সিম্বলে যায় চেনা!

মহাভারতের যুগে রথী-মহারথীরা রথের ধ্বজা দিয়ে আত্মপরিচয় জানান দিতেন। কেউ কপিধ্বজ, কেউ তালধ্বজ, শ্রীকৃষ্ণ গরুড়ধ্বজ। জলদস্যুরা তাদের পতাকায় মড়ার খুলি আর জোড়া হাড় এঁকে রাখত। জলি রজার্স। কালে-দিনে সেই চিহ্নই বিপদচিহ্ন হয়ে আজও থেকে গেছে। পুরাণের যুগ গেছে। জলদস্যুদের যুগও বহুদিন নেই। কিন্তু রোড-সাইন বা নিত্য ব্যবহার্য ইমোজি, চিহ্ন ছাড়া আমরা নিরুপায়। আবার চিহ্ন একটু এদিক-ওদিক হলেই গোলমেলে। ধানের গোলায় আঁকা মাঙ্গলিক স্বস্তিকচিহ্ন একটু হেলে গেলেই আউশভিৎজ ক্যাম্প। সেবা ও মানবতার প্রতীক রেড ক্রস ইসলামিক দেশে রেড ক্রেসেন্ট, ধর্মনিরপেক্ষ হলে রেড ক্রিস্টাল। দেখা যাচ্ছে, সেবা ও মানবতার প্রতীকও দেশ-ভেদে পাল্টে পাল্টে যায়। 

স্বাধীনতার পরপরই প্রথম নির্বাচনের সময় সমস্যা দেখা যায় সাক্ষরতার হার নিয়ে। সে-সময় জনসংখ্যার নিরিখে সাক্ষর ছিলেন পাঁচ ভাগের একভাগের চেয়েও কম মানুষ। তাঁরা প্রার্থীর নাম পড়ে পছন্দের প্রার্থী বাছাই করে ভোট দিতে পারবেন না। তখন ‘সিলোন’ মডেল কাজে লাগানো হল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা মোটের ওপর কাছাকাছি। রাজনৈতিক দলগুলোকে চিহ্ন দেওয়ার প্রচলন হল।  

সর্বভারতীয় দলগুলির চিহ্ন নিয়ে বিশেষ সমস্যা নেই। কংগ্রেসের হাতচিহ্ন, বিজেপির পদ্মফুল, সিপিএমের কাস্তে-হাতুড়ি-তারা। সাবেক কংগ্রেসের প্রতীক ছিল জোড়া বলদ। কৃষিনির্ভর দেশ, তারপর এল গাই-বাছুর। এখন দীর্ঘদিন হাত চিহ্নে লড়ে কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস বাইনারির সময় ছড়া কাটার খুব চল ছিল। এরা যদি বলে, ‘টাটা-বিড়লা ভাই-ভাই/ কাটা হাতে ভোট নাই’, অন্য পক্ষ বলে ‘চিনের কাস্তে-হাতুড়ি, পাকিস্তানের তারা, এর পরেও কি বলতে হবে দেশের শত্রু কারা?’

প্রথম ভোট-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়

যাক গে, সেসব দিন চলে গেছে।

ভোটের  প্রতীকগুলো নেহাতই পার্টির সিম্বলমাত্র নয়। প্রথম নির্বাচন থেকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেশের বদলে যাওয়া আর্থসামাজিক অবস্থার ধারাভাষ্য। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় ‘মেরা দেশ কি ধরতি সোনা উগলে, উগলে হীরা মোতি’ এই ছিল মোদ্দা স্বপ্ন। তাই বলদ, লাঙল, কৃষক, গরুর গাড়ি— এইসব চিহ্নের চাহিদা ছিল। তারপর এল ভারী শিল্পের স্বপ্ন। লাঙলের সঙ্গে ট্রাক্টর এল, গরুর গাড়ির সঙ্গে ট্রাক এল, প্রদীপ, হ্যারিকেন, লন্ঠনের সঙ্গে ইলেকট্রিক বাল্ব, বৈদ্যুতিক খুঁটি আসতে থাকল। নানা রকম ফলমূল, সবজি, গৃহস্থালির সরঞ্জামের সঙ্গে আসতে-আসতে বাসনকোসন, মিক্সার-গ্রাইন্ডার, ফ্রিজ, টিভি, প্রেশার কুকার, হাঁড়ি, বালতি, গ্লাস, গ্যাস সিলিন্ডার, টর্চ, অটো, শ্যালো পাম্প, ক্রিকেট ব্যাট, ক্রিকেটার, টি ভি রিমোট, ডিশ অ্যান্টেনা, রোবট, হেলমেট, চার্জার কি নেই এই সিম্বলের পশরায়? পুরো ‘ঝাঁজরি কড়া বেড়ি হাতা শহর থেকে সস্তা ছাতা।’ 

ছবি এআই নির্মিত

দুঃখের বিষয় হল, স্বাধীনতার পরে পৌনে একশতকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া সত্বেও সাক্ষরতার দিকটা নড়বড়ে আছে। হয়তো সাক্ষরতার হার অনেক বেড়েছে, কিন্তু কার্যকর সাক্ষরতা পঞ্চাশ শতাংশর বেশি নয়। অর্থাৎ, খটোমটো বানান বা যুক্তাক্ষর থাকলে ভোটদাতারা পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে অসুবিধেয় পড়বেন। অগত্যা সিম্বল ভরসা। নিয়ম হল, জাতীয় বা রাজ্যস্তরের রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া বাকি স্থানীয় দল এবং নির্দল প্রার্থীদের বেছে দেওয়া তিনটে সিম্বল থেকে একটাকে বেছে দেয় নির্বাচন কমিশন। শর্ত হল, কোনও ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গ থাকা চলবে না। আর কোন পশুপাখিকে প্রতীক হিসেবে বাছা যাবে না। উট বা ময়ূর বা হনুমানকে প্রতীক বাছলে ভোটের সময় সেই বেচারাগুলোর কী ভোগান্তি হবে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। 

সর্বভারতীয় দলগুলো যাদের নির্দিষ্ট প্রতীক আছে, এবং আঞ্চলিক দলগুলো, যাদের নির্দিষ্ট প্রতীক আছে, তারা ছাড়া আর কারা ভোটে দাঁড়ায়? কী লাভ তাদের ভোটে দাঁড়িয়ে? অনেকেই থাকেন গোঁজ প্রার্থী। সর্বভারতীয় দলে যদি হরগৌরী নস্কর প্রার্থী হয়ে থাকে, এর নাম হয় তো গৌরহরি লস্কর। ব্যস, খুঁজে পেতে প্রধান বিরোধী দল এঁকে ভোটে দাঁড় করাবে। ভোটকেন্দ্রে বিভ্রান্ত ভোটার যদি হরগৌরী আর গৌরহরি গুলিয়ে ফেলে, সেটাই লাভ। এদান্তি, এইজাতীয় প্রার্থীকে ভোট-কাটুয়া বলার চল হয়েছে। বলাই বাহুল্য, এঁদের জামানত জব্দ হয়ে থাকে, বিরোধী জব্দ হয় কি না, ফলাফল বলবে। আরেক দল আছে, এরা ‘ডিলিউশন অব গ্র্যাঞ্জার’-এ ভোগে। অনেকটা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই নন্দলাল টাইপস। স্বদেশের তরে যা করেই হোক, রাখবে সে জীবন। এরা ভোটে দাঁড়ান। অতিরিক্ত নিরাপত্তার আবেদন করেন এবং কিছুদিন পল্টন নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। ভোট হলে দেখা যায়, প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দুই অঙ্ক পেরোয়নি। আবারও ভোটে দাঁড়ান। হয়তো কেউ বুঝিয়েছে, এভাবেও গিনেস বুক অফ রেকর্ডে নাম তোলার চান্স আছে। আর আছেন কিছু ব্যক্তি, জীবনে চিকিৎসক অথবা উকিল, ভোটে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য প্রচার পাওয়া। দেশ-সেবা নয়, পশার বাড়ানোর জন্য ভোটে দাঁড়ানো। আর একদল আছেন, যারা ভোটের ডিউটি এড়াতে ভোটে দাঁড়ান, মূলত শিক্ষক-অধ্যাপকদের কেউ-কেউ এই সুযোগ নিয়ে থাকেন। আর এইসব নির্দল প্রার্থীর জন্য অপেক্ষা করে থাকে বিচিত্র সব চিহ্ন। আম। কাঁঠাল, ছাতা, সাইকেল, দেওয়াল ঘড়ি, হাতপাখা, বাল্ব, ছাতা,রেডিও, হুঁকো, কুঁড়ে ঘর থেকে টিভি, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, চারজার। অনেকে বাথরুম, টয়লেট প্যান, কমোড, মগ, বালতি— এগুলোকে ব্রাত্য করে রাখেন না। আম আদমি তো ঝাঁটাকে সম্বল করে বড়-বড় দলের সঙ্গে যুঝে চলেছে। 

অনেকেই থাকেন গোঁজ প্রার্থী। সর্বভারতীয় দলে যদি হরগৌরী নস্কর প্রার্থী হয়ে থাকে, এর নাম হয় তো গৌরহরি লস্কর। ব্যস, খুঁজে পেতে প্রধান বিরোধী দল এঁকে ভোটে দাঁড় করাবে। ভোটকেন্দ্রে বিভ্রান্ত ভোটার যদি হরগৌরী আর গৌরহরি গুলিয়ে ফেলে, সেটাই লাভ। এদান্তি, এইজাতীয় প্রার্থীকে ভোট-কাটুয়া বলার চল হয়েছে। বলাই বাহুল্য, এঁদের জামানত জব্দ হয়ে থাকে, বিরোধী জব্দ হয় কি না, ফলাফল বলবে। আরেক দল আছে, এরা ‘ডিলিউশন অব গ্র্যাঞ্জার’-এ ভোগে।

মনে পড়ে, তপন সিনহার ‘আপনজন’ ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-অভিনীত চরিত্র ‘পাখির খাঁচা’ চিহ্নে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। তরুণ মজুমদারের ‘ঠগিনী’ ছবিতে অজিতেশ কলসি চিহ্নে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর তাঁর বিরুদ্ধে লন্ঠন চিহ্নে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্য এক প্রার্থী। ছেনো মাস্তান বা ধেনো মদের সেই সাদাকালো দিন আর নেই। এখন বিবমিষা জাগানো রংবেরঙের মিমের যুগ। নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ অশিক্ষা ম-ম করা মিম।

এখন চিহ্ন বলতে তাই থুকদানি খুঁজি ওয়াক তোলার জন্য।