সম্পাদকের রাজনীতি

Representative Image

নতুন বছরের শুরুর দিনে যখন কিনা আমরা সকলেই নিজের মতন আমোদ-আহ্লাদে ব্যস্ত, তখন অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিয়ে দু-চার কথা বলতে বসে কিছু তিক্ত প্রসঙ্গের অবতারণা পাঠকদের বিরক্তির কারণ হবে নিশ্চিত। মনে খানিক বল দিয়েছেন ইরানের চলচ্চিত্রকার, কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি। কয়েক যুগ আগেই লিখেছিলেন— নতুন বছরের প্রথম দিন সূর্য উঠেছিল তেমন করে, ঠিক যেমন করে উঠেছিল বছরের শেষ দিনে। সে-সূত্রেই বছরের অন্যদিনের মতোই কিছু তিক্ত-কথা বলাই চলে; পাঠকরা ক্ষমা করে দেবেন আশা রাখি। 

বিমল মিত্র এক স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, নিজেকে আড়ালে রাখতেই নাকি ভালবাসতেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। সবাই যখন বিকেলের আড্ডায় গিয়ে পৌঁছতেন তখন দেখা মিলত না তাঁর; সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার দৈনন্দিন কাজ শেষ করে চলে গিয়েছেন নিজ-ঘরে। লেখকদের বৈকালিক আড্ডায় তাঁর অনুপস্থিতিই ছিল নিয়ম। কোলাহল থেকে দূরে উত্তর কলকাতার ভাড়া ঘরে নিভৃতে এক কোণে হয়তো লেখাপড়া ব্যস্ত তখন তিনি। সম্পাদক অদ্বৈত তেমনটাই বোধহয় রয়ে গেলেন, নিভৃত এক কোণেই হয়তো বাস। তাঁর সম্পাদক সত্তা বেশ উপেক্ষিতই বলা চলে। আমাদের উদ্‌যাপন-প্রিয় চারিত্র তাঁকে কেবল ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর লেখক হিসেবেই মনে রেখেছে। সত্যি তো কী গভীর মমতায় আর দক্ষতায় জেলে-জীবনের কাহিনি বুনেছেন তিনি; কিন্তু এটাই কি তাঁর একমাত্র পরিচয়? খানিক অগোচরে রয়ে যায়নি কি তাঁর সম্পাদকীয়গুলো? সেরকম কয়েকটি সম্পাদকীয়ই এ-লেখার অবলম্বন।

আরও পড়ুন: আলোর ধারণা নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আধুনিক ও সোজাসাপ্টা কথায় চমকে গিয়েছিলেন আইনস্টাইনও…

বছরের শুরুর দিনেই তাঁর জন্ম। উৎসবের মরশুমে অদ্বৈত যে খানিক আড়ালেই রয়ে যাবেন এতে আশ্বর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে; ‘সাপ্তাহিক নবশক্তি’-র সম্পাদকীয়তে যে-প্রশ্নগুলি তিনি তুলেছিলেন কিংবা যে-আকুতি রেখেছিলেন, ১৯৪১ সালে সেগুলিকে ফিরে দেখা যেতেই পারে। আমরা, এই উপমহাদেশের বাসিন্দারা যে খুব একটা ভাল যে নেই সে-কথা অস্বীকার না-করাই শ্রেয়। অস্থির, বিদ্বেষের কালে আরেকটু মানবিক হওয়ার আর অপরের দিকে নজর ফেরানোর ক্ষেত্রে খানিক আড়ালে থাকা অদ্বৈতর সম্পাদকীয়গুলো কি আশ্রয় হতে পারে?

১৯৪১ সালের বিদ্বেষ, হানাহানির সময়কে কীভাবে দেখছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তার খানিক পরিচয় পাওয়া যাবে ‘সাপ্তাহিক নবশক্তি’র সম্পাদকীয়তে। এই ছোট লেখাগুলো অদ্বৈত মল্লবর্মণকে স্মরণ করার এবং আমাদের সময়কালকে ‘দেখা’-র আরেকটি সূত্র হতে পারে। সেই লেখাগুলিকে পরপর সাজিয়ে দিলে আমাদের সময়কালকে ‘পড়া’-র কিংবা ‘দেখা’-র একটা সূত্র সামনে হাজির করা যাবে বলে বিশ্বাস।

১৯৪১-এর ৭ মার্চের সম্পাদকীয়র বিষয় লোকগণনা। শিরোনাম-ও তাই। লোকগণনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং ঘৃণার আবহ তৈরি হয়েছিল অবিভক্ত বাংলায়, সে-মুহূর্তে অদ্বৈত লিখছেন— ‘আমরা হিন্দু ও আমরা মুসলমান-ইহার অধিক পরিচয় আজ আমাদের নাই। আমরা যে মানুষ এবং সবার উপরে যে মানুষ সত্য— এই সহজ কথাটা আজ আমরা ভুলিয়া গিয়াছি। মন্দির ও মসজিদ লইয়া বিরোধ বাধিয়াছে, অকারণে তুচ্ছ কলহে দেশের আবহাওয়া পঙ্কিল হইয়া উঠিয়াছে। মক্তব ও বিদ্যাপীঠে বিরোধ, টুপি ও টিকিতে বিরোধ, প্রতীক লইয়া বিরোধ, উপাসনার পদ্ধতি লইয়া বিরোধ, সাহিত্যে প্রকাশ ভঙ্গী লইয়া বিরোধ, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে বিদ্বেষ ও বিরোধ ঘনীভূত হইয়া উঠিয়াছে। সেই জন্য, সৌভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রী আজ আমাদের জাতীয় জীবন হইতে বিলুপ্ত হইতে বসিয়াছে। ইহার কি প্রতিকার নাই?’ অদ্বৈত মনে করছেন এ-বিরোধ আমাদের দীর্ঘকাল লালিত মৈত্রী, পরস্পরের জুড়ে-থাকার পরম্পরাকে নষ্ট করতে বসেছে।

প্রায় একমাস আগে আর-একটি সম্পাদকীয় বেরিয়েছিল ১৯৪১-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি। নাম ছিল ‘জিজ্ঞাসা’। একরকমের হতাশা, আকুতি, দরদী মনের ছাপ রয়েছিল সে-সম্পাদকীয়। প্রায় কবিতার মতন সে-লেখা— ‘মনে হয় আমরা মৃত্যুর অতল অন্ধকারে ডুবিয়া আছি। আমাদের মনুষ্যত্ব যেন কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। এই যে শোণিত লোলুপ মানুষ— রক্তে যাহার মৃত্যুর উন্মাদনা, দৃষ্টিতে যাহার হিংস্র নির্মমতা, এই যে হানাহানি রক্তপাত— তার মধ্যে সেই বিরাট মানব সত্তা, সেই মানুষের তপস্যা, সেই মানুষে মানুষে অন্তরের যোগসূত্র স্থাপনের সাধনা যেন বিচ্ছিন্ন বিভ্রান্ত হইয়া ভাঙিয়া চুরিয়া বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। সেই অখণ্ড মানব সমাজের কল্যাণ কামনা, মানুষের পরম এবং সার্বিক আত্মাকে আবিষ্কার করিবার ও প্রতিষ্ঠা করিবার বিরামহীন প্রচেষ্টা আজ হিংসা ও শোণিতের বন্যায় বিক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত। মানুষ কী চায়? কেন আজ এই আত্মবিক্ষেপ, এই বিক্ষোভ, এই বিদ্রোহ? বুদ্ধি ও হৃদয়বৃত্তির এই সংঘাতের মধ্যেই কি সেই পরম সত্যের সন্ধান মিলিবে যেখানে মনুষ্যত্ব চরম পরিণতি লাভ করিবে? এই সংঘর্ষের হলাহলের মধ্যেই কি জন্মলাভ করিবে মনুষ্য ধর্মের পূর্ণতম অভিব্যক্তি-মানবাত্মার পূর্ণতম প্রকাশ?” সভ্যতার প্রাক লগ্নে আমরা জেনেছিলাম আমরা নাকি অমৃতের সন্তান। কিংবা সম্বন্ধ রচতে চেয়েছিলাম নিখিল মানবের সঙ্গে। কেন তবে সেই সংযোগের বাসনার পথ ছেড়েছে সে? কার স্বার্থে?

অদ্বৈতের সম্পাদকীয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বা অক্ষর হল জিজ্ঞাসা চিহ্ন। এর ব্যবহার খানিক গুরুত্বের দাবিও রাখে। আমাদের যুক্ত-সাধনা থেমে যাওয়ার ব্যঞ্জনা বহনকারী কি এ যতিচিহ্ন, তেমন কি ভাবছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ? আর এই বিরোধ কি দুটি ধর্মের দুই সংস্কৃতির? ১৯৪১-এর ২১ মার্চের সম্পাদকীয়তে বরং উলটো কথাই লেখা আছে। ‘যাহারা মনে করেন বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের মধ্যে যে-বিরোধ আজ মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে, তাহা এমনই একটা সংস্কৃতিগত বিরোধ যে ইহার কোন সমাধান নাই তাহাদের সহিত আমরা একমত নহি। আমাদের মতে এই বিরোধ এমনই একটা ঠুনকো কাল্পনিক ভিত্তির উপরে দাঁড়াইয়া আছে…’ অদ্বৈত মনে করেন— ‘প্রকৃতপক্ষে ইহা সাম্প্রদায়িক বিরোধ নহে মুষ্টিমেয় লোকের স্বার্থের সংঘাত মাত্র।’ একদল স্বার্থান্বেষী লোকের বানিয়ে তোলা ভয়, বিদ্বেষ এবং বিনষ্টের আকাঙ্ক্ষাই জটিল-কুটিল করে তুলেছে পরিস্থিতি। বিস্মরণ ও মিথ্যা-স্মৃতি নির্মাণের কালে দাঁড়িয়ে তাঁর আড়ালে থেকে যাওয়া লেখাগুলিকে আরেকবার পড়া জরুরি নয় কি? যখন কিনা ইতিহাস নিছক জ্ঞানচর্চার একটা শাখা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, ইতিহাস-চর্চা নিজেই হয়ে উঠেছে বোমা তৈরির কারখানা। অন্তত আমাদের চারপাশের ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দিলে তেমনটা মনে হওয়া হয়তো অস্বাভাবিক ঠেকবে না।

অদ্বৈতের সম্পাদকীয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বা অক্ষর হল জিজ্ঞাসা চিহ্ন। এর ব্যবহার খানিক গুরুত্বের দাবিও রাখে। আমাদের যুক্ত-সাধনা থেমে যাওয়ার ব্যঞ্জনা বহনকারী কি এ যতিচিহ্ন, তেমন কি ভাবছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ? আর এই বিরোধ কি দুটি ধর্মের দুই সংস্কৃতির?

ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের গবেষকরা অনেক দশক আগেই ফ্যাসিবাদের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। বুঝতে চেয়েছিলেন কেন, কোন উপায়ে তারা মানুষের মনে ঘৃণা আর বিদ্বেষ তৈরিতে সফল হয়। কোন কোন ধারণা, প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য জারিয়ে তুললে মানুষ সে-দিকে আকৃষ্ট হয়। সে-নিয়ে তাঁদের অন্তদৃষ্টি-পূর্ণ ভাবনা-চিন্তা আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে। কিন্তু কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে সেই সমস্যার সে-নিয়ে ভেবেছিলেন তাঁরা। সে-ভাবনায় ছিল ভালোবাসা আর সৃষ্টির প্রবৃত্তির প্রতি পক্ষপাত। যদি ভয় আর ধ্বংসের ইচ্ছাকে জারিয়ে তোলা, দীর্ঘস্থায়ী করাই হয় ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড়ো ইমোশনাল উপাদান/আযুধ, তাহলে ভালোবাসা আর সৃষ্টির বাসনা দায়বদ্ধ থাকে গণতন্ত্রের প্রতি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখাপত্রের মধ্যে কি ভালোবাসা, মৈত্রীর প্রতি পক্ষপাতের ইঙ্গিত পাই না আমরা?