ধর্মের আগ্রাসনে ক্রিকেট

Representative Image

২০২৬ মরসুম শুরুর আগে, নিজেদের ঘর গোছাতে গত ১৬ ডিসেম্বর আইপিএল-এর মিনি নিলামে চারজন নতুন ক্রিকেটারকে দলে নিয়েছিল ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স’। আকাশদীপ, অস্ট্রেলিয়ার তারকা-অলরাউন্ডার ক্যামেরুন গ্রিন, শ্রীলঙ্কার মাথিশা পাথিরানা ও বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। শনিবার আচমকাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) এক নির্দেশিকা পেয়ে মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় শাহরুখ খানের মালিকানাধীন কেকেআর।

নিলামে চেন্নাই সুপারকিংস আর দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে দর হাঁকাহাঁকিতে আইপিএলের পোড় খাওয়া প্লেয়ার মুস্তাফিজুরের দর উঠেছিল ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। এই চড়া দামে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসারকে কিনেছিল কেকেআর ম্যানেজমেন্ট, নিজেদের বোলিং-বিভাগকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিসিসিআই সচিব দেবজিত সাইকিয়ারের এক অনুরোধেই (পড়ুন ‘নির্দেশ’) মুস্তাফিজুরকে রিলিজ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কেকেআর। আইপিএলের আইন অনুসারে, ভারতীয় বোর্ডের নির্দেশে কোনও খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করলে, সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের সম্মতির প্রয়োজন হয় না। তাই কেকেআর থেকে রিলিজের নোটিস পেয়ে সংবাদ মাধ্যমে মুস্তাফিজুরের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘ওরা যদি আমায় ছেড়ে দেয়, আমার কিছু করার নেই।’

২০১৬ মরসুম থেকে আটটি আইপিএল খেলেছেন তিরিশ বছর বয়সি বাংলাদেশী ফাস্ট বোলার। পরেছেন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, মুম্বই ইন্ডিয়ানস, দিল্লি ক্যাপিটালস, রাজস্থান রয়্যালস ও চেন্নাই সুপারকিংস-এর জার্সি। এবারই তাকে প্রথম খেলতে দেখা যেত কলকাতার ফ্র্যাঞ্চাইজিতে। বিসিসিআই নিয়ন্ত্রিত আইপিএল-নিলামের এই পর্বে মুস্তাফিজুরই ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার। কিন্তু বাংলাদেশের ‘সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির’ প্রশ্ন তুলে বোর্ড সচিব দেবজিত সইকিয়া এই বাঁহাতি পেসারকে ছেড়ে দেওয়ার ‘অনুরোধ’ করেন কেকেআর কর্তৃপক্ষের কাছে। বিনা বাক্যব্যয়ে শাহরুখ খানরাও কোপ হানেন মুস্তাফিজুরের ওপর। এর জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কোনও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারকে। তারা সুযোগ পাবে মুস্তাফিজুরের পরিবর্ত নেওয়ারও।

আরও পড়ুন: যুদ্ধের দামামার মধ্যে রিক্ততাই নিহিত থাকে, যা শেখালো ‘ইক্কিস’! লিখছেন উদয়ন ঘোষচৌধুরি…

কেন নিলামে রেখেও অভিজ্ঞ মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে কেকেআরকে নির্দেশ দিল বিসিসিআই? সচিব দেবজিত সইকিয়া সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর যে-নির্যাতন হচ্ছে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ময়মনসিংহের শ্রমিক দীপু দাসকে, পরে আরও-এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে খুন করা হয়েছে, তারই জেরে মুস্তাফিজুরের এই আইপিএলে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ‘প্রশ্ন তুলেছেন দেশের কিছু রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা।’ সেই চাপেই বাংলাদেশি পেসারকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য, কেকেআরকে অনুরোধ করে বিসিসিআই। এর আগে, ২০০৮এর মুম্বই সন্ত্রাসবাদী হামলার পর, ২০০৯ থেকে পাক-ক্রিকেটারদের আইপিএলের খেলা বন্ধ করে দিয়েছিল বিসিসিআই।

বোর্ড সচিবের দেখানো এই কারণ নিয়ে সীমান্তের দু’দিকেই উঠছে নানা প্রশ্ন। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড(বিসিবি) ও অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যর ও সম্প্রচার মন্ত্রকের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান। তাদের মতে বিসিসিআই-এর এই যুক্তি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বাংলাদেশের কাছে। এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তও ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে বিসিবি। এই পর্বের আইসিসি পরিচালিত টি-২০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। আগেই সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জন্য ভারতের মাটিতে খেলবে না জানিয়ে দিয়ছিল পাকিস্তান। তাদের ম্যাচ দেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রুপের সব খেলাই ছিল ভারতে; আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী দিন-সহ তাদের প্রথম তিনটি ম্যাচ ছিল ইডেনে, শেষটি মুম্বইতে। এবার আইসিসির কাছে পাকিস্তানের মতোই ম্যাচ স্থানান্তরিত করার দাবি জানাতে চলেছে বিসিবিও।

বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রকের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আরও জানিয়েছেন, মুস্তাফিজুরকে আইপিএল খেলার জন্য দেওয়া ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ তারা প্রত্যাহার করছেন। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যদি কেকেআর মুস্তাফিজুরকে টিমে ফিরিয়ে নেয়, তাহলেও তার নিরাপত্তার কারণে তাকে ভারতে খেলতে দেওয়া হবে না। এছাড়াও আসিফ নজরুল আরও জানান যে, তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকে নির্দেশ পাঠাবেন, যাতে এই বছর আইপিএলের কোনও ম্যাচ বাংলাদেশে সম্প্রচারিত না হয়। এরই মধ‍্যে বিসিবি আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের জন‍্য ১৫ সদস‍্যের বাংলাদেশ দল ঘোষণা করেছে। যার অধিনায়ক দলের এক সিনিয়র সংখ্যালঘু ক্রিকেটার দিনাজপুরের লিটন দাস। যদিও ভারতীয় বোর্ড আগেই বিশ্বকাপের পর মার্চে নির্ধারিত বাংলাদেশে হোয়াইট বল ক্রিকেটের সফর বাতিল করে দিয়েছে।

মুস্তাফিজুর রহমান সদ্য নিহত ছাত্রনেতা ওসমান হাদি বা তার সাঙ্গপাঙ্গ কেউ নন। একজন আন্তর্জাতিক মানের আদ্যন্ত পেশাদার ক্রিকেটার। তাঁর গায়ে লেগে নেই বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দলের রং। ওসমান হাদিদের মতো কোনও মঞ্চ থেকে ভারতবিদ্বেষী সুর চড়ানোর কোনও তথ্য প্রমাণও তার বিরুদ্ধে পাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের মতোও জড়িয়ে পড়েননি আওয়ামী লিগ, বিএনপির মতো কোনও শাসক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে। ময়মনসিংহে নিহত সংখ্যালঘু শ্রমিকের মৃত্যুর সঙ্গে কোনও সূত্রেই তাকে জড়ানো সম্ভব না! তাহলে কেন বলি করা হল এই বাঁহাতি পেসারকে?

এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ঘটনায়, শুধুমাত্র সংখ্যালঘুরাই আক্রান্ত হননি, আক্রান্ত হয়েছে ‘উদীচী’ বা ‘ছায়ানট’-এর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভবন; আগুন লাগানো হয়েছে প্রথমসারির বাঙলা ও ইংরেজি গণমাধ্যমের অফিসে; নিগৃহীত হয়েছেন বহু সাংবাদিক, যার মধ্যে খুলনায় একজন নিহত হন; গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বহু সুফি-মাজার।

সমস্ত ক্রিকেটীয় ও রাজনৈতিক যুক্তিকে নস্যাৎ করে, উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম, শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে আক্রমণ করেন মুস্তাফিজুরকে টিমে নেওয়ার জন্য! সুর চড়ান দেবকীনন্দন ঠাকুরের মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাও। বছরখানেক আগে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া বাংলার কৌস্তভ বাগচি পর্যন্ত মন্তব্য করেন যে— কেকেআর যদি বাংলাদেশের পেসারকে দলে রাখে, তাহলে নাকি তিনি শাহরুখ খানকে কলকাতাতেই ঢুকতে দেবেন না! একবার ভাবুন তো, কলকাতার ক্রীড়া-সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে এই হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের ন্যূনতম সম্পর্ক রয়েছে কি না? আর কেনই-বা বিসিসিআই ক্রিকেট পরিচালনার ক্ষেত্রে এইসব অ-ক্রিকেটীয় ব্যক্তিত্বদের ‘হুমকিকে’ পাত্তা দেবে?

নয়ের দশকের শুরুতে, ঢাকার আবাহনী থেকে এই শহরেই খেলতে এসে ইস্টবেঙ্গলকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করে দর্শকদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন অকাল প্রয়াত ফুটবলার মুন্না ও তার সঙ্গী রুমি। ঢাকা মহামেডান থেকে কলকাতা মহামেডানে খেলতে এসে মোহনবাগানের চিমা ওকেরিকে আটকে রাতারাতি হিরো হয়ে গিয়েছিলেন কাইজার হামিদ। কলকাতার এই অ-সাম্প্রদায়িক ক্রীড়াসংস্কৃতির শিকড় আরও গভীরে। প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার মুস্তাক আলি ভারতীয় দল থেকে বাদ পড়ায়, এই শহরেই এক সময়ে ময়দান জুড়ে পড়েছিল ‘নো মুস্তাক, নো টেস্ট’-এর পোস্টার। ইডেন গার্ডেনের গ্যালারি ঐতিহাসিক বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছিল প্রাক্তন পাক-অধিনায়ক আসিফ ইকবাল অবসর মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে। কল্লোলিনী তিলোত্তমাতেই সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন লেজলি ক্লডিয়াস, জার্নেল সিং, নইমুদ্দিন, মহম্মদ হাবিবদের মতো আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া-ব্যক্তিত্বরা। তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। আইপিএলে ৬০ ম্যাচে ৬৫ উইকেটের অধিকারী অভিজ্ঞ মুস্তাফিজুরও নাইটদের ম্যাচ জেতালে, কলকাতা তথা বাঙলার ক্রিকেট-প্রেমীদের নয়নের মণি হয়ে উঠতে পারতেন! দেবজিত সইকিয়ার মতো ভুইফোঁড় বোর্ড কর্তারা এসব জানেন না। আর নামে কলকাতা থাকলেও, কেকেআর সংস্কৃতিতে কলকাতার উপাদান প্রায় রাখেনইনি শাহরুখ খানরা। ‘ক্রিকেট-বলিউড-সেক্স’-এর ত্রহ্যস্পর্শে আইপিএল বিনোদন-প্যাকেজ হিসেবে যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, এতে ক্রিকেটীয় উপাদান খুবই কম!

এখানেই মূল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তনয়, জয় অমিতভাই শাহ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল-এর(আইসিসি) সভাপতি। বিসিসিআই সভাপতি মিঠুন মানহাস বা হঠাৎ করে সঙ্ঘ পরিবারের কাছের লোক, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার অতিঘনিষ্ঠ বোর্ড সচিব দেবজিত সইকিয়ার নাম দেশের ক’জন ক্রিকেটপ্রেমী আজ জানেন? এরা জয় বা অমিত শাহর হাতের পুতুল মাত্র। আর জয় শাহরা ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই, উগ্র জাতীয়তাবাদকে ক্রিকেটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশিয়ে দিয়েছে। তাই পাকিস্তানের মাটিতে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাটচ না খেলে, স্রেফ গায়ের জোরে ভারত খেলে দুবাইতে! খেলার আগে বা পরে, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় ভারতীয় খেলোয়াড়দের ওপর! আড়াল থেকে এই নিষেধাজ্ঞা আসলে জারি করছে কেন্দ্রীয় সরকার, বর্তমান ক্রিকেট বোর্ড যার আজ্ঞাবহ দাস মাত্র! তাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত জিতলে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করে বলেন, ‘এটা ক্রীড়াঙ্গনের অপারেশন সিঁদুর; ফলাফল একই, ভারতর জয়!’

ভাবুন তো, রাজসিং দুঙ্গারপুর, আই এস বিন্দ্রা, জগমোহন ডালমিয়া প্রমুখ ব্যক্তিত্বর আমলে বিসিসিআই-এর ওপর এরকম ছড়ি ঘোরাতে পারত কোনও কেন্দ্রীয় সরকার? দক্ষ ক্রিকেট প্রশাসক হওয়ায়, ডালমিয়া-বিন্দ্রারা ক্রিকেট বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। তাই ১৯৯৮-৯৯ সালে, পোখরান বিস্ফোরণের পর, কার্গিল নিয়ে যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সীমান্ত, সেই সময়ে ওয়াসিম আক্রমের পাকিস্তান ভারতের মাটিতে দুই টেস্ট ম্যাচের সিরিজ খেলতে এসেছিল। আর চেন্নাই-এর চিদম্বরম স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টে হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে পঞ্চম দিনে জেতার পর আক্রম-আনোয়ার-সাকলিন মুস্তাকদের উঠে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানিয়েছিল গোটা স্টেডিয়াম। আবার দ্বিতীয় টেস্ট। অনিল কুম্বলের ঐতিহাসিক দশ উইকেটে ভর করে সিরিজে সমতা ফেরায় ভারত। দু’দেশের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিয়েছিল ক্রিকেট।

ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অলিম্পিক, বিশ্বকাপ ফুটবল সবকিছুর সঙ্গেই অতীতে একাধিকবার জড়িয়ে গিয়েছে রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন। তবে এই রাজনীতির দুটো রূপ। একটি উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক, যা গত শতাব্দীর তিনের দশকে হিটলার বা মুসোলিনির আমলে প্রকট হয়েছিল; এখন জয় শাহরা তার ধারক-বাহক। আর একটি হল, ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক-কূটনীতির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জোরদার করা, দু’দেশের মানুষের মধ্যে মৈত্রী সুদৃঢ় করা। অতীতে এই উদাহারণও বারবার দেখা গিয়েছে ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী জয়শঙ্কর যখন সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার জন্য, ওদেশে সফর করেছেন; আলোচনা করেছেন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান-সহ বাংলাদেশের আরও কয়েকটি দলের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে, ঠিক তখনই বিসিসিআই-এর এই পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করছেন দু’দেশের কূটনৈতিক মহলের একাংশ।

কেরলের কংগ্রেস সাংসদ, শশী থারুর যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মুস্তাফিজুর না হয়ে যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হত, তাহলে বিসিসিআই কি এই নির্দেশ দিত? আমরা কাকে শাস্তি দিচ্ছি, একজন ক্রিকেটারকে, ক্রিকেটকে, না একটা ধর্মকে?’ থারুর আরও যোগ করেছেন যে, খেলার সঙ্গে এভাবে রাজনীতি জড়িয়ে দেওয়াটা মূর্খামি। রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘ক্রিকেট তো দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে পারে, কিন্তু ভারতীয় বোর্ডের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।’ শশী থারুরও বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের উপদেষ্টার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেছেন। সিপিআইএমএল-লিবারেশন এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য্যর মতে ‘ঘৃণাভাষ‍্য ও এ ধরণের সংকীর্ণতা শুধু ক্রিকেট নয়, সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনেই কাম‍্য নয়। ভারত-বাংলাদেশ, সীমান্তের দু’দিকের সাধারণ মানুষই বিসিসিআই’এর এই সিদ্ধান্ত ভাল ভাবে নেবেন না। ক্রিকেট তো দু’দেশের মধ‍্যে সেতু হতে পারে।’

কিন্তু অমিত শাহ-রা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা, অশান্তি ও নৈরাজ্যের রাজনৈতিক ফয়দা তুলতে চান সীমান্তের এপারে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি যত অশান্ত হবে, ততই লাভ আরএসএস-বিজেপির। আগামী বাংলার বিধানসভা নির্বাচনেও। সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষারই বলি হন মুস্তাফিজুরের মতো ক্রিকেটাররা, বলি হয় দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সম্পর্ক, সর্বোপরি বলি হয় ক্রিকেট। এর আগে ২০০৮ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট-সম্পর্ক তলানিতে চলে গিয়েছে। এবার আরেক প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বিষিয়ে গেল।

বাঙলার সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিকরা যখন ওড়িশা, অসম, ছত্তিশগড়ের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে, বাংলাদেশি সন্দেহে রোজ হিংসার বলি হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন, তখন বাংলাদেশী মুসলিম বলে মুস্তাফিজুরকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া তাদের প্রতি ‘আক্রোশকে’ আরও বাড়াবেই শুধু নয়, ‘বৈধতা’ দেবে! এবং আরও দুঃখের বিষয় হল, সীমান্তের দু’প্রান্তেই সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রোশ আর ঘৃণা উসকে দেবে, অথচ বোর্ডের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণকে কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছিল।

শশী থারুর যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মুস্তাফিজুর না হয়ে যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হত, তাহলে বিসিসিআই কি এই নির্দেশ দিত? আমরা কাকে শাস্তি দিচ্ছি, একজন ক্রিকেটারকে, ক্রিকেটকে, না একটা ধর্মকে?’

এমনিতেই বিসিসিআইকে হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডার হাতিয়ার করে, আইপিএলকে সামনে এনে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট পরিকাঠামোর বড় ক্ষতি করে দিয়েছেন বর্তমান ক্রিকেট-প্রশাসকরা। স্পষ্ট কথায় বলা ভাল বিজেপি। হোয়াইট বল ক্রিকেটে কিছু সাফল্য পেলেও, ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টেস্ট সিরিজে গোহারা হারছে টিম ইন্ডিয়া! রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষ্মণ, অনিল কুম্বলে বা যশপ্রীত বুমরার মানের প্লেয়ার উঠে আসছে না! ফুটবল নিয়ামক সংস্থা এআইএফএফ-কেও একইরকম কব্জা করে দেশের ঘরোয়া ফুটবলেরও ক্ষতি করে চলেছেন তাঁরা। ভারতীয় দল এখন বাংলাদেশে গিয়েও ফিরে আসছে।

আন্তর্জাতিক স্তরে বড় সাফল্য পেলে, প্রধানমন্ত্রী-সহ বিজেপি নেতারা ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে পোজ দিয়ে খেলা নিয়ে লম্বা-চওড়া ভাষণ দেন, তাদের ওই স্টারদের কৃতিত্বে ভাগ বসাতে, কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গৈরিকিকরণ। জয় শাহ পরিচালিত আইসিসির বৈষম্যমূলক নীতিতে, ক্রিকেট মানচিত্রের বহু দেশ হারিয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডকে সঙ্গী করে ক্রিকেট বিশ্বে ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছে বিসিসিআই। তাদের লক্ষ্য ক্রিকেটীয়-পরিবেশ বিষিয়ে দিয়েও প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ঘৃণার আবহ জিইয়ে রাখা, যাতে ক্ষমতার রাজনীতিতে তার ফয়দা তোলা যায়। ১৯৯৮-৯৯ তে ভারতে যেমন উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন ওয়াসিম আক্রমরা; বাইশ গজের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সঙ্গে ভারত-পাক সিরিজ রেখে গিয়েছিল সম্প্রীতির বার্তা; বছর দু’য়েক আগে ভারতের মাটিতে একদিনের বিশ্বকাপ খেলতে এসে ততটাই ঘৃণা ও হেনস্থার শিকার হতে হয় বাবর আজমদের! এবার তালিকায় নতুন সংযোজন বাংলাদেশ। লিটন দাসদেরও ভবিষ্যতে ভারতের মাটিতে খেলতে হলে হয়তো বাবরদের দশাই হতে পারে! সাম্প্রদায়িক রং চড়িয়ে ক্ষমতার পাশা খেলা চলছে। এটা আর যাই-ই হোক, ক্রিকেট নয়।