সাহেব সাধু
চম্বল যেতে হবে, শুনেই তো আমার মন উত্তেজনায় নেচে উঠল। কিন্তু ওই চম্বল অভিযানের কথা লিখছি একটু পরে। তারাপীঠের কথা এখনও ফুরোয়নি।
আধুনিক সময়ে, অর্থাৎ একালে তারাপীঠ ভক্তজনচিত্তজয়ী হয়ে ওঠে, এক সাধকের কারণে। ভক্তিশ্রদ্ধাজাত তাঁর আদরের নামে, তিনি বামাক্ষ্যাপা। তারাপীঠ মন্দিরের উলটোদিকে, দ্বারকা নদীতীরের শ্মশানে তিনি বাল্যবয়স থেকে পড়ে থাকতেন। তান্ত্রিক সাধক বামাক্ষ্যাপা ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সমসাময়িক। বিবেকানন্দ তখনও নরেন্দ্রনাথ দত্ত, সবে তখন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে শুধিয়েছেন, ‘আপনি কালীঠাকুরকে দেখেছেন? চাক্ষুস দেখেছেন? শ্রীরামকৃষ্ণের ওই চমকপ্রদ স্পর্শের পরই নরেন্দ্রনাথ সহপাঠী বন্ধু শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন বামাক্ষ্যাপা-দর্শনে। তখনও ‘বাংলার বাঘ’ হয়ে ওঠেননি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী, আশুতোষ এসেছিলেন বামাক্ষ্যাপার কাছে। বরিশাল থেকে বামাক্ষ্যাপার কাছে এসেছিলেন চারণকবি মুকুন্দদাস। লোকে বলে, এখনও বলে, নরেন্দ্রনাথকে বামাক্ষ্যাপা বলেছিলেন, বিরাট হবি, ধর্মকর্মে জগৎজুড়ে নাম হবে তোর। আশুতোষকে বলেছিলেন, তুই জজ হবি। মুকুন্দ দাসকে বামাক্ষ্যাপা বলেছিলেন, তুই তোর ওই ফটাস যন্তরটা ফেলে দে। কোমরে গোঁজা রিভলবারটি দ্বারকা নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন চারণকবি মুকুন্দ দাস। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধু ধু মাঠের ভেতর একলা গাছটির সন্ধান দিয়েছিলেন বামাক্ষ্যাপা। বোলপুরের ভুবনডাঙায় ওই বৃক্ষতলে মহর্ষি হয়ে ওঠেন দেবেন্দ্রনাথ।
বামাক্ষ্যাপার সংসারিক নাম বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়, শ্মশান পেরিয়ে, সরু দ্বারকা নদীটি পার হয়ে মাইল দুয়েক হাঁটলে আটলা গ্রাম। ওই আটলা গ্রামেই ১৮৩৭ সালে বামাচরণের জন্ম। আমি, ওই ১৯৮০-র বর্ষাকালে আটলা গ্রামে গিয়ে বামাক্ষ্যাপার বসতবাড়িটি দেখে এসেছি। এখন বোধ করি পাকা রাস্তা হয়ে গিয়েছে, হয়তো টোটো অটোও যাতায়াত করে। তখন অনেকটাই যেতে হত ধানখেতের ভেতরে আল ধরে ধরে।
তারাপীঠে হইহট্টগোল বাধিয়ে দিয়েছিলেন তান্ত্রিক বামাক্ষ্যাপা। মন্দিরের নিয়মবিধি মানতেন না। পুজোর আগেই মুঠো-মুঠো প্রসাদ নিয়ে খেয়ে ফেলতেন। পুরোহিতদের তর্জন-গর্জন করতেন। বামাক্ষ্যাপার বিরুদ্ধ নালিশ পৌঁছোতে, নাটোরের রাজ দরবার হুকুম জারি করল, সাধক বামাক্ষ্যাপার অবাধ গতিবিধিতে কোনও হস্তক্ষেপ করা যাবে না। ১৯১১ সালে বামাক্ষ্যাপা প্রয়াত হন।
আমি যখন তারাপীঠে যাই, তখনও ওই শ্মশানে ছিলেন লাগামছাড়া এক তান্ত্রিক সাধক, তিনি শঙ্করবাবা। তাঁকে ঘিরেও সে-সময়ে অগণন অনুগামী ভক্ত কৌতূহলী মানুষজন। ওই ভীড়ে আমিও একসময় ঢুকে পড়লাম। কাউকে কাউকে তিনি সস্নেহে ডাকছিলেন, আমি তাঁর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছি দেখে, আমাকে ডাকলেন। দুটি-একটি কথা হল। আমাকে কী বলেছিলেন তিনি, উঁহু, তা আমি কাউকে বলিনি, বলবও না। এ প্রসঙ্গে কবুল করা যেতে পারে দেবদ্বিজে ভক্তি নেই আমার, ভগবান ও ভূতে বিশ্বাস নেই।
তারাপীঠ শ্মশানের সামনে, রাস্তায় এক সাহেব তারাসাধকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সাহেবের টকটকে লালবস্ত্র, কপালে সিঁদুরের টিপ দেখে কথা বললাম। সুইডিস ওই তরুণ আমাকে বললেন তিনি ডাক্তার ছিলেন। ডাক্তারি ছেড়েছুঁড়ে তারা মায়ের টানে এসেছেন। ডাক্তার রোগীদের প্রাণ বাঁচানোর মানবসেবা না করে, তারাপীঠের শ্মশানে মা মা করছেন, আমি এসব বলে জিজ্ঞেস করলাম, বিজ্ঞানে বিশ্বাস নেই আপনার? সুইডিস সাধক অন্তআনন্দ হো হো হাসলেন। পথের পাশ থেকে একমুঠো মাটি তুলে নিয়ে বললেন, বিজ্ঞান ? বিশ্বাস? বিজ্ঞান বলছে, এতে আয়রন আছে এত পারসেন্ট, সিলিকন আছে এত পারসেন্ট, আর তোমরা ভারতীয়রা বিশ্বাস করো এই মাটি হল- মা!
বোঝো কাণ্ড! ও রে তোকে বাঁধবে কে রে! মনে-মনে ভাবলাম আমি।
তা সেই পুজো সংখ্যার ‘পরিবর্তন’-এসব শক্তিপীঠের কথা বের হওয়ার পর ধীরেনদা যখন আমাকে চম্বল যেতে বললেন, আমার মন তো উত্তেজনায় নেচে উঠল। ঠিক হল, আমার সঙ্গে আলোকচিত্রী হিসেবে সৌগত রায়বর্মন যাবে। হয়েছিল কী, আমরা যখন খিদিরপুর বন্দরে নাবিকদের সমস্যার খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম, তখন ওই অঞ্চলে জাহাজে যন্ত্রপাতির গ্রিজ, মবিল, লুব্রিকেন্ট তেলের ব্যবসা করতেন এক ব্যবসায়ী। অবাঙালি ওই ব্যবসায়ী ছিলেন ওখানকারই বাসিন্দা, আমাদের সৌগতর এক দাদার পরিচিত। ওই দাদার মাধ্যমেই ব্যবসায়ীটি জানতে পারেন আমরা ‘পরিবর্তন’-এ খিদিরপুরের জাহাজ, নাবিকদের খবর করছি। উত্তরপ্রদেশের চম্বল এলাকার ভূমিপুত্র ওই ব্যবসায়ী সৌগতের দাদাকে বলেন, তাঁদের চম্বল মুলুকে বিস্তর খবর। চম্বলের বেহড়ে সর্বদা ডাকাত-পুলিশে গুলিগোলার ঠাঁই-ঠাঁই-ঠাঁই। সৌগতর দাদা সৌগতর মাধ্যমে চম্বলের বিষয়টি জানিয়ে দেন ধীরেনদা, পরিবর্তন-এর সংযুক্ত সম্পাদক ধীরেন দেবনাথকে। ধীরেনদা আমাকে আর সৌগতকে চম্বল যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় আমরা দু’জনে তুমুলভাবে প্রস্তুতি নিই। তখন আমার বয়স ২৫ ছুঁই-ছুঁই, সৌগতর ২৩। তখন আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ সদ্য বের হয়েছে।
সুইডিস সাধক অন্তআনন্দ হো হো হাসলেন। পথের পাশ থেকে একমুঠো মাটি তুলে নিয়ে বললেন, বিজ্ঞান ? বিশ্বাস? বিজ্ঞান বলছে, এতে আয়রন আছে এত পারসেন্ট, সিলিকন আছে এত পারসেন্ট, আর তোমরা ভারতীয়রা বিশ্বাস করো এই মাটি হল- মা!
কোন্নগরের নবগ্রামে থাকত সৌগত। এখন অনেকেই চেনেন সৌগতকে সুলেখক, চলচ্চিত্রকার হিসেবে সে সুপরিচিত। ‘ভয় চাই, ভয়’ নামে এমন একটি রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস সে লিখেছে, যা পাঠাভিজ্ঞতাকে চমকে দেয়। তখন সৌগত ছিল কচি এক আলোকচিত্রী। চম্বলের প্রাথমিক খোঁজখবরে কলকাতাতেই নেমে পরলাম আমি আর সৌগত। দু’জনে বার কয়েক গেলাম খিদিরপুরে ওই ব্যবসায়ীর কাছে। অনেকদিন আগের কথা তো, ওই অবাঙালি ব্যবসায়ীর নাম আমি ভুলে গিয়েছি। কিন্তু বলতে গেলে তিনিই চম্বলঘাঁটির দরজা আমাদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, তাঁর পরের ভাইটিই রয়েছে মালখান সিংয়ের দলে, কোনও অসুবিধা হবে না। চম্বল অঞ্চল নিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি খোঁজখবর দিলেন তিনি। ঘটনাচক্রে আমাদের শ্রীরামপুর রেলস্টেশনটির ওপরে যে জৈন বুক স্টলটি ছিল, তার মালিক অশোক জৈন আমার সমবয়সি বন্ধু, অশোকের দেশের বাড়ি উত্তর প্রদেশের অম্বায়। অম্বা, চম্বল অঞ্চলভুক্ত আধাশহর। অশোক আমাকে ওই অঞ্চল সম্পর্কে বিস্তর তথ্য দিল।
তরুণ ভাদুড়ী, জয়া ভাদুড়ীর বাবা, অমিতাভ বচ্চনের শ্বশুর, বিখ্যাত তিনি ‘অভিশপ্ত চম্বল’ লিখে। কিশোর বয়সেই সে বই পড়েছিলাম, এরপর পড়ি তাঁর ‘আবার চম্বল’ ( এরপর তাঁর আরেকটি বই বের হয়েছে ‘বেহড় বাগী বন্দুক, তবে তা অনেক পরে)। চম্বল যাওয়ার আগে, ‘অভিশপ্ত চম্বল’ ও ‘আবার চম্বল’ বই দু’টি মুখস্থ করার মতো করে পড়লাম। দু’একটি ইংরেজি বইও পড়লাম। তরুণ ভাদুড়ী একটি ইংরেজি দৈনিকের ভূপালের সাংবাদিক ছিলেন। আমরা যখন চম্বলে যাই তখন তরুণবাবু ভূপালেই ছিলেন। হিন্দিতে সড়গড় হওয়ার জন্য টানা একমাস আমি আর সৌগত সপ্তাহে অন্তত দুটি করে হিন্দি সিনেমা দেখলাম। সৌগত আমাকে একটি জ্যাকেট ধার দিল, ডাকব্যাক থেকে কিনলাম হান্টার শু। প্রস্তুতির জন্য কলকাতাই ঘোরাফেরার কাজে অফিস আমাদের মাসাধিককাল সময় দিয়েছিল। খিদিরপুরের ওই ব্যবসায়ী আমাদের হাতে চিঠিপত্র দিয়েছিলেন। হান্টার শুয়ের ভেতর ওই চিঠিপত্র ভরে আমি সৌগতকে সঙ্গে নিয়ে হাওড়া থেকে রওনা হয়েছিলাম আগ্রা ক্যান্টমেন্ট। আগ্রা থেকে জয়পুরগামী ট্রেনে নামব মুরেনা। মধ্যপ্রদেশের মুরেনা চম্বল উপত্যকার অন্তবর্তী শহর। মুরেনা থেকে যাব অম্বা, অম্বা থেকে যাব চম্বল অন্দরের গ্রাম রছেড়ে। রছেড় আমাদের ওই খিদিরপুরে ব্যবসায়ীর গ্রাম। এই ছিল আমাদের যাত্রাপথ।
এখন মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের জেলাবিন্যাসে বদল হয়ে থাকতে পারে, তবে তৎকালে মধ্যপ্রদেশের মুরেনা, ভিন্দ, গোয়ালিয়র, উত্তর প্রদেশের আগ্রার একাংশ ও এটওয়া, এটা, জালাউন, রাজস্থানের ঢোলপুর জেলা নিয়ে ১০হাজার বর্গ কিমি ভূমি জুড়ে এই চম্বল উপত্যকা। প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিমির বিচিত্র ভৌগোলিক অঞ্চল। চম্বল— ভারতের এই একমাত্র নদী উত্তরগামিনী। হাজার-হাজার বর্ষের সহস্র-সহস্র জলধারায় উত্তরগামী নদী চম্বল আর অদূরের যমুনা নদী তিন রাজ্যের এই সুবিস্তৃত বিশাল শক্ত ভূমিকে দুমড়েমুচড়ে অসংখ্য টিলা, গহ্বর, ফাটল, সুড়ঙ্গ, ফাঁক-ফোঁকর, শুড়িপথ সৃষ্টি করেছে, তাকেই বলে— বেহড়। আর বেহড়ের ভেতরে ছিন্নভিন্ন সমতলগুলিতে গ্রাম, জনপদ, আধুনিককালে গড়ে উঠেছে শহর।
তরুণ ভাদুড়ীর বইয়ে পড়েছিলাম, চম্বলে দস্যুদের সাক্ষাৎ পেতে হলে, সর্বত্র বলতে হবে প্রকাশ্যে সে কথা। বলতে হবে আমরা সাংবাদিক (পত্রকার), আমরা ডাকাতদের সঙ্গে দেখা করতে চাই। পুলিশের যেমন গোয়েন্দা থাকে, মালখান সিং, ফুলন দেবীদেরও তেমনি আছে গোয়েন্দা ছড়ানো সর্বত্র। তাদের বলে মুখবীর। প্রস্তুতিকালেই আমরা এসব জেনেছিলাম বইপত্র থেকে, খিদিরপুরের ব্যাবসায়ীটির কাছ থেকেও।
হাওড়া থেকে আগ্রার উদ্দেশ্যে ট্রেন ছাড়তেই, আমি ও সৌগত ট্রেনে এসব বলতে লাগলাম। ঘাবড়ে গিয়ে কোনও-কোনও যাত্রী আমাদের দিকে তাকাতে লাগলেন। পরদিন আগ্রায় পৌঁছে সে রাত থাকলাম এক হোটেলে ।এরপরদিন সারাদিনে আগ্রায় তাজমহল দেখলাম, আগ্রাফোর্ট দেখলাম। মুঘল রাজাদের ভেতর আকবর ছিলেন খর্বকায়। তাঁর সুদীর্ঘ তরবারি দেখে আশ্চর্য হলাম। জাহানারার সোনার জরিতে অলঙ্কৃত বক্ষবন্ধনীটি মনে কৌতুক জাগাল।
আগ্রা থেকে মুরেনা যাওয়ার ট্রেনে চাপলাম। রাতের জয়পুরগামী এক্সপ্রেস ট্রেন। আগ্রার পর ঢোলপুর, তারপরই মুরেনা, স্বল্প দূরত্ব। ওই ট্রেনেও প্রচার চালালাম, আমরা পত্রকার, ডাকাতদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। কাহানি লিখব। হই হই পড়ে গেল ট্রেনে। তথাকথিত দস্যুউপদ্রিত চম্বল উপত্যকা দিয়ে ছুটে চলল আমাদের এক্সপ্রেস। হিন্দি চলচ্চিত্রে তৎকালে যেমনটি থাকত, ছুটে চলা ট্রেনের পাশ দিয়ে পাল্লা দিয়ে ছুটছে ঘোড়ার পিঠে দস্যুদল, তেমন কিছুই ঘটল না। তবে কিনা, মুরেনা স্টেশনে নামতে কিছুতেই ট্রেনের দরজা খুলতে রাজি হচ্ছিলেন না সহযাত্রীরা। রীতিমত যুদ্ধ করে আমি সৌগত দু’জনে নামলাম মুরেনা স্টেশনে। দু’জনের হাতে দুটি হোল্ডঅল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ফাঁকা মুরেনা স্টেশন। ট্রেন চলে যেতে মনে হল, যেন এ-জগতে আমি সৌগত ছাড়া আর কেউ নেই। তখন দেখলাম স্টেশনের এক প্রান্তে টর্চের আলো জ্বেলে কেউ একজন আসছে আমাদের দিকে। নিকটবর্তী হতে ঠাওর হল লোকটিকে। তার সর্বাঙ্গ চাদরে ঢাকা।


