কালীঘাটে আছে কালী
‘মরি হায় হায় রে কলকাতা কেবল ভুলে ভরা!’
রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই গান প্রথম শুনেছিলাম কালীবাড়ির নাটমন্দিরে। সেই ছেলেবেলায় ভেবেছিলাম, কলকাতা ভুলে ভরা থাক, কালীঘাট নয়। কলুটোলায় কলু না থাক, কাঁকুড়গাছিতে কাঁকুড় না পাওয়া যাক, একটাও সাঁকো নেই অথচ হোক সেটা জোড়াসাঁকো— সারা কলকাতা ভুলে ভরে যাক, কিন্তু কালীঘাটের বেলায় তা হবে না। এখানে একদম ঠিকঠাক, কালীও আছে, আদিগঙ্গার ঘাটও আছে।
কিন্তু ক’দিন পরেও চোখ খুলে দেখলাম আজব কাণ্ড!
চৈত্রের শেষে গাজনের সং বের হয়। সে সঙে কী নেই! শিব-পাবর্তী থেকে বাবু-বিবি, লর্ড ক্লাইভ থেকে ক্লাইভ লয়েড। দেদার মজা। আমরা সং দেখি আর লাল-নীল জলের বরফ চাঁচা সরবত খাই। একমাথা রোদ আর একগা ঘাম নিয়ে চই-চই করি। সেই সং এসে শেষ হয় নকুলেশ্বর তলায়। পরের দিন ঝাঁপ! ওখানেই উঁচু রোয়াকওয়ালা বাড়িতে পর-পর বড়-বড় ছাগল বাঁধা থাকত। দেশি ছাগল নয়, পাটনাই ছাগল। ছাগলের বাঁটে সুন্দর জামা পরানো থাকে। যাতে মাছি-মশা না বসে। দুধেল বাঁট দেখে মানুষের কুনজর না লাগে। সারা কালীঘাটের দুবলা বাচ্চারা ওই ছাগলের দুধ খেত। এখন যেমন দুয়ারে সরকার থেকে অনেক কিছু দুয়ারে আসে, তখন দুয়ারে ছাগল আসত। টং টং ঘণ্টা বাজত। সুরেলা ডাক— মাইজি! চোখের সামনে দুধ দুইয়ে যেত।
কালীঘাটের ওয়াহিদা রহমান ও ড্যানিবউদি! পড়ুন: ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ২…
ওই রোয়াকেই একবার দেখলাম সং শেষে শিব-পাবর্তী-লর্ড ক্লাইভ-ক্লাইভ লয়েড সবাই একসঙ্গে গাঁজা টানছে, এমনকী বাঘ-সিংহও জুটেছে তাদের সঙ্গে। মানুষে পশুতে কোনও ভেদাভেদ নেই।
মানুষে পশুতে ভেদাভেদ থাকত না আর-একটা বেলায়— সেটা হল শ্মশানকালীর ভাসানের দিন। শ্মশানকালী বিসর্জনের বিশাল শোভাযাত্রা। শ্মশান এলাকার মস্তান ছিল ভীম। চেতলার দিকে তখন ধ্রুবর হেব্বি নামডাক। সে-সময়ে ভীম আর ধ্রুব দিন নেই রাত নেই সোডার বোতল আর পেটো ছোঁড়াছুড়ি করত। কিন্তু শ্মশানকালী পুজোর সময়ে দু’জনেই শান্তশিষ্ট মায়ের সন্তান হয়ে মাতৃ সাধনায় রত থাকত। ভীমের এলাকা পেরিয়ে শোভাযাত্রা পার হত টুপি কাশীর এলাকার ওপর দিয়ে, তারপর কালীমন্দির পেরিয়ে বাঘাদার বাজার পাড়া। এই দাদারা সবাই ছোট-ছোট জায়গিরদার! কিন্তু এসবের মধ্যেও একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত। সেটা শ্মশানকালীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে— তাহল বস্ন তুবড়ি। কে কত বড় বস্ন বানিয়েছে। বড়-বড় হাঁড়ির মতো বস্ন তুবড়ি জ্বলত শোভাযাত্রাকে থমকে দিয়ে এবং আরও আলোকোজ্বল করে।
তবে একটা চান্স থাকত— শোভাযাত্রা চলে গেলেই চার পাশে কোথাও না কোথাও মারামারি লাগত। বেশ কিছু সোডার বোতল উড়ত, বেশ কটা গুড়ুমগাড়ুম করত। পরের দিন নানা রোমহর্ষক গল্প শুনতাম। তার বেশিরভাগ গল্পই ছিল ছুঁচোবাজি! ও-পাড়ার মেয়েদের দিকে এ-পাড়ার ছোকরারা ছুঁচোবাজি ছুঁড়েছে!
তখন চারপাশের বেশিরভাগ গণ্ডগোলই হত হয় ফুটবল ম্যাচ, নয় মিস ম্যাচ নিয়ে। এ-পাড়ার ছেলে ও-পাড়ার মেয়েকে আওয়াজ দিল, চিঠি দিল। মেয়ে রাজি হলে ল্যাঠা চুকে গেল। ম্যাচিং হলে তারা লেকের দিকে টাচিং-এ চলে গেল। রাজি না হলেই এ-পাড়ার দাদারা ও-পাড়ার ছেলেটার ঠ্যাং খোঁড়া করে দেবে বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর যে-কোনও পাড়ার ফুটবল টুর্নামেন্টে অফসাইড গোল ফাউল নিয়ে হাঙ্গামা লেগেই থাকত। কিন্তু তারপরেও ফি-বছর ফুটবল টুর্নামেন্ট হত।
পাড়ায়-পাড়ায় এসব নিয়েই বড় কাওতালি! তখন সর্বত্র তোলাবাজি, কাটমানি, প্রোমোটারি আমদানি হয়নি। আমাদের এদিকটা ছিল বাঘাদার। বাঘাদা আবার যেহেতু আমার জ্যাঠতুতো দাদা, তাই আমার স্পেশাল খাতির ছিল। তখন সবাই যুব কংগ্রেস। বাঘাদা ছিল প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর হাতের ছেলে। তবে রাজনীতি পেরিয়ে পাড়ায়-পাড়ায় ‘পাড়ানীতি’ই বড় ছিল।
ফর্মুলা এক। পাড়ার ছেলে অন্যায় করলে, শাসন করব আমরা। তোমরা কে হে!
ভুলে ভরা না থাক, কালীঘাট যে আজব জায়গা এ-নিয়ে আমার কোনও দ্বিধা নেই। অবশ্য বর্তমানে আমার মতো অনেকেরই দ্বিধা নেই। এখন মা কালীকে টপকে অ্যালগরদিমে মমতাময়ী। কালীঘাট বলতে হরিশ চ্যাটার্জি!
যাইহোক কালীঘাটে ফিরি।
আমার ছোটবেলায় কালীঘাটে দুটো জিনিস খুব বিখ্যাত ছিল। বিশেষত আমাদের ছোটদের নিজের মতো করে বিখ্যাত। তারমধ্যে একটি হল— ‘কালীঘাটের কুকুর’! কেউ কিছু দিয়ে আবার নিয়ে নিলে তাকে কালীঘাটের কুকুর উপাধি দেওয়া হত। অন্য কোনও জায়গার কুকুর নয়। অ্যালসেশিয়ান ডোবারম্যান নয়, কালীঘাটের কুকুর!
পাড়ায়-পাড়ায় এসব নিয়েই বড় কাওতালি! তখন সর্বত্র তোলাবাজি, কাটমানি, প্রোমোটারি আমদানি হয়নি। আমাদের এদিকটা ছিল বাঘাদার। বাঘাদা আবার যেহেতু আমার জ্যাঠতুতো দাদা, তাই আমার স্পেশাল খাতির ছিল। তখন সবাই যুব কংগ্রেস। বাঘাদা ছিল প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর হাতের ছেলে। তবে রাজনীতি পেরিয়ে পাড়ায়-পাড়ায় ‘পাড়ানীতি’ই বড় ছিল।
আর কেউ বেশি চাইলে, বেশি দাও-দাও করে, ঘ্যান-ঘ্যান করলে তাকে ‘কালীঘাটের ভিখিরি’ অ্যাখ্যা দেওয়া হত। সত্যি কথা কালীঘাটের মতো এত ভিখারি কলকাতায় আর কোথাও ছিল না। তাদের ভিড় ছিল মন্দিরকে কেন্দ্র করে। কেউ-কেউ ছিল চেনা ভিখিরি। তারা নিয়ম করে পাড়ায় আসত। তাদের দিন বাধা ছিল। এক সপ্তাহ না এলে, পরের সপ্তাহে মা-মাসিরা তাদের খোঁজও নিত। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জানত আগের সপ্তাহে কেন আসেনি।
তবে হৃদয় ফাটানো কিছু ভিক্ষা চাওয়া মনে গাঁথা আছে। ঠিক বন্যার পরে পরে যাঁরা আসতেন। তাঁদের দেখলে সত্যি কষ্ট হত। দুটো রুটির জন্য, একমুঠো চালের জন্য, ক’টা জামা কাপড়ে জন্য সে কী হাহাকার।
এখন কালীঘাটের শুরুয়াৎ এদিকে নবান্ন থেকে স্কাইওয়াক করে মেট্রো স্টেশনের এসক্যালেটরে। আমার কালীঘাটের ছায়াপথের সূচনা হত পটুয়া পাড়ায়। শেষ হত কালীঘাট মহাশ্মশানে। এই কালীঘাট পালা বদলের কালীঘাট।
রাজ্যের মানুষ পালা বদল দেখেছে কালীঘাটে। আমিও তাই দেখেছি, তবে সেরা পালা বদল দেখেছিলাম আপেলের।
আমাদের চক্রবর্তী পাড়ার মুখ থেকে একটু এগিয়ে ছিল তারাপদর ফলের দোকান। তারাপদ বিখ্যাত ছিল তার হাইড্রোসিলের জন্য। সে হাঁটাচলা সময়ে সঙ্গে একটা ব্যাগ থাকত। শরীর বহনের ব্যাগ। সারা কালীঘাটের লোকজনই তাকে চিনত। তার কষ্ট ও দুর্ভোগের কেউ সঙ্গী হয়নি। তার ছেলেও না। অনেকেই তাকে ধরে-বেঁধে ডাক্তার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। ফল হয়নি কিছু। তবে দিন-দিন তার ফলের দোকান বিখ্যাত হয়েছে।
সেই তারাপদর ছেলে ছিল আপেল। আপেল খুব ফর্সা। ওর ছোটবেলা কেটেছে আপেলের পেটিতে। আপেলই ওর প্রধান খাবার ছিল। আপেল একটু বড় হয়েই তার বাবার পরিচয় দিত না। অনেকেই তাকে তার বাবার অসুখ উল্লেখ করে রাগাত। সে ক্রমশ মারকুটে হয়ে গিয়েছিল। এই করে-করে বড় হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আপেল বিবাগী হয়ে গেল।
মধ্যপ্রদেশ হলে ওসব জায়গার ছেলেপুলেরা বাড়ি ঘর ছেড়ে, সমাজের প্রতি রাগ করে বাগী হয়, চম্বলের ডাকাত হয়। আপেলও হল। সে আস্তানা নিল শ্মশানে। দিনরাত মদের নেশায় চুর হয়ে থাকত। বাঁশ মেরে চিতার বডির মাথা ফাটাত।
আমাদের জ্ঞানী নিমাইদার বিশ্লেষণ ছিল— আপেলের গোড়ায় গলদ। তোরা দেখ, ফল পচিয়ে মদ বানানো হয়। ফল পচে গেলে মদ-মদ গন্ধ বের হয় কি না? আপেল কি টাটকা ফল খেত? খেত না। ওর ভাগ্যে পচা ফলই জুটত, ও ছোটবেলা থেকে মদের নেশার মধ্যেই মানুষ হয়েছে। তারপর ওর মা ফলের গাড়িতে উঠে ভেগে হল। ও তো নেশা করবেই। নেশা করার হক ওর আছে।
নেশা করুক তা বলে আপেল ডোম হবে।
হ্যাঁ, শ্মশানে আস্তানা গেড়ে আপেল ডোমের কাজই করত। মড়া পোড়াত।
নিমাইদার বিশ্লেষণ ছিল— রাজা হরিশচন্দ্র রাজা থেকে ডোম হয়েছিলেন, তাহলে?
তাহলে কিছু নয়।
আমার বাবা মারা যেতে, আমরা হরিদেবপুর থেকে কালীঘাট মহাশ্মশানে নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁকে দাহ করার জন্য। মনের ভেতরে ছিল, আমরা হরিদেবপুর চলে এসেছি তো কী হয়েছে— কালীঘাট আমাদের দেশবাড়ি, ওটা আমাদের শ্মশান!
কালীঘাটের শ্মশানে সেদিন আপেল সর্বদা আমার পাশে পাশে ছিল। সান্ত্বনা যেমন দিয়েছে, তেমন কাজেও লেগেছে। দাহকার্য শেষ হলে আপেলই আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে চুল্লির নীচ থেকে অস্থি এনে দিল। অস্থি দিয়ে ডোমেরা টাকা চায়। আপেল বলল— তোকে দিতে হবে না। কাকু তো আমার ফ্যামিলির লোক রে।
এরপরে আর আপেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমার তখন অন্নচিন্তা চমৎকারা। তারমধ্যে অনেকবার নানা মানুষের শবযাত্রায় শ্মশানে গিয়েছি আর আপেলকে দেখিনি।
সেই আপেলের সঙ্গে দেখা হল অদ্ভুতভাবে।
আমার বিয়ের পর-পরই কালীঘাট মন্দিরে গিয়েছিলাম পুজো দিতে। সঙ্গে আমাদের বাড়ির লোকজনও ছিল। হঠাৎ দেখলাম মন্দিরে আমাদের সামনে আপেল এসে হাজির। গায়ের রং ফেটে পড়ছে, রোগা ডিগডিগে, মুখটা তেলা মেরে। অতিরিক্ত মদ্যপানের এফেক্ট। পরনে হাঁটুর একটু নীচ পর্যন্ত ধুতি আর ফতুয়া। কাঁধে একটা ছোট লাল গামছা। কপালে সিঁদুর টানা। মাথার চুল কমে গেছে। তাকালেই স্পষ্ট আপেল এখন পান্ডা।
আমরা অবাক!
আমার মেজদি বলল— তুই আপেল না?
— হ্যাঁ দিদি।
— তা তুই এখানে কী করছিস?
— এই তো পান্ডা। পুজো করাই।
— কবে থেকে, তুই তো…
মেজদি কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি মেজদির দিকে তাকিয়ে মুখ বন্ধ করাই।
— অনেকদিন হয়ে গেল। বছর পাঁচেক হবে।
— ভাল।
বলে মেজদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আপেল আমাকে চোখ ইশারা করল, বলল— বিয়ে করেছিস। গুড। চল পুজো করাবি তো, করিয়ে দিচ্ছি?
আমার রাশভারী মেজদি আর থাকতে পারল না। বলল— তুই তো ব্রাহ্মণ নোস, তোর পৈতে হল কবে? তুই তো শ্মশানে থাকতিস?
আপেল এক গাল হেসে বলল— শ্মশানেই তো সাধনা করছিলাম মেজদি। এক ভৈরবী মা পৈতে দিল—বলল— যা বেটা।
আমার দিদি আরও ভারী গলায় বলল— যা বেটা বলে পৈতে দিল আর তোর প্রোমোশন হয়ে গেল! না রে তোকে দিয়ে পুজো করানো যাবে না—
— কেন দিদি?
— তোকে দিয়ে ভাই পুজো করালে ওদের বিয়ে টিকবে না। ডিভোর্স হয়ে যাবে।
আপেল জিব কেটে শুকনো মুখে চলে গেল। বেচারা বন্ধুর ক্ষতি করতে চায়নি। সেদিন আমার মেজদি আমার বিয়েটা টিকিয়ে দিল। বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম, নইলে আর দুয়ারে ডিভোর্স অনিবার্য ছিল!




