উল্টো দূরবিন : পর্ব ৪

Representative Image

দুঃখবিন্দু

এতক্ষণ গুরুজনদের কথা বলার সময়ে— ‘আসে’, ‘করে’, ‘ছিল’ এইভাবে বলেছি। আসেন, করেন, ছিলেন বলা উচিত ছিল। কিন্তু সব গুরুজনদেরই তো তুমি করেই বলতাম; ছিলেন, এলেন বলিনি। একটু  অস্বস্তি হচ্ছে, এখন থেকে তিনি, গেলেন, ছিলেন এভাবেই বলব।

পরিবারটা বড়। কাকামণির মৃত্যুর পর ছোটকাকু ছিলেন। ছোটকাকু যখন ম্যাট্রিক বা স্কুলফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পড়ছে, রাঙাদা, মানে পিসতুতো দাদা তখন কলেজে পড়ছেন। বিদ্যাসাগর কলেজ, কেমিস্ট্রি অনার্স। এটা পরে জেনেছি। অনেক পরে। যদিও রাঙাদার চেয়ে ছোটকাকু দু-এক বছরের বড়-ই। আমার পরেই পরপর তিন বোন। এরপর দুই ভাই। আমরা তাহলে তিন ভাই, তিন বোন হচ্ছি। আমি সবার বড়। আমার জন্ম ১৯৫১ সালে, আমার সবচেয়ে ছোট ভাই ১৯৬৪ সালে, আমার ছোটপিসি প্রায়ই এ-বাড়িতে চলে আসতেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ছোটপিসির চার সন্তান। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। এছাড়া ঠাকুর্মার এক বোন প্রায়ই এসে থাকতেন।

আমার আসল নাম তো স্বপ্নময় নয়, স্বপন। সে-সময়ে স্বপন নামটা ছিল যথেষ্ট আধুনিক। সে-সময়ে স্বপন নাম বেশি ছিল না, এখন যেমন প্রচুর স্বপন। শ্মশান স্বপন, নাটা স্বপন, লম্বু স্বপন, ট্যারা স্বপন, হাতকাটা স্বপন ইত্যাদি। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় একজন স্বপন ছিলেন। অধ্যাপক স্বপন মজুমদার। আর-একজন গায়ক স্বপন গুপ্ত। আমার সমবয়সি বা দু-এক বছরের ছোট, অধ্যাপক স্বপন চক্রবর্তী। এঁরা সবাই প্রয়াত।

‘স্মৃতি জুড়ে পড়ে আছে পঞ্চাশ ফুটের কালো বারান্দাটা!’ স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কলমে ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৩…

শুনেছিলাম, আমার স্বপন নামটা রেখেছিলেন আমার কাকামণি। তখন সদ্য স্বাধীন দেশ। নেহেরু বলেছেন, নতুন ভারত গড়বেন। নতুন-নতুন কারখানা হবে, নদীবাঁধ হবে, সেচ হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে। আর কাকামণিও ইঞ্জিনিয়র। নতুন ভারত তৈরির উনিও একজন। ওঁরা আগামিদিনের সুখ-স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমি কীভাবে এবং কেন স্বপ্নময় হলাম, তা পরে বলা যাবে খনে।

আমার ভাইদের নাম তপন এবং বিজন। বোনদের নাম নীলিমা, পূর্ণিমা এবং অনিমা। পিসতুতো বোনের নাম রত্না এবং বুলা, ভাইদের নাম বাবু এবং বিশু। আমি ডাকনামগুলোই বললাম। আমার সহোদর বোন নীলিমার ডাকনাম অশ্রু, পূর্ণিমার ডাকনাম পুন্নি, অনিমার— আওয়া। ‘আওয়া’ নামটার জন্মকাহিনি বড় মজার। পিসতুতো বোন বুলা আর আওয়া একই বয়সি প্রায়। বুলা অনিমা নামটা উচ্চারণ করতে পারত না, ওর তিন-চার বছর বয়সে। আওয়া বলে ডাকত। তারপর কীভাবে যেন ওই আওয়া নামটাই পারিবারিক স্বীকৃতি পায়। আমরা, মানে আমরা ভাইবোনেরা এবং ছোটপিসিমার ছেলেমেয়েরা প্রায় একসঙ্গেই বড় হয়েছি। আমাদের শৈশব কেটেছে ওই কালো বারান্দা এবং ঝুলবারান্দায়।

পুরী ছিল বাঙালির হাওয়া বদলের অন্যতম ঠিকানা

কাকামণির মৃত্যুর কিছুদিন পর বাবা আমার দাদু-ঠাকুরমাকে পুরী পাঠালেন শোক ভুলবার জন্য। সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। মেজপিসেমশাই একটা বাড়ি ঠিক করে দিলেন। ওটা তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি। মাতৃকুটির। আমাদের সঙ্গে বড় পিসেমশাই এবং বড়পিসি। বড়পিসি খুব সুন্দরী ছিলেন। হয়তো সেই সময়ের ডাকসাইটে সুন্দরী। ওদের কোনও সন্তান ছিল না। বড় পিসেমশাই মিলেটারিতে ছিলেন। জাপান গিয়েছিলেন শুনেছি। আমার বয়স তখন কত? বছর সাতেক। সেই প্রথম সমুদ্র দেখার স্মৃতি আজও কেমন যেন করে দেয়। একটা ঘোড়ার গাড়িতে উঠেছি, রাস্তা দিয়ে যেতে-যেতে যেই না বাঁক নিল, দেখি কী একটা দৃশ্য। নীল জল আর নীল আকাশ একাকার। কী বিরাট, কী বিশাল! অসীম শব্দটার মানে জানতাম না। অসীম কী, বোঝার বয়স তখন নয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে অসীম শব্দটা সেই সমুদ্র-দৃশ্যটা মনে পড়ে।

পুরীর কথা এখন থাক। বলছিলাম তো সেই বাসাবাড়িটার কথা। সেই কালো বারান্দাটার কথা। কালো বারান্দা জানে আমার দুঃখ কথা। জানে কেন বলছি, জানত। এখন তো সেই বাড়িটাই নেই। ভেঙে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। পাঁচতলা। অনেক বছর আগেই। জ্ঞান হওয়ার পরেই আমি যেন কী করে বুঝে গিয়েছিলাম, আমার মা বড় দুঃখী। সারাদিন ধরে কাজ করত। অনেক কাজ। কাজের লোক একজন ছিল, বাসন মাজা, ঘর মোছা, কয়লা ভাঙা, তাছাড়া উনুন ধরানো, রান্না সবাইকে পরিবেশন করা, আমার পরের বোন-ভাইগুলোকে বড় করা। কিছুদিন পরপরই তো সংসারে নতুন শিশু আসছিল। সংসার সামলে, বাচ্চাগুলোকে সামলে, মা কী করে পারতেন ভাবলে অবাক লাগে। কাকামণির মৃত্যুর পর ঠাকুর্মা বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। সাংসারিক কাজে অনেকটা উদাসীন ছিলেন বেশ কিছুদিন। আমার মাকেই করতে হত সবকিছু। তখনকার সময়ে উনুন ধরানোটা ছিল একটা বিচ্ছিরি রকম ঝকমারি। ঝামেলা-ঝকমারি শব্দগুলোর প্রয়োগ করা হল এ-সময়ের প্রেক্ষিতে।

তখন সবাই কয়লার উনুনেই রান্না করত। কয়লার বড়-বড় চাক দিয়ে যেত বাড়িতে। কয়লার দোকান ছিল পাড়য়-পাড়ায়।

২৫টাকা মন ছিল মনে আছে ছয়ের দশকে। এক মন মানে চল্লিশ সের। উনচল্লিশ কেজির মতো। প্রথমে ঘুঁটে সাজিয়ে টুকরো করা কয়লা উনুনে সাজিয়ে তার উপর আবার ঘুঁটে, গুল, সাজিয়ে উনুনের তলায় আগুন দিয়ে পাখার বাতাস দিতে হত। প্রথমে ঘুঁটে জ্বলত, ঘুঁটের আগুন কয়লায় সংক্রমিত হত। খুব ধোঁয়া হত। ধোঁয়ার কুণ্ডলী রান্নাঘর ছাড়িয়ে বাইরে আসত। ধোঁয়া হামাগুড়ি দিত হাওয়ায়। সেই ধোঁয়ায় দাদু কাশতেন, বাড়িতে অন্য গুরুজন থাকলে কাশতেন। মা লজ্জা পেতেন। যেন ওদের কাশির জন্য মা দায়ী। জল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে মায়ের আঙুলের ফাঁকে হাজা হত। ঠাকুর্মা বলতেন, তুমি আলুসিদ্ধ মাইখোনা বউমা, তোমার হাতে হাজা।

কিছুদিন পরপরই তো সংসারে নতুন শিশু আসছিল। সংসার সামলে, বাচ্চাগুলোকে সামলে, মা কী করে পারতেন ভাবলে অবাক লাগে। কাকামণির মৃত্যুর পর ঠাকুর্মা বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। সাংসারিক কাজে অনেকটা উদাসীন ছিলেন বেশ কিছুদিন। আমার মাকেই করতে হত সবকিছু।

যেন এই হাজা হওয়া মায়ের অপরাধ। পিসিরা দুপুরবেলায় কুঁচি দেওয়া শাড়ি পরে ম্যাটিনি শো-এর সিনেমা দেখতে যেত; মায়ের কি যাওয়ার উপায় আছে? বাবাও মায়ের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করত। মা একা-একা কাঁদত। উপরের ছাদে গেলে একটা বট গাছের ডালপালা দেখা যেত। গাছের ডালে লাল-লাল বটফল। মা একা-একা বটগাছের কাছে গিয়ে কেন দাঁড়িয়ে থাকত চুপচাপ? কাকে বলবে মা নিজের কথা, নিজের ব্যথা? ওই বট গাছটিকেই বলত?

আমার মায়ের নিজের মা ছিল না। মা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলেন। মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কী করে ওটা এসেছিল জানি না।  মা রবীন্দ্রসংগীত জানত। বাবার বিয়ের ব্যাপারটা নাকি আমার মেজ পিশেমশাইয়ের জন্যই হয়েছিল। উনি মায়ের গানের কথা জানতেন। তখন, ১৯৪৮ সালে রবীন্দ্রসংগীত শব্দটা খুব প্রচলিত নয়। রবিবাবুর গান বা রবি ঠাকুরের গানই বেশি প্রচলিত। মেজপিশেমশাই রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন খুব। এই সংসারে মায়ের আগমন রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়েই, কিন্তু মা গাইতে পারত না। সময় কোথায়। হারমোনিয়ামের সঙ্গে একান্তে কথা বলত। হারমোনিয়ামের দিকে তাকিয়ে থাকা মায়ের দু’চোখে জল দেখেছি দু’ফোঁটা। ওই দু’ফোঁটা জল দুঃখ শব্দটার মাঝখানে বসে থাকা বিসর্গের মতোই যেন।