গৃহস্থ বাড়ি, প্রবেশ নিষেধ
প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক সুবিমল মিশ্রর একটা গল্পের নাম ছিল— ‘হারান মাঝির বিধবা বউ ও সোনার গান্ধী মূর্তি’। আর আমাদের কালীঘাটের ছিল— হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ আর কালো পাথরের কালীমূর্তি।
আপাতত হারান মাঝির কথা হোক, কালো পাথরের কালীমূর্তির কথা পরে।
না, না, সুবিমল মিশ্র কোনওভাবেই অনুপ্রাণিত হননি। বরং আমি অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর লেখার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছি। শুনেছি, সুবিমল মিশ্র একসময় কালীঘাটের ধারে-কাছে চেতলার দিকে থাকতেন।
ইংলিশ মিডিয়াম, মাদার টেরিজা ও কালীঘাটের ঘুড়ি! জয়ন্ত দে-র কলমে ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৫…
হারান মাঝির বিধবা বউয়ের মতো কিনা জানি না, হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশের কিন্তু একটা দারুণ ব্যাপার আছে। এখনও কালীঘাটের দিকে গেলে চেখে দেখতে পারেন, তাঁর প্রতিনিধিরা আছেন। উঁচু মতো একটা বেদিতে বাবু হয়ে বসে আছেন। খালি গা, বড়জোর একটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সুমো পালোয়ানের মতো একজন বসে দোকানদারি করছেন। তাঁর সামনের পিতল আর অ্যালুমিনিয়ামের ঢাউস পাত্রে থরে-থরে মিষ্টি। ঝাঁ-চকচকে দোকান নয়। কিন্তু— ওই একটা কিন্তু আছে—! যেটা কালীঘাটের কালীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়। কেমন চুপ করিয়ে দেয়। এ-দোকানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আপনার মনে হবে, কোন মান্ধাতার আমলে ফিরে গেছেন। এখানে মিষ্টি মানে আদি ও অকৃত্রিম। কোনও ফিউশন নেই। আজকাল নকশার ওপর ডিজাইন হয়, এখানে কোনও ডিজাইন নেই। মেট্রো রেলের এস্ক্যালেটর থেকে নেমে স্কাইওয়াকে চড়ে মন্দিরের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। বরং পথচলতি ভিড়, তার মানুষজন, দর্শনার্থী, পান্ডা, পশরা, দোকানদার, ভিখারি, পাগলি, খ্যাপাদের সঙ্গে পায়ে পায়ে কুকুর, শালপাতার উড়োউড়ি, থ্যাঁতলানো জবার মালায় অ্যাক্লিমাইজড হতে হতে মন্দিরে আসা। কালীঘাটকে চিনতে হলে স্কাইওয়াকে নয়, পিচের রাস্তায় পায়ে-পায়ে হাঁটতে হবে।
ছোটবেলায় জানতাম, কালীঘাটের বাচ্চাদের জ্বর হলে বাবারা হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ নিয়ে আসে। আমার তখন ঘন-ঘন জ্বর হত। ইনফ্লুয়েঞ্জা আর প্যারা টাইফয়েডের যুগ তখন। পালটাপালটি করে হত। আগে কালীঘাট বাজারের উল্টোদিকে জ্যোতির মেডিকেল দোকানে বসতেন এক ডাক্তারবাবু, তাঁর ফিজ বেশি। তিনি এলেই দোকানের সামনে তাঁর কালো গাড়ি থাকত। গাড়ি দেখেই ডাক্তারবাবুর ইন-আউট টের পাওয়া যেত। ওই ডাক্তারের কাছে কোনওদিন বাবা নিয়ে যাননি, আমার বড় সাধ ছিল, একবার ওই ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো বলে কত বায়না করেছি। জ্বর হলেই বলতাম— ওই ডাক্তারের কথা। বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন পাথরপট্টির দিকে সুধাংশু ডাক্তারের চেম্বারে। যিনি আমার কাছে ডাক্তারবাবু নন, সুধাংশুজেঠু। তাঁর সঙ্গে বাবার খুব চেনাজানা। মা বলত, ‘সুধাংশুডাক্তার তোর ধাত জানে।’ সুধাংশুজেঠু মানেই মিক্সচার। সব জ্বরেই গোলাপি মিক্সচার। মিষ্টি কিন্তু কী উৎকট গন্ধ! ভাত বন্ধ। দুধ-সাবু আর বার্লি। চেতলার ব্রিজের পাশে একটা বার্লি কোম্পানি ছিল। ওদিকে তাকালেই গা গুলিয়ে উঠত। সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার। তার মধ্যেই অবশ্য টিমটিম করে আশার আলোর মতো জ্বলে থাকত হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ! আহা!

‘মুখে দিলে গলে যায় আহা রে কী পুষ্টি!’ হিমসুধার আইসক্রিমের সেই বিজ্ঞাপন তখনও বাজারে আসেনি। কড়াপাকের সন্দেশ মুখে দিলে গলে না, মার্বেল গুলির মতো ঘোরাফেরা করে বেশ কিছুক্ষণ। ছোটবেলা থেকে চুরি করে মিষ্টি খেয়ে-খেয়ে আমার দাঁতে খুব পোকা ছিল। ক্যাভেটি-ম্যাভেটি আপনি যা বলেন বলুন, আমরা পোকাই বলতাম। সেইসব দাঁত বেশিরভাগ হাজরার মোড়ের লায়নস ক্লাবের ডাক্তারবাবুরা তুলেছে, কিছু আমার মা হাত দিয়ে বা সুতো দিয়ে টেনে তুলেছে বেশ কিছু। বাদবাকি আমার দিদিরা চড় মেরে। মেজদির একটা চড় মানেই একটা দাঁত আমার হাতে!
সেই পোকা ধরা দাঁতের ভেতর হারান মাঝির সেই অপূর্ব সৃষ্টি! আহা!
এখনও জ্বর হলে, শরীর খারাপ হলে, মনে হয় মাথার কাছে হাত বাড়ালে ছোট বাক্সের ভেতর চারটে কড়াপাকের সন্দেশ আছে। আমার বাবা নেই, কিন্তু হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ আছে। ওদিকে গেলেই বাবাকে স্মরণ করে দুটো কিনে আগে খাই। আরও খানদশেক কিনে নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে রাখি। কিন্তু আমার ছেলে তো মিষ্টি খাবে না, তার ওপর এমন মার্বেল গুলি মার্কা গোল-গোল, খাবে কী? খাবে না। নিজেকেই প্রশ্ন করি, নিজেই উত্তর দিই। অগত্যা রাস্তাতেই— দশটা মাত্র— টপাটপ ছুড়ে দিই মুখগহ্বরে।
মুখগহ্বরের সঙ্গে-সঙ্গে আরও এক গহ্বরের স্মৃতি চলকে উঠল।
কালীঘাট মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনওদিন ঢুকেছেন? আগে ওখানে একটা আশ্চর্য গুরুগম্ভীর গন্ধ পাওয়া যেত, সেটা তিনটে জিনিসের মিশ্রণে— জবাফুল-গোলাপ জল আর টোকো-ঘাম। আর গহ্বর ছিল মন্দিরের পিছনে— একটা ক্ষীণ জলের ধারা। চরণামৃত।

আগে ফি শনিবার রাতে আমার মা সেই চরণামৃত নিয়ে আসত। আঙুলে তুলে আমাদের মুখের কাছে এনে ছিটিয়ে দিত। চরণামৃত আমার জিভ নয়, চোখমুখেও ছড়িয়ে যেত। আমিও খেয়েছি, আমরাও, পরীক্ষার আগে আগে বেশি বেশি। শনিবার রাতে চরণামৃত আর রবিবার সকালে চিরতার জল।
প্রতি রবিবার চিরতার জল ছিল বাঁধা।
আমার পরের বোন রোববার সকালে চিরতার জল খেতে হবে বলে মটকা মেরে পড়ে থাকত। কিছুতেই ওর ঘুম ভাঙত না। আমার দোর্দণ্ডপ্রতাপ মেজদি ওকে তুলত। কিন্তু চিরতার জলের প্রতি আমার আলাদা একটা টান ছিল। সে যতই তেতো হোক! আমি মিনমিনে গলায় মাকে বলতাম— গ্লাসে আর একটু জল মিশিয়ে লম্বা করে খাব। পারমিশন পেতাম।
আসলে নিমাইদা আমাদের কবে যেন বুঝিয়ে দিয়েছিল— বিয়ার আর চিরতার জলে উনিশ-বিশ তফাত। তাই বেশ, বিয়ার ভেবেই চিরতাকে আপন করে নিয়েছি। যেন রোববার সকালে বিয়ার, দুপুরে মাংস ভাত!
আমাদের যে চার-ছ’জন-দশজন গলির বন্ধুবান্ধবরা ছিল, তারা জম্মে চিরতার জল খেত না। পেত না, তাই খেত না। তাহলে কি ওদের কৃমির প্রকোপ ছিল না?
নিমাইদার মতে— ও রে ওরা সবগুলো লুকিয়ে-লুকিয়ে বোতলের শেষটুকু গলায় ঢালে। ওদের পেটে কৃমির ‘ক’ থাকবে কেন?
এখনও জ্বর হলে, শরীর খারাপ হলে, মনে হয় মাথার কাছে হাত বাড়ালে ছোট বাক্সের ভেতর চারটে কড়াপাকের সন্দেশ আছে। আমার বাবা নেই, কিন্তু হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ আছে। ওদিকে গেলেই বাবাকে স্মরণ করে দুটো কিনে আগে খাই। আরও খানদশেক কিনে নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে রাখি। কিন্তু আমার ছেলে তো মিষ্টি খাবে না, তার ওপর এমন মার্বেল গুলি মার্কা গোল-গোল, খাবে কী? খাবে না। নিজেকেই প্রশ্ন করি, নিজেই উত্তর দিই। অগত্যা রাস্তাতেই— দশটা মাত্র— টপাটপ ছুড়ে দিই মুখগহ্বরে।
এখন এই বুড়োবেলায় এসে মনে হয় ছোটবেলাটা অদ্ভুত। আসলে ছোটবেলা নয়, এই বড় লোকগুলোই অদ্ভুত। যখন এইট-নাইনে পড়ি— তখন ‘নবকল্লোল’, ‘উল্টোরথ’, ‘ঘরোয়া’, ‘সিনেমা জগৎ’-এ হাত দেওয়ার জো ছিল না। বাড়ির লোক ভাবত— ওইসব বইয়ে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে। ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে।
ঠিক আছে, ওইসব বইয়ে নয় লেখার সঙ্গে বেশ চোখধাঁধানো ছবি আছে। শরৎচন্দ্রের বইয়ে নিশ্চয়ই তেমন ছবি নেই? একদিন মাসতুতো দিদির মাথার বালিশের নীচ থেকে শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’ ঝেড়ে এনে সারা দুপুর রুদ্ধশ্বাস পাঠ দিলাম, যদিও তাতেও শেষ হল না, বেশ কিছু পাতা বাকি ছিল। রাতে আরও রুদ্ধশ্বাস ঘটনা ঘটল। মাসতুতো দিদি এবং আমার দিদি কী করে জেনে গেল আমি আজ সারা দুপুরে ‘গৃহদাহ’ পড়েছি। ব্যস, তারা আমাকে পালা করে পেটাল। মার খেলাম। আমি ডেঁপো, আমি পাকা বলে মা- মাসিরা কেউ বাঁচাতে এল না। আরও মার চলত, কিন্তু লোডশেডিং আমাকে বাঁচিয়ে দিল।

তখন লোডশেডিং মানেই ছিল অলিখিত ছুটি। সামনে পরীক্ষা না থাকলে, আলো গেল তো বই টপকে পাড়ার ভেতর। এ-বাড়ি, ও-বাড়ির দরজায়-দরজায় আড্ডা। তখন বাড়ির সামনে-সামনে রোয়াক থাকত, মানুষজনের বসার জন্য। আসলে মানুষগুলো ভদ্রলোক ছিল। এখন চারদিকে ছোটলোক। না-হলে, বাড়ির চারফুটিয়া-পাঁচফুটিয়া পাঁচিলের মাথায় কেউ পেরেক লাগাতে পারে? কি না ছিঁচকে চোর বা বিড়াল পেরেকে গাঁথবে! আরে মাতালদের কথা কেউ ভাববে না, টাল খেতে খেতে কেউ যে পাঁচিল ধরবে তার জো রাখল না। পরে, দেখেছি বাড়ির সামনে রোয়াক ভেঙে ঢালু করে দিয়েছে। মানে আর এখানে বসা চলবে না।
অথচ এমন কত রোয়াক ছিল, সেই রোয়াকে অলিখিত টাইম থাকত। সকালে কারা বসবে, দুপুরে কারা। বিকেলে কাদের জন্য সিট রিজার্ভ তো সন্ধের পর লোডশেডিং হলে কাদের দখলে থাকবে। এমনকী, রোয়াকে বাঘবন্দি, ষোলো ঘুঁটির ঘরও কাটা থাকত। আমাদের বরাদ্দ ছিল সুকুদাদের বাড়ির মুখের ছোট একটা টুকরো জায়গায়। সেখানে অন্য বাড়ির পর পর দুটো বন্ধ জানালার ধাপেই আমাদের যাবতীয় গুলতানি। স্বপনকুমার থেকে ব্যোমকেশ, শ্যাম থাপা থেকে গাভাসকর। সেদিনও যথারীতি লোডশেডিং হতেই সেখানে গিয়ে ঢুকেছি। ততক্ষণে খবর চলে এসেছে— আমি পটলদির গল্পের বই ঝেপে পড়ার জন্য উদোম ক্যালানি খেয়েছি।
এসে দেখলাম চিন্টু-সহ সবাই আছে। আমাদের এই টিমে মুক্তা বলে একটা মেয়েও ছিল। ওদের বাড়িটা ছিল গলির ভেতর। কিন্তু ওদের বাড়ির দরজায় সাদা চক ঘষে-ঘষে পরিষ্কার করে লেখা থাকত ‘গৃহস্থ বাড়ি— প্রবেশ নিষেধ’। ওই বাড়ির দরজা বাইরের লোক ঠেলত না। খুলত না। মনে করুন, ছিটমহলের মতো ওই বাড়ির অবস্থান ছিল গলির ভেতর।
আমাদের পাড়ার অনেক মেয়ে বউ মুক্তাকে সন্দেহের চোখে দেখত। ওকে দেখলেই চোখ কুঁচকে তাকত। কিন্তু অনেকেই মুক্তাকে খুব পছন্দ করত। মুক্তা আসলে ছিল আমাদের অনেকের মা, দিদি ও পরিবারের মুশকিল আসান। ও তখন আমাদের সমবয়সি। কিন্তু মেয়ে বলে হয়তো চেহারায় গড়নে ও বেশ বড়-বড় মতো। খুব ভাল মেয়ে, ওর গায়ে কেউ কোনওদিন কালির সামান্য ছিটে পর্যন্ত লাগাতে পারেনি। অনেকে মনে করত, ওর মা বেশ্যাবৃত্তি না করলেও ওর মা সন্ধে হলেই ওদের দুটো ঘর ভাড়া দিত। তাই মুক্তা আর ওর ভাই সন্ধের পর আমাদের পাড়ায়— এর দুয়ারে, ওর জানলার গরাদে মুখ চেপে দাঁড়িয়ে থাকত।
তো সেই লোডশেডিংয়ের রাতে সুকুদাদের বাড়ির জানলার আড্ডায় মুক্তা ও তার ভাইও হাজির ছিল। যে আমার মার খাওয়ার খবর দিয়েছিল, সে বলেছিল— ভ্যাগিস লোডশেডিং হল, নইলে ওর শরীরের সব প্যাঁকাটি (পাটকাঠি) আজ ওর দিদিরা ভেঙে দিত!
ওই জানলায় সবাই আমাকে টিপেটুপে দেখছে আমার হাত-পা অক্ষত আছে কি না। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে বিড়বিড় করছে— শেষ কুড়ি পাতাগুলো আর পড়া হল না— না জানি কী আছে ওই শেষ পাতাগুলোতে। জীবন বুঝি বৃথা যায়। জানা যাবে না— কী ছিল ওখানে?
চিন্টু বলল— চিন্তা করিস না, আমরা রাসবিহারী মোড়ের বান্ধব সমিতির লাইব্রেরিতে চলে যাব। কী করে ওখানে মেম্বার হওয়া যায় আমি যখন জানব— তুই তখন শরৎচন্দ্র বের করে পড়ে নিবি। পারবি না?
কিন্তু ওখানে তো হাজার-হাজার বই!
আহা শরৎচন্দ্রের জন্য নির্ঘাত একটা আলাদা র্যাক থাকবে। সেটা ঢুকেই মার্ক করে নিবি।
সেই রাতে ওই পর্যন্ত।
মজা হল পরের দিন। পরেরদিন বিকেলবেলা মাঠ থেকে ফিরে ভেলিগুড় দিয়ে তিনটে রুটি খেয়ে পড়তে বসেছি। হঠাৎ জানলার সামনে ভেসে উঠল মুক্তার মুখ। বলল— কাল যদি বিকেল খেলতে না যাস, তাহলে আমি তোকে বইটা পড়াতে পারি।
আমি রাজি।
পরেরদিন। স্কুল থেকে ফিরে বিকেলবেলা খেলতে গেলাম না। কিছু খেয়েই গেলাম মুক্তার খোঁজে। কালীঘাট রোডের দিকে যাওয়ার আগেই মুক্তা আমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে চলল শনি মন্দিরের পাশের গলিপথে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর এ-গলি ও-গলি করে মুক্তা আমাকে একটা বাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দোতলায় এনে ফেলল। তখন টাটকা বিকেল। সন্ধের আগের সাজ পর্ব চলছে। এ-ঘরে ও-ঘরে মেয়েরা ঢুকছে বেরুচ্ছে। কেউ কেউ দুপুরের ভাত-ঘুম দিয়ে উঠে আসন্ন সন্ধেরাতের উত্তেজনায় আছে।
মুক্তাকে দেখে একটা বউ বলল— আয়। তারপর আমাদের একটা ঘরে ঢুকিয়ে বলল— নে ওঠ।
মুক্তা একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল। ওর সামনে একটা র্যাক। সেখানে সার-সার খালি মদের বোতল। মুক্তা আট-দশটা বোতল সরাতে আমি দেখতে পেলাম বোতলের আড়ালে সার দিয়ে বই। গল্পের বই। হ্যাঁ, শরৎচন্দ্রও আছেন। সেই বই বের করে করে মুক্তা দিল। না, ‘গৃহদাহ’ নেই। তবে অমূল্য আর একটি বই পেলাম। ‘দেবদাস’। সেই বইটি জামার আড়ালে পেটের ভেতর চালান করে বাড়ি নিয়ে এলাম। দেবদাস পড়ে ফেললাম আমি, দু’বার। এছাড়াও সবাই। ‘দেবদাস’ পড়েই আমরা ঝপাঝপ প্রেমে পড়লাম।
ওই খালি মদের বোতলের আড়ালেই ছিল আমার প্রথম লাইব্রেরি। আমি ওই বাড়ির বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসেও গল্পের বই পড়েছি অনেক দুপুর-বিকেলবেলায়। বিশেষত বর্ষার দিনে।
তখন মনে হয়নি, মদের বোতলের আড়লে আছে বই। কী ভাল ছেলেবেলা ছিল! আসলে বড়রাই বড় গণ্ডগোলের। তাই এখন আমাদের বাড়ির সবচেয়ে গাম্ভীর্যে বড়-মানুষ আমার স্ত্রীর ভয়ে মদের বোতল চলে যায় বইয়ের র্যাকে, বইয়ের আড়ালে।
ছোটবেলায় আর বড়বেলায় আড়ালের কেমন আশ্চর্য পার্থক্য হয়ে গেল! মদের বোতল আর বই, বই আর মদের বোতল কেমন করে অবস্থান পালটে নিল! সময়ের তফাতে একজন আর-একজনের আড়ালে লুকাল।
আমাদের বাড়ির একটা বুকশেল্ফে বেশ অনেক বই ছিল। কিন্তু আলমারিতে তালা মারা। সেসময় দেখতাম তরকারির বাটি চালাচালি হত, বইও চালাচালি হত। বিশেষত শারদীয়া পত্রিকাগুলো। পাশাপাশি বাড়ি পালটাপালটি করে কিনত। আমার মা, দিদিদের লাইব্রেরিতে যাওয়ারও দিন ছিল, সন্ধেবেলা। কে-কার সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে, সেটা ঠিক করা। তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধে মানেই ছিল বাড়ি-বাড়ি উনুনধরানো ধোঁয়ায় মেঘের আনাগোনা। শীতকালে বেশি বেশি সেই মেঘ-মেঘ ধোঁয়া আমার পাড়ার ভেতর আটকে থাকত।
আর ওদের গলিতে জ্বলে উঠত আলো। কখনও-কখনও রঙিন টুনি লাইটের মালা! আমাদের ঘরোয়া মেঘ, ওদের সন্ধেরাতের তারা। এখন আমাদের ওদিকে যাওয়া মানা।




