কালি-কলম-মন
আমি তখন সদ্য সাক্ষর। অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে শব্দ তৈরি করতে পারছি। বাবা স্কুলের মাস্টারমশাই যেহেতু, বাবার পকেটে চকের টুকরো থাকত। সেই টুকরো চক, দিয়ে কালো খরখরে বারান্দায় অক্ষর সাজিয়ে ব্যথা লিখতাম। মায়ের কষ্ট-কথাই লিখতাম, নইলে মা কেন তাড়াতাড়ি ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে দিত ওই সব প্রত্নলিপি? মা আমার কপালে চুমো খেয়ে বলত, থাক খোকা, এইসব লিখিস না। ওরা দেখলে খুব খারাপ হবে। তুই অনেক বড় হ সোনা।
ঝুল-বারান্দার এক পাশে বাঁশের বেড়ার আড়াল ছিল। সেই ঘরে থাকত বড়দা। বড়দা হলেন পিসেমশাইয়ের প্রয়াত দাদার বড় ছেলে। এই বড়দা আড়ালেই থাকতেন। ওই কুঠুরির দরজা বন্ধ থাকত। বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে দেখার চেষ্টা করেছি, দেখা পাইনি। বেড়ার ওপাশে খবর-কাগজ সাঁটা ছিল। বড়দার হাতে মাঝে-মাঝে ব্যান্ডেজ দেখতাম। দুপুর বেলায় লাল সিমেন্টের বারান্দায় খেতে আসতেন। ওঁর একটা আলাদা থালা ছিল, পাথরের। সেই থালাটা বারান্দার এক কোণে রাখা থাকত। মেজ পিসিমাদের রান্নাঘরটা বেশ বড় ছিল। ওখানেই সবাই খেত, মেঝেতে বসে।
নতুন ভারতের সুখ-স্বপ্ন থেকেই প্রথমে আমার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘স্বপন’! পড়ুন: ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৪…
আমাদের রান্নাঘরটা ছিল ছোট। ওখানে একজন বা দু’জন বসে খেতে পারত কোনওরকমে। আমাদের ঘরেই পরিবেশন করা হত। বড়দা কখনও রান্না ঘরে গিয়ে খাননি। কোনও ঘরেও ঢুকতেন না। নীচের কারখানার কর্মচারীদের জন্য একটা স্নান-পায়খানার ব্যবস্থা ছিল। কেমন যেন অন্ধকার জায়গাটা। ওখানেই বড়দার জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল বোধহয়।
বড়দা ওখানেই স্নান করতেন। আর গামছাটা শুকোতে দিতেন ওর নিজের ঘরের রেলিংয়ে। বড়দা সন্ধের পর লাল সিমেন্টের বারান্দার এক প্রান্তে দক্ষিণের জানলার সামনে মাঝেমাঝে বসতেন, গান করতেন। ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায়।’, ‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’, ‘ওগো কর্ণধার’— এইসব। কখনও-বা কবিতা আবৃত্তি করতেন, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই।’ আমরা কেউ বড়দার কাছাকাছি যেতাম না। বড়রা বলে দিয়েছিল, তাই। বড়দার পায়ে একটা কেড্স জুতো। খালি পায়ে কখনও দেখিনি। বড়দা সকালেই চলে যেতেন নীচে, কারখানায়। ওখানে একটা ঘর ছিল, প্যাকিংঘর। ওখানে কাঠের পেটিতে কালির কৌটো ভরা বাক্সগুলো ভরা হত। সেই ঘরে একটা সরু চৌকি ছিল। বড়দা ওখানেই থাকতেন সারাদিন। দুপুরে খাওয়ার পর আবার ওখানে। সন্ধের পর নিজের ওই রহস্য-ঘরে। কখনও কিছুক্ষণ দক্ষিণের জানালার ধারে। শুতেন ওই ঝুলবারান্দার রহস্য-ঘরে। রাত্তিরে কোথায় খেতেন বলতে পারব না। জিজ্ঞাসা করার মতো কেউ বেঁচে নেই। অনেক পরে জেনেছিলাম, এই বড়দা ছিলেন কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত। তখন ধারণা ছিল কুষ্ঠ ব্যাধি ছোঁয়াচে। বড়দার নাকি বালক বয়সেই এই অসুখ হয়েছিল। কিছুদিন বাঁকুড়ার একটা হাসপাতালেও ছিলেন। আমার মেজ পিসেমশাই তাঁর প্রয়াত বড় ভাইয়ের চার ছেলেরই দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলা যায়। বড়দা, নাড়ুদা, সুনুদা, মুনুদা। নাড়ুদা এই কালির কারখানারই খাতাপত্রের কাজ করতেন। সুনুদাকে প্রথমে অন্য কোথাও যেন চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মনুদাকে কালির সেলসম্যান করে দিয়েছিলেন। ওরা সবাই মেজ পিসেমশাইকে বড়াক্কু ডাকত। বড়াক্কু হল বড় কাকুর সংক্ষিপ্ত রূপ।

মেজ পিসেমশাইয়ের ছোট ভাইটির নাম ছিল রমেশ। স্বদেশি করতেন। জেল থেকে আমার মেজপিসিমাকে লেখা চিঠি কী করে যেন আমার কাছে রয়েছে।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে একটা ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। নাম ছিল, ‘উদয় সায়েন্টিফিক কোম্পানি’। কীসব সরঞ্জাম তৈরি করা হত এখন মনে নেই। বড়দার ভাই সুনুদাকে এখানেই নিয়ে গিয়েছিলেন। শ্যামবাজারে একটা বাড়িও করেছিলেন তিনি। নাড়ুদারা সিঁথিতে বাড়ি করছিলেন। প্রতিটা বাড়ির পিছনেই এই কালির কারখানার অবদান ছিল।
কালি তৈরি কীভাবে হত সেটা তো বলিনি; সারা পৃথিবীতেই যখন চামড়া, গাছের ছাল বা পাতা, পরে কাগজে লেখার চল শুরু হয়েছিল, সেই সঙ্গে কালি তৈরির পদ্ধতি আবিস্কার হয়েছিল স্থানীয় ভাবে। কালো কালির জন্য কাঠকয়লার মিহি গুঁড়ো দরকার ছিল, সঙ্গে একটি আঠালো কিছু এবং জল। আমি পরিণত বয়সে কোথাও দেখেছিলাম, আমাদের বাংলায় কালি তৈরির শ্লোকবদ্ধ ফর্মুলা যেমন—
তিল ত্রিফলা বকুলের ছালা
ছাগ দুগ্ধে করি মেলা
তাহাতে হরিতকি ঘষি
ছিঁড়ে পত্র, না ছাড়ে মসি।
তালপাতার পুথির জন্য এই কালি। বকুলের ছাল পুড়িয়ে যে-অঙ্গার, তার সঙ্গে তিল, ত্রিফলাবাটা ছাগলের দুধে মিশিয়ে হরিতকির কষ যুক্ত করে বোধহয় কালো রঙের কালি হত। পাতা ছিঁড়ে যাবে, তবু কালি উঠবে না। এরকম আরেকটা ফর্মুলা হল—
কুল কাষ্ঠ ভস্ম
যবচূর্ণ তস্য সিকি
তার অর্ধ বাবলার আঠা
কালি বানারে বামুনের ব্যাটা।
এই শ্লোকটা অনেক অর্বাচীন।
সম্ভবত এই লোকায়ত ফর্মুলার ওপরই ভিত্তি করে কালি তৈরি শুরু করেছিলেন পিসেমশাইয়ের বাবা উদয়চন্দ্র চক্রবর্তী। যব-চূর্ণের পরিবর্তে, অন্য কোনও স্টার্চ ব্যবহার করতেন। আর কাঠ পুড়িয়ে কার্বন না তৈরি করে, রঙ কিনে নিতেন। আমি দেখেছি, সাদা ময়দার মতো একটা গুঁড়ো ঢালা হচ্ছে মেঝেতে ত্রিপল ফেলে, সেটায় রঙ জলে গুলে মাখা হচ্ছে। শ্রমিকরা ওটা দু’হাতে দলাই-মালাই করার পর পায়ে মাড়াচ্ছে। তারপর বড়-বড় পিণ্ড তৈরি হচ্ছে। এবার ওগুলো ছাতে শুকোতে দেওয়া হবে।
নীল-কালো-লাল-সবুজ— এই চার রঙের কালি হত। নীল আর কালো মিশিয়ে ব্লু-ব্ল্যাকও হত। সাদা চূর্ণের নাম পরে জেনেছি, ডেক্সট্রিন। ওটা নাকি আলুর গুঁড়ো। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত। ওইসব পিণ্ডগুলো শুকিয়ে গেলে, প্রথমে মুগুর দিয়ে পিটিয়ে একটা মেশিনে ফেলে দিয়ে পাউডারের মতো গুঁড়ো করে ফেলা হত। তারপর আলাদা মেশিনে ফেলে ট্যাবলেটের মতো আকৃতির কালির বড়ি বেরিয়ে আসত। তারপর কৌটোতে ভর্তি করা হত। একটা পাল্লায় একটা নির্দিষ্ট ওজন চাপিয়ে ১৪৪-টা বড়ি মেপে কৌটোয় ঢালা হত। ১৪৪ মানে বারো ডজন। ঘনাদা, খ্যাঁদাদা এরা বলত ডর্জন। বারো ডজনে এক গ্রোস। একটা কৌটোয় এক গ্রোস করে কালির বড়ি থাকত। এই কৌটোগুলো পিসবোর্ডের বাক্সে ভরা হত। সেই বাক্সগুলো কাঠের বাক্স। এবার ঠেলা গাড়িতে এই মাল চলে যেত রেলে কিম্বা খিদিরপুরে। খিদিরপুর থেকে জাহাজে এই কালির বড়ি চলে যেত বর্মামুলুকে।
সম্ভবত এই লোকায়ত ফর্মুলার উপরই ভিত্তি করে কালি তৈরি শুরু করেছিলেন পিসেমশাইয়ের বাবা উদয়চন্দ্র চক্রবর্তী। যব-চূর্ণের পরিবর্তে, অন্য কোনও স্টার্চ ব্যবহার করতেন। আর কাঠ পুড়িয়ে কার্বন না তৈরি করে, রঙ কিনে নিতেন।
পিসেমশাই বছরে একবার করে রেঙ্গুন যেতেন। দু’তিনবার দমদম এয়ারপোর্টে গিয়েছি। পিসিমা-রাঙাদাদের সঙ্গে এরোপ্লেন ওড়া-নামা দেখেছি। এয়ারপোর্ট গেলে পিসেমশাই ওখান থেকে একটা ক্যাডবেরি চকলেট কিনে আমাদের ভেঙে-ভেঙে দিত। আমরা মানে আমি, রত্না, অশ্রু, বাবু। আমার নিজের বোন এবং ছোট পিসিমার ছেলেমেয়েরা। রেঙ্গুন থেকে পিসেমশাই বর্মি ছাতা নিয়ে আসতেন। খড়ম নিয়ে আসতেন, আর আনতেন বর্মি চপ্পল। খুব মোটা চামড়ার। ভীষণ টেকসই। আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং পিসেমশাইয়ের বন্ধুবান্ধবদের উপহার দিতেন সেই বর্মি চটি।




