আরামের দ্বার ভেঙে
১৯০০ সালের সামার অলিম্পিক্স-এ বন্দুক-চালনার পারদর্শিতা মাপার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল সত্যিকারের জ্যান্ত পাখি। খাঁচা থেকে বেরিয়ে একে-একে তারা উড়ে যাবে, গুলি করে মারতে পারলে বাড়বে পয়েন্ট! পরপর দুটো ‘টার্গেট’ মিস করা অবধি সুযোগ পাবে এক একজন প্রতিযোগী! একাই মোট বাইশটি পাখিকে নিখুঁত নিশানায় হত্যা করে প্রথম হয়েছিলেন সেদিন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগী লিওঁ দে লুন্ডেন!
আমরা জানি, গোটা পৃথিবীর শিকার-কাহিনিগুলো ভরে আছে নির্বিচার পাখি মারার উল্লাসে। ‘বীরত্ব’-ময় বাঘ শিকারের বয়ান চলতে-চলতে পাখি-মারার বিবরণ যেন টানটান দৃশ্যের পর ‘জনি লিভার’ হয়ে আসে, একটানা ‘রোমাঞ্চ’-এর পর ওই-একটু আমোদ আর-কী! আমাদের এইসব অনবদ্য কৃত্বিত্বেরই স্বীকৃতি চিরস্থায়ী হয়ে আছে আমাদের নিত্য-ব্যবহার্য ভাষায় : ‘এক ঢিলে দুই পাখি’!
এই বই কি আদৌ রাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত? পড়ুয়ার দপ্তর পর্ব: ২, লিখছেন আশিস পাঠক…
বলা হয়, এবং ঠিকই বলা হয় যে, পশুরা যদি তাদের পুরাণ-কথা লিখতে পারত তবে সেখানে সবচেয়ে হিংস্র দানবদের চেহারা হত অবিকল মানুষের মতো। কিন্তু সীমাহীন হিংস্রতাতেই মানুষের ‘কৃতিত্ব’ থেমে নেই, মানুষ পশুপাখিদের উপর আরোপ করেছে তার যাবতীয় কুসংস্কার-ভরা কদর্য জাজমেন্টাল মনের বিষ। তার কাছে কালো বেড়াল অশুভ, এক শালিখ অপয়া, শেয়াল সবসময়ই নিন্দার্থে ধূর্ত, যে-শুয়োর শিশুটি এইমাত্র জন্মাল সে-পর্যন্ত এক কুৎসিত গালি!
ভাষা খুব মজার জিনিস। তা খুব সযতনে ধরে রাখে আমাদের পাপ ও পুণ্য, আমাদের প্রেম ও বিদ্বেষ, আমাদের মহত্ত্ব ও নীচতার নানা অভিজ্ঞান। গালি হিসেবে আমরা যখন বলি ‘চামার’ তখন সবসময় জাতিঘৃণার বয়ানটা আমরা জ্ঞানত উচ্চারণ করতে চাই তা নিশ্চয়ই নয়, কিন্তু প্রতিবার এই সত্যটা তবু ওর ভেতরে থেকেই যায় যে, ওই গালি এক ঘৃণাপ্রবণ সমাজমন থেকে আদতে সৃষ্টি হয়েছিল।

একটা ছোট্ট বই। তার প্রচ্ছদে আটটি প্রাণীর ছবি। বেশ বড়-বড় চোখ করে তারা সকলে তাকিয়ে আছে পাতার কেন্দ্রের দিকে। সেই কেন্দ্রে, প্রচ্ছদের মাঝ বরাবর, বড় করে লেখা আছে: মানুষ। বইটির নাম ‘মানুষ’। পঁচিশটি আর্টপ্লেট আর একটি ছোট্ট কিন্তু অসামান্য ভূমিকা দিয়ে তৈরি তিরতিরে এক বই। কিন্তু এ-বই শুধু পড়ার নয়, এমনকী শুধু দেখারও নয়। এ বই যতক্ষণ পারা যায়, ছুঁয়ে বসে থাকবার বই। আরাম নয়, উপশম তো নয়ই, এ বই ছুঁলে কিন্তু তীব্র একরকমের অস্বস্তি হয়। শিল্পী এবং ভাবুক উদয় দেব সেই অস্বস্তিকেই বুনে দিয়েছেন এই বইয়ের ছবি-রং-তুলি-কথায়; কেননা, শুদ্ধতার দিকে যাত্রার সমস্ত মানুষী-পথ অনিবার্যভাবে অস্বস্তি দিয়েই গড়া।
দার্শনিক জাক দেরিদার এক অসামান্য বই আছে যার নাম ‘দ্য অ্যানিমাল দ্যাট দেয়ারফোর আই অ্যাম’। সে বইয়ের গোড়ায় দেরিদা বলছেন, তিনি সবে বেরিয়েছেন স্নান সেরে, সম্পূর্ণ নগ্ন তখন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি জানেন, ঘরে তখন কেউ নেই। হঠাৎ দেখলেন এক বেড়াল কোত্থেকে এসে হাজির হয়েছে। এই বেড়াল কি ‘কেউ’? এ কি দেখে? নাকি ‘দ্রষ্টা’ একা মানুষই? গোটা বইজুড়ে দেরিদা দেখাতে থাকেন একা মানুষকে দ্রষ্টা ভাবার বিপদের কথাটা। দেরিদার বইটি শেষ করার পরও ওইরকম অস্বস্তি হয়, উদয় দেবের বইটির প্রচ্ছদের মতো, আমরা যেন বসে আছি এই সংসারের কেন্দ্রে আর সব পশুপাখি জীবজন্তু আমাদের ‘দেখছে’, বলছে যে-পৃথিবী ছিল আমাদের সকলের তাকে এরকম করে তুললে কেন তোমরা?
উদয় দেবের এই আশ্চর্য বইটির জোর হল এ তো তত্ত্ব‘কথা’র বই নয়, ছবির বই। ছবি তৈরি করে দৃশ্য, দৃশ্য তৈরি করে মর্মান্তিক অভিঘাত, শব্দের সামর্থ্যকে তা বহুদূরে ছাড়িয়ে যায়। ফলে প্রথম আর্টপ্লেটেই যখন আমরা দেখি গাড়ি চড়ে যাচ্ছে এক শুয়োরছানা আর পথের পাশে দাঁড়ানো এক ভ্যাবাচাকা মানুষ-শিশুর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে উদ্ধত গালি, ‘মানুষের বাচ্চা’, তখন বুঝতে পারি এ তো ছবি-মাত্র নয়, এ হল এক আয়না। এ ছবি দিয়ে নিজেকে চেনা যায়।
এ-বইয়ের ছোট্ট ভূমিকাটি মন দিয়ে, থেমে থেমে, প্রত্যেক শব্দে খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে, পড়বার মতো এক লেখা। নির্ভার, সহজ গদ্য, যেমন গদ্য লিখতে গেলে সত্যিকারের কলমের জোর লাগে। শিল্পী উদয় দেবের কাছে আরও বেশি করে গদ্য লেখবার দাবি জানিয়ে রাখলুম এই ফাঁকে।
‘‘উন্নত’ মস্তিষ্কের মানুষের সঙ্গে পশুদের পার্থক্য একটাই। মানুষ অকারণে অন্যের অর্থাৎ জন্তুজানোয়ারদের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু জন্তুজানোয়ারেরা অকারণে মানুষের ক্ষতি করে না।’, লিখেছেন উদয় দেব। এই কথার সঙ্গে তো ষোল-আনা সহমত বটেই, তার-উপরে এই কথার সূত্র ধরে আরও কিছু কথা তৈরি হতে থাকে আমার নিজের কাছে।

মানুষ যেখানে ‘অকারণে’ অন্যের ক্ষতি করে সেইখানে মানুষ বর্বর, কিন্তু সেই বর্বরতার চেহারাটা এতই স্পষ্ট যে মানুষকে তার বিরুদ্ধে সজাগ করাটা হয়ে ওঠে অপেক্ষাকৃত সহজ। সেইজন্যেই ‘ট্রফি-হান্টিং’ গোত্রের শিকারের মতো নৃশংস স্যাডিস্টিক ক্রিয়াটি আইন করে প্রায় সর্বত্র বন্ধ করা গেছে। কুকুরের লেজে কালীপটকা বেঁধে মজা-লোটা আমোদগেঁড়ে মানুষ সংসার থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে তা নয়, কিন্তু তার বিপ্রতীপে মানুষের ভিড় বাড়ছে ক্রমশ। মুশকিল হল সেইখানে, যেখানে অন্যের ক্ষতি করবার জন্য মানুষ ‘কারণ’ তৈরি করে নিয়েছে। আঘাত করবার, টর্চার করবার, ব্যবহার করবার, এক্সপ্লয়েট করবার বুদ্ধিসম্মত ‘কারণ’, জাস্টিফিকেশন! সেইটে হল সত্যিকারের কঠিন ঠাঁই। তাকে প্রতিহত করা যাবে কীভাবে? ব্যাডমিন্টনের একটা (ভালমানের) শটল কক বানাতে রাজহাঁসের বাম ডানার ষোলটা পালক লাগে। হ্যাঁ, বাম ডানারই শুধু, তাতে শটল ককের ‘কার্ভেচার’ স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। একখানা রাজহাঁস মারলে তার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটা বা ছটা ‘আদর্শ’ পালক মেলে। তার মানে খেয়াল করে দেখুন, একটা শটল কক বানাতে অন্তত তিনটে রাজহাঁসকে মারতে হয়। নয়তো জ্যান্ত ছাড়িয়ে নিতে হয় পালকগুলি। এই অত্যাচার (exploitation) কি ‘কারণ-যুক্ত’ না ‘অকারণ’? ‘ট্রফি-হান্টিং’কে অকারণ নির্মমতা বলে যাঁরা মেনে নিয়েছেন তাঁদেরও অনেকসময়ে এ-কথা বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে যে এ-ও আদতে এক ‘অকারণ’ নিষ্ঠুরতা, ক্রীড়ার নান্দনিকতা দিয়ে একে ন্যায্য বলে দেগে দেওয়া চলে না কোনওমতে। আপনার প্রিয় শ্যাম্পুটি অসাবধানতা বশে চোখে ঢুকে গেলে আপনার চোখ কতখানি জ্বালা করতে পারে, তা বোঝার জন্য যখন ল্যাবরেটরিতে সেই শ্যাম্পু এক খরগোশের চোখের উপর পরীক্ষা করা হয় তখন তাকে ‘বাপরে-কী-মহৎ-কারণ’ বলে মনে হলেও আদতে তা এক নির্মম অকারণ, এ কথা আজও বুঝিয়ে ওঠা মুশকিল!
ভাল্লুক সম্বন্ধে নানা তথ্য জানাতে গিয়ে মদনমোহন তর্কালঙ্কার তাঁর শিশুশিক্ষা বইতে শিশুদের শিখিয়েছিলেন এইসব কথা: ‘কোন কোন দেশের লোকেরা ভালুকের চর্ম্মে বিছানা গায়ের কাপড় ও টুপি প্রস্তুত করে। এবং বরফের উপর দিয়া চলিতে পারিবার জন্য জুতোর তলাও গড়ে। ভালুকের নাড়ী অভ্রের মত স্বচ্ছ এজন্য ঐ লোকেরা সেই নাড়ীর চর্ম্মে জানালার পরদা তৈয়ার করে। ঐ পরদায় আলো আটকায় না। আর ভালুকের ঘাড়ের হাড় দিয়া তাহারা ঘাসও কাটিয়া থাকে।’ শিশুদের জানানোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এইসব শিক্ষা, তাতে সন্দেহ নেই! দুনিয়ার সব প্রাণীকে এইভাবে কেটেকুটে ছাড়িয়ে-ছুড়িয়ে মেখে-চেখে আমরা তাদের পরম ‘উপকারী’ প্রাণী বানিয়ে ছেড়েছি। আমাদের উপকার করতে-করতে প্রাণীকূলের নাভিশ্বাস ওঠার দশা!এইসব কথা যে উদয় দেবের বইটায় লেখা আছে তা নয়, কিন্তু এইসব কথার ধরতাই ওঁর বইয়ের মায়াবী পাতাগুলোর মধ্যে থেকে জেগে উঠতে থাকে বলেই আমার মনে হয়। ওঁর বইয়ের বহিরঙ্গে ছড়ানো আশ্চর্য মায়া তাই আসলে সদর্থে ‘প্রতারক’, এ বই আমাদের অলস মনের বিরুদ্ধে এক কঠোর ঝাঁকুনি।

এই বইয়ের পঁচিশটি ছবির মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছবি কোনটি? আমার বিচারে যে ছবিটি সবচেয়ে অস্বস্তিকর, সেইটিই। বইয়ের ঠিক মাঝামাঝি, বারো নম্বরে, দেখতে পাই, এক মুরগি সাইকেলে করে চলেছে, তার হ্যান্ডেল থেকে ক্যারিয়ার থেকে ঝুলছে পায়ে দড়ি বাঁধা উল্টো করে টাঙানো একগুচ্ছ মানুষ! বাকি চব্বিশটি ছবিতে অল্প কিছু সংলাপ বা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, একমাত্র এই ছবিটি শব্দহীন। আমার মতে, তাই, এই ছবিটিই সর্বোচ্চ বাঙ্ময়! জঙ্গলে-থাকা বাঘ সিংহের অধিকারের কথাটা তবু না-হয় শহরজীবী আমরা মেনে নিলাম, কিন্তু মুরগির কি কোনো অধিকার আছে? সে যতদিন বেঁচে আছে তার স্বস্তি-অস্বস্তি নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনো দায় কি আমাদের আছে? মাথাটা নীচের দিকে করে ঝুলিয়ে যখন মুরগির দলকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন মাথায় রক্ত নেমে তাদের মাথাটা কেমন-করে ফেটে যাওয়ার দশা হয়, তা নিয়ে কি আমাদের আদৌ ভাবার প্রয়োজন আছে? যে-প্রশ্ন আমাদের দৈনন্দিন স্বার্থের থেকে দূরে তা সহজ প্রশ্ন। যে-প্রশ্ন আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিসরের মধ্যে ঢুকে পড়ে তা-ই সত্যিকারের কঠিন প্রশ্ন। এই কঠিন প্রশ্নটি করতে পারে এই বিশেষ ছবিটি। এই ছবির কোনও তুলনা নেই। ‘মানুষের ধর্ম’ বইতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন মানুষের একটা বড়ো গুণ হচ্ছে যে সে ‘দুঃখভীরু’ নয়, সে নিজেকে ‘আরামের দ্বার ভেঙে’ বাইরে বের করতে জানে, সেইখানেই মানুষের জয়। উদয় দেবের এই ছোট্ট বইটি আমাদের আরামের দ্বারে নাড়া দেয়। এই বইয়ের জয় হোক।
মানুষ। উদয় দেব। হিউমার ইংক স্টুডিও। ৩৫০ টাকা




