মাঝরাস্তার পথিক

Representative Image

‘মিডল রোড’ শব্দটির উত্থান ভারতীয় সিনেমায় ঘটেছিল মোটামুটি আটের দশকে। বাণিজ্যিক ও সমান্তরাল— এই দুই ধারার ছবির বোঝাপড়ার মাঝামাঝি একটি রাস্তা, যেখানে কিঞ্চিৎ বাণিজ্যিক মশলাও আছে, আবার সমান্তরালের সংবেদনশীলতাও আছে। কুন্দন শাহ-র ‘জানে ভি দো ইয়ারো’, কেতন মেহতা-র ‘মির্চ মশালা’, রবীন্দ্র ধর্মরাজের ‘চক্র’ জাতীয় ছবিগুলিকে এই তকমা দেওয়া হত। কিন্তু বাংলা ছবিতে এই অভিধা দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হয়েছে যাঁদের, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম তপন সিংহ।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনদের শিল্পসম্মত ছবির গতির মধ্যেই জনপ্রিয় ছবি তার সোপান গড়ছিল, যা খানিক অলক্ষিতই থেকে গিয়েছিল। তপন সিংহর ছবি সেই জনপ্রিয়তার জয়যাত্রায় সরাসরি শামিল ছিল, এমনটা নয়। বিধানচন্দ্র রায় যে একবার একটি ভাষণে ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’-র পরিচালকের নাম গুলিয়ে ফেলেছিলেন, তা এমনি-এমনি নয়। তপন সিংহ সমান্তরাল ধারায় সেই ছাপ রাখছিলেনই। কিন্তু কোথাও একটা বিচ্যুতি তৈরি হচ্ছিল, যা তপন সিংহকে সরিয়ে রাখল শৈল্পিক ছবির পরিচালকদের থেকে, আবার তথাকথিত মূলধারাতেও তাঁর নামটা সরাসরি উচ্চারিত হল না।

আরও পড়ুন: বেলা টার সারাজীবন বাস্তবতার গভীরে গিয়ে, একটাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গিয়েছেন! লিখছেন শুভ রায়চৌধুরী

কেন তপন সিংহ-র সঙ্গেই এমনটা হল?

‘দ্য সোশ্যাল হিস্ট্রি অফ আর্ট’ বইতে আর্নল্ড হাউসার বলেছিলেন, শিল্প ও জনপ্রিয়তার মধ্যে যত টানাপোড়েনই থাকুক না কেন, মানুষ গুণগতভাবে ভাল শিল্পকে, নিম্নমানের শিল্পের তুলনায় কিছুটা বেশি গুরুত্ব চিরকালই দিয়ে এসেছে। এই মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা, ভুল-ঠিকের বিবেচনাকে খানিক বাদ রাখা যাক আপাতত। কিন্তু কেবলই এই মন্তব্যের নিরিখে পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় সাতের দশকে একটি নিবন্ধ লেখেন, ‘বাংলা ছবির সংকট’ শিরোনামে। সেই নিবন্ধ জুড়ে, মূলধারার0 বা ‘জনপ্রিয়’ ধারার সঙ্গে শৈল্পিক ছবির ধারার সংঘাত নিয়ে একটি প্রতর্ক তৈরি করেছিলেন পার্থপ্রতিম। সেখানে পার্থপ্রতিম বলছেন, শিল্পসম্মত ছবির ধারা যেখানে মধ্যবিত্তকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে বারবার, মধ্যবিত্তর সামনে ধরছে ময়নাতদন্তের আয়না, সেখানে বাণিজ্যিক ছবি, বা জনপ্রিয় ছবি, লেখকের ভাষায় ‘বাঙালি উদভ্রান্ত মধ্যবিত্ত’-কে তোষণ করে চলেছে। সেই প্রসঙ্গে পার্থপ্রতিম উল্লেখ করেন তপন সিংহ-র সেই সময়ের দু’টি ছবির কথা, যা তাঁর কলকাতা ট্রিলজি-র অন্যতম বাণিজ্যসফল দু’টি ছবি। ‘আপনজন’ ও ‘এখনই’। পার্থপ্রতিম বলছেন, মধ্যবিত্তর অসহায়তার মাঝেই মস্তান যুবকদের আকাঙ্ক্ষাকে বেশ সুচারুভাবে মিলিয়েছেন তপন সিংহ, ‘আপনজন’-এ। ‘এখনই’-তে অপর্ণা সেন-শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য, যাকে পার্থপ্রতিম ‘জোরদার’ দৃশ্য ইত্যাদি বলছেন, তার কথাও উল্লেখ করে পার্থপ্রতিম একে প্রায় ‘বাঙালি নবতরঙ্গ’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন।

এই প্রবন্ধের এই অংশটুকুর উল্লেখ জরুরি ছিল, তপন সিংহর চলচ্চিত্রভাষ্যর সঙ্গে তৎকালীন সমালোচকদের ঠিক কীরকম সংলাপ চলত, তা বোঝার জন্য। একেবারে শেষ মন্তব্যটি যদি স্মরণে রাখা যায়, তাহলে একথাও মাথায় রাখতে হবে, ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই সাতের দশকেই যে নবতরঙ্গের সূত্রপাত ঘটবে, শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনিদের হাত ধরে, বা যার সূত্রপাত কিছুটা লুকিয়ে ছিল বাসু ভট্টাচার্যদের ‘সারা আকাশ’-এ, এবং প্রায় ঘোষণা ছিল মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’-এ— তা নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব কিছু সমালোচনা ছিল। কিন্তু তপন সিংহ কি সত্যিই বাংলা ছবিতে কোনও নবতরঙ্গের সূত্র রেখেছিলেন?

‘আপনজন’-এর একটি হিন্দি ভার্সনও হয়, বিনোদ খান্নার অভিনয়ে, ‘মেরে আপনে’। সেই ছবি পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক। আর এই দশকেই, ওই ভারতীয় ‘নিউ ওয়েভ’-এর পাশাপাশি যে ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’ যুগের রবরবা চলল, তার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা যেতে পারে ‘মেরে আপনে’-কে। কিন্তু ‘আপনজন’ যে রাগী যুবকদের কথা বলে, তা সাতের দশকের বাংলার নিজস্ব। রাজনৈতিক ভাষ্যে যে-সহিংসতা ছিল, এই সমাজ-বিরোধিতার প্লাবন তার বিপ্রতীপেই ছিল। কিন্তু বেকারত্ব, সংকটে ভরা সেই দশকের ইতিহাসে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আখ্যান অবলম্বনে, তপন সিংহর এই চলচ্চিত্র, এই যুবককুলের প্রতি সমব্যথী হয়েছিল, যার সম্পূর্ণ বিপরীতাভাস তাঁরই ছবিতে উঠে আসবে আর ঠিক এক দশক পরে, যখন তিনি ‘আতঙ্ক’, ‘অন্তর্ধান’ ও ‘আদালত ও একটি মেয়ে’-র সামাজিক চলচ্চিত্রত্রয়ী নির্মাণ করবেন। তার কারণও খুব অস্পষ্ট নয়। ‘আপনজন’-এর যুবকরা এক দৃশ্যে বসে চাকরির পরীক্ষা নিয়ে হতাশার কথা বলে, রবি আর তার বন্ধু যখন এই সংলাপ চালায়, বিমর্ষ চিত্তে, তখন নেপথ্যে চলে একটি বল নিয়ে লোফালুফি, যুবকরা গাইছে ‘আলো আমার আলো’। ছেনো-রবির সংঘাতের মাঝে আসল ক্রীড়নক যে রাজনীতিবিদরা, তাঁদের চরিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও রবি ঘোষের খানিক গা-জোয়ারি কমিক অভিনয়ে একথাও স্পষ্ট হয়, আদত খলনায়কদের তপন সিংহ কিছুটা সং সাজিয়েই রাখতে চান। রবি আর ছেনো দু’জনেই আদতে পরিস্থিতির শিকার হয়। শেষে গুলির আঘাত যদিও আনন্দময়ীকে নিহত করে, কিন্তু দিনের শেষে রবি আর ছেনোর দলবল বিভ্রান্ত যৌবনের সহায়হীন প্রতিনিধিই হয়ে থাকে, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্দরে ধান্দা, সুবিধাবাদ ও লোভের চেহারাকে বেআব্রুও করেন তিনি। কিন্তু দিনের শেষে ‘আপনজন’, ‘যদুবংশ’-র মতো কোনও আঁধারাচ্ছন্ন স্টাইল নেয় না, বরং কিছুটা ট্র্যাজিকমেডি-ই এই ছবিকে ঘিরে থাকে।

এই ত্রয়ীর অন্য দু’টি ছবি ‘এখনই’ আর ‘রাজা’ তুলনায় কিছুটা সিরিয়াস। কিন্তু রসবোধ, করুণরস ও সামাজিক নীতিবোধকে তপন সিংহ তাঁর মতো করেই চিত্রিত করে যান তাঁর বিভিন্ন ছবিতে, যে-চলচ্চিত্রভাষা হয়তো ‘অউতর’ (Auteur) নয় আজকের ভাষায়। তপন সিংহ রবীন্দ্রকাহিনি যখন চিত্রায়িত করেছেন, জরাসন্ধর ‘লৌহকপাট’ বা সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’-র আধুনিক মনন ছুঁয়েছেন যখন, বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশ্চাত্য-অনুপ্রাণিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘ঝিন্দের বন্দী’-কে হলিউডি ধাঁচে হাজির করেছেন, বারবার তিনি ঘুরে বেরিয়েছেন আখ্যানকে সরলভাবে, কিন্তু নতুন চলচ্চিত্রের ভাষায় উপস্থাপনের আঙিনায়। ‘হারমোনিয়াম’-এর মতো হাইপারলিংক ছবি যখন বানাচ্ছেন তপন সিংহ, তখন যেমন নিশ্ছিদ্র কমেডির আভাস রয়েছে অশোক ও সোনালির প্রেম ও পালিয়ে যাওয়ার গল্পে, তেমনই সামন্ততন্ত্র ভেঙে পড়ার ঐতিহাসিক বিপর্যয় থেকে, সুধা বা বিমলার কাহিনিসূত্র ধরে নারীর অবস্থানের রাজনীতিকে সামাজিক আখ্যানের অছিলাতে ছুঁয়ে যাচ্ছেন।

বিপ্লবী রাজনীতি করা তরুণ (সন্তু মুখোপাধ্যায়) ও পুলিশের দারোগার সংলাপে (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) হোক বা অশোক-বাসন্তীর (ভীষ্ম গুহঠাকুরতা ও সোনালি গুপ্ত) পালিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের বাবারা (কালী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্তোষ দত্ত) যখন সংঘাতে যায়, তখন আদতে রসিকতাকে আশ্রয় করে রাজনৈতিক টালমাটালকে চিহ্নিত করা, নতুন যৌবনের দুঃসাহসকে সামাজিক মোড় হিসেবে দেখা, বিয়ের বাসরে ‘মধ্যবিত্ত মানস’কে আতসকাচের সামনে রাখা, যেখানে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট-এর প্রতিও কিছুটা ইঙ্গিত থেকে যায়— তাকে কেবলই ‘কমেডি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? ‘নবান্ন’ যে বিয়েবাড়ির বাইরের অঙ্গনের ভয়াবহতা ধরেছিল, তপন সিংহ-র ক্যামেরা আকার-ইঙ্গিতে তেমনই এক বিয়েবাড়ির অন্দরে পৌঁছে যায় না কি?

এই সাতের দশকের শেষের দিকে দীপঙ্কর দে অভিনীত ‘এক যে ছিল দেশ’ যেমন সরাসরি রাজনৈতিক স্যাটায়ার। তার মধ্যে ভণিতার আভাস নেই কোথাও, কেবল, মৃণাল সেনের ‘কোরাস’ যেখানে আঁকাড়া রাজনৈতিক, সেখানে তপন সিংহ সাধারণ্যর ভাষ্যকে সরাসরি আশ্রয় দিচ্ছেন। বাংলা মূলধারার ছবির থেকে এগিয়ে থেকে, আবার সরাসরি শৈল্পিক ছবির মতো নির্মম না হয়ে (যা সময়ের প্রেক্ষিতে অবশ্যই জরুরি ছিল), তপন সিংহ এক মানবিক আখ্যানেই গুরুত্ব দেন।

‘এক যে ছিল দেশ’-এর ক্লাইম্যাক্সে সৎ বৈজ্ঞানিক হয়তো রাজনীতিবিদদের নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারেন, কিন্তু ‘আতঙ্ক’-র মাস্টারমশাই (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) ততটাও পেরে ওঠেন না। শেষে সমাজবিরোধীরা জেলে যায় বটে, এবং দেখা যায়, তাকে চালনা করা নেতাটি ঠিকই গা বাঁচিয়ে নিল, কিন্তু সততা ও আদর্শবাদের লড়াই যে বস্তুত সেই সময় কতটা কঠিন, তা ‘আদালত ও একটি মেয়ে’-র আদর্শবান পুলিশ অফিসার (মনোজ মিত্র) বা ‘অন্তর্ধান’-এ অসহায় মেয়ের বাবার (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বারবার আহত হওয়ার অভিঘাতেই স্পষ্ট হয়। এইসব ছবিগুলির আখ্যানভাগ, বা নেপথ্যের বার্তাও তুলনায় আগের চেয়ে বেশি জনমানস-অনুসারী। ‘হুইলচেয়ার’ সেই তুলনায় কিঞ্চিৎ মানবিক জটিলতাকে আশ্রয় করে, কিন্তু সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সেখানেও তপন সিংহ, খানিক নৈর্ব্যক্তিকতার বিরুদ্ধে গিয়েই সোচ্চার। সেই সময়ে মৃণাল সেন তুলনায় অনেকটা অন্তর্বর্তী হচ্ছেন, ক্যামেরাকে করে তুলছেন তীক্ষ্ম ও মধ্যবিত্তর দ্বিচারী মনের প্রতি নির্মোহ ও নিষ্ঠুর।

তাই বাকি পরিচালকদের মতো, তপন সিংহ-ও তাঁর গতিপথ বদলেছিলেন, তাঁর নিজস্ব ভাষ্যে, বারবার। না, নবতরঙ্গ নয়, ব্যক্তিগত এক চলচ্চিত্রবয়ান তাঁর ছিল, যা বামপন্থা-অনুসারীও নয় সরাসরি, কিন্তু সমাজ-রাজনীতি-নিরপেক্ষ, একথা তাঁর কঠিনতম সমালোচকরাও বলতে পারবেন না। দুই ধারা তাঁকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি, কিন্তু নিজস্ব শৈল্পিক সোপানে তিনি অটুট, তাঁর মতো করেই।