটবাক্সের বোতাম জোরে টিপবে, তারপর ওয়ার্ক ফ্রম হোমে বসে ভাববে আজ বিরিয়ানি খাবে কি না।

তাই নেতাদেরও পোয়াবারো। এখন বিধিভঙ্গ করলে কমিশন থেকে আদালতে তাও চাট্টি অভিযোগ জমা পড়বে, দু’এক পিস জনস্বার্থ মামলাও হবে। নির্বাচন মিটলেই তো গয়ংগচ্ছ! তাই কী আর যায় আসে? তাছাড়া, চণ্ডীমণ্ডপ থেকে সোশ্যাল উঠোন, ফরওয়ার্ড কর্মসূচি থেকে কাফে-রেস্তোরাঁয় গিয়ে এই আমরা, মধ্যবিত্তরাই তো সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করি অবলীলায়, নেতারা করলে তাই কীই-বা বলার আছে? এই মধ্যবিত্তরাই তো ভোটের সময়ে তরুণী প্রার্থীকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে নির্দ্বিধায় বলবে, ওর কম বয়স, সুন্দর দেখতে, অতএব বিয়ে করে নিলেই তো পারে। এই মধ্যবিত্তরাই তো কোনও-কোনও প্রার্থীর গায়ের রং, কারও উচ্চারণ নিয়ে উচ্চবর্ণীয়, অশালীন মশকরাগুলো করবে। সমাজমাধ্যমে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে বানাবে চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক ও ধর্ষকামী মিম। তাহলে নেতাদের দোষ দিয়ে কী হবে? গুরগাঁও থেকে কেউ চাইবেন, পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক, আমাদের ‘মেইড’-রা যাতে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে, তাই খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে কলকাতাকে ‘বস্তির শহর’ বলে চলে গেলে আমরা দলমতনির্বিশেষে প্রতিবাদ করি না।

ভোটার তালিকা সংশোধন চাই বলে এই আমরাই গলা ফাটাই, তারপর প্রতিবেশীর পদবি আর ধর্মের দরুন তাঁর বৈধ ভোটাধিকার না থাকলে নিজেরাই গলা নামিয়ে ফিসফিস করি ‘বাংলাদেশি’। যাদের থেকে সবজি কিনি, মাছ কিনি, যারা এই অসম্ভব মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও দু-এক টাকা কম দামে আমাদের বাজার করার সুযোগ দেয়, তাদের দু-দিন দেখতে না পেলে উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে ভাবব, নিশ্চয়ই রোহিঙ্গা, তাই এসআইআরে নাম বাদ গেল বুঝি! যে-বাইক আমাকে সময়মতো অফিস পৌঁছে দেবে, তার পরিচিতি দেখতে চাইব। ডাক্তার বলবে, পদবি দেখে চিকিৎসা করব, ধর্মীয় স্লোগান দিলে ডিসকাউন্ট দেব। শিক্ষক ধর্ম দেখে পড়াবে, উকিল জাতধর্ম বুঝে মামলা নেবে— এই পরিস্থিতিও তাহলে আর অসম্ভব নয়?

আমরা অনেক কিছু নিয়ে চিন্তিত। সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ— এসব নানাবিধ হারাকিরি নিয়ে। আমরা চিন্তিত নই কেবল নিজেদের ভণ্ডামি নিয়ে। চিন্তিত নই নিজেদের আচরণবিধি নিয়ে, ‘আদর্শ’ তো ক্রমে অপ্রাসঙ্গিক শব্দ হয়ে উঠবেই আমাদের কাছে। মতি নন্দীর ওই শেষ বাক্যটিই তাই স্মৃতিধার্য। আমাদের যা প্রাপ্য, তা আমরা পাব না কেন?