১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫। স্বপ্না দেবের প্রয়াণের ঠিক পর পরই, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যখন খুব সংকোচে জানতে চেয়েছিলাম যে, তাঁর পক্ষে কিছু লেখা সম্ভব হবে কি না— উত্তরে তিনি মেসেজে জানিয়েছিলেন, ‘অনেক দিনের পুরোনো বন্ধুকে নিয়ে দু-চারটে কথা লিখতে খুবই ইচ্ছে করছে…’ ইত্যাদি-ইত্যাদি। নির্ধারিত দিনে এরপর যখন সে-লেখা আনতে শমীকবাবুর বাড়িতে যাই, উনি আমাকে দেন মাত্র দেড় পাতার একটি লেখা— স্বপ্না দেবের সঙ্গে তাঁর কীভাবে প্রথম আলাপ হয়েছিল, সেই আলাপটুকুর বিবরণ। অন্য কোনও স্মৃতি সে-লেখায় নেই। মনে আশা ছিল, আরও অনেক কথাই হয়তো জানা যাবে স্বপ্না দেব সম্পর্কে; কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না শেষমেশ। অবশ্য আশার ধর্মই তাই, নইলে আর আশা করা কেন! তবে একটা শব্দ, ওই লেখা থেকেই, নতুন করে গেঁথে যায় মনে— ‘আত্মপ্রত্যয়ী’। কেন এই কথা ক-টা বললাম? কেননা, স্বপ্না দেবের জীবন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যদি ভাবতে বসি, ওই একটা শব্দ দিয়েই অনেকটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে।
এ-বছর জানুয়ারি মাসের গোড়ায়, যাদবপুরের ত্রিগুণা সেন প্রেক্ষাগৃহে স্বপ্না দেবের যে-স্মরণসভা হয়, সেখানে প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মকথা ‘আমার শেকড়-বাকড় অথবা নেম ড্রপিং’। চিত্রদেব মজুমদারের প্রচ্ছদ, মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা। ‘প্রকাশকের নিবেদন’ অংশ পড়ে জানতে পারছি, ২০১১ ও ’১২ সালে স্মৃতিকথার দুটো পর্ব লিখেছিলেন স্বপ্না দেব ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকায়— ‘আত্মকথা অথবা নেম ড্রপিং’ এবং ‘আমার শেকড় বাকড়’ শিরোনামে। ওই দু-পর্বের লেখা মিলিয়েই এই আত্মকথার বই। তবে আত্মকথা যেমন সব সময়েই অসম্পূর্ণ, পাঠকের পড়ে মনে হয় আরও অনেক কথা কেন যে লেখক লিখলেন না— এ-বইও তেমনই। স্বপ্না দেব এ-বইতে আরও কিছু ব্যক্তিস্মৃতি যোগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই সংযোজনটুকু করে উঠতে পারেননি। বইয়ের গোড়ায় খুবই স্বল্প কথায় লেখকের যে পরিচিতি অংশ মুদ্রিত হয়েছে শুদ্ধব্রত দেবের বয়ানে, তা পড়লেই আঁচ পাওয়া যায়, এক জীবনে তিনি কত কী করেছেন! ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল মুখ স্বপ্না চক্রবর্তী থেকে ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকার সম্পাদক স্বপ্না দেব হয়ে ওঠার যে-যাত্রাপথ, মূলত তা-ই এই বইয়ের পাতায়-পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে।
একজনকে চেনার জন্য তাঁর শৈশব ও কৈশোর যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অন্য কিছু সেভাবে নয় বোধহয়। জীবন কোন পথে চলবে, তার একটা রূপরেখা, অনেকটাই তৈরি হয়ে যায় ওই বয়সের মধ্যে। এই বইয়ের ‘আমার শেকড়-বাকড়’ অংশটি সেই কারণেই এত আকর্ষণীয়। আত্মীয়তার নানান টুকিটাকি গল্প কিংবা কিছু দৃশ্য-কোলাজের বাইরে, লেখকের এমন একটা ব্যক্তিত্ব এই অংশে প্রকট— যা আরও পোক্ত হয়ে বাকি জীবন তাঁকে চালিত করবে। বরিশাল থেকে শিকড়চ্যুত হয়ে কলকাতাবাস-পর্বে পিতা সুধীররঞ্জন চক্রবর্তী যখন বাজারের থলেতে বড় কালো হরফে নিজের নাম লিখে পাশে লিখে রাখতেন বরিশাল— তখন স্বপ্না নতুন জুতো-মোজা পায়ে বাবার সঙ্গে এই শহরে পরিচিত হচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবং সেই ঘুরে বেড়ানো কেমন? তাঁর বয়ানে ‘গটমট করে ঘুরে বেড়াতাম’। এই দৃপ্ত, ধারালো পরিব্রাজন-ই ছিল তাঁর সম্পদ। যেমন সম্পদ ছিল তাঁর স্পষ্ট কথন। সুধীররঞ্জন ছোটবেলায় যখন তাঁকে নিয়ে যান অফিসের বড় সাহেবের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন বলে, তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এই নাকি সাহেব? এ দেহি কালা!’ আবার সেই শৈশবেই, তাঁদের বাড়ি লুণ্ঠনকালে হামলাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাবার এক ট্যাহা থাকলে তোমাগো আট আনা দিয়া খায়, তোমরা আইছ আমাগো বাড়ি লুট করতে?’ কোনও অবস্থাতেই যে নিশ্চুপ থাকা যায় না, তা তিনি ছেলেবেলা থেকেই বুঝতেন। কমিউনিষ্ট সুবাতাস, এবং সেই বাতাসে বারুদের গন্ধ— এসব টপকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তিনি যে তাঁর শিকড় চারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছিলেন, তার মূল শক্তিই ছিল তাঁর আত্মপ্রত্যয়, স্বচ্ছ ভাষণ।

‘বাঙাল’ পরিচয়ে এক সময়ে কলকাতা-বসবাস যখন মনে হত ‘দুঃস্বপ্ন’, যখন মনে হত চোর-চোর হয়ে বেঁচে থেকে লাভ কী, একপ্রকার হীনম্মন্যতায় ভোগার শুরু যখন থেকে— পরিবর্তিত পরিস্থিতি সইয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন স্বপ্না। মনোবল বাড়তে থাকে। ১৯৫৩ সালে জোসেফ স্তালিন প্রয়াত হলে, তিনি স্কুলের প্রার্থনাসভায় জানতে চান, স্কুল ছুটি হবে না?
স্কটিশ চার্চ কলেজ, কিশোরবাহিনী, ছাত্র-রাজনীতি, থিয়েটার— তৈরি হয় একটা রঙিন বলয়। ছুটে-ছুটে চলা। বাঙাল মেয়েদের ‘হটর হটর এখানে সেখানে’ চলে যাওয়া— স্বপ্না দেবের জীবনে আশীর্বাদস্বরূপই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৮ সালে দিল্লিতে যুব উৎসব চলাকালীন, কুড়ি টাকা সম্বল করে তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন বলেই-না পি সি যোশীর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা! যোশীজি প্রথম দর্শনেই তাঁকে দেখে বলেছিলেন, ‘কলকাতা থেকে এসেছ? কেমন সুন্দর মেয়ে। তোমাকে আমার বেটার বউ করব।’ পরিকল্পিত জীবনের যে-চেনা ছক, তার বাইরে বেরিয়ে অনেক বড় করে জীবনকে দেখতে চেয়েছিলেন স্বপ্না দেব। এবং চাইলেই তো সব সময়ে পাওয়া যায় না, তিনি পেয়েওছিলেন। ব্যক্তিজীবনে যেমন, সাংবাদিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনেও তেমন। অভিজ্ঞতার এত বিচিত্র মণিমুক্তো তাই তাঁর ঝুলিতে।
এই আত্মকথা পড়লে মালুম হয়, খুব গুছিয়ে, ভেবেচিন্তে তা লেখা নয়। ছেঁড়া-ছেঁড়া স্মৃতি। কাটা-কাটা। যখন যা মনে এসেছে, লিখেছেন। প্রথম অংশ ‘আমার শেকড়-বাকড়’ এবং দ্বিতীয় অংশ ‘… অথবা নেম ড্রপিং’— দু-ক্ষেত্রেই তাই। তথ্যে ভারাক্রান্ত নয়— কিন্তু একটা কর্মব্যস্ততা, দৌড়ঝাঁপ যেন তাঁর অনায়াস গদ্যভাষায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্দীপনা চালনা করেছে স্মৃতিকে, স্মৃতি চালিত হয়েছে সেই সূত্র ধরে। এবং এই বইয়ের আরও একটা ভাল লাগার দিক হল, যেসব চরিত্রচিত্রণ লেখক ঘটিয়েছেন এই বইয়ে, তা এতই পরিষ্কার— তাঁরা মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে ওঠেন চোখের সামনে। জলের ট্যাঙ্কের ওপরে বসে কেয়া চক্রবর্তী তাঁকে লেখা বিস্তর প্রেমপত্র পড়ে শোনাচ্ছেন, পি সি জোশী জাপটে ধরে আদর করছেন কল্পনা দত্তকে, মোহিত মৈত্র আনন্দময়ীর জন্য কিনে আনা শাড়ি দেখে বলছেন তাঁর মাকে সেই শাড়িতে মানাবে ভাল— এমন নানান রংদার ঘটনা এই বইয়ে ছড়িয়ে রয়েছে।
শেষ করি দুটো মন্তব্য দিয়ে। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাছে স্বপ্না দেবের সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। তিনি তাঁকে যে ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা নিয়ে একদিন কথা-কাটাকাটি হয়। জল গড়ায় কিছুদূর। বিবেকানন্দবাবু শেষে স্তম্ভিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে দেখতে তো স্নিগ্ধ একটি জুঁইফুলের মতো। ভিতরে এত তেজ!’ স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াকালীন মেয়েদের ডিন মিসেস জোসেফও বলেছিলেন কাছাকাছি একটি কথাই, ‘শি ইজ ডিফারেন্ট!’ জীবন-সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বহুমুখী কর্মকাণ্ডে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে, কোনওরকম আপোস না করে কীভাবে ‘স্বতন্ত্র’ থাকা যায়— এই বই সেই সাক্ষ্যই বহন করে।



